জমিদারের ছেলে, কুষ্ঠরোগীদের সেবায় বিলিয়ে দিয়েছিলেন সব, আজীবন কাটিয়েছেন খাটো ধুতি পরে

শাশ্বতী সান্যাল

স্বাধীনতার ঠিক একবছরের মাথায় স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে গাছের নীচে খুললেন দীন-দরিদ্রদের জন্য দাতব্য হাসপাতাল। মাত্র ১৪ টাকা মূলধন আর ৬ জন রুগীকে নিয়ে খোলা সেই হাসপাতাল বড় হতে হতে আজ ২৫০ একরের একটা গ্রামের রূপ নিয়েছে৷ স্বনির্ভর সেই গ্রাম ‘আনন্দবন’ আজ দেশ-বিদেশের গরীব কুষ্ঠ রোগীদের পুনর্বাসনের কেন্দ্রও।

পিতৃদত্ত নাম মুরলীধর আমতে। কিন্তু সে নাম কবে যে বদলে গেছে লোকের মুখে মুখে। দুঃখী, আতুর, অসুস্থ, সর্বহারা মানুষ তাঁকে ডাকতেন ‘বাবা’ বলে৷ আর ডাকবে না-ই বা কেন! জমিদারের ছেলে হয়েও দেশের মানুষের কাজে স্থাবর-অস্থাবর সবই বিলিয়ে দিয়েছেন দুহাতে। মোটাসুতোর খাটো ধুতি আর ফতুয়া পরে কাটিয়েছেন আজীবন। হ্যাঁ, কথা হচ্ছে ‘আনন্দবন’এর প্রতিষ্ঠাতা বাবা আমতে‘কে নিয়ে।১৯১৪ সালে মহারাষ্ট্রের এক ধনী, ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ‘বাবা’ আমতে। তাঁর বাবা দেবীদাস আমতে ছিলেন ইংরেজ সরকারের রেভিনিউ ডিপার্টমেন্টের অফিসার। সেই পরাধীন ভারতে প্রায় সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মেছিল দেবীদাসের বড় ছেলে। নাম রাখা হল মুরলীধর, ডাকনাম ‘বাবা’।

মুরলীধর বেড়ে উঠেছেন বড় আশ্চর্য এক সময়ে। সারা দেশ তখন ছটফট করছে পরাধীনতার গ্লানি থেকে মুক্তি পেতে। গান্ধিজির ডাকে উত্তাল হয়ে উঠেছে আসমুদ্রহিমাচল। ছোটোবেলা থেকেই গান্ধীজির ভাবাদর্শে নিজেকে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন মূরলীধর। খুব কাছ থেকে দেখা গ্রামীণ জীবন তাঁকে শিখিয়েছিল অনেককিছু। এ দেশে শ্রেণি বৈষম্যের চেহারা যে কতখানি ভয়ানক হতে পারে, তার আঁচ পেয়েছিলেন তিনি। একটু বড় হয়ে কিছুটা পরিবারের চাপেই আইন নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। প্রথম থেকেই মেধাবী ছাত্র, বিদেশ থেকে ওকালতি পাশ করে এসে মাত্র ২০ বছর বয়সেই উকিল হিসাবে সুখ্যাতি অর্জন করেন মুরলীধর আমতে।জমিদার বাড়ির বড় ছেলে, ছেলেবেলা থেকেই দক্ষ ছিলেন শিকার, রেসিং, ঘোড়ায় চড়ায়। কমবয়েসে একাহাতে ভল্লুকও মেরেছেন। খুব প্রিয় ছিল একটি রেসিং কার। আগাগোড়া চিতার চামড়া দিয়ে মোড়া ছয় আসনবিশিষ্ট সেই বিশেষ গাড়িটার দাম ছিল তখনকার দিনেই কয়েক লাখ টাকা। আভিজাত্যে মোড়া এই স্বচ্ছল জীবনে থেকেও এক আশ্চর্য দরদি মন ছিল মুরলীধর আমতে’র। আইন প্র‍্যাকটিসের পাশাপাশি ঐ বয়সেই জড়িয়ে পড়লেন স্বাধীনতা সংগ্রামের কাজে৷ কারাগারে বন্দি ভারতীয় বিপ্লবী ও স্বাধীনতা কর্মীদের হয়ে বিনা পয়সায় ব্রিটিশ প্রভুদের বিরুদ্ধে কেস লড়তেন আমতে। বিশেষ করে ‘ভারত ছাড়ো আন্দোলন’এ যারা কারাবরণ করেছিল, স্বেচ্ছায় তাদের পক্ষের উকিল হিসাবে কাজ করতেন।গান্ধীজির আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে সেসময় খাদি পড়া শুরু করেন তিনি। নিজের হাতে চরকা চালিয়ে সুতো কেটে তৈরি করতেন নিজের পোশাক। ব্রিটিশ সৈন্যদের অশ্লীল কৌতুক থেকে সেসময় একটি মেয়েকে রক্ষা করেন মুরলীধর আমতে। সে খবর পৌঁছয় সোজা গান্ধীজির কানে। এ ঘটনার পরেই আমতের সাহসিকতায় মুগ্ধ গান্ধিজি তাঁর নতুন নাম দেন ‘অভয় সাধক’কাছাকাছি এই সময় কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত এক ব্যক্তির সঙ্গে আলাপ হয় মুরলীধরের। সেই কুষ্ঠরোগীর ক্ষয়ে যাওয়া পচা শরীর আর অবর্ণনীয় দুঃখদুর্দশা দেখে মনে মনে ভীষণ কষ্ট পেয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, কুষ্ঠরোগীদের প্রতি সমাজের ব্যবহার, তাদের জন্তুজানোয়ারের মতো দূরছাই করার মানসিকতা দেখেও স্তম্ভিত হয়েছিলেন তিনি। তাঁর মনে হয়েছিল, কুষ্ঠ শুধু একজন মানুষের শরীরেই বাস করে না, কুষ্ঠ ছড়িয়ে আছে এ সমাজের মনের মধ্যেও।

