বিরাট সেই ঘণ্টার গায়ে লেগে আছে নিষ্পাপ কিশোরীর হাড় মাংস রক্তের দাগ

দ্য ওয়াল ম্যাগাজিন ডেস্ক: পৃথিবীর সবথেকে বড় আর সুমধুর ঘণ্টা কোথায় আছে জানেন! চিনের বেজিং শহরের বেসানহুনের এক বিখ্যাত মন্দির ‘দা জোং’, যার আসল নাম ‘তা চুং সু’ মন্দির। এই মন্দিরে গেলে যেটি প্রথমেই আপনার নজর কাড়বে তা হল বিশালাকৃতি এক ঘণ্টা। কথিত আছে ১৭৩৩ সালে সম্রাট ইয়ংলুর শাসন আমলে সুবিশাল এই ঘণ্টাটি নির্মাণ করা হয়েছিল। সম্রাটকে শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর নামানুসারেই মন্দিরের ভেতর বড় ঘণ্টাটির নামকরণ করা হয় ‘ইয়ংলু’।

‘তা চুং সু’ মন্দির

প্রায় ৪০ টন ওজনের বিপুলাকৃতি এর ধাতব ঘণ্টাটির উচ্চতা ৫.৫ মিটার ও ব্যাস ৩.৩ মিটার। শুধু বিরাট আকৃতির জন্যই নয় মন্দিরের এই বড় ঘণ্টাটি যখন বাজে তখন ১২০ ডেসিবল পর্যন্ত শব্দ তৈরি করতে পারে। রাতের দিকে ৫০ কিলোমিটার দূর থেকেও শোনা যায় এই ঘণ্টাধ্বনি। মনে করা হয়, এই ঘণ্টাটিই বিশ্বের শ্রুতিমধুর ঘণ্টা। এমন মন কেড়ে নেওয়া মিষ্টি শব্দ পৃথিবীর আর কোনও ঘণ্টাতেই নাকি শুনতে পাওয়া যায়না। নেহাত জনশ্রুতি নয়, রীতিমতো পরীক্ষানীরিক্ষার পর এই ঘণ্টার শব্দকে শ্রুতিমধুর বলে আখ্যা দিয়েছেন অনেক ধ্বনিবিশারদই। কিন্তু এই আশ্চর্য ঘণ্টার মধুর ধ্বনির পেছনে আজও করুণ সুরে বাজে এক মর্মান্তিক ইতিহাস। লোকমুখে প্রচারিত সেই সুপ্রাচীন গাথা আজও মুখে মুখে ফেরে চিনের মানুষের।

চিনের সম্রাট ইয়ংলুর শাসনকালে তিনি ‘তা চুং সু’ মন্দিরের জন্য এক বিরাট ঘণ্টা নির্মাণের পরিকল্পনা করেন। সম্রাটের ইচ্ছে যখন তখন তো আর ফেলে রাখা যায়না। পরিকল্পনাকে বাস্তবায়িত করতে শুরু হল তোড়জোড়। সম্রাটের আদেশ মতো একটা দল তৈরি করা হল যারা দেখাশোনা করবে এই যাবতীয় কর্মপদ্ধতি। ডাক পড়ল শহরের সেরা কারিগরদের। চুলচেরা কঠিন বাছাইপর্বের মধ্যে দিয়ে প্রায় ২০০ কারিগরের মধ্যে থেকে বেছে নেওয়া হল একজনের নাম, আর তাঁর হাতেই তুলে দেওয়া হল এই সুবিশাল ঘণ্টা তৈরির দায়িত্ব। সেই কারিগরের নাম ওং চাং ছি।

সম্রাট ইয়ংলু

বেজিং শহরের সেরা কারিগর ছিলেন ওং চাং ছি। সম্রাটও তার কথা শুনে খুব খুশি হয়ে তাকেই দায়িত্ব দিলেন ঘণ্টাটি নির্মাণের। সম্রাটের শর্ত একটাই। ঘণ্টা হতে হবে প্রকাণ্ড আর তাঁর আওয়াজ হতে হবে যেমন জোরালো তেমনই শ্রুতিমধুর। শুরু হল কাজ। একটানা কয়েকমাস কঠোর পরিশ্রম করার পর সত্যিসত্যিই প্রস্তুত হল বিরাট একটি ঘণ্টা। খবর পেয়ে সম্রাট স্বয়ং তড়িঘড়ি ছুটে এলেন সেই প্রকাণ্ড ঘণ্টা দেখতে। অপূর্ব কারুকার্য নির্মিত সেই ঘণ্টাটি দেখে বেশ পছন্দ হল সম্রাটের। কিন্তু ভালো লাগলো না ঘণ্টার আওয়াজ। আবার নতুন করে ঘণ্টা নির্মাণের আদেশ দিলেন সম্রাট। শর্ত সেই এক। আওয়াজ শুনে মন ভরে যাবে এমন সুবিশাল ঘণ্টাই চাই তাঁর।

