একটা আশ্চর্য বই, যা জন্ম দিয়েছিল রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের, বদলে দিয়েছিল একটা মহাদেশের চেহারা

দ্য ওয়াল ম্যাগাজিন ডেস্ক: কলম যে তরবারির চাইতেও শক্তিশালী সেকথা আবহমানকালের সাহিত্যের ইতিহাসে বারবার প্রমাণিত হয়েছে। দীনবন্ধু মিত্রের নীলদর্পণ নাটকের ইংরেজি অনুবাদ বৃটিশ পার্লামেন্টে পাঠানো হলে তার প্রতিক্রিয়ায় আইন বলবৎ করে ভারতবর্ষে নীলচাষ বন্ধ করে দেওয়া হয়। হাজার হাজার নীলচাষি নীলকর সাহেবদের নির্মম অত্যাচার আর দাসত্ব থেকে মুক্তি পায় এর ফলে।

এই ঘটনার বেশ কিছু সময় আগেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঔপন্যাসিক হ্যারিয়েট বিচার স্টো লিখেছিলেন এক যুগান্তকারী উপন্যাস ‘আঙ্কল টম’স কেবিন’। আমেরিকার গৃহযুদ্ধের লেলিহান আগুনে ঘৃতাহুতি দিয়েছিল এই বইটি। দাসপ্রথার বিরুদ্ধে লেখা এই বই আমূল বদলে দিয়েছিল আমেরিকার ইতিহাস। গৃহযুদ্ধ আরম্ভের পর আব্রাহাম লিংকন একবার দেখা করেন হ্যারিয়েটের সঙ্গে। সেদিন সবিস্ময়ে তিনি বলেছিলেন : ‘So this is the little lady who started this great war.’

ইতিহাস বলছে, খৃস্টপূর্ব ৪০০০ সালে মেসোপটেমিয়ায় প্রথম ক্রীতদাস প্রথা চালু হয়। ক্রমশ তা ছড়িয়ে পড়ে সারা পৃথিবীতে। আমেরিকার মতো বিশাল দুটি মহাদেশের লক্ষ লক্ষ একর অনাবাদী জমি চাষ করার মতো জনবল সেখানকার সামন্ত প্রভুদের ছিল না। ফলে আফ্রিকা থেকে লাখ লাখ কালো মানুষ ধরে আনা হল সেইসব অকর্ষিত কৃষিজমিতে শ্রম দানের জন্য। শুরু হল ‘ট্রান্স আটলান্টিক স্লেভ ট্রেড’। মূলত সেখানকার দাস-ব্যবসার কেন্দ্রভূমি ছিল পশ্চিম আফ্রিকার উপকূলীয় অঞ্চল, যার বিস্তার সেনেগাল থেকে এঙ্গোলা পর্যন্ত।

ইচ্ছের বিরুদ্ধে দাসদের প্রকাশ্য হাটে গরু-ছাগলের মতো কেনাবেচা করা হত। তুলো, তামাক, আখ ও অন্যান্য ফসলের জমিতে তাদের উদয়াস্ত অমানুষিক পরিশ্রম করতে বাধ্য করা হত। কথায় কথায় চলত অত্যাচার। পাছে কেউ পালিয়ে যায় তার জন্য গলায় আর পায়ে শিকল পরিয়ে রাখা হত। ক্রীতদাসীদের দিয়ে বাড়ির যাবতীয় কাজকর্ম করানো হত। সঙ্গে চলত যৌন নির্যাতন। জাহাজে চালান করার সময় বহু দাসের মৃত্যু ঘটত। অনাহারে অর্ধাহারে অসুখে অত্যাচারেও মারা যেত বহু ক্রীতদাস। পালিয়েও রেহাই ছিল না, পলাতক দাসদের খুঁজে আনার জন্য শ্বেতাঙ্গ প্রভুরা শিকারি কুকুর নিয়োগ করত। উত্তর আমেরিকার চাইতে দক্ষিণ আমেরিকায় এই দাসপ্রথা ছিল আরও ভয়াবহ।

