অজ্ঞাতপরিচয় ভিখিরির শব কাঁধে করে বয়ে আনলেন, সৎকারও করলেন মহিলা পুলিশ অফিসার

দ্য ওয়াল ব্যুরো: বেশিদিন আগের কথা নয়। পয়লা ফেব্রুয়ারির ভোর- পথে ঘাটে তখনও দুধের সরের মতো লেগে আছে শীতের কুয়াশা। অন্ধ্র প্রদেশের শ্রীকাকুলাম জেলার একটা প্রান্তিক ছোট্ট থানার মধ্যে সেই ভোরবেলায় ডিউটি দিচ্ছিলেন মহিলা সাব-ইন্সপেক্টর ২৬ বছর বয়সী কোট্টুরু সিরিশা। রাত্রিজাগার ক্লান্তিতে সবে একটু চোখ লেগেছে, আচমকা ঝনঝন করে বেজে উঠল টেবিলের উপরের ফোনটা। ফোন করেছেন অল্প দূরের সামপাঙ্গিপুরম লাগোয়া আদাভিকটুট্টু গ্রামের লোকজন। সিরিশা টের পেলেন ফোনের অন্য প্রান্তে তাদের গলা কাঁপছে। কাঁপবে না-ই বা কেন! গ্রামের চৌহদ্দির বাইরে কুয়াশায় ভেজা ঘাসের উপর পাওয়া গেছে অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তির লাশ। ভোরবেলা ঘুম ভেঙে সম্ভবত প্রকৃতির ডাকে ওদিকে গেছিলেন গ্রামের কেউ। তিনিই প্রথম দেখতে পান লাশটাকে। কথাটা চাউর হতে খুব বেশি সময় নেয়নি। স্বাভাবিকভাবেই আতঙ্কিত গ্রামবাসীরা ফোন করেন পুলিশ স্টেশনে।

অত ভোরে পুলিশস্টেশনেও লোক কম। শেষমেশ জনা দুই কনস্টেবলকে নিয়ে ইন্সপেক্টর সিরিশা যখন সেই গ্রামে পৌঁছয়, তখন দিনের আলো ফুটে গেছে৷ গ্রামে পৌঁছলেও যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে পুলিস ভ্যান নিয়ে ঘটনাস্থলে ঢুকতে পারেনি তাঁর টিম। গাড়ি যাবে না, পায়ে হাঁটা ছাড়া উপায় নেই। অগত্যা গ্রামবাসীদের পিছন পিছন ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখা যায় মাটিতে পড়ে আছে এক প্রবীণ বয়স্ক মানুষের লাশ, সারারাত শিশিরে ভিজে সে দেহ শক্ত কাঠ হয়ে গেছে ততক্ষণে।

প্রথম দর্শনে সেটা কোনও ভিখিরির মৃতদেহ বলেই মনে হয়েছিল সিরিশার। অজ্ঞাতপরিচয় দেহ যখন, তার কিছু ডাক্তারি পরীক্ষানিরীক্ষা তো হবেই। এদিকে লাশ তো শক্ত কাঠ। দুজন কনস্টেবলের কাজ নয় তাকে গাড়ি অব্দি টেনে নিয়ে যাওয়া। তাই সিরিশা গ্রামবাসীদের কাছে অনুরোধ করলেন হাত লাগাতে।

কিন্তু ফল হল বিপরীত। কোন জাতের মরা কে জানে! তার উপর কোভিড রোগীও হতে পারে। গ্রামবাসীরা তো এগিয়ে এলোই না, এমনকি বেঁকে বসল সঙ্গের পুরুষ কনস্টেবলরাও। অজানা বুড়ো ভিখিরির মরা ছোঁবে না কেউ। কারও সাহায্য পাবেন না, বুঝতে পেরে তখন একাই সেই মৃতদেহ তুলতে চেষ্টা করলেন ২৬ বছরের সেই তরুণী সাব ইন্সপেক্টর।

একসময় ললিথা চ্যারিটেবল ট্রাস্টের সঙ্গে একসময় যুক্ত ছিলেন সিরিশা। ভিড়ের মধ্যে সেদিন ঘটনাস্থলে হাজির ছিলেন ওই ট্রাস্টের ভলিন্টিয়ার চিন্নি কৃষ্ণ। ৫৩ বছরের প্রৌঢ় চিন্নি কৃষ্ণ একমাত্র সেদিন এগিয়ে এসেছিলেন সিরিশার পাশে। কোনওরকমে একটা স্ট্রেচার বানিয়ে দুজনে মিলে ধরাধরি করে বহু কষ্টে মৃতদেহটিকে স্ট্রেচারে তোলেন। তারপর স্ট্রেচারটা প্রায় নিজের কাঁধেই তুলে নেন তরুণী সিরিশা, আর গ্রামের সরু আলপথ ধরে সেই মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে হাঁটতে শুরু করেন।

