‘বসন্তর’ যুদ্ধের নায়ক অরুণ ক্ষেত্রপাল, মৃত্যুর আগে গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন দশটি পাক ট্যাঙ্ক

সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট অরুণের বুকে জমা ছিল পাকিস্তানের প্রতি তীব্র ঘৃণা।

রূপাঞ্জন গোস্বামী

১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর। বিকেল পাঁচটায় পাকিস্তান রেডিও একটি বিশেষ ঘোষণা করেছিল, “পশ্চিম পাকিস্তান সীমান্তে আক্রমণ  করেছে ভারত। বিস্তারিত খবর একটু পরেই।” ঘোষণাটি ছিল সর্বৈব মিথ্যা। আসলে ভারতের পূর্ব সীমান্তে, পূর্ব পাকিস্তানের মানুষরা সে সময় স্বাধীনতার জন্য লড়ছিলেন। তাঁদের মুক্তিযুদ্ধে সর্বান্তকরণে সাহায্য করছিল ভারত। তাই ভারতের ওপর ক্ষিপ্ত পাকিস্তান পশ্চিম সীমান্তে ভারতকে ব্যস্ত রাখার ফিকির খুঁজছিল।

বিকেল পাঁচটা বেজে ন’মিনিটে পাকিস্তান শুরু করেছিল ‘অপারেশন চেঙ্গিস খান’। তিন দফায় একান্নটি পাক বোমারু বিমান উড়ে গিয়েছিল ভারতের অমৃতসর, আম্বালা, আগ্রা, অবন্তীপুর, বিকানির, হালওয়াড়া, জোধপুর, জয়সলমীর, পাঠানকোট, ভুজ ও শ্রীনগর এয়ারবেসে বোমা ফেলার জন্য। ঠিক সেই মুহূর্তে কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে এক বিশাল জনসভায় বক্তৃতা করছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। হামলার খবর পেয়ে দ্রুত ফিরে গিয়েছিলেন দিল্লিতে। সেদিন সন্ধ্যার এক রেডিও বার্তায় ইন্দিরা গান্ধী বলেছিলেন, পাকিস্তানের এই হামলার অর্থ হল ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা।

ইন্দিরা গান্ধী

পরের দিন ভোরেই ভারতীয় বায়ুসেনার ‘ক্যানবেরা’ বিমানগুলি পশ্চিম পাকিস্তানের ভেতরে ঢুকে পাক বিমানঘাঁটিগুলির ওপর ভয়ঙ্কর প্রতি আক্রমণ চালিয়েছিল। একই সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানে চারদিক থেকে ঢুকে গিয়েছিল ভারতীয় সেনাবাহিনী। প্রথম বাহিনী এগোতে শুরু করেছিল সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা হয়ে নোয়াখালির দিকে। দ্বিতীয়টি রংপুর, দিনাজপুর হয়ে বগুড়ার দিকে। তৃতীয়টি যশোর, খুলনা, কুষ্টিয়া হয়ে ফরিদপুরের দিকে এবং চতুর্থটি মেঘালয়ের তুরা থেকে জামালপুর হয়ে ময়মনসিংহের দিকে।

সাম্বার শাকরগড় সেক্টর

পূর্ব পাকিস্তানে যখন মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনা পর্যুদস্ত করছিল পাকিস্তানকে, পশ্চিম সীমান্তের বিভিন্ন ফ্রন্টেও তুমুল আক্রমণ শুরু করে দিয়েছিল ভারত। সব থেকে ভয়াবহ যুদ্ধ হয়েছিল জম্মুর সাম্বা জেলার শাকরগড় সেক্টরে। ‘বসন্তর যুদ্ধ’ নামে ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছে সেই যুদ্ধ। ‘বসন্তর’ হল রাবি নদীর একটি শাখা নদী। যেটি বয়ে চলেছে পাঞ্জাব ও হিমাচলের মধ্যে দিয়ে। ভারত পাকিস্তান সীমান্ত বরাবর। কৌশলগত কারণে শাকরগড় সেক্টর ভারত ও পাকিস্তানের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ‘বসন্তর’ নদীর দু’দিকেই আছে উভয়পক্ষের সড়কপথ, রেলপথ ও গুরুত্বপূর্ণ শহর।

