বিজ্ঞানী থেকে সিরিয়াল কিলার, উদ্ভট এক ভয়ংকর শাস্তি দেওয়া হয়েছিল রোমান মহিলাকে

শাশ্বতী সান্যাল

ভেষজ বিজ্ঞান ছিল তাঁর নখদর্পণে। গাছগাছড়া, শেকড়বাকড় খুঁজে তৈরি করতেন আশ্চর্য সব বিষ। সেই বিষের সামান্য প্রয়োগেই টপাটপ মারা যেত নির্দোষ মানুষ। এভাবে বিষপ্রয়োগ করে মানুষ মারাটা একসময় নেশার পর্যায়ে চলে যায় তাঁর। কখনও খেলার ছলে, কখনও পরীক্ষানিরীক্ষার প্রয়োজনে চলতেই থাকে হত্যালীলা।  শাস্তির ভয়? নাহ, রাজার ভারি কাছের মানুষ যে তিনি! নিয়মিত সাহায্য করেন রাজকার্যেও। তাঁর উদ্ভাবন করা বিষ দিয়েই তো মেরে ফেলা হয় রাজার শত্রু আর দেশদ্রোহীদের। আর তাই সাত খুন কেন, সাতশ খুন মাফ ছিল সেই বিজ্ঞানীর। আইনকানুনের নাকের সামনে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অবাধে চলছিল সেই মানুষ মারার খেলা।

এভাবে কতদিন চলত কে জানে! কিন্তু সময়ের নিয়মে গদি পালটে যেতেই নেমে এল সমূহ বিপদ। রাষ্ট্রযন্ত্রের হাতে ধরা পড়লেন পৃথিবীর প্রথম সিরিয়াল কিলার। বিচার বসল, আর সেই বিচারে ভয়ংকর এক সাজার নিদান দেওয়া হল তাঁকে। কী সেই শাস্তি, যা শুনলে আজও হাড় হিম হয়ে আসে? আর কে সেই নির্মম ঘাতক বিজ্ঞানী? জানতে গেলে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে কয়েক হাজার বছর।

ষড়যন্ত্র, নিষ্ঠুরতা, অবাধ যৌনতা, ভাইয়ের হাতে ভাইয়ের খুন- এসব নিয়েই গড়ে উঠেছিল দু’হাজার বছরের প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্য। এই রোম সাম্রাজ্যের জুলিও-ক্লডিয়ান রাজবংশের চতুর্থ রাজা ছিলেন ক্লডিয়াস। তার আগের সম্রাট ক্যালিগুলা আবার সম্পর্কে ছিলেন ক্লডিয়াসের ভাইপো। নিজের দেহরক্ষীদের হাতে একদিন আচমকাই খুন হয়ে যান ক্যালিগুলা। তারপর যা হয়, পথের কাঁটা সরিয়ে রোমের সিংহাসনে বসেন তাঁর সৎ কাকা ক্লডিয়াস।

দেহরক্ষীর হাতে খুন হলেন সম্রাট ক্যালিগুলা

রাজা হিসাবে ক্লডিয়াস নেহাত মন্দ ছিলেন না। অন্তত আগের রোমান সম্রাটদের মতো রক্তপিপাসু আর পাশব চরিত্রের ছিলেন না তিনি। কিন্তু সমস্যা দেখা দিল যখন অবৈধ যৌন সম্পর্ক আর ষড়যন্ত্রের আঁচ পেয়ে তিনি নিজের আগের স্ত্রী মেসালিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে বিয়ে করে বসলেন নিজেরই ভাইঝি এগ্রিপিনা দ্য ইয়ঙ্গার’কে। প্রথম রোমান সম্রাট অগাস্টাসের বংশধর এই এগ্রিপিনা। তাঁর ধমনিতেও বইছে নীলরক্ত। রাজকীয় উচ্চাশার পাশাপাশি কূটবুদ্ধি আর হিংস্রতা ছিল তাঁর চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ক্লডিয়াসকে সরিয়ে নিজের ছেলে নিরোকে রোমের সিংহাসনে বসানোই একমাত্র ধ্যানজ্ঞান হয়ে দাঁড়ায় রানি এগ্রিপিনার। নতুন বউয়ের চাপে পড়ে সৎ ছেলে নিরোকে দত্তক নিতে একরকম বাধ্য হন ক্লডিয়াস৷

মায়ের আদরে-প্রশ্রয়ে ছেলেবেলা থেকেই উচ্ছন্নে গেছিল নিরো। রাজ্য পরিচালনার চেয়ে অভিনয়, সুর আর সুরাতেই তার আগ্রহ ছিল বেশি। একইসঙ্গে তার ভেতর জন্ম নিচ্ছিল এক ভয়ানক নিষ্ঠুর ব্যক্তিত্বের।

