দেহব্যবসা ছেড়ে জলদস্যু, এই মেয়ের নামে কাঁপত ওলন্দাজ-ব্রিটিশেরা

দ্য ওয়াল ব্যুরো: ‘দেবী চৌধুরানী’ উপন্যাসের প্রফুল্লকে মনে আছে? সেই যে গরীব বিধবার মেয়ে, স্বামী-সংসার নিয়ে সুখে থাকতে চেয়ে পাকেচক্রে হয়ে উঠেছিল ভয়ংকর এক ডাকাত দলের সর্দার… দলবল নিয়ে বজরায় চেপে ত্রিস্রোতা নদীর বুকে ঘুরে বেড়াত সেই ডাকাত রানি। গল্পকথা নয়, বাস্তবেও এই মহাদেশের বুকে সত্যি সত্যিই ছিলেন এক দেবী চৌধুরানি। জাহাজে চেপে এ সমুদ্র থেকে ও সমুদ্রে ঘুরে বেড়ানো সেই নৃশংস দস্যুরানিকে ভয় পেতনা, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার ছিল সেসময়। বিদেশি বণিকদের নৌবহরে ঝাঁপিয়ে পড়ে লুঠতরাজ ছিল সেই দস্যুদলের রোজকার ঘটনা। তাঁর ভয়ে বাণিজ্যপথ অব্দি বদলে ফেলেছিল ব্রিটিশ-পর্তুগিজেরা। কিন্তু বাংলার দেবী চৌধুরানীর মতো সেই কুখ্যাত জলদস্যু-রানির জীবনেও ছিল এক আশ্চর্য নরম অতীত।

১৭৭৫ সালে চিনের একেবারে দক্ষিণে গুয়াংডং প্রদেশের এক সামান্য পরিবারে জন্মেছিলেন এক অসামান্য মেয়ে। ইতিহাস তাকে চেনে চিং শিহ নামে। যদিও এটা মোটেও তাঁর আসল নাম নয়। জন্মের পর বাবা মা মেয়ের নাম রেখেছিলেন শিল জিয়াং গু। পরমাসুন্দরী হলেও গরীব ঘরের মেয়ে, অবস্থার চাপেই সম্ভবত শরীর বিক্রির পেশাকেই জীবিকার পথ হিসাবে বেছে নেন শিল জিয়াং গু। সেই আদিম পেশার হাত ধরেই তাঁর জায়গা হয় সমুদ্রের কাছাকাছি এক ভাসমান পতিতালয়ে।

এটা যে সময়ের কথা, তখন চিনের বন্দরে বন্দরে রাজত্ব করত জলদস্যুরা। তেমনই এক জলদস্যু সর্দার ছিলেন ঝেং ই ( মতান্তরে জিং ইয়ে)। ‘রেড ফ্ল্যাগ ফ্লিট’ নামে বিশাল এক নৌবহর নিয়ে ক্যান্টনের আশেপাশে দাপিয়ে বেড়াত এই কুখ্যাত জলদস্যু। তারপর যা হয়, নিয়তির অমোঘ ইশারায় কীভাবে যেন ঝেং ই-র সঙ্গে দেখা হয়ে যায় সুন্দরী বারবণিতা চিং শিহ’র।

চিনের বন্দরে বন্দরে রাজত্ব করত জলদস্যুরা

চিং শিহ’র সঙ্গে জলদস্যু সর্দারের প্রেম নিয়ে নানা গল্প ছড়িয়ে আছে চিনা লোককথায়৷ কেউ বলে, বন্দরের পথেই তাঁদের প্রথম দর্শন, আর সেখান থেকেই সুন্দরী চিং শিহ’র প্রেমে পড়েন দস্যু সর্দার। আবার কোনও কোনও উপাখ্যান বলে, একবার পতিতাপল্লী লুঠ করে সব মেয়েদের ধরে নিয়ে আসার হুকুম দিয়েছিলেন ঝেং ই। সেই মেয়েদের দলে অপরূপা চিং শিহ-ও ছিলেন। তাঁকে দেখেই মাথা ঘুরে যায় দস্যু সর্দারের। সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বসেন চিং শিহ-কে৷ শোনা যায়, বিয়ের আগে না কি বেশ কঠিন একটা শর্ত রেখেছিলেন চিং শিহ। তিনি স্পষ্টই জানিয়ে দেন, জলদস্যুদের লুঠ করা ধনদৌলতের অর্ধেক ভাগ দিতে হবে তাঁকেও, তাহলেই পুরোনো জীবন থেকে নতুন এই ঝুঁকির জীবনে পা দেবেন তিনি।