শাকরগড় সেক্টর দিয়ে প্রবাহিত বসন্তর নদী

তাই শাকরগড় সেক্টরে আগে থেকেই তিনটি স্তরে মাইন বিছিয়ে রেখেছিল পাকিস্তান, যাতে ভারতীয় বাহিনী ‘বসন্তর’ নদী পার হলেই মৃত্যুফাঁদে পড়ে। সীমান্তের ওপারে পজিশন নিয়েছিল পাকিস্তানের টোয়েন্টি-ল্যান্সার, থার্টিন-ল্যান্সার ও থার্টি থ্রি ক্যাভালরি। ভারতের দিকে নির্দেশের অপেক্ষায় ছিল ওয়ান-কর্প, ফিফটি-ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশন, সেভেন-লাইট ক্যাভালরি, টি-ফিফটিফাইভ ট্যাঙ্ক ট্রুপ, ফোর জিরো ফোর-ফিল্ড কোম্পানি, ফোর জিরো সিক্স-ফিল্ড কোম্পানি ও ফর্টিসেভেন-ইনফ্যান্ট্রি ব্রিগেড, সেভেন্টি সিক্স-ইনফ্যান্ট্রি ব্রিগেড, নাইনটি ওয়ান-বিগ্রেড, সিক্সটিন-আর্মার্ড বিগ্রেড, নাইন-ইন্ডিয়ান রেজিমেন্ট। নির্দেশ মেলা মাত্র ৬ ডিসেম্বর শুরু হয়ে গিয়েছিল ‘বসন্তর যুদ্ধ”।

একুশের তরুণ, সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট অরুণ

সেভেনটিন-পুনা হর্স রেজিমেন্টের সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট একুশ বছরের অরুণ ক্ষেত্রপাল তখন ছিলেন আহমেদনগরে। তাঁকে ‘ইয়ং অফিসার কোর্স’ করতে পাঠিয়েছিল তাঁর রেজিমেন্ট। পশ্চিম সীমান্তে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় কোর্সের মাঝপথেই অরুণ ক্ষেত্রপালকে ডেকে নিয়েছিল রেজিমেন্ট। পাঠিয়ে দিয়েছিল ফ্রন্টলাইনে। শাকরগড় সেক্টরে তাঁকেই ট্যাঙ্ক বাহিনীর ‘বি’ স্কোয়াড্রনের নেতৃত্ব দিতে হবে।

 সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট  অরুণ ক্ষেত্রপাল

ক্ষেত্রপাল পরিবারে সেনাবাহিনীতে যোগদানের প্রথা বহুদিনের। তাঁর ঠাকুর্দা ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর হয়ে লড়াই করেছিলেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধে। ভারতীয় সেনার ইঞ্জিনিয়ারিং কোরে ছিলেন বাবা ব্রিগেডিয়ার এম এল ক্ষেত্রপাল। স্বাভাবিকভাবেই ছোটবেলা থেকে সেনা অফিসার হওয়ার ইচ্ছা ছিল অরুণের। তাঁদের আদি বাড়ি ছিল পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের সারগোদা এলাকায়। ভারত ভাগের পর রিফিউজির বেশে দেশে চলে আসতে হয়েছিল ক্ষেত্রপাল পরিবারটিকে।
অরুণ তাঁর বাবা মায়ের কাছে শুনতেন তাঁদের ফেলে আসা জন্মভূমির গল্প। অরুণ ক্ষেত্রপালের ব্রিগেডিয়ার বাবার চোখ থেকে টপ টপ করে জল ঝরে পড়ত

১৯৫০ সালের ১৪ অক্টোবর পুণেতে জন্মানো অরুণ ক্ষেত্রপাল, ১৯৬৭ সালে যোগ দিয়েছিলেন ন্যাশনাল ডিফেন্স অ্যাকাডেমিতে। তারপর ১৯৭১ সালের ৩ জুন, সেভেনটিন-পুনা হর্স রেজিমেন্টে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট পদে যোগ দিয়েছিলেন। তাঁর সার্ভিস নম্বর ছিল IC-25067। খুব ভাল সাঁতারু ছিলেন অরুণ ক্ষেত্রপাল। অসম্ভব ভাল স্যাক্সোফোন বাজাতেন।

ন্যাশনাল ডিফেন্স অ্যাকাডেমির কোর্সে অরুণ ক্ষেত্রপাল ( দাঁড়িয়ে ডান দিক থেকে  প্রথম)

অরুণের বুকে জমা ছিল পাকিস্তানের প্রতি তীব্র ঘৃণা

সেনাবাহিনীতে যোগদানের মাত্র ছ’মাসের মধ্যেই পাক-ভারত যুদ্ধে লড়ার সুযোগ পেয়ে উত্তেজিত হয়ে উঠেছিলেন ২১ বছরে অরুণ ক্ষেত্রপাল। তাঁর সেভেনটিন-পুনা হর্স রেজিমেন্টকে দেওয়া হয়েছিল একটি বিশেষ মিশন। বসন্তর নদীর অস্থায়ী সেতু পেরিয়ে ওপারে পাতা মাইন সরিয়ে পরবর্তী বাহিনীর জন্য আক্রমণের পথ তৈরি করে দিতে হবে। একই সঙ্গে দখলে রাখতে হবে সেতুটির পাকিস্তানের দিকের অংশ।