কারও কুষ্ঠ ধরা পড়লে তার নিজের লোকজন, আত্মীয়স্বজন তাকে ঘেন্না করতে শুরু করে। দেবতার অভিশাপ বলে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয় তাকে। অথচ অসুস্থ মানুষটার প্রতি আরও বেশি সহৃদয় হওয়ার প্রয়োজন ছিল তাদেরই। দরকার ছিল আরও স্নেহ, মমতা, পরিচর্যা। পরবর্তীকালে এ প্রসঙ্গেই তিনি বলেছিলেন- “অঙ্গহানিই একমাত্র ভয়ংকর দিক নয়, কুষ্ঠ মানুষের মন থেকে দয়া আর করুণা অনুভব করার শক্তিটা মেরে ফেলে, সেটাই আসল অসুখ।”কুষ্ঠ রোগীদের চিকিৎসার জন্য তিন-তিনখানা আশ্রম খোলেন তিনি। সেখানে দাতব্য ওষুধপত্রের পাশাপাশি থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাও মিলত।

সপরিবার বাবা আমতে

বাবা আমতে সেই বিরল মানুষদের একজন, যিনি নিজের সারাটা জীবন উৎসর্গ করেছেন সমাজসেবার কাজে। গান্ধীজির আদর্শে ভরসা রেখে লড়ে গেছেন রাজনৈতিক অন্যায়, অস্বচ্ছতা আর দুর্নীতির বিরুদ্ধে। ৭২ বছর বয়সে তিনি কন্যাকুমারী থেকে কাশ্মীর পর্যন্ত পায়ে হেঁটে ঘুরেছেন, যোগাযোগ গড়ে তুলেছেন সাধারণ মানুষের মধ্যে। অসুস্থ শরীর নিয়েও ‘ভারত জোড়ো অভিযান’এ অংশ নেন তিনি, হেঁটে যান ৩০০০ মাইলেরও বেশি দূরত্ব। শেষ বয়সে এসে ১৯৯০ সাল নাগাদ মেধা পাটেকরের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনেও।মানবতার পক্ষে তাঁর আজীবন লড়াইয়ের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭১ সালে পদ্মশ্রী পুরস্কারে সম্মানিত হন বাবা আমতে। ১৯৮৮ সালে মানবাধিকার ক্ষেত্রে জাতিসংঘ পুরস্কার এবং ১৯৯৯ সালে গান্ধী শান্তি পুরস্কারে সম্মানিত হন৷ বলা হয়, এক নোবেল ছাড়া সরকারি-বেসরকারি প্রায় সমস্ত বড় সম্মানেই সম্মানিত হয়েছেন তিনি। ২০০৮ সালে নিজের হাতে তৈরি আনন্দবনেই শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন গান্ধীজির এই শেষ অনুগামী। আজ ‘বাবা’ নেই, কিন্তু তাঁর জীবনবোধ রয়ে গেছে। তাঁর দেখানো পথেই এগিয়ে চলেছেন তাঁর দুই ছেলে ও পরিবার

Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More