প্রেমে অন্ধ ঝেং ই যে তাঁর সমস্ত শর্তই নির্দ্বিধায় মেনে নিয়েছিল, সেটা বোধহয় আর বলার অবকাশ রাখে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দস্যু সর্দারের সঙ্গে সুন্দরী চিং শিহ’র বিয়েটা হয়েছিল কী না সেটা নিয়ে খুব স্পষ্ট কোনও তথ্য পাওয়া যায় না। তবে ১৮০১ সালের কাছাকাছি সময় থেকেই তাঁরা একসঙ্গে বসবাস করতে শুরু করেন। শুধু সহবাসই নয়, ব্যক্তিত্ব আর বুদ্ধিমত্তার জোরে ‘রেড ফ্ল্যাগ ফ্লিট’এর দস্যুদলে নিজের প্রভাব-প্রতিপত্তিও বাড়িয়ে তুলেছিল চিং শিহ। সম্পত্তির ভাগ তো ছিলই, পাশাপাশি দল চালানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোতেও এই সময় থেকেই বেশ বড়রকম ভূমিকা নিতে শুরু করেন চিং শিহ।

সুন্দরী চিং শিহ

জলদস্যুদের জীবনে সে ছিল এক আশ্চর্য সুসময়। এই দুজনের নেতৃত্বে ২০০ জাহাজের নৌবহর কিছুদিনের মধ্যেই বাড়তে বাড়তে প্রথমে ৬০০, তারপর প্রায় ১৮০০ জাহাজের এক বিরাট নৌসেনায় পরিণত হয়। নানা রঙের পতাকা দিয়ে সেসব জাহাজের ক্ষমতা প্রকাশ করা হত। দস্যুদলের সর্দারদের জাহাজে থাকত লাল পতাকা। বাকি জাহাজগুলোর মাথাতেও ক্ষমতা আর কাজ অনুসারে নীল, কালো, সবুজ নানারঙের পতাকা থাকত।

এই সময় আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন চিং শিহ। ওই এলাকার আরেক কুখ্যাত জলদস্যু ইয়ু শি’র সঙ্গে একটা সমঝোতা চুক্তি করেন তাঁরা। এর ফলে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, দস্যুদের নিজেদের মধ্যে মারামারি, লোকক্ষয় – এসব অনেকটাই কমে যায়। দক্ষিণ সমুদ্রে ক্যান্টোনিজ জলদস্যুদের একটা শক্তিশালী জোট গড়ে ওঠে। কিন্তু দস্যু দলপতি ঝেং ই-র সুসময় দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। বিয়ের মাত্র ছ’বছরের মাথায় এক প্রাকৃতিক দুর্যোগে মাঝসমুদ্রে ভয়ংকর দুর্ঘটনার মুখে পড়েন তিনি। ১৮০৭ সালে দস্যুসর্দার যখন মারা যাচ্ছেন, বাহিনীর দস্যুসংখ্যা ৫০,০০০ ছাড়িয়ে গেছে ততদিনে।

১৮০০ জাহাজের এক বিরাট নৌসেনা গড়ে তুলেছিলেন চিং শিহ

পুরোনো জীবনের মোহ একেবারে ঝেড়ে ফেলেছিলেন চিং শিহ। পিছন ফিরে তাকাতে চাননি আর। ঝেং ই মারা গেলেও সেই দস্যুদলই হয়ে ওঠে তাঁর নিজের পরিবার। সর্দারের মৃত্যুতে প্রথম প্রথম নেতৃত্ব নিয়ে কিছু অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু দল ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়ার আগেই ক্ষমতার রাশ শক্ত হাতে চেপে ধরেন চিং শিহ। সঙ্গে নেন পালিত ছেলে চ্যাং পাও’কেও। বিয়ের পরপরই চ্যাং পাও’কে দত্তক নিয়েছিলেন এই দস্যু দম্পতি। এবার সেই দত্তক নেওয়া ছেলেই সর্বশক্তি নিয়ে এসে দাঁড়ালেন চিং শিহ’র পাশে। শুরু হল নতুন লড়াই।