আবার নতুন করে শুরু করলেন ওং চাং ছি। অত বড়ো ঘণ্টা পছন্দ না হওয়া মানে সেই পুরোনো ঘণ্টাটিকে একেবারে গলিয়ে ফেলে আবার অ্যালুমিনিয়ম, কাঁসা বা তামা জাতীয় ধাতব দ্রব্য দিয়ে নতুন করে কাজ শুরু করা। ব্যাপারটা পরিশ্রমসাধ্য হলেও হার মানলেন না শিল্পীকারিগর ওং চাং ছি। দিন রাত এক করে তিনি এবার আরও মনোরম এক সুবিশাল ঘণ্টা বানিয়ে ফেললেন। সম্রাটের সামনে নিয়ে আসা হল দ্বিতীয় ঘণ্টাটি। বাজানোও হল। কিন্তু সম্রাটের সেই একই কথা, ঘণ্টাধ্বনি তাঁর মনের মতোন হচ্ছেনা কিছুতেই।

এদিকে পরপর দুবারের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় সম্রাট গেলেন প্রচণ্ড রেগে। বারবার একই কাজ কেঁচে গণ্ডূষ করার ফলে সময়ের অপচয়, আর তার সঙ্গে অর্থের অপচয় হচ্ছে প্রচুর পরিমাণে। আরও একবার সু্যোগ চেয়ে সম্রাটের কাছে কাতর প্রার্থনা জানালেন ওং চাং। সম্রাট রাজি হলেন বটে, তবে এবার তিনি এটাও বলে রাখলেন এটাই শিল্পীর শেষ সুযোগ। ঘণ্টা যদি এবারও পছন্দ না হয় তাহলে রাজকোষের অর্থ নষ্ট করার অপরাধে পরিণাম হবে ভয়ঙ্কর। কারিগর ওং চাং ছি’র মৃত্যুদণ্ড তো হবেই, তার পাশাপাশি প্রাণ যাবে তাঁর পরিবারের সকলেরই।

সম্রাটের আদেশ শুনে ভয়ে কেঁপে উঠলেন কারিগর। নিজের প্রাণের পরোয়া করেন না তিনি, কিন্তু আদরের দুই মেয়ে আর স্ত্রীয়ের গায়ে কোনওকিছুর আঁচটুকুও আসতে দিতে চাননা তিনি। নিজের অক্ষমতার শাস্তি হিসাবে প্রাণাধিক স্ত্রী-সন্তানদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেবেন কীভাবে? এই ঘণ্টা তৈরির পরিণাম যে এত ভয়ঙ্কর হতে পারে তা কখনও দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি তিনি। এদিকে কাজও ছেড়ে দিতে পারছেন না। সম্রাটের নির্দেশ অমান্য করলেও যে মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত তা খুব ভালোভাবেই জানেন তিনি। সব অভিজ্ঞতা, জ্ঞান কাজে লাগিয়ে অক্লান্ত পরিশ্রমের পরও সম্রাটের মনের মতো ঘণ্টা করতে কেন যে অকৃতকার্য হচ্ছেন বারবার, তাও বুঝতে পারছিলেন না তিনি।

আবার নতুন করে কাজ শুরু করলেন ওং চাং ছি। যেভাবেই হোক বিশ্বের সবথেকে মধুর ধ্বনির ঘণ্টা প্রস্তুত করতেই হবে তাঁকে। এবার আর বিফল হওয়ার উপায় নেই, কারণ তাঁর নিজের এবং পরিবারের সকলের জীবন জুড়ে আছে এই কাজের সঙ্গে। বিভিন্ন লোকের কাছ থেকে পরামর্শ নিতে শুরু করেন ওং চাং। কিন্তু সঠিক পথ দেখাতে পারছিল না কেউই। চিন্তায় চিন্তায় নিজের উপর একটু একটু করে মনোবল হারিয়ে ফেলতে লাগলেন তিনি। কাজকর্মও এগোচ্ছিল না। তেমনই একদিন অসহায় হয়ে এক মন্দিরে বসে আছেন ওং চাং। তাঁর চোখমুখের অসহায়তা দেখে মন্দিরে আসা এক জ্যোতিষী এসে বসলেন তাঁর পাশে। জানতে চাইলেন কী সমস্যা হয়েছে তাঁর। নিরুপায় ওং চাং জ্যোতিষীকে খুলে বললেন সব। সব শুনে জ্যোতিষী নিদান দিলেন। তিনি জানালেন ওই মন্দিরের দেবতা কোনও কারণে রুষ্ট হয়েছেন কারিগরের ওপর, তাই হাজার চেষ্টা করেও মনের মতো ঘণ্টা তৈরি করতে পারবেন না তিনি। রাস্তা একটাই। দেবতাকে খুশি করতে হবে। কিন্তু সে পথও খুব সহজ নয়। ভগবানকে খুশি করতে তাঁর সামনে বলি দিতে হবে কোনও এক কুমারী মেয়েকে।

