অসুখ নয়, তাঁকে তিলে তিলে মেরেছিল অন্যায় সমালোচনা

শাশ্বতী সান্যাল

তাঁর জন্ম হয়েছিল সরাইখানার বুকে। ভালোবাসতেন ভায়োলেট ফুল, ভালোবাসতেন শেক্‌সপিয়রের ট্রাজেডি। একটু বেঁটেখাটো চেহারা হলেও আয়ত চোখ আর কোঁকড়ানো সোনালি-বাদামি চুলে তাঁকে লাগত ঠিক দেবদূতের মতো৷ শান্ত সৌম্য মুখটাতে দুধের সরের মতো লেগে ছিল এক মায়াবী বিষাদ। মাত্র ২৫ বছর তাঁকে পেয়েছিল পৃথিবী। ছোট্ট জীবন, কয়েকটা মাত্র লেখা- তবু উনিশ শতকের রোম্যান্টিক যুগের অন্যতম সেরা কবির শিরোপা আমরা তুলে দিয়েছি তাঁরই মাথায়। হ্যাঁ, কথা হচ্ছে, ইংরাজি কবিতার বহু আলোচিত নাম জন কিটস’কে নিয়ে, মৃত্যুর ২০০ বছর পরেও যাঁর কবিতা আজও অনুবাদ হয় নানা দেশে নানা ভাষায়, যাঁকে নিয়ে আজও লেখা হয় অজস্র প্রবন্ধ, আলোচনা, গবেষণার বই।

বাবা থমাস কাজ করতেন আস্তাবলে। মা ছিলেন সেই আস্তাবলের মালিকের মেয়ে। সমাজের বিধিনিষেধকে তোয়াক্কা না করে ভালোবেসে বিয়ে, কিন্তু সে বিয়েও টিঁকলো না বেশিদিন। আচমকাই এক দুর্ঘটনায় ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে মারা গেলেন থমাস। ছোটো ছোটো চার ছেলেমেয়েকে নিয়ে স্ত্রী ফ্রান্সিস পড়লেন অকূল জলে। শোক কাটিয়ে দ্বিতীয়বার বিয়ে করলেন বটে, কিন্তু একবছরের বেশি টিঁকলো না সেই বিয়েও। ছোট ছোট ছেলেমেয়ের হাত ধরে ফ্রান্সিস ফিরে এলেন বাপের বাড়ি, মায়ের আশ্রয়ে। বড় ছেলে জন সবে ১০ বছরে পা দিয়েছে তখন।

টাকার অভাবে ইচ্ছে থাকলেও ছেলেকে দামি স্কুলে ভর্তি করতে পারেননি থমাস। বদলে ছোট্ট জনকে ভর্তি করা হয়েছিল এনফিল্ডের একটা সাধারণ স্কুলে। তাতে অবশ্য শাপে বরই হল জনের।

ছোট্ট স্কুল হলেও তার লাইব্রেরিটা ছিল নানান বইপত্রে ভর্তি। স্কুলেও বছরভর লেগে থাকত খেলাধুলো, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। দিনের অনেকটা সময়ই জন কাটিয়ে দিত লাইব্রেরিতে। কতরকম বই যে পড়ত! কখনও ইতিহাস, কখনও রেঁনেসাসের সাহিত্য- এসব নিয়ে সেই লাইব্রেরি-ঘরেই আড্ডা জমে উঠত বন্ধু চার্লসের সঙ্গে। এই পড়াশোনা আর আড্ডাগুলোই জনের সাহিত্যের মনটা গড়ে দিয়েছিল।

কিন্তু সেই সুখও বেশিদিন সইলো না। বাবার মৃত্যুর ৬ বছরের মধ্যে যক্ষ্মায় ভুগে চলে গেলেন মা’ও। ছোট ছোট অনাথ চার ভাইবোন, ঠাকুমা তাদের দেখভালের দায়িত্ব তুলে দিলেন ট্রাস্টি বোর্ডের হাতে। জনের বয়স তখন সবে চোদ্দ।

