কাননবালা, বাংলা ছবির ফার্স্ট গ্ল্যামার গার্ল কিন্তু আন্তরিকতায় অতুলনীয়া

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

সুচিত্রা সেনের চলচ্চিত্র জীবন কাহিনীর নীল নকশা যেন কাননবালা এঁকেছিলেন অনেক আগেই। দুজনের খ্যাতি, ক্যারিয়ার গ্রাফ অনেকটাই এক। কাননের সংগ্রাম যদিও ছিল অনেক বেশী শক্ত। আবার সুচিত্রার ভাঙা সংসারে চিরভরসার জননী ছিলেন সুচিত্রার কানন দি।

সুচিত্রা অন্তরালে সরে যাওয়ার আদেশও অনেকটাই কাননের থেকে পান। ১৯৯২ সালের প্রথম দিকে অসুস্থ হয়ে কিংবদন্তি কানন দেবী যখন হাসপাতালে, অন্তরালের সুচিত্রা সেন কানন দেবীকে দেখতে গিয়েছিলেন। এতটাই হৃদ্যতা ছিল দুজনের।

কিন্তু তফাৎ দু’জনের আন্তরিকতায়। সুচিত্রা স্টারডম ছেড়ে কোনদিনও বেরোননি। তৎকালীন ইন্ডাস্ট্রির অনেকেই সুচিত্রা সান্নিধ্য পাননি। ইন্ডাস্ট্রির ম্যাডাম তিনি। তাঁর আগে কেউ ম্যাডাম ছিলেন না। সুচিত্রা ‘দেবী’তে রূপান্তরিত হতে চাননি। যদিও ‘দেবী চৌধুরানী’ তিনিই। আজীবন প্রণয়িণী রিনা ব্রাউন। তাঁর তেজ দম্ভ রহস্যই তাঁর দর্প কখনও আবার খুব আপনভোলা মুডের অপর নাম ম্যাডাম সেন।

কিন্তু কানন বালা বা কানন দেবী যাই বলুন তিনি ইন্ডাস্ট্রির জননী। নায়িকা গায়িকা প্রযোজিকা, অভিভাবিকা কত কি!

মুনমুন সেনের বিয়েতে কানন-সুচিত্রা, টলিউডের দুই দীপ্তিময়ী

প্রথম গল্প থেকেই বুঝতে পারবেন কানন দেবী মহাতারকা হয়েও স্টারডমের বালাই করতেন না। এখানেই কাননের মহত্ব।

গল্পটা শোনা সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের বোনঝির স্বামীর থেকে। তিনি একবার স্টুডিও থেকে সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়কে আনতে গেছিলেন। তো তখনও শ্যুট চলছে সাবিত্রীর। তো ঐ ভদ্রলোককে একটা সোফায় মেকআপ রুমে বসতে দেওয়া হয়েছে। ওপরে পাখা ঘুরছে। ভদ্রলোক অপেক্ষা করছেন সাবিত্রী দেবীর জন্য।

হঠাৎ এক বয়স্কা ভদ্রমহিলা ঘরে ঢুকে এলেন। খুব গরমকাল তখন। ঘরে ঢুকে ভদ্রমহিলা বললেন সাবিত্রীর বোনঝির স্বামীকে, ‘বাবা, এই পাখার তলায় একটু বসব? খুব গরম পড়েছে।’

ভদ্রলোক বলেছেন, ‘হ্যাঁ বসুন।’

ভদ্রমহিলা সোফায় বসা দূর, বসে পড়লেন সটান মাটিতে। বাড়ির মা মাসি ঠাকুমারা যেমন মাটিতে বসেই আরাম করেন সেরকমই বসে পড়েছেন। কিছুক্ষণ বাদে ঘরে প্রবেশ শ্যুটিং সেরে সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের।

বোনঝির স্বামী বললেন ‘চলো তোমায় নিতে এসেছি।’

সাবিত্রী সে কথা শুনবেন কি, ঐ মাটিতে বসা ভদ্রমহিলাকে দেখে হতবাক!

সাবিত্রী বলে উঠলেন ‘একি কাননদি, তুমি মাটিতে বসে! ওঠ ওঠ।’

ভদ্রলোক তো ঐ শুনে দিশেহারা। কি ভুল করলেন! চোখের সামনে মহাতারকা কানন দেবী। চিনতেই পারেননি। তাঁকে পায়ের কাছে বসতে দিয়েছেন। আসলে রূপোলি পর্দার কাননবালা তখন অভিনয় ছেড়ে দিয়েছেন। চেহারাও অনেক পরিবর্তিত। কিন্তু কানন দেবী তখন প্রযোজিকা।

দু’জনেই লজ্জায় দিশেহারা। কানন দেবী বললেন ‘থাম তোরা বাছা! গরম লাগছিল তাই মাটিতে পাখার তলায় ঠান্ডায় বসেছি। মেলা ঝামেলা করিস নে তোরা। বল শ্যুটিং কেমন করলি।’

