অশ্লীলতার অভিযোগে তাঁর কবিতা বারবার উঠেছে কাঠগড়ায়

শাশ্বতী সান্যাল

ভুল সময়ে জন্মেছিলেন, তার জন্য হেনস্থাও কম হয়নি। তাঁর কবিতার আধুনিক ভাষাজ্ঞান, সময় সচেতনতা আর ইতিহাসপ্রিয়তা আজও প্রশ্নাতীত। তবু জীবদ্দশায় যত না সম্মান পেয়েছেন, অনাদর-অপমান পেয়েছেন তার ঢের বেশি। বারবার তাঁর কবিতাকে কাঠগড়ায় তোলা হয়েছে। কখনও জটিলতা, কখনও অশ্লীলতার অভিযোগ এনে আঘাত করা হয়েছে। কিন্তু সমস্ত কুতর্ক, সমালোচনা, যুগের প্রহার হেলায় হারিয়ে তাঁর কবিতা আজও স্বমহিমায় বেঁচে আছে বাঙালির মনের মণিকোঠায়। তিনি আর কেউ নন, বিশ্বযুদ্ধোত্তর বাংলা কবিতার সবচেয়ে আলোচিত নাম জীবনানন্দ দাশ।

একের পর এক চাকরি ছাড়া, লোকের সঙ্গে সহজ ভাবে মিশতে না পারা, সমালোচকদের আক্রমণে ধ্বস্ত একটা মানুষ… টাকাপয়সা নেই ঘরে, সুখও নেই। তিক্ততায় ভরা আশ্চর্য ঘৃণা-প্রেমে মেশা দাম্পত্য নিয়ে রক্তক্ষরণ চলছে। তার উপর আছে বিবাহবহির্ভূত অস্বাভাবিক সম্পর্ক, ছোটবেলার ভুলতে না পারা প্রেম। আসলে এই সবকিছুকে নিয়েই তো গড়ে উঠেছে জীবনানন্দ দাশের সেই অবিস্মরণীয় কবিমানস। বিশ্বযুদ্ধোত্তর আধুনিক যুগের বিমূঢ় বিভ্রান্ত মানুষের চরম প্রতীক যেন তিনি।

স্ত্রী লাবণ্য দাশের সঙ্গে বিয়ের ছবি

কবিতা তো বটেই, পাশাপাশি তাঁর গল্প আর উপন্যাসগুলোতে যেন সেই জটিল আবর্তরূপ আরও স্পষ্ট, আরও প্রতীয়মান। ‘কারুবাসনা’য় হেম আর কল্যাণীর সম্পর্কের আলোছায়াই যেন আরও হিংস্রভাবে, আরও প্রত্যক্ষভাবে ফিরে এসেছে ‘মাল্যবান’ উপন্যাসে। মাল্যবান আর উৎপলার দাম্পত্যসংঘাত আসলে তো আধুনিক মানুষের হৃদয়-সংকটে ভরা। অচরিতার্থ কাম, অবিশ্বাস, সন্দেহ বারবার ঘুরেফিরে এসেছে তাঁর গল্পে, উপন্যাসে। কবিতাতেও কী আসেনি? ‘লোকেন বোসের জার্নালে’ তিনিই তো লিখছেন-

“পুরোনো চিঠির ফাইল কিছু আছে:
সুজাতা লিখেছে আমার কাছে,
বারো তেরো কুড়ি বছর আগের সে-সব কথা;
ফাইল নাড়া কি যে মিহি কেরানীর কাজ;
নাড়বো না আমি
নেড়ে কার কি লাভ;

…..

আজকে হৃদয় পথিক নয়তো আর,
নারী যদি মৃগতৃষ্ণার মতো — তবে
এখন কি করে মন কারাভান হবে।”

১৯৩২ সাল নাগাদ সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘পরিচয়’ পত্রিকায় প্রকাশ পেয়েছিল ‘ক্যাম্পে’ কবিতাটা। শোনা যায়, কবি বিষ্ণু দে নিজেই না কি খানতিনেক কবিতা চেয়ে নিয়েছিলেন ‘পরিচয়’এ ছাপানোর জন্য, তারই অন্যতম ‘ক্যাম্পে’।

