শিবের অবতার কালভৈরবের জন্য আলাদা চেয়ার রাখা থাকে কাশীর থানায়

দ্য ওয়াল ব্যুরো: কথায় বলে কাশীর রাজা হলেন বিশ্বনাথ, আর কালভৈরব হলেন কাশীর নগরপাল বা কোতোয়াল। তাঁর অনুমতি ছাড়া কাশীতে বসবাস করা, বা বাবা বিশ্বনাথ দর্শন করা যায় না। কিন্তু কে এই কালভৈরব? ‘ভৈরব’ শব্দের অর্থ হল ভীষণ বা ভয়াবহ। ভগবান শিবের যে কয়টি অবতার আছেন, তাঁর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর এই কালভৈরব। মহাদেবের সেই রক্তচক্ষু উন্মত্ত রূপকেই হিন্দু ধর্ম অনুসারে কালভৈরব নামে পুজো করা হয়। কালভৈরব হলেন কাল বা সময়ের অধিপতি, মৃত্যুর দেবতা। পাপীদের দণ্ড দেন তিনি। চতুর্ভুজ কালভৈরবের এক হাতে থাকে শূল, অন্য হাতে বরাভয়। আর দুটো হাতে দণ্ড আর মুণ্ড। সম্পূর্ণ নগ্ন, পোশাকবিহীন গায়ের রঙ ঘোর কালো। বাহন কালো রঙের কুকুর।

সমস্ত শিবমন্দিরেই কালভৈরবের মূর্তি থাকে। তন্ত্রশাস্ত্রগুলোতে কালভৈরবের যে বর্ণনা পাওয়া যায়, তাতে তিনি এক মহাশক্তিশালী দিব্যপুরুষ। তাঁরই অধীনে থাকে বরাহরূপী ষড়রিপু। বামাচারী তান্ত্রিক আর অঘোরিদের উপাস্য দেবতা এই বাবা কালভৈরব। শুধু তাই নয়, বৌদ্ধ আর জৈনধর্মেও কালভৈরবের নাম পাওয়া যায়।কেন আর কীভাবে জন্ম হল কালভৈরবের? ব্রহ্মপুরাণ থেকে জানা যায়, জগৎসৃষ্টির সময় প্রথম মানব মনুর সঙ্গে প্রথম মানবী হিসেবে শতরূপার জন্ম দিয়েছিলেন ‘ব্রহ্মা’। এই প্রথম নারী ‘শতরূপা’ ছিলেন অনন্তযৌবনা আর অসামান্য রূপসী। সেই রূপযৌবনই তাঁর কাল হল। সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা নিজেই তাঁর এই মানস-কন্যাটির রূপে মোহিত হয়ে পড়েন। কামনার জ্বালায় তাঁর শুভবোধ এতটাই লোপ পায়, যে ইন্দ্রিয়তাড়িত হয়ে ছুটে যান মেয়ের দিকে ব্রহ্মা। ব্যাপারটা বুঝতে পেরেই সতর্ক হন শতরূপা। এই অজাচারের হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে ব্রহ্মলোক থেকে পৃথিবীতে পালিয়ে যান তিনি। কিন্তু ব্রহ্মার চোখ এড়িয়ে ত্রিভুবনে কোথাও লুকোনো অসম্ভব। মেয়ের উপর নজরদারি করতে প্রজাপতি ব্রহ্মার ঘাড়ের উপর গজিয়ে ওঠে পাঁচ-পাঁচটা মাথা। সেই পাঁচ মাথার, পাঁচজোড়া দশ চোখে পৃথিবী আর আকাশের সবকিছুর উপরেই তিনি নজর রাখতে পারতেন। কামাতুর বাবার হাত থেকে নিজেকে লুকোনোর জন্য শতরূপা তখন বিভিন্ন প্রাণীর রূপ নিতে থাকেন। শতরূপা যখনই যে প্রাণীর রূপ ধারণ করে, ব্রহ্মাও সেই প্রাণীর পুরুষ রূপ নিয়ে পিছু নেয় মেয়ের। বলা হয়, এইভাবেই না কি পৃথিবীতে তৈরি হয়েছিল জীবকূল। বাবার হাত থেকে বাঁচতে শেষপর্যন্ত একটি গুহার ভিতর আশ্রয় নেন শতরূপা। তাঁর পিছু ধাওয়া করে ব্রহ্মাও পৌঁছোন সেই গুহাতে। আর সেখানেই শতরূপার ইচ্ছের বিরুদ্ধে মিলিত হন তাঁর সঙ্গে।