মায়ের আদরে-প্রশ্রয়ে উচ্ছন্নে গেছিল নিরো

সৎ ছেলে হলেও রাজার সন্তানদের মধ্যে বয়সের হিসেবে নিরোই ছিলেন বড়। তাই ক্লডিয়াসের পর নিরোই ছিলেন রাজসিংহাসনের দাবিদার। কিন্তু তর সইছিল না রানি এগ্রিপিনার। অনেকদিন ধরেই তক্কে তক্কে ছিলেন তিনি। বুড়ো রাজা ক্লডিয়াসকে খুন করতে হবে, আর এমনভাবে করতে হবে যাতে রোমান সেনেট বা প্রজারা কিচ্ছুটি বুঝতে না পারে। আর তাই গোপনে বিষপ্রয়োগ করে খুন করার বুদ্ধিই আঁটলেন তিনি।

রানি এগ্রিপিনার সঙ্গে ছেলে নিরো ( রোমান স্থাপত্য)

কিন্তু বিষয়টা মোটেও সোজা ছিল না। বুড়ো হলেও অসম্ভব বুদ্ধিমান আর দূরদর্শী ছিলেন রাজা ক্লডিয়াস। রাজপরিবারের ঘৃণ্য রাজনীতিও তাঁর অজানা ছিল না। তাই বিশ্বস্ত দেহরক্ষীদের পাশাপাশি তাঁর সঙ্গে সবসময় থাকত একদল খাবার পরীক্ষক। যেকোনও খাবার রাজা খাওয়ার আগে তা খেতে হত সেই পরীক্ষকদের। এতেও নিশ্চিন্ত ছিলেন না রাজা। তিনি জানতেন টাকার লোভ দেখিয়ে রাজকর্মচারীদের কিনে নেওয়া ষড়যন্ত্রকারীদের পক্ষে অসম্ভব নয় মোটেই। তাই খাবারে বিষ থাকলেও যাতে তা পাকস্থলী অব্দি পৌঁছতে না পারে, তাই খাওয়ার পর গলায় পালক ঢুকিয়ে বমি করার অভ্যেসও ছিল রাজার।

আশ্চর্য খাদ্যাভ্যাস ছিল রাজা ক্লডিয়াসের

এ অবস্থায় এগ্রিপিনার পাশে ত্রাতার ভূমিকায় এসে দাঁড়ালেন আর এক নারী… তাঁর নাম লোকাস্টা।

কে এই লোকাস্টা?

ইতিহাস বলে, রোমের গল প্রদেশের বাসিন্দা ছিলেন লোকাস্টা। আশ্চর্য মেধাবী ছিলেন তিনি। জিনিয়স বললেও কম বলা হয়! চিকিৎসা বিজ্ঞানে, বিশেষত ভেষজবিদ্যায় তাঁর জ্ঞান ছিল অপরিসীম।

নানারকম বিষ নিয়ে সেসময় গবেষণা করছিলেন লোকাস্টা। লোকমারফত তাঁর মেধা আর পাণ্ডিত্যের কথা জেনে গোপনে লোকাস্টাকে ডেকে পাঠিয়ে তাঁর সাহায্য চান রানি। রাজার খাদ্যাভ্যাস খুব ভালোমত জানতেন এগ্রিপিনা। তিনি লোকাস্টাকে এমন বিষ প্রস্তুত করতে বলেন, যা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়বে শরীরে। স্বাদ পরীক্ষকদের কয়েকজনকে সম্ভবত টাকা দিয়ে বশ করা হয়েছিল। অথবা কোনওভাবে তাদের চোখ এড়িয়ে কাজ হাসিল করার পরিকল্পনা করা হয়।

