সূর্যাস্তের পর নিধিবনে মানুষের প্রবেশ নিষেধ, পালিয়ে যায় পশুপাখিরাও

দ্য ওয়াল ব্যুরো: একটা নয়, আট আটটা তালা মেরে বন্ধ করে দেওয়া হয় রংমহল আর বাঁকেবিহারী মন্দিরের দরজা। সন্ধে নামতে না নামতেই তালা পড়ে যায় নিধিবনের মূল ফটকেও। সূর্যাস্তের পর শুধু মানুষ কেন, মরজগতের কোনও প্রাণীরই প্রবেশাধিকার নেই এই উপবনে। তাই দিনেরবেলা নিধিবনে ঘুরে বেড়ানো পশু-পাখিরাও অন্ধকার নামলেই এই জঙ্গল ছেড়ে চলে যায় অন্য কোথাও। কিন্তু কেন? কী এমন ঘটনা প্রতিরাতে ঘটে বৃন্দাবনের এই অরণ্যপ্রান্তরে, যা চর্মচক্ষে দেখার অধিকার নেই কারও!

ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ, বিষ্ণুপুরাণ আর শ্রীমদ্ভাগবতের মতো একাধিক ধর্মগ্রন্থে গোপীদের সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণের রাসলীলার বর্ণনা রয়েছে। জনশ্রুতি বলে, দ্বাপর যুগে বৃন্দাবনের কাছেই মধুবন নামে গাছপালা ঢাকা এক মনোরম অঞ্চল ছিল। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বড় প্রিয় ছিল এই মধুবন। গোপিনীদের নিয়ে তিনি প্রায়ই আসতেন মধুবনে। সেই মধুবনই না কি লোকমুখে নাম বদলে আজকের নিধিবন বা নিধুবন। ভক্তদের বিশ্বাস, এই নিধিবনে আজও প্রতি রাতে অভিসারে আসেন রাধারমণ শ্রীকৃষ্ণ। আসেন ‘শ্যামর হৃদয় বিহারিণী’ শ্রীরাধিকাও। প্রতি রাত্রেই গোপিনীদের সঙ্গে এই নিধিবনে মহারাসলীলায় মাতেন রাধা-গোবিন্দ। শোনা যায় ঠিক এই কারণেই নাকি, প্রতিদিন সন্ধ্যায় আরতির পরে নিধিবনের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়।

সত্যিই বড় আশ্চর্য জায়গা এই নিধিবন। এই জঙ্গলাকীর্ণ জায়গায় যে গাছপালা দেখা যায়, তেমন প্রজাতির গাছ সারা বৃন্দাবনে আর কোথাও দেখা যায় না। সোজা উপরের দিকে না বেড়ে এইসব গাছের ডালপালাগুলো বেড়ে চলে নীচের দিকে। ঘন ঝোপের মতো বেড়ে ওঠা আঁকাবাঁকা গাছগুলোকে দেখলে মনে হবে যেন মাথা নত করে কারও উদ্দেশ্যে তারা অভিবাদন জানাচ্ছে। বৃন্দাবন এমনিতে শুকনো দেশ। কিন্তু নিধিবনের গাছগুলো সারা বছরই চিরসবুজ পাতায় ঢাকা। পর্ণমোচী গাছের বদলে এমন চিরহরিৎ গাছ এই শুকনো দেশে বেঁচে আছে কী করে সেটাও আশ্চর্যের।

নিধিবনের তুলসীগাছগুলোও ভারি অদ্ভুত। একা তুলসী গাছ দেখাই যায় না এখানে। রাসনৃত্যের আদলে সমস্ত তুলসী গাছই জোড়ায় জোড়ায় জন্মায় এই বনে।

এই নিধিবনের মধ্যেই বিশাখাকুণ্ড বলে একটা জলাশয় আছে। খরার দিনেও শুকোয় না এই বিশাখাকুণ্ডের জল। কথিত আছে রাসনৃত্য চলাকালে কৃষ্ণের সখীদের অন্যতমা বিশাখার জলতেষ্টা পাওয়ায়, সেই তৃষ্ণা নিবারণের জন্য বাঁশির এক খোঁচায় এই জলাশয় নির্মাণ করেছিলেন শ্রীকৃষ্ণ। কৃষ্ণের পবিত্র বাঁশির ছোঁয়ায় তৈরি এই জলাশয়ের জলও খুব পবিত্র বৈষ্ণব ভক্তদের কাছে।

