গাছ কাটা রুখতে অস্ত্রের মুখে এসে দাঁড়িয়েছিল গোটা সম্প্রদায়, বুকের দুধ দিয়ে তাঁরা আজও লালন করে পশুদের

দ্য ওয়াল ম্যাগাজিন ডেস্ক: প্রায় তিনশো বছর আগের কথা। মোঘল সাম্রাজ্যের গৌরব সূর্য ততদিনে ঢলে পড়েছে পশ্চিমে। বণিকের ছদ্মবেশে এসে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত ধরে এদেশের বুকে একটু একটু করে সাম্রাজ্য বিস্তার শুরু করেছে শ্বেতাঙ্গ প্রভুরা। সেই যুগসন্ধিতে দাঁড়িয়ে ১৭৩০ সাল নাগাদ মাড়োয়ার তথা যোধপুরের সিংহাসনে বসলেন রাজপুত অভয় সিং।

সদ্য সিংহাসনে বসেই রাজা অভয় সিং ঠিক করলেন রাজপুতানার বুকে নতুন এক কেল্লা বানাবেন। কিন্তু অত বড় ইমারত তৈরির জন্য দরকার প্রচুর কাঠ। কোথা থেকে আসবে অত কাঠ! রাজপুত রাজার চোখ পড়ল ওখান থেকে ২৬ কিলোমিটার দূরে বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের খেজার্লি গ্রামের উপর। ঠিক হল, ওই গ্রামের চারপাশে যেসব শক্তপোক্ত খেজরি গাছ আছে, তা কেটে এনেই বানানো হবে কেল্লা। সেই মতোই মন্ত্রী গিরিধরের নেতৃত্বে যোধপুর রাজার সৈন্যরা চলল বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের গ্রামের উদ্দেশ্যে। কিন্তু যে গাছ কাটার পরিকল্পনা রাজা নিয়েছিলেন, মরুদেশে স্বল্প জলে জন্মানো সেই খেজরি গাছ ছিল খেজার্লি গ্রামের প্রাণের সম্পদ। বিরাট এই গাছগুলো শুধু ছায়াই দেয়না এতে ফলে বিনস জাতীয় একরকমের ফল, যা কিনা স্থানীয় মানুষ আর পশুদের আহার। আর তাছাড়া বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের কাছে প্রকৃতি ও গাছ ছিল ঈশ্বরের সমান। তাই রাজার শমনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালেন সে গ্রামেরই রমণী অমৃতা দেবী বিশনয়ী।

সোজা কথায় কাজ হচ্ছে না দেখে মন্ত্রী গিরিধর প্রথমে ঘুষ দিয়ে ও পরে ভয় দেখিয়ে কাজ হাসিল করার চেষ্টা করেন। কিন্তু অমৃতাদেবী ছিলেন নাছোড়। তিনি কিছুতেই গাছ কাটতে দেবেন না। এদিকে নতুন কেল্লা বানানোর জন্য কাঠ আনার চেষ্টা বিফলে যাওয়ায় রাগে ফেটে পড়লেন রানা অজয় সিং। আদেশ দিলেন, যে কোনও মূল্যে কেটে আনতে হবে সেই গাছ। রাজার আদেশে পরদিন আবার সেই গ্রামে ফিরে এলেন রাজার সেনাবাহিনী। সৈন্যদের ফিরে আসার খবর পেয়েই প্রমাদ গণলেন অমৃতা দেবী। কিন্তু ভয় পেয়ে পিছিয়ে এলেন না। উলটে গাছকে বুকে জড়িয়ে দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করলেন, “সার সন্ঠে রুখ জায়ে, তো ভি সাস্তো জান”- যার বাংলা করলে দাঁড়ায়, একটি মাথার বিনিময়ে হলেও যদি একটি গাছ বাঁচানো যায়, তবে তা-ই সই।

রাজাদেশের কাছে সাধারণ মানুষের প্রাণের দাম আর কত! গাছ কাটতে মরিয়া সৈন্যরা তাই কোনওকিছুর পরোয়া না করে গর্দান লক্ষ করে চালিয়ে দিল তরোয়াল। রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ল অমৃতাদেবীর দেহ। মায়ের দেখাদেখি তাঁর তিন কন্যা অসু, ভগু আর রত্নি একইভাবে দাঁড়িয়েছিল গাছেদের জড়িয়ে। একে একে প্রাণ যায় তাদেরও। শুরু হয় নির্বিচারে বৃক্ষচ্ছেদন।