চার ভাইবোনের বড়, পরিবারের দায়িত্ব তো ছিলই। ছিল টাকার প্রয়োজনও। স্কুল শেষ করে ডাক্তারি পড়তে ভর্তি হলেন কিটস। লুকিয়ে লুকিয়ে কবিতা লেখা শুরু হয়ে গেছে ততদিনে। সার্জারির ছুরি, কাঁচি, মেডিসিনের ক্লাস কেটে প্রায়ই চলে যেতেন সাহিত্যের আড্ডায়। এভাবেই এক সাহিত্যসভায় আলাপ হয়ে যায় প্রায় সমবয়সী কবি শেলীর সঙ্গে। আলাপ গড়ালো বন্ধুত্বে।

পার্সি বিশি শেলি

ছোটবেলায় পড়া গ্রিক মিথোলজির গল্পগুলো বড় প্রিয় ছিল কিটসের। এক মেষপালক আর চাঁদের দেবী সেলেনি’র প্রেম নিয়ে লিখে ফেললেন প্রায় ৪০০০ লাইনের দীর্ঘ কবিতা ‘এন্ডিমিয়ন’। প্রকাশও পেল সেই লেখা। কিন্তু ততদিনে নতুন বিপদ ঘনিয়ে এসেছে।

মা মারা গিয়েছিলেন যক্ষ্মায়। নিজের অজান্তে সেই রাজরোগ তিনি ঢুকিয়ে দিয়ে গেছিলেন সন্তানদের রক্তেও। ওই বছরই লন্ডনে যক্ষ্মা ধরা পড়ে ছোটভাই টমের শরীরেও। প্রথমে মা, তারপর ভাইয়ের এই পরিণতি মেনে নিতে পারেননি কিটস। ছোট ভাই’কে পাগলের মতো ভালোবাসতেন তিনি। যক্ষ্মার কোনও ওষুধ ছিল না সেসময়। তবু চেষ্টার কসুর হল না। কিন্তু একের পর এক ডাক্তার দেখিয়ে, রাত জেগে সেবা-যত্ন করেও বাঁচাতে পারলেন না ভাইকে।

অসুস্থ ভাই টম

খবরের কাগজে তখন একের পর এক বেরোচ্ছে ‘এন্ডিমিয়ন’এর সমালোচনা। পণ্ডিতেরা একমত, কবিতা লেখা না কি কিটসের কম্মো নয়! এমনকি লেখালিখি ছেড়ে ডাক্তারিটাই মন দিয়ে পড়ার অযাচিত উপদেশও ধেয়ে আসছে। কেউ সমালোচনা করছেন তাঁর কবিতার ভাষার, কেউ বা চিত্রকল্পের।

আঘাতে আঘাতে ক্ষতবিক্ষত কিটস এসব থেকে দূরে একটু শান্তি পেতে চলে আসেন বন্ধু চার্লস ব্রাউনের হ্যাম্পস্টেডের বাড়িতে। আর এখানেই তাঁর আলাপ হয় বছর ১৮র ফ্যানি ব্রাউনের সঙ্গে। প্রথম আলাপেই ফ্যানি’র প্রেমে পড়েন কিটস। বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে সটান চলে যান ফ্যানি’র মায়ের কাছে।

হ্যাম্পস্টেডের সেই বাড়ি

ফ্যানি ব্রাউনের সঙ্গে প্রেমের সময়টাকেই কিটসের জীবনের সবথেকে মূল্যবান অধ্যায় বলে মনে করেন অনেকেই। তাঁর বিখ্যাত লেখাগুলোর প্রায় ৮০% এই সময়ে লেখা। এসব লেখালিখিতে ফ্যানি ছিল কিটসের প্রেরণা। ঠিক কতখানি ভালোবাসতেন তাঁরা একে অপরকে? শোনা যায়, মৃত্যুর পর কিটসের শেষ ইচ্ছে অনুসারে তাঁর সমাধিতে রাখা হয়েছিল ফ্যানি’র একগোছা চুল আর তাঁর হাতে লেখা একটা চিঠি।

