কলোসিয়ামের ক্ষুধিত পাষাণে রক্ত লেগে আছে হাজার হাজার মানুষের

দ্য ওয়াল ব্যুরো: এই প্রান্তরে এলেই কানে ভেসে উঠবে অস্ত্রের ঝনঝন, আহত পশুর হুংকার, শিকলের শব্দ… কেটে ফেলা হাত পা, আর টাটকা রক্তের গন্ধে ভারী হয়ে আছে বাতাস। ফিনকি দিয়ে রক্ত ছিটকে আসছে, আর তার সঙ্গেই ছিটকে আসছে উল্লাস, হাততালি… কী ভাবছেন, এমন জায়গাও হয় না কি! কোনও হরর সিনেমার গল্প নয়, নৃশংস বাস্তব এমনই এক ইতিহাসকে বুকে নিয়ে ইটালির রোম শহরের বুকে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন কলোসিয়ামের পাথুরে কঙ্কাল।

ইতালির রোমকে এমনিতে চিরশান্তির নগরী বলা হয়, কিন্তু সেই শান্তির শহরের বুকেই দাঁড়িয়ে রয়েছে পৃথিবীর ইতিহাসে রক্তাক্ত লড়াইয়ের নৃশংসতম মঞ্চ, রোমান কলোসিয়াম। কথায় বলে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যত না রক্ত ঝরেছে, তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি রক্ত ঝরেছে রোমের ‘কলোসিয়াম’-এর মাটিতে। প্রাচীন গ্রেকো-রোমান স্থাপত্যশিল্পের এক অসাধারণ নিদর্শন এই কলোসিয়াম, যা একই সাথে রোমানদের হিংস্রতা আর নির্মাণশৈলীর এক অনন্য স্মারক হয়ে টিকে আছে শত শত বছর ধরে। ইউনেস্কোর তালিকা অনুসারে ১৯৯০ সালে এই ওপেন অ্যাম্পিথিয়েটারকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী অঞ্চল বা হেরিটেজ সাইটের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। মানুষের হাতে তৈরি সপ্তম আশ্চর্যের অন্যতম এই কলোসিয়ামের পাথুরে এরেনায় যেন এখনও ভেসে বেড়ায় হাজার হাজার প্রাণী আর মানুষের শেষ আর্তনাদ। মানব সভ্যতার সেই আশ্চর্য নৃশংস অধ্যায় আজও হতবাক করে দেয় আমাদের।

ইতালির রোম শহরের একেবারে মাঝখানে ছিল একটা উপবৃত্তাকার মঞ্চ, মঞ্চের চারপাশে এখনকার স্টেডিয়ামের মতোই দর্শকদের জন্য সার সার বসার ব্যবস্থা। মাঝখানে প্রায় গোলাকার প্রাঙ্গণ। আজ থেকে প্রায় দুহাজার বছর আগে এই আশ্চর্য স্থাপত্যটি বানানো হয়েছিল সরকারি কাজ ও প্রদর্শনীর মঞ্চ হিসাবে। উদ্দেশ্য যাই থাক, অভিনয় আর দ্বৈরথ যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে দেশের রাজা আর নাগরিক সমাজের মনোরঞ্জনই এই হিংস্র মঞ্চটি গড়ে তোলার মূল কারণ ছিল। এই ময়দানেই লড়িয়ে দেওয়া হত হিংস্র পশুর সঙ্গে নিরস্ত্র মানুষদের। কিংবা বর্মধারী যোদ্ধার বিপরীতে অসহায় উত্ত্যক্ত বনের পশুকে। প্রবলের হাতে একটা অসহায় প্রাণীর সেই ছিন্নভিন্ন মৃত্যু আর আর্তনাদ প্রবল করতালির সঙ্গে উপভোগ করতেন রোমের নাগরিক সমাজ। পরবর্তী ৩০০ বছর কত নিষ্পাপ পশু আর হতভাগ্য মানুষের রক্তে যে ভেসে গেছে এই পাথুরে ময়দান, তা আজ গণনার অতীত।

