মদ জুয়ার নেশা, বেপরোয়া জীবনযাপন, তবু ৩০০ বছর পেরিয়েও তিনি কবিতার বেতাজ বাদশা

দ্য ওয়াল ব্যুরো: রামপুর লোহারু থেকে নিয়মিত বৃত্তি পেতেন তিনি। তারপরও অভাব মিটতো না। রোজ দুবেলা ডাল রুটির সংস্থান করতেই চোখে অন্ধকার দেখতেন স্ত্রী উমরাও বেগম। তাঁর মূল কারণই হল স্বামীর নেশা। সারাদিনই মদের নেশায় চুর হয়ে থাকতেন কবি। শরাব ছাড়া শায়েরি হবে কী করে!

দিশি মদে মন ভরত না, তাই দিল্লিতে ম্যাকফরসন সাহেব জোগান দিতেন উৎকৃষ্ট বিদেশি শরাবের। পরাধীন দেশে সেই সুরার দাম নেহাত কম ছিল না। গরীব কবি সাহেবি মদের উচ্চমূল্য মেটাতে পারবেন না, সেটাই তো স্বাভাবিক। এই করে করে বাজারে তাঁর ধারের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল চল্লিশ হাজার টাকা, যা আজকের বাজারমূল্যে প্রায় কোটি টাকার কাছাকাছি। বহুবার তাগাদা দিয়েও টাকা না পাওয়ায় খাতকের বিরুদ্ধে মামলা করলেন ম্যাকফরসন সাহেব। পাওনাদারের নালিশে কাঠগড়ায় দাঁড়ালেন কবি। বিচারক তাঁর কাছে জানতে চাইলেন, শোধ করতে পারবেন না জেনেও কেন করলেন এত দেনা? কবি হেসে জানালেন-

‘কর্জ করে মদ খেতাম ঠিক,

তবে জানতাম যে হ্যাঁ

এই খালি পেটে আনন্দ করা একদিন পুরো দুনিয়ায় রং ছড়াবে।’

বলাই বাহুল্য, সেই মামলায় জয় হল শ্বেতাঙ্গ সাহেবেরই। কোমরে দড়ি বেঁধে ঋণগ্রস্ত কবিকে পাঠানো হল জেলখানায়। কিন্তু গারদের ভিতরে কী আর আটকে রাখা যায় তাঁকে। জামিন দিয়ে সেযাত্রা ছাড়িয়ে আনলেন বন্ধু, শুভাকাঙ্ক্ষী নবাব আমনুদ্দিন। এই আশ্চর্য কবি আর কেউ নন, স্বয়ং মির্জা গালিব।

একজন বিখ্যাত পণ্ডিত সমালোচক কথাপ্রসঙ্গে বলেছিলেন— ভারতবর্ষে মাত্র দু’টোই তো বই, একটি পবিত্র বেদ আর দ্বিতীয়টি গালিবের কবিতার সংকলন। এই সেই মির্জা গালিব, উর্দু কবিতার ইতিহাসের এক অনন্য নাম।

১৭৯৭ সাল নাগাদ আগ্রায় সেনানায়ক আবদুল্লাহ বেগের ঘরে জন্মাল প্রথম সন্তান। আদর করে বাবা-মা ছেলের নাম রাখলেন মির্জা আসাদুল্লাহ খান। পরে কবিজীবনে তিনি নিজের নাম রাখলেন ‘মির্জা গালিব’। ‘গালিব’, যার অর্থ বিজয়ী।

আগ্রার মকতবে থাকতেই শায়েরি লেখায় হাত পাকায় গালিব। মাত্র ন’বছর বয়সে ফার্সিতে কবিতা লেখা শুরু করলেও তরুণ বয়সে তিনি উর্দুকেই বেছে নিলেন তাঁর কবিতার ভাষামাধ্যম হিসাবে। এত যে বিখ্যাত কবি, কিন্তু জীবদ্দশায় প্রতিভার স্বীকৃতি পেলেন কই! গুণমুগ্ধ যত না ছিল, তার দ্বিগুণ ছিল নিন্দুকের দল।