বৃন্দাবনের বিখ্যাত ‘বাঁকেবিহারী’জিউর মন্দির রয়েছে এই নিধিবনেই। মন্দিরের ভিতরে রয়েছে শ্রীকৃষ্ণের অসামান্য কারুকার্যমণ্ডিত এক মূর্তি। দেশের নানা প্রান্ত থেকে ভক্তেরা ছুটে আসে কষ্টিপাথরে তৈরি বাঁকাচাঁদকে একবার চোখের দেখা দেখতে। তাদের নামগানে সারাদিন মুখরিত হয়ে থাকে মন্দির প্রাঙ্গন। কিন্তু সন্ধ্যারতি শেষ হলেই বন্ধ করে দেওয়া হয় মন্দিরের সব দরজা- জানালা। ভক্ত কিংবা পূজারি- সন্ধের পর মন্দিরে থাকার অধিকার নেই কারো। মন্দির কর্তৃপক্ষের কড়া নির্দেশ অনুযায়ী সূর্যাস্তের পর আর কাউকে এই মন্দির চত্বরে থাকতে দেওয়া হয় না। ভক্তদের বিশ্বাস রাতের অন্ধকারে এই আপাত স্বাভাবিক নিধিবনের বুকেই জেগে ওঠে দ্বাপর যুগের সেই পৌরাণিক নিধুবন।

ভিড়ে ভিড়াক্কার মন্দিরপ্রাঙ্গন ফাঁকা হয়ে যায় সন্ধের পর

প্রতি রাত্রেই না কি স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, তাঁর হ্লাদিনীস্বরূপা রাধিকাকে নিয়ে পা রাখেন এই নিধিবনে। তখন জঙ্গল ভরে ওঠে আশ্চর্য আলোয়। সারাদিন মাথানত করে দাঁড়িয়ে থাকা গাছেরা অপরূপ নারীমূর্তি ধারণ করে তখন। ভক্তেরা বিশ্বাস করে, নিধিবনের প্রতিটি গাছই ছদ্মবেশী গোপিনী। যাঁরা শ্রীকৃষ্ণ দর্শনের আশায় যুগ যুগান্তর ধরে গাছের রূপ ধরে মাথা নত করে তপস্যামগ্ন রয়েছে এই নিধিবনে।

এই নিধিবনের মধ্যেই রয়েছে ‘রংমহল’ নামে আরও এক আশ্চর্য ছোট্ট মন্দির। ভক্তদের বিশ্বাস মহারাস সাঙ্গ করে ক্লান্ত শ্রীকৃষ্ণ রাধার সঙ্গে এই রংমহল মন্দিরেই বাকি রাতটুকু বিশ্রাম নেন।তাই সন্ধের আগেই পূজারিরা দেবতার জন্য এই মন্দিরে চন্দনকাঠের পালঙ্ক, জল-মিষ্টি, রাধার জন্য আয়না ও শৃঙ্গারের জিনিসপত্র, খিলি করা পান, দাঁতনকাঠি সব রেখে আসেন। তারপর তালা দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয় সেই মন্দিরও।

আশ্চর্যের ব্যাপার, পরের দিন ভোর পাঁচটা নাগাদ যখন মন্দিরের দরজা খোলা হয়, দেখা যায়, বিছানা এলোমেলো, আধখাওয়া মিষ্টি- পান, ব্যবহৃত দাঁতনকাঠি। সারারাত সেই তালাবন্ধ ঘরে কে বা কারা যেন বিশ্রাম নিয়ে গেছেন!

কিন্তু কী হয় রাত্রে নিধিবনে পা রাখলে?

