দুধের শিশুকে বুকে বেঁধে মরতে গেছিলেন, তিনিই আজ হাজার শিশুর মা

দ্য ওয়াল ব্যুরো: মেরেধরে, চরিত্রহীন অপবাদ দিয়ে যখন শ্বশুরবাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, তখন উনিশ পেরিয়ে সদ্য কুড়ি’তে পড়েছে মেয়েটা। বিরাট পৃথিবীর কিছুই দেখেনি সে। একটা দশ দিনের সদ্যোজাত বাচ্চাকে বুকে জড়িয়ে খোলা আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে সে বুঝেছিল এই বিরাট পৃথিবীতে তার আর কোনও আশ্রয় নেই।কিন্তু সব চলে গেলেও পেটের জ্বালা থেকে যায়। সেই খিদের তাড়নাতেই দুধের বাচ্চাটাকে বুকে জড়িয়ে সেদিন টলতে টলতে সে এসে পৌঁছেছিল এক রেলস্টেশনে। বসে পড়েছিল ভিখিরিদের পঙক্তিতে। গান গাইলে ভিক্ষে জোটে, তাই খালি গলায় গান গেয়েই দুপয়সা রোজগার শুরু। তারপরও দিনের শেষে গলা দিয়ে খাবার নামত না। এই স্টেশন চত্বরেই শুয়ে আছে কত অসুস্থ, বৃদ্ধ, রুগ্ন, পঙ্গু মানুষ। তাদের মুখে অন্ন নেই। সেখানে দাঁড়িয়ে একা, স্বার্থপরের মতো ভাত খাবে সে! ভিক্ষের টাকায় চাল কিনে, আটা কিনে দিনের শেষে রান্না করে খুঁজে বেড়াত কে অভুক্ত আছে৷ সবাইকে খাইয়ে তবে নিজে খাওয়া।

মহারাষ্ট্রের একটা ছোট্ট গ্রামে জন্ম তার। গরীব বাড়ির মেয়ে, টাকার অভাবে ৪ ক্লাস অব্দি পড়াশোনা করার সুযোগ পেয়েছিল। তারপর, মাত্র ১০ বছর বয়সেই বাবা-মা তার বিয়ে দিয়ে দেয় বয়সে দ্বিগুণ বড় একজনের সঙ্গে। অপরিচিত মানুষটার হাত ধরে যেদিন ছেলেবেলার আশ্রয় ছেড়ে শ্বশুরবাড়ির পথে পা বাড়িয়েছিল মেয়েটি, সেদিনও জানত না আগামীতে কী কী অগ্নিপরীক্ষা অপেক্ষা করে আছে তার জন্য। টুকটাক লিখতে পড়তে পারত, মুখে মুখে বুনে ফেলতে পারত ছড়া, সেই অপরাধে বিয়ের পর কম মার খেতে হয়নি তাকে। মেয়েমানুষের আবার পড়াশোনা কী! তাই আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হত তার কুড়িয়েবাড়িয়ে আনা কাগজ, বইপত্র।

সংসার আর স্বামীর চাহিদা মেটাতে মেটাতে সেই কিশোরী তখন বছর ১৯ এর যুবতী। ন’মাসের গর্ভবতী সেই মেয়ে না কি ‘বদচলন’! চরিত্রের মিথ্যে অপবাদ দিয়ে শ্বশুরবাড়ি থেকে মেয়েটাকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে দূর করে দেয় স্বামী। কিন্তু ভরপোয়াতি অবস্থায় কোথায় যাবে সে! শ্বশুরবাড়ির সকলের হাতেপায়ে ধরেও আশ্রয় মেলেনি সেদিন, উলটে জুটেছিল পতিদেবতার পদাঘাত।

মারধোর আর লাথির আঘাতে অজ্ঞান ভারী শরীরটাকে টেনেহিঁচড়ে এনে কোনওভাবে তারা ফেলে রেখে গেছিল গরুর গোয়ালে। যখন জ্ঞান ফেরে তখন মেয়েটি বুঝতে পারে, ওই অজ্ঞান অবস্থাতেই সন্তানের জন্ম দিয়েছে সে। গোয়ালের জমা নোংরা আর খড়ের গাদার মধ্যেই চারদিক আলো করে শুয়ে আছে এক দেবশিশু, তার সদ্যোজাত মেয়ে। ধাই জোটেনি, তাই নিজের হাতে পাথর দিয়ে সেই সদ্যোজাত বাচ্চার নাড়ি কেটেছে সে। শুধু নাড়ি নয়, সেদিন বোধহয় পাথরের আঘাত দিয়েই সে ছিঁড়ে ফেলেছিল এতদিনের সব সম্পর্ক আর আজন্মলালিত সংস্কার।বাপের ঘরেও আশ্রয় জোটেনি তার। কুড়ি বছরের মেয়ে, ভরা যৌবন, বন্ধু নেই, অভিভাবক নেই, বিপদে আপদে পাশে দাঁড়ানোর কেউ নেই। কোথায় যাবে সে! রাত্রে স্টেশনে শুতেও ভয় করত মেয়েটার। দুধের বাচ্চাটাকে বুকে জড়িয়ে পায়ে পায়ে চলে যেত শ্মশানে। সে জানতো, অশরীরীর থেকেও ভয়ংকর মানুষের মতো দেখতে জন্তুরা। শ্মশানে জীবিত মানুষ আসে না বিশেষ। তাই সেখানেই নিরাপদে রাত্তিরটুকু ঘাঁটি গেড়ে বসে থাকত। মরার ইচ্ছে হয়েছে অনেকবার। ভিখিরির জীবন, ঘেন্নার জীবন। কী হবে সেই জীবনে! এসব পাঁচ-সাত ভেবে অনেকবার মেয়ের হাত ধরে রেললাইনে চলে গেছে সুইসাইড করবে বলে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে কে যেন ফিরিয়ে আনত তাকে। শ্মশানের সেই পুড়ে যাওয়া শবেরা ডেকে বলত, ‘লড়াই কর, মরার আগে মরিস না।’