দর্শকদের জন্য সার সার বসার ব্যবস্থা, মাঝখানে প্রায় গোলাকার প্রাঙ্গণ

৬ একর জমির উপর কংক্রিট, চুনাপাথর আর আগ্নেয়শিলা দিয়ে বানানো ১৮৯ মিটার দৈর্ঘ্য এবং ১৫৬ মিটার প্রস্থ্যের এই স্থাপত্যটিকে আজও রোম সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বড় স্থাপত্য হিসেবে ধরা হয়। বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ওই ওপেন-থিয়েটারে দর্শকদের ঢোকার জন্য ছিল ৮০টি প্রবেশপথ। ৫০ থেকে ৮০ হাজার মানুষ এই কলোসিয়ামে ধরে যেত অনায়াসে। একসঙ্গে বসতে পারত প্রায় ৬৫ হাজার দর্শক।

রোমের বুকে তৈরি হল কলোসিয়াম

ষষ্ঠ শতাব্দীর কোনও এক সময় এক বিরাট অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে যায় রোমের অনেকখানি। রোমের সিংহাসনে তখন বসে আছেন সম্রাট নিরো। নৃশংস আর খামখেয়ালি রাজা প্রজাদের কথা না ভেবে এক ফরমান জারি করে পুড়ে যাওয়া উপত্যকার সবটাই প্রায় নিজের মালিকানায় নিয়ে নেন। স্থপতিদের ডেকে এনে সুরম্য এক প্রাসাদ তৈরি করার নির্দেশ দেন। তাঁর ইচ্ছে মতোই পুড়ে যাওয়া ওই উপত্যকায় গড়ে ওঠে অপূর্ব এক প্রাসাদ। তার নাম রাখা হয় ডোমাস ওরিয়া। শুধু প্রাসাদই নয়, তার চারপাশে সুন্দর সুন্দর দিঘি, বাগান, প্যাভিলিয়নও তৈরি করার হুকুম দেন সম্রাট। আর তৈরি করেন ‘কলোসাস অব নিরো’ নামে নিজের বিশাল এক ভাস্কর্য।

নিরোর সময় এমনটাই না কি ছিল ‘কলোসাস অব নিরো’

রোমের ইতিহাসে এই হিংস্র আর পাগলাটে রাজা নিরোকে নিয়ে গল্পের শেষ নেই। শোনা যায় চার বছরের রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের শেষে ফাঁসির দড়ি গলায় পড়ার ভয়ে নিজেই আত্মহত্যা করেন নিরো। তারপর ৭০-৭২ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি রোমের সিংহাসনে বসেন ফ্লেবিয়ন সাম্রাজ্যের রাজা ভেসপাসিয়ান। তাঁর রাজত্বকালে রোমান ফোরামের ঠিক পশ্চিমে, সুবিশাল এই মঞ্চটি তৈরির কাজ শুরু হয়েছিল। সাধারণ মানুষকে বঞ্চিত করে যে জমি বাজেয়াপ্ত করে ব্যক্তিগত প্রাসাদ বানিয়েছিলেন নিরো, সেই জমিই আবার সাধারণ মানুষের কাজে লাগিয়ে খুব-সম্ভবত পূর্বসূরীর পাপের কিছুটা প্রায়শ্চিত্ত করতে চেয়েছিলেন ভেসপাসিয়ান। রোমান সাম্রাজ্যের মানুষদের উপহার দেওয়ার জন্যই তিনি শুরু করলেন এই মঞ্চ তৈরির কাজ।

এই কলোসিয়াম তৈরির মধ্যে দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে রাজা হিসাবে নিজের জনপ্রিয়তা বাড়াতে চেয়েছিলেন ভেসপাসিয়ান। বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠানের আয়োজন করার পাশাপাশি স্থাপত্যবিদ্যায় রোমানদের দক্ষতা তুলে ধরাও এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু তিনি তাঁর জীবদ্দশায় এটিকে শেষ করে যেতে পারেননি। ভেসপাসিয়ানের মৃত্যুর পর সিংহাসনে বসেই বাবার অসমাপ্ত কাজ শেষ করার দায়িত্ব নেন তাঁর ছেলে টাইটাস বা টিটাস। প্রায় ১০ বছর ধরে ১০,০০০ ইহুদিকে কাজে লাগিয়ে ৮০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ কলোসিয়ামের নির্মাণ কাজ শেষ হয়।

গ্ল্যাডিয়েটরদের সেই রক্তাক্ত ইতিহাস

কলোসিয়ম তৈরির পর আনুষ্ঠানিক ভাবে ‘ফ্লেবিয়ন অ্যাম্পিথিয়েটর’ নামে এই মঞ্চটিকে উদ্বোধন করেন টিটাস, আর সেই আনন্দে ১০০ দিন ব্যাপী এক বিশাল উৎসবেরও আয়োজন করেন। কী না ছিল সেই অনুষ্ঠানে! নাটক, গানবাজনা তো ছিলই, এছাড়াও ছিল গ্লাডিয়েটরদের মধ্যে শক্তির লড়াই, মল্লযুদ্ধ, এমনকি জন্তুজানোয়ারদের লড়াইও।