বৃন্দাবনে কান পাতলেই শোনা যায় নিধিবন নিয়ে আশ্চর্য সব কাহিনি। নিধিবনে সূর্যাস্তের পর সকলের প্রবেশ নিষেধ। সরকারিভাবে সেই নিষেধাজ্ঞা লেখাও আছে চারদিকে।

স্থানীয় লোকেরা বলেন নিয়ম অমান্য করে কেউ যদি ঢোকে নিধিবনে, তাহলে তার নিস্তার নেই৷ অবিশ্বাসী কেউ কেউ না কি বিষয়টায় আমল না দিয়ে রাতের অন্ধকারে পা রেখেছিল নিধিবনে। অতিরিক্ত কৌতূহলেও কেউ কেউ সন্ধের পর লুকিয়ে গেছে নিধিবনে। পরের দিন সকালে তাদের প্রত্যেককেই পাওয়া গেছে অন্ধ, বোবা, উন্মাদ, বা অর্ধমৃত বিকলাঙ্গ দশায়৷ রাতের অন্ধকারে তাঁরা ঠিক কী দেখেছিল সে কথা জানানোর সুযোগ মেলেনি আর। কেবল একজন ভক্তই এর ব্যতিক্রম।

দূর থেকে নিধিবনের চিরসবুজ অরণ্য আর রংমহল

গুরুর মুখে নিধিবনের আশ্চর্য আখ্যান শুনে কোলকাতার এক বাঙালি ভক্তের কৌতূহল জেগেছিল রাতের নিধিবনে কী হয় তা স্বচক্ষে দেখার। সেই ইচ্ছে নিয়ে সে পাড়ি দেয় বৃন্দাবন। বাঁকেবিহারী দর্শনের পর পূর্বপরিকল্পনা মতো সে লুকিয়ে থাকে নিধিবনেরই এক ঝোপের আড়ালে। কিন্তু সন্ধেবেলা পূজারিদের হাতে ধরা পড়ে যায় সেই ভক্ত৷ এভাবে পরপর দু’দিন ব্যর্থ হয়ে আরও জেদ চড়ে যায় সেই ভক্তের। তৃতীয়দিন সে এমনভাবে লুকোয়, যে নিধিবনের পাহারাদারেরা খুঁজে পায়না তাকে। সন্ধের পর নিয়ম মতো রাধাশ্যামের খাট সাজিয়ে দরজায় তালা দিয়ে চলে যান পূজারিরা। পরের দিন যখন দরজা খোলা হয়, সেবায়েতরা নিধিবন পরিষ্কার করতে গিয়ে দেখেন প্রাঙ্গনে অচৈতন্য হয়ে পড়ে আছেন সেই ভক্ত। সে তখন এতটাই অসুস্থ যে কথা বলার শক্তিটুকুও নেই৷ তাড়াতাড়ি তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু চিকিৎসায় সাড়া দিচ্ছিল না ওই বাঙালি ভক্তের শরীর।

খবর পেয়ে ঘটনার ৫ দিন পর ছুটে আসেন তাঁর গুরুদেব। অসুস্থ শিষ্যকে নিজের আশ্রমে নিয়ে যান। কোনও এক অজানা কারণে বাকশক্তি একেবারে হারিয়ে ফেলেছিল লোকটি। ডাক্তারেরাও বুঝতে পারছিল না অসুখটা কোথায়। একদিন গঙ্গাস্নানে যাওয়ার আগে গুরু তাকে দেখতে এলে তাঁর কাছে ইশারায় একটা কাগজ-কলম চায় শিষ্য। শিষ্যকে কাগজ দিয়ে স্নানে যান গুরু। ফিরে এসে দেখেন শিষ্যের দেহে প্রাণ নেই আর। শুধু পাশে পড়ে আছে একটা চিঠি। চিঠিতে লেখা ছিল, ‘গুরুজি, এ কথা আমি কাউকে বলিনি। আপনাকেই বলছি এ কথা। আপনি বলতেন যে নিধিবনে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ রাসলীলা করতে আসেন, কিন্তু আমি বিশ্বাস করিনি। আপনার কথা অমান্য করে আমি নিধিবনে গেছিলাম। সেখানে আমি ভগবানের অলৌকিক রূপ প্রত্যক্ষ করেছি। সে রূপ দেখার পর জীবনে আর কিছু চাওয়ার নেই আমার। আমি আর বাঁচতেও চাইনা।’ স্পষ্ট বাংলায় লেখা সেই আশ্চর্য চিঠি আজও মথুরার সরকারি সংগ্রহশালায় সযত্নে রাখা আছে। যে কেউ চাইলে পড়েও আসতে পারেন।

[ ‘দ্য ওয়াল’ কোনও রকম অবাস্তব, অলৌকিক বা অতিপ্রাকৃতিক ঘটনায় বিশ্বাস করে না ]
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More