সমকালীন ধর্মের বিরুদ্ধে ছুঁড়ে দিয়েছিলেন চ্যালেঞ্জ, তাঁর বিদ্রোহের হাতিয়ার ছিল ‘হরিনাম’

শাশ্বতী সান্যাল

আড়াইশো বছরের মুসলিম শাসনের শেষে তখন একেবারে ভেঙে পড়েছে বাংলাদেশ। হিন্দু ধর্মের পুরোনো গৌরব ফিরিয়ে আনার নামে শুরু হয়েছে আশ্চর্য ব্যভিচার। গরীবদের রক্ত চুষে বড়লোকদের ম্লেচ্ছাচার আর সাধারণ মানুষের রোজকার জীবনে বেড়ে চলা দুর্দশা, সেসময় বঙ্গদেশের আম-গল্প। ব্রাহ্মণদের উৎপাত তো ছিলই, পাশাপাশি শৈব আর শাক্ত সাধকদের মধ্যে ভীষণভাবে বেড়ে গেছিল নানারকম অস্বাভাবিক তান্ত্রিক কাজকর্ম, শবসাধনা। ধর্মের নামে অবাধ যৌনতা আর ব্যভিচারও বেড়েছিল পাল্লা দিয়ে।

জাতপাত, সম্প্রদায়, উঁচু-নীচুর বিভেদে তখন ভিতরে ভিতরে হাজার টুকরো হয়ে গেছে বাঙালি। নিজের নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য এক গোষ্ঠীর মুরুব্বিদের সঙ্গে অন্য গোষ্ঠীর বাকযুদ্ধ থেকে হাতাহাতি- এসবই রোজকার ঘটনা। শান্তিপ্রিয়, তুলনায় অহিংস বৈষ্ণবেরা বাংলার বুকে যেন কিছুটা কোণঠাসা। তুলসীকাঠের মালা পরা, রসকলি আঁকা নেড়া-নেড়িদের নিয়ে প্রকাশ্যেই চলত ঠাট্টা-তামাশা।

এমনই এক প্রেক্ষাপটে পঞ্চদশ শতকের শেষভাগে নদিয়া জেলার নবদ্বীপে বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ জগন্নাথ মিশ্র ও তাঁর স্ত্রী শচী দেবীর ঘরে এক দোলপূর্ণিমার সন্ধ্যায় চন্দ্রগ্রহণের মধ্যে জন্ম নিল তাঁদের কনিষ্ঠ সন্তান। নিম গাছের নীচে জন্ম, তাই আদর করে ছেলের নাম রাখা হল নিমাই।

যখন নিমাই জন্মাচ্ছে, তখন কেমন ছিল বঙ্গদেশের অবস্থা? বৃন্দাবন দাস বলছেন, “তখন মানুষ অত্যন্ত ধর্মবিমুখ হয়ে পড়েছিল। ধর্মকর্মের মধ্যে ছিল সারারাত জেগে ‘মঙ্গলচণ্ডীর গীত’ শোনা, মদমাংস দিয়ে ‘যক্ষপূজা’, ধূমধাম করে বিষহরির পূজা আর পুত্রকন্যার বিয়েতে অর্থের অপচয় করা।”

আলাউদ্দিন হোসেন শাহের রাজত্বে রাজনৈতিক অস্থিরতা তেমন কিছু ছিল না ঠিকই, কিন্তু ধর্ম, জাত, ছোঁয়াছুঁয়ির নানা টুকরোয় নিজেকে ভেঙে ফেলেছিল হিন্দুসমাজ। গরীব আরও গরীব হয়েছিল, তুলনায় উচ্চবিত্তরা ফুলেফেঁপে উঠেছিল। একদিকে দারিদ্র্য আর অন্যদিকে জাতপাতের অনুশাসন – এই সাঁড়াশির চাপ থেকে নিজেদের বাঁচাতে গরীব হিন্দুরা দলে দলে ছুটে গেছিল ধর্মান্তরের পথে। ইসলামের শ্রেণিহীন সাম্যবাদী সমাজব্যবস্থাকেই আশ্রয় করতে চেয়েছিল। শুধু সমাজজীবনেই নয়, সবদিকেই স্পষ্ট হচ্ছিল ভাঙনের ছবি।

আত্মরক্ষার জন্য ধর্মীয় মুরুব্বিরা লৌকিক ও পৌরাণিক ধর্মবিশ্বাস ও সংস্কৃতির মেলবন্ধনের একটা চেষ্টা করেছিলেন বটে, কিন্তু শেষ অব্দি সেটাও তেমন কাজে লাগেনি। এমনই এক যুগসন্ধিতে, অন্ধকারের বুক ছিঁড়ে চাঁদ উঠে আসার মতোই আবির্ভাব হয়েছিল শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর।