তারপর হাসি আড্ডা গল্প। মধুরেণ সমাপয়েৎ।

সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়

এটাই হল কাননদেবীর আন্তরিকতা, অচেনা মানুষকেও আপন করে নেওয়া। স্টারডম ঝেড়ে ফেলে বাস্তবের মাসিমা পিসিমা হয়ে ওঠা। ভাবুন কাননবালার মতো সুপারস্টার মাটিতে এসে বসছেন। যেটা স্বপ্নাতীত। যে আন্তরিকতা আজকালকার কোনও সিরিয়ালের অভিনেত্রীরাও দেখান না। কেউ পারবে এটা করতে কোনও জগতে? নাহ। কিন্তু কানন যে ‘দেবী’।

হয়তো ঐ মাটি ধরিত্রী-মাতাকে সম্মান দিয়েছিলেন বলেই কানন, দেবী হতে পেরেছিলেন। যার কাছে সুচিত্রা-সাবিত্রী কিংবা সুপ্রিয়া-উত্তম কুমার সবাই আশ্রয় পেতেন ভরসা, নির্ভরতা পেতেন। কাননও তো জনককন্যা সীতা, যিনি মাটির সন্তান। বহু লালসা কামনা শোষন নিপীড়ন থেকে উর্ত্তীনা মহাতারকা কাননবালা থেকে কানন দেবীতে যার উত্তরণ। তবু সেই ধরিত্রীমাতাই যেন তাঁর আশ্রয়স্থল। শূন্য থেকে শুরু করে শত কোটি তে পৌঁছোন তবু মাটিতে পা রেখে চলতে ভুলে যাননি।

দেবকী কুমার বসু ও কানন দেবীর স্নেহধন্য উত্তমকুমার

কানন এর আন্তরিকতার আরেকটা গল্প বলি। শ্রীমতী পিকচার্স, কাননের প্রোডাকশান হাউসে হঠাৎ একদিন এক ভদ্রলোক হাজির। এসেই আবদার, ‘টাটকা চুনো মাছের ঝোল খাব।’ অনেক খোঁজের পরে মাছ মিলল। আর তা কাটতে বসলেন কাননদেবী। মাছ কেটে, রেঁধেবেড়ে ভদ্রলোককে তৃপ্তি করে খাওয়ালেন কানন দেবী। ম্যানিকিওর, পেডিকিওর দরকার পড়েনি, অথচ কানন বাংলা ছবির প্রথম আইকনিক গ্ল্যামার গার্ল।

শচীন কর্তার সংবর্ধনায় কাননবালার সঙ্গে উত্তম কুমার এবং রাহুল দেব বর্মণ

যে পিতৃপরিচয়হীন বালিকা কাননকে একদিন সমাজ দুমুঠো অন্ন খেতে দেয়নি সেই বালিকাই বড় হয়ে শীর্ষস্থানিয়া রূপে বহু দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন অন্নপূর্ণার মতো।

‘মেজদিদি’ ছবিতে কানন দেবী ও শিখারানি বাগ

সেবার কাননের সূর্যনগরের পাড়ায় সরস্বতী পুজোর খানাপিনা। পাড়ার লোকের ভোজের মাঝে হঠাৎ একদল বেপাড়ার ভিখিরি এসে হাজির। পাড়ার পুজোর হর্তাকর্তারা তো তাঁদের তাড়িয়ে দিতে এই মারে কি সেই মারে! রুখে দাঁড়ালেন পুজোর চিফ গেস্ট কানন দেবী। বললেন ‘আমি বেঁচে থাকতে কোনও লোক যেন অভুক্ত না থাকে। ওঁদের বসিয়ে খাবার দেবার ব্যবস্থা কর। খাবার তো বাড়তি আছেই। দরকার হলে ওদের কিছু বেঁধে দিয়েও দাও। ওঁদের খাওয়া শেষ হলেই আমি খাবো। ততক্ষণ আমার উপবাস চলবে।’

এত বড় কথা কানন দেবী বলার পর আর কার বুকের কত পাটা যে ভিখিরিদের অভুক্ত রাখে! সব দরিদ্র-ভোজন শেষে নিজে খেতে বসলেন কানন দেবী। সত্যি তিনি দেবী। দেবী কেউ উপাধি নিয়ে হন, কেউ সম্পত্তির জোরে হন, কেউ খ্যাতির জোরে হন। কাননের এই সবকটি ছিল। কিন্তু কানন দেবীতে উর্ত্তীর্ণা হন আন্তরিকতা, স্নেহ আর মমত্ববোধের জোরে।

সূর্যনগরে কালীপুজোয় পাড়ার মাসিমা কানন। ছবি – জ্যোতিপ্রকাশ গুহ

কাননকে বাংলাছবির ফার্স্ট গ্ল্যামার গার্ল বলা হত, কিন্তু গ্ল্যামারেই ভেসে যাননি তিনি। নিজেকে একজন সেলফ মেড উয়োম্যান হিসাবে গড়ে তুলেছেন, সমাজের অনন্যা হয়েছেন। এমন নারী সবার চোখে গডমাদার।

সত্যি বনফুল কানন।

প্রথম ব্র‍্যান্ডেড নায়িকা কানন দেবী কিন্তু তিনি জোড় হাত করে বলতে পারেন ‘সবারে আমি নমি’!

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More