ইতিহাস বলে, নেত্রী হিসাবে একদিকে যেমন দক্ষ ছিলেন, তেমনই কঠোর ছিলেন চিং শিহ। সামরিক কৌশল, ব্যবসার ফন্দিফিকির সবটাই খুব ভালো বুঝতেন। নিয়মকানুনের আঁটসাঁট বাঁধনে গোটা দলকে বেঁধে রেখেছিলেন তিনি। ডাকাতি পিছু নিয়ম করে দস্যুরানিকে রীতিমতো ট্যাক্স দিতে হত সেসময়। লুঠ করা মালের ৮০%ই যেত দস্যুদের সমবায় তহবিলে। বিষয় যাই হোক, সর্দার বা ক্যাপ্টেনের কথাই ছিল দলের শেষ কথা। যেকোনও বিদ্রোহকেই বজ্র মুঠিতে দমন করতে জানতেন দস্যুরানি চিং শিহ।

তিনি নিয়ম করলেন, লুটতরাজ করে সমুদ্র তীরের গ্রাম থেকে যেসব মেয়েদের ধরে আনা হয়, তাদের মধ্যে বেশিরভাগ মেয়েদেরই বিনা শর্তে মুক্তি দিতে হবে। সুন্দরী বন্দিনীদের উপর কোনওরকম শারীরিক নির্যাতন বা যৌন অত্যাচার করা যাবে না। নারী বন্দিদের সঙ্গে দস্যুদলের কেউ সঙ্গম করার চেষ্টা করলে তার জন্য অপেক্ষা করে থাকত কঠিন শাস্তি। তবে বন্দিনী মেয়েটির ইচ্ছে অনুসারে, তার মত নিয়ে যদি দস্যুদের কেউ তাকে বিয়ে করতে চায়, একমাত্র তবেই অনুমতি মিলত। সেখানেও শর্ত ছিল, বিবাহিত মেয়েটির প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে হত সেই দস্যুকে। অন্যথায় মুণ্ডচ্ছেদ। মেয়েরা যাতে কোনওভাবেই জলদস্যুদের লালসার শিকার না হয়, সে ব্যাপারে বেশ কঠোর ছিলেন চিং শিহ।

নারী-পুরুষ নির্বিশেষে বন্দিরা অসুস্থ হলে যাতে ঠিকমতো চিকিৎসা পায়, সেদিকেও কড়া নজর ছিল এই দস্যুরানির। দলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা হোক, বা নারীধর্ষণ – দুইয়েরই শাস্তি ছিল মৃত্যু। তখনকার দিনে দস্যুসমাজে শিরশ্ছেদ খুব স্বাভাবিক শাস্তি ছিল। অন্যায় করে, বা নিয়ম ভেঙে পালাতে গিয়ে ধরা পড়লে তক্ষুনি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হত। এছাড়া কখনও কখনও কান কেটে নেওয়া হত অপরাধীদের, হাত পা বেঁধে লোহার লাঠি দিয়ে পেটানোও হত। এমনকি বিদ্রোহীদের হাত পা’য়ে পেরেক ঠুকে জাহাজের ডেকের মধ্যে আটকে রেখে মারধোর করার মতো নির্মম শাস্তির কথাও জানা গেছে। মোট কথা, চিং শিহ’র রাজত্বে নিয়ম ভাঙলে তার শাস্তিটিও ছিল বেশ কড়া।

ম্যাকাও থেকে ক্যান্টন পর্যন্ত দক্ষিণ সমুদ্রে একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল চিং শিহ-র৷ ওই বিস্তীর্ণ এলাকার সমুদ্রতীরের গ্রামগুলোকেও নিজের ছত্রছায়ায় নিয়ে এসেছিলেন তিনি। গ্রামের মানুষকে জলদস্যুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করতেন, বিনিময়ে কর নিতেন গ্রামবাসীদের থেকে৷ তাঁর কঠোর অনুশাসন, তুখোড় যুদ্ধনীতি, আর নির্মম শাস্তির জন্য দক্ষিণ সমুদ্রের ত্রাস হয়ে দেখা দিয়েছিলেন এই দস্যুরানি।

ইতিহাসবিদদের কেউ কেউ দাবি করেছেন, লুঠতরাজের পাশাপাশি চিং শিহ আফিম চোরাচালানের ব্যবসা করতেন, আবার কারও মতে, জলদস্যুদের আক্রমণে সমুদ্রতীরের গ্রামগুলোতে সেসময় প্রায়ই যে লুটপাট, ডাকাতি, কর-আদায় চলত, সেই অরাজকতাই থামাতে চেয়েছিলেন তিনি। আর এই কাজে তাঁর সহায়ক হয়েছিল প্রথম জীবনের অন্ধকার অভিজ্ঞতা।

