ইঁদুরের ছবি আঁকতেন খামারঘরে বসে, সেই ইঁদুরই ভোল বদলে দিয়েছে অ্যানিমেশন বিশ্বের

দ্য ওয়াল ব্যুরো: ছেলেটা’কে দেখতে মোটেও মন্দ নয়। বুদ্ধিসুদ্ধিও আছে। কিন্তু প্রেমে পড়লে কী আর বুদ্ধি কাজ করে! সুন্দরী ছটফটে এক তন্বীর প্রেমে সে পাগল। মেয়েটাও যে তাকে একেবারে পাত্তা দেয় না, তা নয়। কিন্তু অন্য সব প্রেমের মতো এই প্রেমেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে। আছে নানারকম বাধা। সেসব বুদ্ধি করে কাটিয়েই ছেলেটা ঠিক পৌঁছে যায় তার ভালোবাসার মানুষের কাছে, সঙ্গে থাকে আদরের পোষা কুকুরটাও। ভাবছেন প্রেমের গল্প! একেবারেই না, কথা হচ্ছে মিকি মাউজ, মিনি মাউজ, ডোনাল্ড ডাকের মতো চরিত্র আর তাদের স্রষ্টা ওয়াল্ট ডিজনি’কে নিয়ে।

মিকি মাউসের নাম শোনেনি, বাচ্চাবুড়ো নির্বিশেষে এমন মানুষের খোঁজ পাওয়াই মুশকিল। ওয়াল্ট ডিজনি, এই নামটা শুনলেও কেমন এককথায় চোখের সামনে ভেসে উঠবে ছটফটে দুটো প্রাণির মুখ, যারা সারাদিন নিজেদের মধ্যে খুনসুটি লড়াই করে আমাদের আনন্দ দিয়ে চলেছে। কিন্ত নির্ভেজাল আনন্দের পিছনে লুকিয়ে আছে দাঁতে দাঁত চাপা এক জেদ আর জীবনসংগ্রামের গল্প। সেই গল্প স্রষ্টা ওয়াল্ট ডিজনির জীবনের।১৯০১ সালের ডিসেম্বর মাসে এলিয়াস ডিজনি আর ফ্লোরা ডিজনির অভাবের সংসারে, শিকাগোতে, জন্ম নিল তাঁদের চতুর্থ সন্তান। ছেলের নাম রাখা হল ওয়াল্টার এলিয়াস। শিকাগোয় তখন অপরাধ জগতের রমরমা, খুন রাহাজানি, টুকটাক অসামাজিক কাজকর্ম লেগেই আছে। তাই বাবা এলিয়াস ডিজনি তার পরিবার নিয়ে পাড়ি জমান মিসৌরিতে। জমানো টাকা দিয়ে নতুন শহরে এসেই একটি ফার্ম কিনে ফেলেন তিনি। কাঠমিস্ত্রির পেশা ছেড়ে শুরু হয় চাষবাস।

এলিয়াস ডিজনি আর ফ্লোরা ডিজনির চতুর্থ সন্তান

রাগি বাবা চাইতেন তাঁর ছেলেমেয়েরা অনুশাসনের মধ্যে বড় হয়ে উঠুক। গরীব পরিবার, বেশি কর্মচারী রাখার সামর্থ্য কই! তাই পাঁচ ছেলেমেয়েকেই ইস্কুলে পড়াশোনার পাশাপাশি বাড়ির কাজে হাত লাগাতে হত। বাবার ফার্মে কাজ করতে গিয়েই নানারকম পশুপাখিকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান ডিজনি। মনে করা হয়, শৈশবের সেই পর্যবেক্ষণই ভবিষ্যৎ জীবনে তাঁর কার্টুন তৈরির কাজে অনেকখানি সহায়ক হয়েছিল। সেসময় ওয়াল্টার আর তার দুবছরের ছোটো বোন খামারে ইদুঁরের ছোটাছুটি দেখে খুব মজা পেত আর চেষ্টা করল আঁকার খাতায় সেইসব মুহূর্তকে জীবন্ত করে তোলার।

ছোটো বোনের সঙ্গে

ছবি আঁকতে বরাবরই ভালোবাসতেন ডিজনি। কমবয়সে মিসৌরিতে থাকাকালীন অনেকেরই পছন্দ ছিল তাঁর আঁকা ছবি। গ্রামে ছোটখাটো কোনও অনুষ্ঠান হলে ঘর সাজানোর জন্য ওয়াল্টের কাছ থেকে ছবি চেয়ে নিয়ে যেতেন গ্রামবাসী। বিনিময়ে মিলত, রংপেন্সিল বা মিষ্টি চকলেট৷