ভুলে গেলে চলবে না, ভক্তি আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ার আগে তিনি ছিলেন নিমাই পণ্ডিত। ঐ তরুণ বয়সেই শিক্ষক হিসাবে যে ঋদ্ধি আর খ্যাতি তিনি লাভ করেছিলেন, তা খুব সামান্য ব্যাপার নয়। শুধুমাত্র বেদান্ত-জ্ঞানই নয়, সমকালীন সমাজ জীবনের অন্ধকার, গরীবদের দুর্দশা, ব্রাহ্মণ্যবাদের বাড়াবাড়ি, ছোঁয়াছুঁয়ির রাজনীতির মতো বিষয়গুলোও তাঁর অজানা ছিল না। প্রথমা স্ত্রী লক্ষ্মীপ্রিয়ার মৃত্যুর পরই সংসার-জীবনের প্রতি মোহ কেটে যায়। বৃহতের প্রয়োজনে তিনি উৎসর্গ করেন নিজের জীবনকে।

ধর্মের আধারে চৈতন্য মহাপ্রভু দেশজুড়ে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন মানবতার বাণী, এ কথা বলাই যায়। ‘হরিনাম’ আসলে সেই কয়েনেজ, যাকে সামনে রেখে সাম্যবাদের এক ছাতার তলায় সবাইকে আনতে চেয়েছিলেন শ্রীচৈতন্যদেব। উঁচু-নীচু, ধনী-দরিদ্রের বিভেদ মুছে গিয়ে এক জাতি এক প্রাণ হয়ে বেঁচে থাকার আদর্শই তো প্রচার করেছিলেন তিনি। সেজন্যই বলতে পেরেছিলেন- ‘চণ্ডালোহপি দ্বিজশ্রেষ্ঠ হরিভক্তিপরায়ণঃ’… ভেদাভেদসীমা মুছে দিয়ে ব্রাহ্মণ আর চণ্ডালকে একই আসনে বসিয়ে দেওয়ার এই স্পর্ধা শ্রীচৈতন্যের আগে বাংলাদেশে আর কেউ করতে পেরেছে কি? প্রেম আর গান- এই ছিল তাঁর অস্ত্র, তাঁর আয়ুধ।

এই প্রসঙ্গে যবন হরিদাস ঠাকুরের কথাও এসে পড়ে। হিন্দু ধর্মে বিধর্মী বা ধর্মত্যাগীদের কোনও জায়গা নেই। তারপরও মুসলিম পরিবারে বেড়ে ওঠা, যবন অন্নে প্রতিপালিত হরিদাসকে পরম বৈষ্ণব বলে নিজের বুকে টেনে নিতে সেদিন দুবার ভাবেননি মহাপ্রভু। ব্রাহ্মণ্যবাদের ভ্রুকুটির একেবারে উল্টোপিঠে দাঁড়িয়ে শ্রীচৈতন্যদেব দেখিয়েছিলেন কৃষ্ণ নামের পতাকাতলে উঁচু-নীচু, জাত-ধর্ম নির্বিশেষে যেকোনও মানুষই আশ্রয় পেতে পারেন।

ষোড়শ শতাব্দীর সমাজজীবনে দাঁড়িয়ে এ কাজ করে দেখানো আসলে তো ঘোষিত ধর্মবোধের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। আর ঠিক সেই কাজটাই করেছিলেন শ্রীচৈতন্যদেব। ১৫-১৬ শতকের সমাজজীবনে তাঁর প্রভাবকে অস্বীকার করে শুধু ধর্মের চোখ দিয়ে তাঁর আবির্ভাবের গুরুত্ব বিশ্লেষণ করা যায় না।

প্রেম আর গান- এই ছিল তাঁর অস্ত্র

একটু ভেবে দেখলেই বোঝা যায়, আত্মনাশী ভাঙনের হাত থেকে তুলে এনে বাঙালিকে ভালোবাসায় ভরা এক নতুন পৃথিবীতে দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন শ্রীচৈতন্যদেব। সর্বাত্মক মানবতার আদর্শের পথে ধর্মের মোড়কটুকু শুধু সেই সাম্যবাদের বাইরের চামড়া, আর কিছু নয়। তাঁর হাত ধরেই বাংলা দেখেছিল প্রথম সার্থক সামাজিক তথা ধর্মীয় বিপ্লবের নরম বহ্নিরূপ।

Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More