প্রেমিকা ফ্যানি ব্রাউন

ফ্যানির মায়ের শর্ত অনুযায়ী বিয়ে করার জন্য টাকা রোজগারে মন দিয়েছিলেন কিটস। অসুস্থ শরীর, ঠান্ডা লাগার ধাত, তবু সবকিছু ছাপিয়ে নিজেকে উজাড় করে দিচ্ছিলেন কবিতার খাতায়, চিঠিতে চিঠিতে৷ কোনও কোনও আলোচক মনে করেন, কিটসের এই ক্রনিক অসুস্থতা ফ্যানিকে তাঁর জীবন থেকে সরিয়ে দিয়েছিল অনেকটাই। প্রেমের বদলে এসেছিল সন্দেহ আর বিষাদ। কিন্তু সারাজীবন যে আঙুলে পরে থেকেছে প্রেমিকের ভালোবাসার চিহ্ন, তাঁর দেওয়া বাগদানের আংটি, সেই ফ্যানিকে কি সত্যিই অবিশ্বাসী ভাবা যায়? কিটসের শেষ ইচ্ছেও সেই ভাবনার বিরোধিতা করে।

১৮২০ সালের শুরুতেই অসুস্থতা বাড়ে কিটসের। দমকা কাশি, তার সঙ্গে রক্তের ছিটে। রক্তের রং দেখেই ডাক্তারির ছাত্র জন কিটস বুঝে গেছিলেন রাজরোগ পিছু ছাড়েনি তাঁর। সেপ্টেম্বরে বন্ধু জোসেফ সেভার্ন কিটসকে নিয়ে গেলেন ইতালি। আশা ছিলো হয়তো কিছুটা সুস্থ হবেন কবি। কিন্তু ফল হল উলটো। রোম পৌছে আরও অসুস্থ হয়ে পড়েন কিটস। সেভার্নের সমস্ত চেষ্টা, সেবাযত্ন সত্ত্বেও ১৯২১এর ফেব্রুয়ারির শেষে মাত্র ২৫ বছর বয়সে ঘুমের দেশে অস্ত গেলেন ইংরাজি রোম্যান্টিক কবিতার সবচেয়ে প্রতিভাময় তারাটি।

কিটসের মৃত্যুর পর কথাপ্রসঙ্গে শেলী বলেছিলেন, যক্ষা তাঁকে ততটাও মারেনি, যতটা মেরেছিল সমালোচকেরা। নেহাত ভুল নয় কথাটা। অল্পবয়সে বাবা-মা’কে হারানো, ভাঙা পরিবারে স্নেহহীন অভিভাবকত্ব, প্রেম-অপ্রেমের দোলা, এমনকি কবি হিসাবেও দিনের পর দিন আঘাত আর অপ্রতিষ্ঠা – তাঁকে সত্যিই অভিমানী করে তুলেছিল। বিষাদ ছিল, আর ছিল ভালোবাসার জন্য গভীর আর্তি। তাঁর সমাধির গায়ে লেখা আছে ‘Here lies One Whose Name was writ in Water‘… জলে লেখা নাম, সামান্য রোদ উঠলেই যা শুকিয়ে যাবে, হারিয়ে যাবে অনস্তিত্বের বুকে।

লেখালিখির জীবন মাত্র ছ’বছরের। প্রকাশকাল ধরলে আরও কম। জীবদ্দশায় প্রকাশ পেয়েছে মাত্র ৫৪টি কবিতা। ছোট-বড় মিলিয়ে বাকি লেখা বেরিয়েছে তাঁর মৃত্যুর পরে। কিছু চিঠিপত্র লিখেছেন প্রেমিকা আর বন্ধুদের, সাহিত্যমূল্য কম নয় তারও। বিশেষত ফ্যানিকে লেখা তাঁর প্রেমের চিঠিগুলোকে বলা হয় বিশ্বের অন্যতম সেরা প্রেমপত্র। কবি হিসাবে যোগ্যতার কোনও দামই পাননি জীবনভর। সার্থকতা পাননি প্রেমিক হিসাবেও। অথচ সেই ব্যর্থ কবিই বিশ্বজুড়ে আজ কত মানুষের অনুপ্রেরণা। সারা পৃথিবীর প্রেমিক আর কবিদের ধ্রুবতারা তো তিনিই, স্যার জন কিটস। জলের অক্ষরে লেখা সেই নাম, আজ তারার আলোর মতো জ্বলে আছে মানুষের বুকের অন্ধকারে।

 

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More