সেসময় বাংলার পাঠকমহলে সজনীকান্ত দাসের ‘শনিবারের চিঠি’ র খ্যাতি ( না কি কুখ্যাতি!) ছড়িয়ে পড়েছে। রবীন্দ্রনাথ, প্রমথ চৌধুরী, শরৎচন্দ্র থেকে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ লেখকদের সংখ্যায় সংখ্যায় তুলোধোনা করে পত্রিকাটি তখন সকলের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে।তবে ‘কল্লোল’ গোষ্ঠীর কবিদের লেখা আধুনিক কবিতা কাটাছেঁড়া করেই সম্ভবত বেশি আমোদ পেতেন তিনি। ১৯৩১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এই কাগজের সাহিত্য বিভাগেই প্রকাশ পেল ‘ক্যাম্পে’ কবিতার সেই বিখ্যাত সমালোচনা। জীবনানন্দের কবিতাকে অশ্লীল, অকাব্য কিছুই বলতে বাকি রাখেননি সেদিন সজনীকান্ত। কিন্তু কেন অশ্লীলতার তকমা লেগেছিল ‘ক্যাম্পে’ কবিতার গায়ে? কী ছিল সেই লেখায়? জীবনানন্দ বলছেন-

“…
ঘাইমৃগী সারারাত ডাকে;
কোথাও অনেক বনে—যেইখানে জ্যোৎস্না আর নাই
পুরুষহরিণ সব শুনিতেছে শব্দ তার;
তাহারা পেতেছে টের,
আসিতেছে তার দিকে।
আজ এই বিস্ময়ের রাতে
তাহাদের প্রেমের সময় আসিয়াছে;
তাহাদের হৃদয়ের বোন
বনের আড়াল থেকে তাহাদের ডাকিতেছে জ্যোৎস্নায়—
পিপাসার সান্ত্বনায়—আঘ্রাণে—আস্বাদে”

হরিণ শিকারের আবহকে তুলে এনে নর-নারীর প্রেম, শরীর, অতৃপ্ত কামনা ফাঁদের এই যে অসাধারণ আধুনিক মেটাফর তা সেকালে অনেক সাহিত্য-মুরুব্বিরই হজম হয়নি। দাঁত নখ বের করে ধেয়ে এসেছিল আক্রমণ।

‘ঘাইহরিণী’ শব্দটা নিয়ে খুব আপত্তি ছিল সজনীকান্ত দাসের। যৌন উদ্দীপক শব্দ বলে দেগে দিয়েছিলেন ‘ঘাইহরিণী’কে। আপত্তি ছিল ‘হৃদয়ের বোন’ শব্দটা নিয়েও। তাঁর মনে হয়েছিল ভাই-বোনের পারিবারিক সম্পর্কের ছবিতেও বোধহয় যৌনতার কালি মাখিয়েছেন জীবনানন্দ। ‘শনিবারের চিঠি’তে ব্যঙ্গ করে লিখেছিলেন – “বনের যাবতীয় ভাই-হরিণকে তাহাদের হৃদয়ের বোন ঘাই-হরিণী আঘ্রাণ ও আস্বাদের দ্বারা তাহার পিপাসার সান্ত্বনার জন্য ডাকিতেছে। পিস্তুতো মাস্তুতো ভাই-বোনদের আমরা চিনি। হৃৎতুতো বোনের সাক্ষাৎ এই প্রথম পাইলাম।…”

‘পরিচয়’এর মতো বিখ্যাত সাহিত্য পত্রিকায় সম্পাদক সুধীন্দ্রনাথের তত্ত্বাবধানে যেখানে রবীন্দ্রনাথ, হীরেন্দ্রনাথের কবিতা ছাপা হয়, সেখানে এমন অশ্লীল লেখা কী করে ছাপা হয় সে নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সজনীকান্ত। শুধু ‘ক্যাম্পে’ নয়,  ‘বোধ’, ‘মাঠের গল্প’, ‘ঘোড়া’ র মতো একাধিক বিখ্যাত কবিতা নিয়েই সেসময় হাসিঠাট্টা করা হয়েছিল ‘শনিবারের চিঠি’তে।

সজনীকান্ত দাস

কবিতা সমালোচনার পাশাপাশি সেদিন কবিকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করতেও ছাড়েননি সজনীকান্ত। ‘জীবানন্দ’ বা ‘জিহ্বানন্দ’; ‘কবি-গণ্ডার’- ব্যক্তি জীবনানন্দকে আঘাত করার জন্য এইসব শব্দ তখন কথায় কথায় ব্যবহার করতেন তিনি।পরের পর বেশ কয়েকটি সংখ্যায় এই লাগাতার দুরমুশ, ব্যঙ্গবাণ, বিদ্রুপ-কটাক্ষ ভিতরে ভিতরে যেন আরও একা, বিচ্ছিন্ন করে তুলেছিল জীবনানন্দকে। নষ্ট হয়েছিল কবির আত্মবিশ্বাস। বিষয়টা সেসময়কার পাঠককে এতটাই প্রভাবিত করেছিল, যে সিটি কলেজ থেকে সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক কারণে জীবনানন্দের চাকরি চলে যাওয়া প্রসঙ্গে রটে যায় অশ্লীল কবিতা লেখার অপরাধেই চাকরি হারিয়েছেন কবি।