নৃশংসতার সেই শুরু। কলোসিয়াম তৈরির পর এক অদ্ভুত পৈশাচিক খেলায় মেতে উঠলেন রোমান সম্রাট। তাঁর নির্দেশে রাজকোষের অর্থে সেসময় প্রায়ই এক বিশেষ খেলার আয়োজন করা হত। লড়াইয়ের জন্য উত্তর আফ্রিকাসহ পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আমদানি করা হত হাজারে হাজারে হাতি, গণ্ডার আর সিংহের মতো জন্তু। তারপর কলোসিয়ামের মাটিতে তাঁদের লড়িয়ে দেওয়া হত একে অন্যের বিরুদ্ধে।

পশুদের সেই জীবন-মরণের লড়াই দেখতে কলোসিয়ামের গ্যালারিতে জড়ো হত হাজারে হাজারে মানুষ। চোখের সামনে সেই অসহায় পশুদের আর্তনাদ, যন্ত্রণা, মৃত্যুকষ্ট দেখে উল্লাসে ফেটে পড়ত পুরো গ্যালারি। শোনা যায়, শুধুমাত্র কলোসিয়ামের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের ঐ ১০০ দিনেই মারা পড়েছিল কয়েক হাজারের বেশি পশু।

শিউরে উঠছেন! কিন্তু এ তো সবে শুরু। দিনের পর দিন এই একঘেয়ে পশুর লড়াই দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে পড়েন সম্রাট টিটাস। অস্ত্রহীন দুটো জন্তুর দাঁত-নখের লড়াই আর আগের মতো আনন্দ-উত্তেজনা দিচ্ছিল না তাঁকে। লড়াইটাকে আরও অসম, আরও ভয়ংকর করার জন্য নতুন ফন্দি বের করলেন তিনি। এবার আর পশুর সঙ্গে পশুর লড়াই নয়, কলোসিয়ামে চালু করা হল পশুর সঙ্গে মানুষের লড়াই। সিনেমাহলে বসে সিনেমা দেখার মতোই খাবার, পানীয় হাতে দর্শকাসনে বসে অমানুষিক সেই যুদ্ধের মজা নিতে শুরু করলেন রাজা সহ রাজসভাসদেরা… কলোসিয়ামের আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠতে লাগল ছিন্নভিন্ন মানুষের চিৎকারে, রক্তে আর আর্তনাদে।

এই লড়াইতে যারা অংশ নিতেন তাঁদের গ্ল্যাডিয়েটর বলা হত। ল্যাটিন শব্দ ‘গ্ল্যাডিয়েটর’ মানে হচ্ছে ‘তরবারিওয়ালা মানুষ’। প্রথম প্রথম যুদ্ধবন্দীদের দিয়ে এই লড়াই করাতেন রাজা। লড়াই ততক্ষণ চলত যতক্ষণ না ক্ষতবিক্ষত হয়ে মারা যায় একপক্ষ। এরপর গ্ল্যাডিয়েটর হিসেবে বেছে নেয়া হত দাসেদের, যাদের বড় একটি অংশই ছিলেন যুদ্ধে পরাজিত অসহায় লোকজন। এদের মধ্যে অনেক অভিজাত ব্যক্তিও ছিলেন। কিন্তু বন্দী অবস্থায় তাঁদের একটাই পরিচয়- তাঁরা গ্ল্যাডিয়েটর। শুধু পুরুষরাই না, প্রাচীন রোমে অনেক নারীও বেছে নিতেন গ্ল্যাডিয়েটরের ভয়ংকর জীবন।

লড়াই চলকালীন গ্ল্যাডিয়েটর যত আহত হত, ক্ষতবিক্ষত হত, ততই নারকীয় উল্লাসে ফেটে পড়ত মঞ্চ। আহত, রক্তাক্ত গ্ল্যাডিয়েটর প্রথা অনুযায়ী প্রাণভিক্ষা চাইতেন সম্রাটের কাছে। কপালগুণে সম্রাট ক্ষমা করলে সে যাত্রায় বেঁচে যেতেন। কিন্তু সেই শুভক্ষণ খুব কমই আসত, বেশিরভাগ সময়ই গ্ল্যাডিয়েটরদের জন্য অপেক্ষা করে থাকত তিলে তিলে কষ্ট পেয়ে, রক্তক্ষরণে আর শিরশ্ছেদে নারকীয় মৃত্যু।