এবড়োখেবড়ো সরু রাস্তা, তার উপর দিয়ে কাঁধে একটা শব নিয়ে সেদিন টানা আধঘণ্টার উপর হেঁটে প্রায় ২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছিলেন ওই ২৬ বছরের তরুণী। শরীর ভেঙে পড়লেও বারবার মানবিকতার দোহাই দিয়ে নিজেকে শক্ত রেখেছেন। গ্রামের শেষপ্রান্তে তাঁর গাড়ি পর্যন্ত এভাবেই কাঁধে করে বয়ে নিয়ে আসেন অজ্ঞাতপরিচয় এক বুড়ো ভিখিরির লাশ।

সিরিশার সঙ্গী এক কনস্টেবল আগাগোড়া বিষয়টি ভিডিও করেন। পরে সেই ভিডিওই ভাইরাল হয়ে ছড়িয়ে পড়ে নেটে। ভিডিও করলেও আশ্চর্যের ব্যাপার, সারিশার ভার লাঘব করতে একবারও কিন্তু এগিয়ে আসেননি সেই কনস্টেবল। অবশ্য সেসব নিয়ে কোনও রাগ-ক্ষোভ নেই কট্টুরু সিরিশার। নিজের ডিউটিটুকু করতে পেরেই তিনি খুশি।

বৃদ্ধের লাশ এতটাই দুর্বল আর ক্ষয়িষ্ণু ছিল, একঝলক দেখে সিরিশার মনে হয়েছিল সম্ভবত অনেকদিন অনাহারে থাকার ফলেই মারা গেছেন ওই বুড়ো ভিখিরি। খোঁজখবর করে মৃতের পরিচয় জানা গেলেও দাহ করার সময় দেখা গেল আরেক বিপত্তি। মঙ্গলবারে না কি মৃত মানুষের সৎকার করা যায় না, তাতে সংসারে অমঙ্গল আসে- এইসব কুসংস্কারের দোহাই দিয়ে বৃদ্ধের পরিবার সেই লাশের শেষকৃত্য করতে অস্বীকার করে। এবারও এগিয়ে আসেন সেই তরুণী সাব-ইন্সপেক্টর কট্টুরু সিরিশা। ললিথা চ্যারিটেবল ট্রাস্টের সঙ্গে যৌথভাবে তিনিই শেষকৃত্য করেন সেই মৃত ভিখিরির।

২০১৪ সাল থেকে আবগারি দফতরে কাজ করেছেন সিরিশা। ২০১৭ সাল নাগাদ এস.আই পরীক্ষায় পাশ করেন। পরবর্তী তিন বছর ইনস্পেকটর হিসাবে একাধিক থানায় কাজ করেছেন তিনি। মারামারিতে আহত মানুষজনকে হাসপাতালে নিয়ে গেছেন বেশ কয়েকবার। পথদুর্ঘটনায় মৃত ব্যক্তিকেও হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়েছে অনেকবার। কিন্তু আদাভিকটুট্টুতে তাঁর যে অভিজ্ঞতা হল, তা একেবারে অভিনব।

একজন আইন রক্ষকের এ হেন মানবিক মুখ দেখে প্রশংসার বান ডেকেছে চারিদিকে। অন্ধ্র পুলিশের তরফেও এই বিরল মানবিকতার স্বীকৃতি হিসাবে ইতিমধ্যেই সম্বর্ধনা জানানো হয়েছে এই মহিলা সাব ইন্সপেক্টরকে। কিন্তু এই সম্মান-সম্বর্ধনার ভিতরেও আশ্চর্য শান্ত সিরিশা। অসুস্থ, মৃতপ্রায়, এমনকি মরে যাওয়া মানুষের জাত নিয়েও প্রশ্ন ওঠে যে সমাজে, যেখানে এখনও বার-তিথি-নক্ষত্রের কুসংস্কারে আটকে আছে মানুষ, তার মধ্যেই সিরিশার মতো তরুণ আইনরক্ষকেরা নিঃসন্দেহে একঝলক তাজা হাওয়া।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More