অভিনব ষড়যন্ত্রের শিকার হলেন রাজা ক্লডিয়াস

রানি এগ্রিপিনার হাতে লোকাস্টা তুলে দিলেন ডেথ ক্যাপ নামের এক বিষাক্ত মাশরুম। সামান্য অ্যাকোনাইটও মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল সেই মাশরুমে। সেই ভয়ানক বিষ মাশরুম সুকৌশলে মিশিয়ে দেওয়া হল রাজার খাবারে। কিন্তু খাওয়ার পরেই তো গলায় পালক ঢুকিয়ে বমি করবেন রাজা। ঠিকমতো কাজ হওয়ার আগেই বিষ যদি বেরিয়ে যায়! এবারেও বুদ্ধি আঁটলেন লোকাস্টা। ফন্দি করে পালকের ডগাতেও লাগিয়ে রাখলেন কয়েকফোঁটা বিষাক্ত তরল। ফলে যা হওয়ার তাই হল। একটার পর একটা বিষের তীব্র প্রতিক্রিয়ায় মুহূর্তে নীল হয়ে গেল রাজার শরীর। রাজার ব্যক্তিগত চিকিৎসক জেনোফোনকে ডেকে পাঠানো হল তক্ষুনি। কিন্তু অদৃষ্টের পরিহাসে সেই ডাক্তারও এগ্রিপিনা আর নিরোর হাতের পুতুল তখন। তাই ওষুধের বদলে রাজার শরীরে তিনিও ঢুকিয়ে দিলেন বিষ। এক নিদারুণ ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে নিজের ঘরেই ছটফট করতে করতে মারা গেলেন হতভাগ্য সম্রাট ক্লডিয়াস।

নিজের ঘরেই ছটফট করে মারা গেলেন সম্রাট ক্লডিয়াস

রাজাকে খুন করে এগ্রিপিনার ছেলে নিরো সিংহাসন পেলেন ঠিকই, কিন্তু নিশ্চিন্ত হতে পারলেন না। ক্লডিয়াসের ছেলে ব্রিটানিকাস তখনও বেঁচে। সিংহাসনকে নিষ্কণ্টক করতে মা-ছেলে আবার ছুটে গেলেন লোকাস্টার কাছে৷ তখনকার দিনে গরম জলে ওয়াইন মিশিয়ে খেতে ভালোবাসত রোমের অভিজাতরা। তেমনই একবার সুযোগ বুঝে ভীষণ গরম ওয়াইন পরিবেশন করা হয় ব্রিটানিকাসকে। গরমে তো তার জিভ পুড়ে যাওয়ার দশা। কোনওক্রমে কিছুটা ঠান্ডা জল গলায় ঢালতেই চোখে অন্ধকার দেখল সে। সেই ঠান্ডা জলের পাত্রে সবার অজান্তে বিষ মিশিয়ে রেখেছিল লোকাস্টা। বিষের জ্বালায় প্রাণ হারালো ক্লডিয়াসের ছেলে ব্রিটানিকাসও।

ভেষজ-বিজ্ঞানী থেকে সিরিয়াল কিলার

নিরো তো মহাখুশি। সিংহাসনের কাঁটা সরে গেছে তাঁর। জমি, বাড়ি, ধনদৌলত আর দামি দামি উপহারে ভরিয়ে দেওয়া হল লোকাস্টাকে। লোকাস্টার বিরুদ্ধে আনা সমস্ত অভিযোগ নস্যাৎ করে গবেষণার কাজ চালিয়ে যাওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতাও দেওয়া হল তাঁকে। রাজার আদেশে সেসময় নিয়ম করে কারাগার থেকে বন্দিদের পাঠানো হত লোকাস্টার গবেষণাগারে। গিনিপিগের বদলে এইসব বন্দিদের উপর নিজের আবিষ্কৃত নানা মারণ বিষের পরীক্ষানিরীক্ষা চালাতেন লোকাস্টা।

নিজের গবেষণাগারে লোকাস্টা

নিরোর রাজত্বে বেশ সুখেই দিন কাটছিল বিজ্ঞানী লোকাস্টার। সম্মান, প্রতিষ্ঠা, ধনদৌলত আসছিল ভালোই। যেকোনও বিপদে রাজা সবার আগে ডেকে পাঠাতেন তাঁকে। একদল শিষ্যশিষ্যাও জুটেছিল, যারা তাঁর কাছে নিয়মিত ভেষজ বিজ্ঞানের, বা প্রকারান্তরে বিষ তৈরির পাঠ নিতে আসত। ‘কনট্র‍্যাক্ট কিলার’ বলতে আজকাল আমরা যা বুঝি, সেকালে রোম সাম্রাজ্যে অনেকটা তেমনই ছিলেন লোকাস্টা। এই নারীই মানব ইতিহাসের প্রথম সিরিয়াল কিলার।

সম্রাট নিরোর সঙ্গে লোকাস্টা

বিজ্ঞানী হয়ে উঠেছিলেন ঘাতক। দিনের পর দিন কখনও টাকার বিনিময়ে, কখনও গবেষণার নামে কারণে-অকারণে মানুষ মারতে হাত কাঁপত না তাঁর। যত অপরাধই করুন না কেন, নিরোর রাজ্যে তাঁর গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করার স্পর্ধা ছিল না কারও। রাজার সমাদর আর পৃষ্ঠপোষকতায় তাঁর গবেষণা আর মানব-নিধন যজ্ঞ দুইই চলতে থাকে সমানতালে।