কিন্তু এরপরই প্রবল বাধার মুখে পড়ে রাজার সৈন্যরা। অমৃতাদেবী ও তার তিন মেয়ের মৃত্যুর খবর দাবানলের মতো দিকবিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে ততক্ষণে। সেই খবর পেয়ে ছুটে আসে ৮৩টি বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের গ্রামের মানুষ। গাছ বাঁচাতে নিজেদের প্রাণের তোয়াক্কা না করে একে একে গাছ জড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন তাঁরা। এরপরের ঘটনা এদেশের রাজপুত ইতিহাসের এক লজ্জাজনক অধ্যায়। রক্তপিপাসু হায়নার মতো রাজার সৈন্যরা ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরস্ত্র বিষ্ণোইদের উপর। নির্বিচারে শুরু হয় হত্যালীলা। একের পর এক মাটিতে লুটিয়ে পড়ে রক্তাক্ত মানুষ আর খেজরি গাছের দেহ। সেদিন মাড়োয়ার রাজ্যের রাজপুত ক্রোধের বলি হয়েছিল ৩৬৩ জন প্রকৃতিপ্রেমী বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের মানুষ।

ভারতের বুকে এটাই বোধহয় রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে প্রকৃতিপ্রেমীদের প্রথম আন্দোলন, যাকে ইতিহাস চেনে বিষ্ণোই মুভমেন্ট নামে। কিন্তু জানেন কি, কারা এই বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের মানুষ? এই ভারতের বুকে আজও কি বেঁচে আছে এই আশ্চর্য প্রকৃতিপ্রেমী জাতি? উত্তর খুঁজতে ইতিহাসের পাতা ধরে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে বেশ কয়েকশ বছর। পশ্চিম রাজস্থানের বিস্তীর্ণ থরের বুকে বহু বছর ধরে বাস করছেন এ সম্প্রদায়ের মানুষ। ধর্মীয় দিক থেকে বিশনয়ী বা বিষ্ণোইরা সনাতন বৈষ্ণব ধর্মের ধারাভুক্ত হলেও এঁদের দর্শন একদম আলাদা। এঁরা বিশ্বাস করেন এই পৃথিবীর বুকে ঈশ্বরের সৃষ্ট প্রতিটি জীবনের বেঁচে থাকার অধিকার আছে। ঈশ্বর যখন তাদের সৃষ্টি করেছেন তখন তাদের প্রাণ কেড়ে নেওয়ার অধিকার কারও নেই। প্রাণ আর প্রকৃতিকে রক্ষা করাই এই বিষ্ণোইদের কাছে পরম ধর্ম।

কথিত আছে, রাজস্থানের পিপাসার গ্রামে ১৪৫১ সাল নাগাদ জন্মগ্রহণ করেছিলেন এক মহাত্মা, তাঁর নাম জাম্বেশ্বর। তিনিই পরবর্তীকালে এই বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠা করেন। বিষ্ণুর উপাসক ছিলেন জাম্বেশ্বর। গবেষকেদের একাংশ মনে করেন, বিষ্ণুর নাম থেকেই সেই সম্প্রদায়ের নাম হয় বিষ্ণোই। আবার কারও কারও মতে, গুরু জাম্বেশ্বর যে মোট ২৯টি নীতির কথা বলে গিয়েছিলেন সেই নীতির সংখ্যা অনুযায়ী সম্প্রদায়ের নাম হয়েছে বিশনই;  অর্থাৎ তাতে রয়েছে বিশ যুক্ত নয় অর্থাৎ ২৯টি শব্দ।

গুরু জাম্বেশ্বর

গুরু জাম্বেশ্বর তাঁর ভক্তদের বলেছিলেন, প্রকৃতিকে বাঁচানোর কথা। সুস্থভাবে বাঁচতে গেলে নিজের চারপাশের প্রতিবেশীদের মানে, পশু-পাখি-গাছপালাকেও বাঁচিয়ে রাখার প্রয়োজন রয়েছে, সেটাই ছিল তাঁর মূল বক্তব্য। ২৯ টি নীতির মধ্যে ১৯ নম্বর নীতি অনুযায়ী, সবুজ কোনও গাছ কাটা এই সম্প্রদায়ের কাছে অধর্ম! শুনতে অবাক লাগলেও গাছ যাতে কাটতে না হয় বা বলা যায় জ্বালানীর অপচয় রুখতে হিন্দু হয়েও বিষ্ণোইরা শবদেহ পোড়ায় না, বরং কবর দেয়।

বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের বসবাস মরু এলাকায় হওয়ায় এখানকার মাটি অনেকটাই আলাদা। ফলতঃ একপ্রকার জীবন রক্ষার্থেই বিশনয়ীরা এখানে সেখানে তৈরি করেন গুল্মের ঝাড়। এতে একদিকে যেমন মাটিক্ষয় রোধ হয়, সুরক্ষা পায় ভূমি, তেমনই অন্যদিকে দুর্ভিক্ষের সময় গবাদি পশুরা সেই সবুজ গুল্ম খেয়ে বেঁচে থাকতে পারে। কৃষ্ণসার ও চিঙ্কারা হরিণদের তেষ্টা মেটাতে খেতের মাঝে তৈরি করা হয় কুয়ো। পাখিরা যাতে তাদের বাসস্থান তৈরি করতে পারে তাই খেতের মাঝখানে নির্দিষ্ট দূরত্বে লাগানো হয় উঁচু উঁচু গাছ। বিপদে পশু পাখিদের নিজেদের ঘরে আশ্রয় দেন তাঁরা। এমনকি মাতৃহীন পশুশাবকদের নিজের বুকের দুধ খাইয়ে বড় করে তোলেন বিষ্ণোই নারীরা। পরম মমতায় সন্তানজ্ঞানে নিজের শিশুর সঙ্গে লালন করেন তাদেরও।

পরিবেশ রক্ষার্থে গাছের একটি পাতা পর্যন্ত ছেঁড়েন না এই বিষ্ণোইরা। বরং গৃহস্থালির কাজে ব্যবহার করেন কুড়িয়ে পাওয়া শুকনো পাতা, মরা ডাল, গাছের কাণ্ড কিংবা নারকেলের ছোবড়া ও গোবর। এই ক্ষয়িষ্ণু পৃথিবীর বুকে আজও এক অসম্ভব সুন্দর জীবন দর্শনের মধ্যে দিয়ে বেঁচগাছে এই বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের মানুষেরা।

বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের নাম আরও আবার প্রকাশ্যে এসেছিল ১৯৯৮ সালে, যখন সুরজ বরজাতিয়া পরিচালিত ‘হাম সাথ সাথ হ্যায়’ সিনেমার শুটিং চলাকালীন ‘থর’ মরুভূমির শহর যোধপুরের কাছে বিষ্ণোইদের কঙ্কণী গ্রামে বিরল প্রজাতির দু’টি কৃষ্ণসার হরিণ শিকারের অভিযোগ ওঠে বলিউড চিত্রতারকা সলমন খানের বিরুদ্ধে। যে সম্প্রদায়ের কাছে প্রকৃতি আর প্রকৃতির কোলে পরম নিশ্চিন্তে বেড়ে ওঠা পশুপাখিরাই সব, যে সম্প্রদায় গাছের জন্য আত্মবলিদান দিতে পারে, তারা বলিউড তারকাদের এই বন্দুকবিলাসের বিরুদ্ধে মামলা করবে এটাই স্বাভাবিক। মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন সলমন ও তাঁর সহকর্মী কলাকুশলীরা।

১৭৩০ সালে বিষ্ণোইরা যে আন্দোলন গড়ে তুলেছিল সেই আন্দোলনকে ভারতের প্রথম পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন বলা হয়। পরবর্তীকালে, একই পন্থায় গাছ বাঁচাও আন্দোলন হয় ভারতের উত্তরাখণ্ডে, যা চিপকো আন্দোলন নামে পরিচিত। স্বাধীনতার পরে অমৃতা দেবীর নেতৃত্বে প্রকৃতি বাঁচাতে শহিদ হওয়া বিষ্ণোইদের স্মৃতিতে খেজার্লিতে গড়ে উঠেছে স্মৃতিসৌধ। অমৃতা দেবীর নামে ‘অমৃতা দেবী বিষ্ণোই স্মৃতি পুরস্কার’ চালু করেছে রাজস্হান ও মধ্যপ্রদেশের বন-দফতর। অথচ সেই অমৃতাদেবীর কথা ইতিহাস মনে রাখেনি বরং মনে রেখছে রাজস্থানের রাজপুত তথা হিন্দু-স্বাভিমানের আইকন কল্পকাহিনীর পদ্মাবতীর কথা। আর ধীরে ধীরে ধূসর হয়ে গেছে ধরিত্রী মা’কে রক্ষা করার জন্য নিজের প্রাণ বলি দেওয়া রাজস্থান-তনয়া অমৃতাদেবীর স্মৃতি।

Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More