তেমনই একদিন শেষরাতে মেয়েকে বুকে বেঁধে মরার সংকল্প নিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে, এমন সময় কানে এল একটা কান্নার শব্দ। এক বয়স্ক ভিখিরি স্টেশনেরই এক কোণে কাঁদছিল। তার কেউ নেই, কেঁদে কেঁদে দু-ঢোক জল খেতে চাইছিল সে। মায়া হল মেয়েটার। অসুস্থ লোকটার কাছে এসে বলল, শুধু জল কেন বাবা! আমার কাছে রুটিও আছে। মরতেই চলেছ যখন, খেয়ে মর। সঙ্গের রুটিগুলো খাইয়ে দিলো বুড়ো লোকটাকে। আর কী আশ্চর্য লোকটা মরল না। বেঁচে গেল। এই ঘটনাটা সেদিন নাড়িয়ে দিয়েছিল মেয়েটাকে। বেঁচে থাকা যে কত দামি এক অনুভব, তা সেদিন বুঝেছিল মেয়েটি। সেই মেয়ে সিন্ধু তাই সপকল, যাকে আজ সারা দেশ চেনে ‘অনাথের মা সিন্ধু তাই’ নামে।

খাবার জুটতো না রোজ, তবু যেটুকু জুটতো ভাগ করে খেতেন সিন্ধু তাই। আশেপাশের মানুষের চরম দুর্গতি তাঁর চোখ খুলে দিয়েছিল। নিজেকে নিয়ে কাঁদার সময় ছিল না আর। স্টেশনে পড়ে থাকা ছোট ছোট অনাথ বাচ্চাদের কোলে তুলে নিতেন। আয়ের টাকা দিয়ে খাবার কিনে রাতে রান্না করতেন। শুধু নিজের সন্তানই নন, রেলস্টেশনে ঘুমিয়ে থাকে অন্যান্য অভুক্ত শিশুদেরও পেট ভরাতেন। গাইতেন ঘুমপাড়ানিয়া গান।

এমনই এক সময় একদিন ঘটে গেল এক আশ্চর্য ঘটনা। ভিক্ষে করতে গিয়ে একদিন দেখতে পেলেন একটি ব্রিফকেস। টাকা ভর্তি সেই ব্রিফকেস স্টেশন মাস্টারের অফিসে জমা দেন সিন্ধু তাই। কয়েক সপ্তাহ পর খুঁজে খুঁজে তার সঙ্গে দেখা করতে আসেন এক ভদ্রলোক। উপহার দিতে চান। ‘কোনও উপহার চাইনা, শুধু আমার শিশুদের নিয়ে থাকার জন্য একটা ছাতের ব্যবস্থা করে দিন’- এটুকুই চেয়েছিলেন সেদিন। এভাবেই একটু একটু করে গড়ে উঠল তার অনাথ আশ্রম। শুরু হলো জীবনের আরেকটি অধ্যায়। তাঁর সারা জীবনের অবদানের জন্য দেশে বিদেশে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সম্মানিত হয়েছেন সিন্ধু তাই। পেয়েছেন ‘নারী শক্তি পুরস্কার’, ‘পদ্মশ্রী’ সহ  ৭৫০ রকমের সম্মাননা। “মাদার অফ থাউজেন্ড অরফানস” নাম নিয়ে তিনি রোজই সামাজিক মাধ্যমের ট্রেন্ডিং টপিক। তার জীবন নিয়ে তৈরি মারাঠি ছবি পেয়েছে জাতীয় পুরস্কারও। করোনা আবহেও একের পর এক জনকল্যাণমুখী কাজ করে চলেছেন ৭৫ বছরের এই মহিলা।এখনও মুখে মুখে ছড়া কাটেন সিন্দুতাই৷ শোনান ভজন-কীর্তন। বিশ্বের একাধিক দেশে বক্তৃতা দিয়ে আসা ‘আয়ি’কে তাঁর পরিবার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি অবলীলায় বলেন, তিনি ২৪৩ জন ছেলে মেয়ের শাশুড়ি, আর নাতি নাতনির সংখ্যা ১০৫০।সিন্ধু তাই বিশ্বাস করেন জীবনে সবার আগে শিক্ষা। নিজের অরফানেজের ছেলেমেয়েদের পড়াশোনাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর অনাথালয় থেকে শত শত নামহীন শিশু আজ ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হয়ে শুধু ভারতে না, বিশ্বের নানান জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন। তাঁরই আশ্রয়ে লালিত সন্তান আজ পিএইচডি করছে ‘সিন্ধুতাই’কে নিয়ে। সন্তানের কৃতিত্বেই মার কৃতিত্ব। সেই কথাকেই জীবনের ধ্রুব সত্যি বলে মনে করেন ‘সকলের মা সিন্ধু তাই সপকল’।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More