হ্যারিয়েট এলিজাবেথ বিচার স্টোর(১৮১১– ১৮৯৬) জন্ম কানেটিকাটের লিচফিল্ডে। তাঁর বাবা লাইম্যান বিচার একজন ক্যালভানিস্ট ধর্মযাজক। তিনিও ছিলেন দাসপ্রথা বিলোপের পক্ষে একজন বলিষ্ঠ প্রবক্তা। মা রোক্সানা বিচার ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ এক মহিলা। অনেক ভাইবোনের মধ্যে বড় হয়ে ওঠা হ্যারিয়েট ছোটবেলা থেকেই বাবা মায়ের আদর্শকে সামনে রেখেই ক্রীতদাস প্রথার বিরুদ্ধে নিজের অন্তরাত্মাকে প্রস্তুত করে তুলেছিলেন। তিনি আর তাঁর স্বামী রেভারেন্ড কেলভিন ব্যক্তিগত উদ্যোগে বহু দাসকে মুক্ত করে নিজেদের বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছিলেন।

বাবা-মা ভাইবোনেদের সঙ্গে হ্যারিয়েট

সারাজীবনে কুড়িটিরও বেশি বই লিখেছেন হ্যারিয়েট। তবে ‘আঙ্কল টম’স কেবিন’ লিখে তিনি যে অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন, পৃথিবীর মানবিকতার ইতিহাসে তা সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে। প্রথম বছর বইটি যুক্তরাষ্ট্রে তিন লক্ষ কপি বিক্রি হয়েছিল। গ্রেট ব্রিটেনে বিক্রি হয়েছিল এক মিলিয়ন কপি। চল্লিশ বছর বয়সে লেখা এই বইটি প্রথমে ‘ন্যাশনাল এরা’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। তারপর ১৮৫২ সালের ২০ মার্চ এটি বই হিসেবে প্রকাশ পায়। তার প্রায় দেড় দশক পরে আব্রাহাম লিংকন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আইন করে দাসপ্রথার অবসান ঘটান। উইলিয়াম বুথ নামের এক ঘাতক যখন লিংকনকে হত্যা করে, তখন তিনি একটি থিয়েটার হলে বসে ছিলেন। মৃত্যুর সময়ও তাঁর হাতে ছিল একটি উপন্যাস : ‘আঙ্কেল টম’স কেবিন’।

আব্রাহাম লিংকন

এই উপন্যাসের ক্রীতদাস টম স্বপ্ন দেখেছিল এক শোষণমুক্ত সমাজের। যেখানে সবাই সমান অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকতে পারবে। যেখানে দাসপ্রথা থাকবে না। যেখানে মানুষ অর্থ ও ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে নিজেকে সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের চেয়ে বড় বলে মনে করবে না। একদা নাস্তিক কবি শেলিও এই স্বপ্ন দেখেছিলেন।

এই উপন্যাসের একটি শিশুকন্যা ইভা। সে-ই প্রথম টমকে জানায় তার স্বপ্নের কথা। যে স্বপ্ন এক অত্যাচার-মুক্ত সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন। ইভার সেই স্বপ্নই আসলে হ্যারিয়েট বিচার স্টোর মর্মলালিত স্বপ্ন। আঙ্কল টম’স কেবিন সেই শাশ্বত স্বপ্ন-সম্ভাবনার উপন্যাস। যার অন্য নাম ‘Life Among The Lowly’.

১৮৪৯ সালে প্রকাশিত একজন ক্রীতদাসের (Josiah Henson এর লেখা The Life of Josiah Henson) আত্মজীবনীমূলক বই পড়েই হ্যারিয়েট এরকম একটি বই লেখার অনুপ্রেরণা পান। পাশাপাশি বহু নিগ্রো ক্রীতদাসের সঙ্গে কথা বলে নিজের অভিজ্ঞতার ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করে তুলেছিলেন তিনি। তাঁর উপন্যাসের টমকাকা কোনও ব্যক্তিচরিত্র নয়। সে এক নিপীড়িত সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি, এক অন্ধকার সময়ের প্রতীক।

টম প্রথমে ছিল কেন্টাকির এক ফার্ম-মালিক আর্থার শেলবির ক্রীতদাস। টাকার অভাবে শেলবি আর তার স্ত্রী এমিলি একদিন ঠিক করে টমকে বিক্রি করে দেবে। সঙ্গে ক্রীতদাসী এলিজার ছেলে হ্যারিকেও। শেলবির ছেলে জর্জ টমকে ভীষণ ভালোবাসত। সে চায়নি টমকে বিক্রি করা হোক। এলিজা ও হ্যারি রাতের অন্ধকারে পালিয়ে যায়। টম তাদের পালাতে সাহায্য করে।