সেসময় দক্ষিণ সমুদ্রে চিং শিহ-কে সমঝে চলত সবাই। ওই পথে যাওয়া-আসা করা চিনা পর্তুগিজ আর ব্রিটিশ বাণিজ্য-বহরে প্রায়ই লুঠপাট চালাত দস্যুরানির দল। ব্রিটিশ আর পর্তুগিজদের সাহায্য নিয়ে চিনা রাজবংশ বেশ কয়েকবার জলদস্যুদের দমন করার চেষ্টা চালায় বটে, কিন্তু জেতা তো দূরস্থান, উল্টে চিং শিহ-র হাতে নাস্তানাবুদ হয়ে ফিরে আসতে হয় তাদের। জলের উপর চিং শিহ-কে হারানো যায় না, এমন একটা কথা তখন রটে গেছিল দেশে দেশে। ত্রাস এতটাই, যে সেই একলা নারীকে পরাজিত করার জন্য সেসময় তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী জলদস্যুদের কাছেও দূত পাঠায় চিন।

জলের উপর চিং শিহ-কে হারানো যায় না

জলদস্যু দমনে সেসময় বেশ তৎপর হয়ে উঠেছিল চিন সরকার। তারা একটা সমঝোতায় যেতে চাইছিল, কিন্তু নানা জটিলতায় কথা এগোচ্ছিল না। এ অবস্থায় নিজেই এগিয়ে আসেন চিং শিহ। জনা ১৭ নিরক্ষর বউবাচ্চাকে সঙ্গে নিয়ে প্রায় খালি হাতেই সরকারি আধিকারিকদের সঙ্গে দেখা করতে সটান তাদের অফিসে চলে যান চিং শিহ। কূটনীতির এই এক চালেই তিনি ধরাশায়ী করে ফেলেন বিরাট চিন প্রশাসনকে।

একা হাতে জলদস্যুদের বিরাট সাম্রাজ্য চালাতেন চিং শিহ। কিন্তু তাঁর দূরদর্শিতা ছিল আর পাঁচজনের চেয়ে ঢের বেশি। তিনি বুঝেছিলেন, জলদস্যুতার এই জীবন খুব বেশিদিন টেনে বেড়ানো অসম্ভব। আর তাই চুক্তিতে এগিয়ে আসেন তিনি। সমঝোতা অনুযায়ী, সমুদ্রে তাঁর আধিপত্য থাকলেও, সমুদ্রতীরবর্তী যেসব জায়গা দখল করেছিলেন সেসব ফিরিয়ে দিতে হয় চিন রাজবংশের হাতে। বিনিময়ে লুটের ধনদৌলত নিজের কাছে রাখার নিশ্চয়তা পান দস্যুরানি। এই চুক্তিরই অংশ হিসেবে আবার বিয়ে করেন চিং শিহ। প্রথমজীবনের দত্তক ছেলে, দীর্ঘদিনের প্রেমিক ও সহচর চ্যাং পাও-কেই বিয়ে করেন তিনি।

১৮৮৪ সালে প্রকাশ পাওয়া ‘দেবী চৌধুরানী’ উপন্যাসেও বঙ্কিমচন্দ্র প্রফুল্লকে দস্যুরানির জীবন থেকে ফিরিয়ে এনে থিতু করেছিলেন সংসারে৷ এ উপন্যাস লেখার অন্তত ৫০ বছর আগে ঠিক তেমনভাবেই ভালোবেসে জলদস্যুতার অভিশপ্ত জীবন ছেড়ে সংসারজীবনে ফিরে গেছিলেন বিশ্ব কাঁপানো এক কুখ্যাত ডাকাতরানি৷ হ্যাঁ, প্রেমিক চ্যাং পাও-য়ের সঙ্গে থিতু হওয়ার পর দস্যুজীবন থেকে একরকম অবসরই নেন এই ভয়ংকর জলদস্যু। সন্তানের জন্ম দেন। ফিরে যান সংসার জীবনে। চ্যাং মারা যাওয়ার পরে ক্যান্টনে ফিরে এসে জুয়োর আড্ডা খোলেন। ১৮৪৪ সালে মারা যাওয়ার আগে পর্যন্ত এই ক্যান্টনেই শান্ত নিরুত্তাপভাবে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিয়েছিলেন চিন সমুদ্রের একদা ত্রাস দস্যুরানি চিং শিহ।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More