এ কথা শুনে ভয়ঙ্কররকম ভেঙে পড়লেন ওং চাং। নিজের আর পরিবারের জীবন বাঁচাতে একটা নিরপরাধ অসহায় মেয়ের জীবন বিসর্জন দেওয়া তাঁর পক্ষে কোনোদিনই সম্ভব নয়। আর তাতে যদি তাঁর বা তাঁর পরিবারের প্রাণ যায় যাক। কোনও মূল্যেই এই জঘন্য নারকীয় কাজ করতে পারবেন না তিনি। তাই জ্যোতিষীর কথাকে কুসংস্কার ভেবে মন থেকে ঝেড়ে ফেলে কাজে মন দিলেন ওং চাং। ভাস্করের দুই মেয়ের বড়টির বয়স তখন ১২। ফুটফুটে পরির মতো দেখতে সেই মেয়ের নাম ছিল ‘মাও আই’। ওং চাং এর সবচেয়ে আদরের এই মেয়ে বাবাকেও ভালোবাসতো খুব। বাবার সঙ্গেই ছিল তার যা কিছু গল্প, খেলাধুলা। বয়সের তুলনায় আর পাঁচজন মেয়ের তুলনায় একটু বেশি পরিণত ছিল মাও আই। বেশ কিছুদিন ধরেই বাবাকে দুশ্চিন্তাগ্রস্থ দেখে তার ছোট্ট মনে কৌতূহল তৈরি হয়েছিল। তার হাসিখুশি বাবা যে আর আগের মতো নেই তা বেশ বুঝতে পারছিল মাও আই। একদিন আর থাকতে না পেরে মাকে জিজ্ঞেসা করলে মা সব কথা খুলে বলে ছোট মেয়েকে। সব শুনে খুব ভয় পেয়ে যায় মাও আই। তাঁর মনে ঘুরতে থাকে একটাই চিন্তা। এইবারও যদি বাবার তৈরি করা ঘণ্টা সম্রাটের পছন্দ না হয় তাহলে বাবা, মা, ছোট বোন সবাইকে হত্যা করবে নৃশংস রাজা। বাঁচার পথ নেই। ওই ছোট মেয়ে এও বুঝেছিল যে একজন কিশোরী মেয়ের আত্মাহুতিই হয়তো পারে তার বাবাকে এবং পরিবারকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে। সেদিনের পর থেকে ওইটুকু মেয়ে মনে মনে যে কী কঠিন সিদ্ধান্ত নিচ্ছিল তা বিন্দুমাত্র আঁচ করতে পারেনি পারিবারের কেউ।