কিন্তু মিসৌরিতেও বেশিদিন থাকা হল না তাদের। ওয়াল্টের বাবা অসুস্থ হয়ে পড়ায় কিছুদিন পরই ফার্ম বিক্রি করে সপরিবারে কানসাস চলে আসেন তাঁরা। টাকাপয়সার চরম অভাব তখন। কানসাসে এসে তাই আর ফার্ম নয়, খবরের কাগজ বিক্রির ব্যবসা শুরু করলেন এলিয়াস ডিজনি। সেই কাগজ ফেরি করার দায়িত্ব এসে পড়ল স্কুলপড়ুয়া ছেলের কাঁধে।

কৈশোরে ভাইবোনেদের সঙ্গে

ভোর হতে না হতেই কাগজের বাণ্ডিল নিয়ে ছোট্ট ডিজনি ছুটতেন এ পাড়া থেকে ওপাড়া। পরিশ্রমে ক্লান্ত হয়ে কখনও কখনও ঘুমিয়ে পড়তেন ক্লাসে। তবু এতকিছুর মধ্যেও আঁকার প্রতি ভালবাসা কমেনি তাঁর। পড়াশুনায় মনোযোগ না থাকলেও মিস করতেন না স্কুলের ছবি আঁকার ক্লাসগুলো। স্কেচ করতে তো ভালোবাসতেনই, পাশাপাশি ভালোবাসতেন ছোট্ট রেল স্টেশনে চুপচাপ বসে ট্রেনের যাওয়া-আসা দেখতে। কমেডি-শো আর সেলুলয়েডের ছবির প্রেমে পড়াও সেই অল্পবয়সেই।

খবরের কাগজের ব্যবসাতেও সুবিধা করতে না পেড়ে এলিয়াস সপরিবারে আবার ফিরে এলেন শিকাগোতে। পার্টনারশিপে শুরু করলেন জেলি ফ্যাক্টরির ব্যবসা। পরিবারের নিয়মকানুনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পেরে বড় দুই ভাই তদ্দিনে অন্যত্র উঠে গেছেন। শিকাগোতে এসে ১৬ বছরের কিশোর ওয়াল্টকে ভর্তি করা হল হাই-স্কুলে। আঁকার হাত তো বরাবরই ভালো ছিল,তাই খুব অল্প সময়ের মধ্যেই নিজের দক্ষতায় হয়ে উঠলেন স্কুলের নিউজপেপারের জুনিয়র আর্ট এডিটর। কিন্তু সংসারের অভাব মিটছিল না। টাকা রোজগারের তাগিদে এসময় ছোটোখাটো কতরকম কাজ যে করতে হয়েছে তাঁকে! মাঝখান থেকে নষ্ট হল হাইস্কুলের পড়াশুনো। স্কুল ছাড়তে হয় তাঁকে, ইতি পড়ে পড়াশোনায়।

এসময় দাদা রয় সেনাবাহিনীতে যোগ দিলে ওয়াল্টেরও ইচ্ছে হয় যুদ্ধে যাওয়ার। বয়স কম, তাই সেনাবাহিনীর বদলে অ্যাম্বুলেন্সের চালক হিসেবে যোগ দিলেন রেডক্রসে। তখন ফ্রান্সে যুদ্ধ চলছে। ডিজনিকে নিয়ে যাওয়া হয় সেই যুদ্ধে। তাঁর সংবেদনশীল মন যুদ্ধের ভয়াবহতা সহ্য করতে পারেনি। মন শান্ত করতে একের পর এক ছবি আঁকতে থাকেন।

যুদ্ধ ভালো লাগল না। বাড়ি ফিরে যোগ দিলেন ক্যানসাস সিটির প্রেসম্যান-রুবিন স্টুডিওতে। কমার্শিয়াল আর্টিস্ট হিসেবে সেখানেই পরিচয় হলোসহকর্মী আব আইওয়ার্কসের সাথে। ওখানে কিছুদিন কাজ করার পর দুই বন্ধু মিলে খুলে ফেললেন নিজেদের স্টুডিও। নাম হল ‘ডিজনি-আইওয়ার্কস অ্যাড স্টুডিও’।

কিন্তু ভাগ্য সুপ্রসন্ন হল না। এক মাসে বাদে ব্যবসায় ক্ষান্ত দিয়ে শুরু করলেন নতুন চাকরি। ক্যানসাসেই সিটি ফিল্ম অ্যাড কোম্পানিতে যোগ দিলেন কার্টুনিস্ট হিসেবে। কাজ চলাকালীন কোথা থেকে যোগাড় করলেন পুরনো একটা ক্যামেরা, আঁকা ছবিগুলো তাতে জুড়ে সেই প্রথম শুরু হল এনিমেশনের কাজ। নাম দিলেন দিলেন ‘লাফ-ও-গ্রাম’। পরে ওই নামে কোম্পানিও খোলেন।