গ্ল্যাডিয়েটররা প্রথা অনুযায়ী প্রাণভিক্ষা চাইতেন সম্রাটের কাছে

গ্ল্যাডিয়েটরদের যুদ্ধে হার মানেই মৃত্যু। খুবই ভয়ানক সেই মৃত্যু। পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে সাহসী এই যোদ্ধারা ময়দানে নামার সময়ই জানতেন খেলা শেষে হয় জিতবেন, নাহলে তাঁর ছিন্নভিন্ন শরীর পড়ে থাকবে প্রতিদ্বন্দ্বীর পায়ের নীচে৷ ময়দানে মৃত্যুর পর গ্ল্যাডিয়েটরদের দেহ কলোসিয়ামের একটি বিশেষ ফটক দিয়ে বের করে আনা হত। সাহস ও সম্মানের সঙ্গে মৃত্যবরণ না করলে, টেনে-হিঁচড়ে তাদের মরদেহ বের করা হত। মরার ভান করে পড়ে থাকারও উপায় ছিল না৷ আঘাতে আঘাতে ক্ষতবিক্ষত করে এরেনার মধ্যেই শিরশ্ছেদ করা হত হেরে যাওয়া প্রতিযোগীর।

যে সমস্ত পশু ও গ্ল্যাডিয়েটর ওই পৈশাচিক খেলায় অংশগ্রহণ করত তাদের জন্য মাটির নীচে তৈরি করা হয়েছিল বিরাট বিরাট খাঁচা। ওই খাঁচাগুলোতে বন্যপশুদের পাশাপাশি অসহায় গ্ল্যডিয়েটরদেরও রাখা হত। খাঁচাগুলোতে চলাচলের জন্য বিশাল আকারের সুড়ঙ্গও ছিল। হাতির মতো বড় প্রাণীও অনায়াসে যাওয়া-আসা করতে পারত সেই পথে।

২১৭ খ্রিষ্টাব্দের পর এক অগ্নিকাণ্ডে ভয়ংকর ক্ষতিগ্রস্ত হয় কলোসিয়াম। ২৩৮ খ্রিষ্টাব্দে আবার সংস্কার করে সারিয়ে তোলা হয়। ওই নিষ্ঠুর খেলা বন্ধ হয়নি তখনও। প্রাক মধ্যযুগ থেকেই কলোসিয়াম বিখ্যাত হয়ে ওঠে গ্ল্যাডিয়েটরদের এই পৈশাচিক যুদ্ধের জন্য। এর পাশাপাশি আরও কিছু প্রয়োজনে মাঝেমধ্যে এই অ্যাম্পিথিয়েটারের ব্যবহার হয়েছে অতীতে। কখনও আবাসন, প্রশিক্ষণকেন্দ্র, যুদ্ধের সময় সৈন্যদের অস্থায়ী ব্যারাক, তীর্থযাত্রীদের আবাসন, এমনকি কোন এক পর্যায়ে দুর্গ হিসেবেও ব্যবহার হয়েছে কলোসিয়ামের। তবে গ্ল্যাডিয়েটর খেলা থামেনি। রাজার পর রাজা এসেছে, কিন্তু খেলার নামে এই হিংস্র নরঘাতক হত্যালীলা থামায়নি কেউ। বরং উপভোগই করেছে।

এত রক্ত আর আর্তচিৎকার বোধহয় প্রকৃতিও নিতে পারছিল না। ৪৪২ আর ৫০৮ খ্রিষ্টাব্দে ওই এলাকাতেই পরপর দু’টি বেশ বড়মাপের ভূমিকম্প হয়, যা কলোসিয়ামের কাঠামোর মারাত্মক ক্ষতি করে। ভেঙে যায় বেশ কিছু এলাকা। এছাড়াও মধ্যযুগে আরও কিছু ভূমিকম্পের ফলে এর বেশিরভাগ অংশ ধ্বংস হয়ে যায়। এখন রোম শহরে কলোসিয়ামের যে কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে, তা আসলে মূল কাঠামোর তিন ভাগের এক ভাগ। আজও সেই ভাঙা স্থাপত্যের ভিতরে গুমরে গুমরে কাঁদে মানবজাতির এক হিংস্র রক্তলোলুপ অধ্যায়।

Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More