মৃত্যুর ১বছর আগে সপরিবারে দিল্লিতে

আঘাতে আঘাতে সেসময় ঠিক কতটা তিতিবিরক্ত ছিলেন জীবনানন্দ, সেটা বোঝা যায়, যখন ‘ক্যাম্পে’ নিয়ে এই বিরুদ্ধ মতামতগুলোর উত্তর দিতে নিজেই কলম তুলে নেন। সেসময় প্রায় জবাবদিহির ঢংয়ে একটি লেখা লেখেন কবি, যদিও স্বভাবগত দ্বিধা বা বিষাদে সে লেখা ছাপতে দেননি কোথাও। তাঁর মৃত্যুর পর ‘শতভিষা’ পত্রিকার ভাদ্র সংখ্যায় ছাপা হয় সে লেখা।

সেদিন সব বিরুদ্ধ সমালোচনার জবাব দিতে তিনি লিখেছিলেন- “ক্যাম্পে কবিতাটির মানে অনেকের কাছে এতই দুর্বোধ্য রয়ে গেছে যে এ কবিতাটিকে তাঁরা নির্বিবাদে অশ্লীল বলে মনে করেছেন। কিন্তু তবুও ‘ক্যাম্পে’ অশ্লীল নয়। যদি কোন একমাত্র স্থির নিষ্কম্প সুর এই কবিতাটিতে থেকে থাকে তবে তা জীবনের-মানুষের-কীট ফড়িঙের সবার জীবনেরই নিঃসঙ্গতার সুর।”

জীবনানন্দের মতো প্রচারবিমুখ কবিকেও যখন নিজের সপক্ষে এভাবে কলম তুলে নিতে হয়, বোঝা যায় কতটা মানসিক কষ্ট আর আঘাত তাঁকে এই কাজে বাধ্য করেছিল। আর এখানেই প্রশ্ন জাগে, সজনীকান্ত কি সত্যিই বোঝেননি ক্যাম্পে কবিতার আধুনিক ভাষ্য? প্রেমিকাকে ‘হৃদয়ের বোন’ সম্বোধন করা নিয়ে এত যে জলঘোলা, অথচ জীবনানন্দের বহু আগেই তো কবি শেলি তাঁর ‘এপিসাইকিডিয়ান’ নামের দীর্ঘ কবিতায় এমনই এক শব্দবন্ধ ব্যবহার করে ফেলেছেন। টেরেসা ভিভিয়ানি বা এমিলিয়া নামের জনৈকা ইটালীয় মহিলার প্রেমে পড়ে লেখা সেই বিখ্যাত কবিতায় প্রেয়সীকে কবি ডেকেছেন ‘হার্টস সিস্টার’ নামে। এই ‘হৃদয়ের বোন’ তো সেই ‘হার্টস সিস্টার’এরই বাংলা তর্জমা।

জীবনানন্দ নিজে পুরোনো ও সমকালীন ইংরাজি সাহিত্যের যে কতখানি মুগ্ধ পাঠক ছিলেন তা আজ কারোরই জানতে বাকি নেই। তাঁর ডায়েরি আর চিঠিপত্রেও সেই প্রমাণ ভুরি ভুরি। কিন্তু নিজেও স্বনামধন্য কবি-সমালোচক হয়ে সজনীকান্ত কি পরিচিত ছিলেন না বিদেশি ভাষায় বহু আগে লেখা এই বিখ্যাত শব্দবন্ধের সঙ্গে?

এর উত্তরও পাওয়া যায় জীবনানন্দ দাশের মৃত্যুর পর। সেসময়কার একাধিক লেখালিখিতে সজনীকান্ত দাস নিজেই স্বীকার করেছেন, কবি হিসাবে জীবনানন্দ দাশ ছিলেন অনেক উচ্চমানের মহৎ আধুনিক কবি। তরুণ বয়সে নেহাত খোঁচা দিয়ে আনন্দ পাওয়ার উদ্দেশ্যেই আরও নানা কবির পাশাপাশি তাঁরা জীবনানন্দেরও ত্রুটি ধরতেন।

কবির অকালমৃত্যুর পর নিন্দুক সমালোচকদের নিরীহ চেহারা যেন কিছুটা মুখোশ। বেঁচে থাকতে যাকে গালি না দিয়ে জল খেতেন না, মৃত্যুর পরে তাঁরই গুণগ্রাহী সেজে ওঠার খেলা অবশ্য নতুন কিছু নয়। যুগে যুগে এই অভিনয় পুনরাবৃত্ত হয়। কিন্তু মহাকালের হাতে অন্যায় সমালোচনার গরম হাওয়া উবে যায়, পরে থাকে একমাত্র সত্যি, তার নাম কবিতা।

Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More