১৯২৮ সালে তৈরি করলেন ৮ মিনিটের একটা সাদাকালো ছবি। মিকি মাউস, মিনি মাউস ও মিকির শত্রু-চরিত্র ‘পিট’কে নিয়ে তৈরি সেই ছবিই পালাবদল নিয়ে এল কার্টুন ছবির ইতিহাসে। সেই যে ছোটোবেলায় খামারে বসে স্কেচ করতেন জন্তুজানোয়ারের, ঘুরে ঘুরে দেখতেন ইঁদুরদের দৌড়োদৌড়ি, সেই স্মৃতি থেকেই উঠে এল এনিমেশনের বিখ্যাত চরিত্র মিকি মাউজ।

শোনা যায়, মিকি মাউজ নামটা না কি ডিজনির নিজের দেওয়া নয়। বউয়ের ইচ্ছে অনুসারে ইঁদুরহিরোর পুরোনো নাম বদলে রাখা হয় মিকি। ব্যাস, আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি ওয়াল্ট ডিজনিকে। ১৯৩২ সাল নাগাদ তৈরি হল তাঁর প্রথম রঙিন কার্টুন ছবি ‘ফ্লাওয়ার্স অ্যান্ড ট্রিস’। এ কার্টুনটি ওয়াল্ট ডিজনির জীবনে নিয়ে এল প্রথম অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড। ‘দ্য ব্যান্ড কনসার্ট’ ছবিতে মিকিকেও দেখা গেল রঙিন চেহারায়। ১৯৩৭ এ স্নো হোয়াইটকে নিয়ে তৈরি পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবিটি চূড়ান্ত হিট করে বক্স অফিসে। সেসময় সিনেমাটি বিশ্বজুড়ে ৪১৬ মার্কিন ডলারের ব্যবসা করেছিল।

সুস্থ একটা ছেলেবেলা পাননি, ছিন্নমূলের মতো ভেসে বেরিয়েছেন এ শহর থেকে ও শহর। বার বার হেরে গেছেন জীবনযুদ্ধে। কিন্তু নিজেকে ফেলিওর ভাবতে রাজি ছিলেন না ওয়াল্ট ডিজনি। দাঁতে দাঁত চেপে লড়েছেন প্রতিকূল ভাগ্যের সঙ্গে, অনটনের সঙ্গে। আঁকতে ভালোবাসতেন, সেই প্রেম নিয়েই আজীবন ঘর করেছেন। আর সেই জেদ আর ভালোবাসাই একদিন তাঁকে এনে দিয়েছে বিশ্বজোড়া স্বীকৃতি, পুরস্কার। একের পর এক অসাধারণ কাজ এগিয়ে নিয়ে গেছে তাঁর স্বপ্নের ডিজনি স্টুডিওকে কোন কাজটা কোন সময়ে কাকে দিয়ে করালে সবচেয়ে ভাল হবে, সেটা বোঝার মারাত্মক দক্ষতা ছিল ওঁর নিজেও ছিলেন কাজপাগল মানুষ। আর পছন্দ ছিল শিশুদের সঙ্গ। বাচ্চাদের কথা মাথায় রেখেই ১৯৫৫ সালে গড়ে তুললেন এক আশ্চর্য থিম পার্ক, যাকে আজ সারা পৃথিবীর মানুষ চেনেন ডিজনিল্যান্ড নামে।

ডিজনিল্যান্ড প্রতিষ্ঠার বছর দশেকের মধ্যেই মারা যান স্যার ওয়াল্ট ডিজনি। কিন্তু ততদিনে অ্যানিমেশন বিশ্বের ভোল পাল্টে দিয়েছেন তিনি। ক্ষণজন্মা প্রতিভা হলেও আজও অ্যানিমেশন জগতের মুকুটহীন বাদশা ওয়াল্ট ডিজনি। আমাদের ছোটবেলা জুড়ে হেঁটে চলে বেড়ায় তাঁর তৈরি কালজয়ী সব চরিত্র আর রূপকথার জগৎ। তাঁর নিজের জীবনটা রূপকথার মতো ছিল না ঠিকই, কিন্তু ইচ্ছে আর অধ্যাবসায় থাকলে যে সমস্ত ঝড়ঝাপটাই হাসিমুখে সামলে দেওয়া যায়, সে কথা শুধু তাঁর সৃষ্ট চরিত্রেরাই নয়, তিনি নিজেও তাঁর জীবন দিয়ে শিখিয়ে গেছেন আমাদের।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More