জীবনে কখনও চাকরি করেননি গালিব। নবাবের অনুগ্রহে, বন্ধবান্ধবদের কাছে হাত পেতে, দেনা কর্জ করেই সংসার চালিয়েছেন। শ্বশুরবাড়ির সূত্রে সমাজের উচ্চস্তরে মেলামেশার সুযোগ পেলেও, নিজের খামখেয়ালিপনায় খুব বেশি জনসমাদর পাননি জীবনে। তাঁর প্রথমদিককার কবিতা অনেকেরই দুর্বোধ্য মনে হত। ফলে কবিসম্মেলনে গালিবকে নিয়ে ঠাট্টাতামাশাও চলত দেদার। নিজের কবিতার শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে গালিবের মনে কিন্তু কোনও দ্বিধাই ছিল না। এই সচেতনতা তখনকার দিনে অনেকের কাছেই অহংকার বলে মনে হত। যে যাই বলুক, আজীবন নিজের কবিতা নিয়ে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন গালিব। তিনি মনে করতেন, খুব কম লোকের ভিতরেই তাঁর কবিতার সঠিক মূল্যায়ন করার যোগ্যতা আছে৷

“আমার হৃদয়ের আগুন থেকেই আলো দিচ্ছে আমার কবিতা,

        আমি যা লিখছি তাতে একটি  আঙুল দেওয়ার সাধ্য নেই কারো৷”

মদ খাওয়ার পাশাপাশি গালিবের আরেকটি দুর্বলতা ছিল, জুয়া খেলতে ভালোবাসতেন তিনি। আর এ ব্যাপারে তাঁর কোনও রাখঢাক ছিল না৷ তখন গরমকাল, রমজান মাস চলছে, গালিবের খুব কাছের বন্ধু কবি মুফতি সদরুদ্দিন আজুর্দা গালিবের সাথে দেখা করতে তাঁর বাড়ি গেছেন। বাইরের ঘরে বসে জুয়া খেলতে মত্ত তখন গালিব৷ বন্ধুর এমন ইসলাম-বিরোধী কাজকর্ম দেখে রাগে আগুন হয়ে আর্জুদা বলে বসলেন, পবিত্র কোরানে যে বলা হয়েছে রমজান মাসে শয়তান কারারুদ্ধ থাকে, তা ঠিকই। বন্ধুর কথার খোঁচাটুকু দিব্যি বুঝতে পারলেন গালিব। হাসিমুখে আর্জুদার বিদ্রুপ তাঁকেই ফিরিয়ে দিয়ে উত্তর দিলেন, ‘ঠিকই বলেছ বন্ধু। কোরানের কথা এক্কেবারে ঠিক। শয়তান এখন সত্যিই কারারুদ্ধ, আর কোথাও নয়, আমার এই ঘরেই৷’

টাকাপয়সার অভাব আজীবন কষ্ট দিয়েছে তাঁকে। টাকা রোজগারের জন্য এক একসময় বেপরোয়া হয়ে উঠতেন। বাড়িতে বন্ধুদের ডেকে এনে বসাতেন জুয়ার আসর। ইংরেজ আমলের শুরুর দিকে সেই সময়গুলোতে জুয়ো খেলাকে নৈতিকভাবে অপরাধ মনে করা হত। সেই অপরাধে মাস তিনেক জেলেও কাটাতে হয় গালিবকে। মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর তখন দিল্লির সিংহাসনে নামেমাত্র বসে আছেন। সব ক্ষমতাই শ্বেতাঙ্গদের দখলে। ফলে অনেক চেষ্টা করেও গালিবকে সেই দুর্দশার হাত থেকে বাঁচাতে পারেননি নবাব। সে যাত্রা সশ্রম কারাদণ্ড না হলেও প্রায় মাস তিনেক জেলেই কাটাতে হয় কবিকে।

মির্জা গালিবের একমাত্র প্রামাণ্য ছবি

ধর্মে অবিশ্বাস না থাকলেও, ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি তেমন পছন্দ ছিল না গালিবের। তিনি সারাজীবনে কখনও রোজা রাখেননি, খুল্লমখুল্লা স্বীকারও করেছেন সে কথা৷ মদ-জুয়ো নিয়েও তাঁর লুকোচুরি ছিল না। গোঁড়া রসুলদের বাণীকে বিদ্রূপ করতেও ছাড়েননি৷ সবদিক দিয়েই তিনি ছিলেন ভুল সময়ে জন্মানো এক আধুনিক মনের মানুষ। তাঁর কবিতাই তাঁর পরিচয়, ৩০০ বছর পেরিয়ে আজও তা যেকোনও আধুনিক কবির অপেক্ষা অনেক বেশি স্বতন্ত্র, উজ্জ্বল।

Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More