শতরূপার করুণ দশা আর ব্রহ্মার এই অনাচার দেখে রাগে কাঁপতে থাকেন দেবাদিদেব শিব। অসহায় শতরূপাকে তাঁর কামোন্মাদ বাবার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য মহাদেবের ক্রোধ থেকে জন্ম নেন কালভৈরব। ঘোর কালো তাঁর গায়ের রঙ। বড় বড় রক্তজবার মতো চোখ। তাঁর গর্জনে কেঁপে ওঠে আকাশ পৃথিবী। একমুহূর্তও দেরি না করে ব্রহ্মাকে তাড়া করেন ‘কালভৈরব’ আর রাগের বশে একটানে ব্রহ্মার পঞ্চম মাথাটা ছিঁড়ে নেন। সেই থেকে ব্রহ্মা চতুরানন। তাঁর চার মাথা থেকেই চার বেদের উৎপত্তি। কিন্তু ওই পাঁচনম্বর মাথাটি কামভাবের জন্ম দিয়েছিল। ব্রহ্মার সেই মাথাটা ছিঁড়ে নেওয়ায় কামের উপরে জ্ঞানের প্রকাশ ঘটল।

আর একটি কাহিনিতে বলা হয়, ব্রহ্মা একবার অহংকারের বশে পঞ্চমুখে মহাদেবের নিন্দা প্রচার করছিলেন। ব্রহ্মার অহং নাশ করতে তখন মহাদেব কালভৈরবকে পাঠান। যে মুখে ব্রহ্মা শিবনিন্দা করছিলেন, ভীষণ রাগে সেই মুখটিই ছিঁড়ে নেন কালভৈরব।

কিন্তু ব্রহ্মার মুণ্ড ছিঁড়ে নেওয়া তো ব্রহ্মহত্যার সামিল। সেই ব্রহ্মহত্যার পাপ কালভৈরবকেও এসে ধরে। মাথা ছিঁড়ে নিলেও ব্রহ্মার ওই পঞ্চম মুণ্ডটি খসে না গিয়ে আটকে থাকে কালভৈরবেরই তালুতে। ব্রহ্মার সেই মুণ্ড হাতে নিয়ে প্রচণ্ড কষ্টে ত্রিভুবন ছুটে বেড়ান কালভৈরব। কোনওভাবেই সে যন্ত্রণার উপশম ঘটছিল না৷ শেষে কাশীর গঙ্গায় হাত ডোবাতেই কালভৈরবের হাত থেকে খসে যায় সেই মুণ্ড। শাপমুক্ত হন তিনি৷ উপশম হয় কষ্টের। মহাদেবের আশীর্বাদ নিয়ে এই কাশীতেই প্রতিষ্ঠা পেলেন কালভৈরব। আজও কাশীতে বাস করতে হলে, অথবা বাবা বিশ্বনাথ আর মা অন্নপূর্ণা দর্শনে এলে সবার আগে কালভৈরবের অনুমতি নিতে হয়৷ কাশীর ‘ল এন্ড অর্ডার’ একরকমভাবে তিনিই সামলান। আর তাই তো কাশীর পুলিশ কোতোয়ালিতেও তাঁর জন্য নির্দিষ্ট থাকে আলাদা চেয়ার। অবাক হলেও কথাটা সত্যি। কাশীতে কালভৈরব মন্দিরের ঠিক পিছনেই বিশ্বেশ্বরগঞ্জ থানা। এই থানায় গেলেই দেখতে পাবেন, একটা চেয়ার আলাদা করে সাজিয়ে রাখা আছে কালভৈরবের জন্য। রয়েছে বাবা কালভৈরোর একটি মূর্তিও। রোজ দেবতাকে প্রণাম করেই শুরু হয় কোতোয়ালির কাজ। স্থানীয় পুলিশকর্মীরা বিশ্বাস করেন, ওই চেয়ারে স্বয়ং বিরাজ করেন প্রভু কালভৈরব। করবেন না কেন! তিনিই যে কাশীনগরীর রক্ষক। বেনারসের কোনো পুলিশ অফিসারই আজ পর্যন্ত ওই চেয়ারে বসার সাহস দেখান না। বরং সেখানে এসে প্রভু কালভৈরবের আশীর্বাদ নিয়েই কাজ শুরু করেন তাঁরা।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More