আর পাঁচটা দিনের মতো সেদিনও ওং চাং ব্যস্ত ছিল ঘণ্টা তৈরির কাজে। বিরাট এক চুল্লিতে গনগনে আগুন জ্বলছিল আর তাতে চলছিল লোহা গলানোর কাজ। তার মেয়ে প্রতিদিনের মতো খাবার নিয়ে এসেছিল বাবার কাছে। বাবার খাওয়া হয়ে গেলে বাবার পাশে এসে বসল আদুরে কিশোরী। বাবার মাথায় হাত বুলিয়ে কিছুক্ষণ আদর করার পরই হঠাৎ সে ছুটে গেল ধাতু গলানোর জন্য তৈরি গনগনে আগুনের চুল্লিটার দিকে। আর কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঝাঁপিয়ে পড়ল সেই লেলিহান অগ্নিকুণ্ডে। আর্তচিৎকার করে ছুটে গেলেন কারিগর। কিন্তু দেরি হয়ে গেছে ততক্ষণে। ভয়ংকর আগুনের শিখা দ্বিগুণ লেলিহান হয়ে যেন মুহূর্তের মধ্যে গিলে নিল ছোট্ট মেয়েটির মোমের মতো নরম শরীর। পুড়ে ছাই হয়ে গেলো সবকিছু। মাটিতে আছড়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেন অসহায় বাবা। মেয়ের মৃত্যুর পর অদ্ভুত এক শূন্যতা নেমে এল ওং চাং এর জীবনে। কাজ করার সমস্ত ইচ্ছে হারিয়ে ফেললেন তিনি। নিজেকেও প্রায় মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে লাগলেন দিনের পর দিন। এদিকে সময় প্রায় শেষ। সম্রাটের আদেশে সিপাহি এসে হাজির হল শিল্পীর বাড়িতে। পরিষ্কার জানিয়ে গেল আগামী মাসে কাজ শেষ না হলে ভয়ঙ্কর বিপদ অপেক্ষা করছে তার জন্য। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে কাজ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল ওং চাং ছির। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব যারা ছিলেন তারা বোঝালেন যে কাজ একেবারে বন্ধ করে দিলে তার পরিবার বিপদে পড়ে যাবে। বড় মেয়ের মতো ছোট মেয়েকেও হারাতে হবে। ধীরে ধীরে নিজের মনকে বোঝাতে শুরু করলেন ওং চাং। মনস্থির করলেন এই শেষবারের মতো ঘণ্টা নির্মাণ শুরু করবেন তিনি। আবারও জ্বলে উঠল মৃত মেয়ের ছাই ভস্ম রক্ত মাখা সেই নিভে যাওয়া আগুনকুণ্ড। ধাতু গলিয়ে নতুন করে তৈরি হল ঘণ্টা। খবর পেয়ে এবারও ছুটে এলেন সম্রাট। তাঁর সামনেই বাজানো হল সেই নবনির্মিত ঘণ্টা, আর কী আশ্চর্য! এমন মধুর দেবদুর্লভ ঘন্টার ধ্বনি আগে কেউ কখনও শোনেনি। সে শব্দের কম্পাঙ্ক এমনই, যে মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ল সেই শব্দ মাইলের পর মাইল জুড়ে। আনন্দে উত্তেজনায় সম্রাট প্রায় বুকে টেনে নিলেন শিল্পীকে। ঘন্টার ধ্বনি তাঁর পছন্দ হল এতোটাই যে ওং চাংকে পুরস্কৃতও করলেন সম্রাট।এর অনেক বছর পর এই বিস্ময়কর এই ঘণ্টার ধাতব গুণ পরীক্ষা করতে গিয়ে গবেষকেরা দেখেন যে তাতে কাঁসা, সোনা তামা এবং ফসফরাস মেশানো হয়েছিল একদম সঠিক অনুপাতে, সম্ভবত এর ফলেই আরও মধুর হয়ে উঠেছিল ঘণ্টাধ্বনি। ঐতিহাসিকেরা এই ধারণাও করেন যে প্রথম দুবার ওং চাং বাকি সবকিছুর মিশ্রণ ঠিক বানালেও হয়তো ফসফরাস মেশাতে ভুলে গেছিলেন। এর একটা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও তাঁরা দিয়েছিলেন। মানবদেহে প্রচুর পরিমাণে ফসফরাস থাকে। মানুষের শরীরে হাড় আর দাঁতে এই ফসফরাসের পরিমাণ প্রায় ৮৫ শতাংশ। ফলে ওং চাং-এর মেয়ে যখন আগুনে ঝাঁপ দেয় তখন তার দেহের হাড়ের মধ্যে থাকা ফসফরাস বাকি যৌগগুলোর সাথে মিশে যায়। এখন প্রশ্ন, যদিও লোহার সংমিশ্রণে ফসফরাস খুব কম পরিমাণেই লাগে তাও অতো বড়ো ঘন্টা তৈরিতে ওই সামান্য ফসফরাস কি আদৌ কোনও ভূমিকা নিয়েছিল? তবে ঘটনা যাই হোক একথা সত্যি যে ওই শেষবারের তৈরি সেই ঘণ্টাই আজ ইতিহাস হয়ে বেঁচে আছে ‘দা জোং’ মন্দিরপ্রাঙ্গণে। সুমধুর সুরে সেই ঘণ্টা যখন বাজে কেউ কি শুনতে পায় ১২ বছরের এক ছোট্ট মেয়ের মৃত্যুচিৎকার!

Leave a comment

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More