পরিণাম হল ভয়ংকর 

রোম ইতিহাসের সবচেয়ে নিষ্ঠুর আর অত্যাচারী রাজা বলা হয় নিরো’কে। নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য মা, ভাই, স্ত্রী কাউকে হত্যা করতেই হাত কাঁপেনি তাঁর। ১৬ বছর বয়সে রোমের সিংহাসনে বসেছিলেন, আর সেনাবাহিনীর সহযোগিতা নিয়ে রোমান সেনেট যখন তাঁকে ‘জনগণের শত্রু’ হিসেবে ঘোষণা করে, তখন নিরোর বয়স মাত্র ৩০৷ কিন্তু সেনেটের সৈন্যদের হাতে ধরা পড়ার আগেই বুকে ছুরি বসিয়ে আত্মঘাতী হন তিনি। আশ্রয়দাতা রাজার এই আকস্মিক মৃত্যুতে বিপদে পড়েন লোকাস্টা। মাথার উপর থেকে নিরোর ছায়া সরে যেতেই জনরোষ আছড়ে পড়ে তাঁর উপর।

খ্যাপাটে ভয়ংকর রোমান সম্রাট নিরো (স্কেচ)

বিচারসভা বসে, বিচারে দোষী সাব্যস্ত হন বিজ্ঞানী লোকাস্টা। কিন্তু যেমন তেমন শাস্তি নয়, এক নির্মম ভয়াবহ শাস্তি অপেক্ষা করে ছিল লোকাস্টার জন্য। এতটাই উদ্ভট আর ভয়ংকর সে শাস্তি, যে শুনলে হাড় হিম হয়ে আসে আজও। শোনা যায়, দোষ প্রমাণের পর লোকাস্টাকে ভিড়ের মধ্যে নগ্ন করে তাঁর গায়ে ঢেলে দেওয়া হয়েছিল এক নারী জিরাফের যোনিরস। তারপর তাঁর দিকে লেলিয়ে দেওয়া হয় বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত কিছু পুরুষ জিরাফকে। বন্যপ্রাণীর হাতে সর্বসমক্ষে ধর্ষিত হন লোকাস্টা। তারপর তাঁর আহত, ক্ষতবিক্ষত দেহটা ছুঁড়ে ফেলা হয় হিংস্র বুভুক্ষু জানোয়ারদের খাঁচায়।

লোকাস্টাকে যে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। কিন্তু জিরাফ দিয়ে ধর্ষণের ব্যাপারটা কষ্টকল্পনা বলে মনে করেন আজকের ইতিহাসবিদেরা। হয়তো বন্যপ্রাণীর মুখোশ পরা কিছু মানুষ মৃত্যুর আগে সর্বসমক্ষে যৌন নিগ্রহ করেছিল তাঁকে। ঘটনা যাই হোক, একজন জিনিয়স বিজ্ঞানীর এই পরিণাম শুধু দুর্ভাগ্যজনক নয়, বিশ্ব ইতিহাসে বিরলও। প্রশ্ন উঠতে পারে, সত্যিই কি বিরাট অপরাধী ছিলেন লোকাস্টা? না কি রাজতন্ত্রের হাতের পুতুল ছিলেন তিনি? নিজের স্বার্থসিদ্ধি করার জন্য এই নারীর মেধাকে বারবার ব্যবহার করেছে রাষ্ট্র। তাঁকে ঘিরে গড়ে তোলা হয়েছে ভয় আর আতঙ্কের পরিমণ্ডল। তার কতটা সত্যি, আর কতটা লোকমুখে ফেনিয়ে ওঠা গল্প, তা নির্ধারণ করা আজ অসম্ভব। অপরাধ প্রমাণ হলে সেকালে রোমের স্বাভাবিক শাস্তি ছিল মৃত্যুদণ্ড বা শিরোশ্ছেদ। কিন্তু এমন নির্মম যৌন নির্যাতন এর আগে বা পরে কাউকে করা হয়েছে কি? অপরিসীম মেধা আর পাণ্ডিত্যের অধিকারী নয়, বিজ্ঞান-সাধক নয়, এমনকি অপরাধীও নয়, এক অসুরক্ষিত নারী- দিনের শেষে রাষ্ট্রের কাছে তবে কি এটাই ছিল লোকাস্টার পরিচয়?

 

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More