এরপর টমকে দাস-ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। মিসিসিপির স্রোতে ভেসে সে চলে যায় বহু দূরে। এবার তার মালিক হয় ক্লেয়ার নামে একজন। প্রভু হিসাবে খুব খারাপ ছিলেন না ক্লেয়ার, আর তাঁরই ছোট্ট মেয়ের নাম ইভা। টমের সঙ্গে তার গভীর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। অসুস্থ ইভা মৃত্যুর আগে আঙ্কেল টমকে জানায় তার স্বপ্নের কথা : সে স্বপ্ন দেখেছে এমন এক আশ্চর্য পৃথিবীর, যেখানে মানুষে মানুষে কোনও ভেদাভেদ নেই, যেখানে সকলেই সমান, যেখানে শোষণ ও অত্যাচার বলে কিছু নেই। এই নিষ্পাপ মেয়েটির স্বপ্নই যেন এই বইয়ের মূল সুর। ইভা যেন লেখিকা হ্যারিয়েটেরই অল্টার ইগো।

ক্লেয়ারের মৃত্যুর পর অবস্থা বিপাকে পড়ে তার স্ত্রী টমকে বিক্রি করে দেয় সাইমন লেগ্রি নামে এক নিষ্ঠুর ব্যক্তির কাছে। সাইমন তাকে লুসিয়ানায় নিয়ে যায়। সেখানে আরও অনেক ক্রীতদাসের সঙ্গে দেখা হয় টমের। সাইমন চাইত, টম তার হয়ে অন্য দাসদের উপরে অত্যাচার করুক। কিন্তু সেই প্রস্তাবে রাজি হয় না সে। ফলে প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে সাইমন। টমের ঈশ্বর-বিশ্বাসকেও পছন্দ করত না সাইমন। স্বাভাবিকভাবেই অমানুষিক নিপীড়ন চলত তার উপরে। সহ-ক্রীতদাসদের বাঁচাতে বাইবেল পড়া বন্ধ করে দেয় সে। এবং গোপনে ক্যাসি ও ইমেলিন নামে দুজন ক্রীতদাসকে পালাতে সাহায্য করে। এই অভিযোগে সাইমন টমের উপরে ভয়ংকর নির্যাতন শুরু করে। আর শেষপর্যন্ত টমকে মেরে ফেলার নির্দেশ দেয়।

সাইমন চাইত, টম অন্য দাসদের উপরে অত্যাচার করুক

মৃত্যুর আগে সাইমন জানতে চায়, টম তাকে প্রভু বলে স্বীকার করে কীনা। কিন্তু মার খেতে খেতে মরে যাওয়ার আগেও টম জানায়, প্রভু একজনই, তিনি ঈশ্বর, সাইমন মালিক মাত্র, আর কিছু নয়।

এই অনমনীয় জেদ ও গভীর ঈশ্বরবিশ্বাস নিয়ে মারা যায় টম। প্রথম মালিক শেলবির ছেলে জর্জ তখন একটু বড়, প্রিয় কাকা টমকে মুক্ত করার জন্য খুঁজতে খুঁজতে যখন সে অকুস্থলে আসে, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। তার প্রিয় আঙ্কেল টম আর বেঁচে নেই, একথা জানতে পেরে মর্মাহত জর্জ ফিরে গিয়ে বাড়ির সমস্ত ক্রীতদাসকে মুক্ত করে দেয়।

একটা দীর্ঘ সময় ধরে দক্ষিণ আমেরিকায় নিষিদ্ধ করা হয়েছিল এই বই। কিন্তু আগ্নেয়গিরির লাভাস্রোতকে কে কবে বন্দী করে রাখতে পেরেছে! প্রেসিডেন্ট লিংকনের নেতৃত্বে সারা আমেরিকা জুড়েই একদিন কৃতদাস প্রথা রদ করা হয়। শুরু হয় নতুন পর্ব। একশ সত্তর বছর পরে ‘আঙ্কল টম’স কেবিন’ আজও সমান প্রাসঙ্গিক। আজও এই বই আমাদের চেতনাকে উদ্দীপ্ত করে। আজও হ্যারিয়েট বিচার স্টো, সেই আশ্চর্য মেয়ে আর তাঁর সেই বৈপ্লবিক কলম এই পৃথিবীর প্রতিটা মানুষের কাছে সমান প্রণম্য।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More