১৫ ডিসেম্বর ১৯৭১। রাত ৯টা নাগাদ পাকিস্তানের মাটিতে প্রবেশ করেছিল ভারতীয় সেনার ফর্টিসেভেন বিগ্রেড বা ‘ব্ল্যাক অ্যারো’। যেটি সেভেনটিন-পুনা হর্স ও ফোর- হডসন হর্স রেজিমেন্ট নিয়ে গঠিত। রাতের অন্ধকারে সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়াররা ‘মাইন স্যুইপার’ ট্যাঙ্ক দিয়ে মাটির নীচে পেতে রাখা মাইন পরিষ্কার করে চলেছিলেন। এলাকা পাহারায় ছিল ভারতের ‘এ’ এবং ‘বি’ ট্যাঙ্ক স্কোয়াড্রন। ‘এ’ স্কোয়াড্রনের কমান্ডার ছিলেন অরুণ ক্ষেত্রপাল। তিনি নিজে ছিলেন তাঁর ‘ফামাগুস্তা’ ট্যাঙ্কে। ট্যাঙ্কটির ড্রাইভার ছিলেন প্রয়াগ সিং, রেডিও অপারেটর ছিলেন নন্দ সিং এবং গানার ছিলেন নাথু সিং।

ইঞ্জিনিয়ারদের মাইন সরানোর কাজ তখন মাঝপথে। পাকিস্তানের জারপালের কাছে ভারতীয় ইঞ্জিনিয়ারদের ওপর তুমুল হামলা চালিয়েছিল পাক সেনাবাহিনী। শহিদ হয়েছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর বেশ কিছু ইঞ্জিনিয়ার। ধ্বংস হয়েছিল একটি ‘মাইন স্যুইপার’ ট্যাঙ্ক। এই ট্যাঙ্ক বাহিনীর সাহায্য চেয়েছিল অগ্রবর্তী বাহিনীটি। ট্যাঙ্ক বাহিনী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ইঞ্জিনিয়ার রেজিমেন্টকে বাঁচাবার জন্য মাইন বিছানো পথেই এগোবে।

 ফামাগুস্তা ছুটেছিল জারপালের পথে

১৬ ডিসেম্বর ভোরে সেভেনটিন-পুনা হর্সের ‘এ’ ও ‘বি’ ট্যাঙ্ক স্কোয়াড্রন এগিয়ে গিয়েছিল পাকিস্তানের জারপাল গ্রামের দিকে। এগোনো শুরু করতেই আক্রমণ শুরু করেছিল পাকিস্তানের ট্যাঙ্ক বাহিনী এবং বিভিন্ন জায়গায় ঘাপটি মেরে থাকা মেশিনগান পোস্ট। প্রথমে অপ্রস্তুত হয়ে গেলেও, কয়েক মিনিটের মধ্যেই ভয়ঙ্কর জবাব দিয়েছিল অরুণ ক্ষেত্রপালের ‘এ’ স্কোয়াড্রন। গুঁড়িয়ে দিয়েছিল পাকিস্তানের সবকটি মেশিনগান পোস্ট। নিপুণভাবে যুদ্ধ পরিচালনা করছিলেন এক একুশ বছরের তরুণ। তাঁর স্কোয়াড্রনের সবাই বয়সে অরুণের থেকে বড়। কিন্তু সবাই তাঁকে মানেন। কারণ তিনি সবাইকে শ্রদ্ধা করেন। তাই তাঁর স্কোয়াড্রনে ক্ষেত্রপাল স্যারের কথা বেদবাক্য।

‘বি’ স্কোয়াড্রন এগিয়ে গিয়েছিল ‘মাইন স্যুইপার’ বাহিনীকে রক্ষা করার জন্য। অরুণ ক্ষেত্রপালের ‘এ’ স্কোয়াড্রন এলাকা দখলে রাখছিল। সকাল আটটা নাগাদ, গোটা জারপাল এলাকা চলে গিয়েছিল পাকিস্তান সেনার তৈরি করা ধোঁয়ার আড়ালে। ধোঁয়ার সুযোগ নিয়ে পাক সেনার থার্টিন-ল্যান্সার ট্যাঙ্ক বাহিনী অতর্কিতে আক্রমণ হেনেছিল ভারতের ‘বি’ স্কোয়াড্রনের ওপর। অতর্কিত আক্রমণে প্রায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল ‘বি’ স্কোয়াড্রন। শহিদ হয়েছিলেন ‘বি’ স্কোয়াড্রনের কমান্ডার। ‘বি’ স্কোয়াড্রন থেকে সাহায্য চাওয়া হয়েছিল ‘এ’ স্কোয়াড্রনের কমান্ডার অরুণ ক্ষেত্রপালের কাছে। যিনি তাঁর স্কোয়াড্রন নিয়ে অবিরাম চারদিকে গোলাবর্ষণ করে এলাকা দখলে রাখছিলেন।

‘ফামাগুস্তা’ ট্যাঙ্কের রেডিও অপারেটর নন্দ সিংয়ের কাছ থেকে বার্তা পেয়ে অরুণ ক্ষেত্রপাল সঙ্গে সঙ্গেই এগিয়ে গিয়েছিলেন জারপালের দিকে। যেখানে চরম বিপদে পড়েছে ‘বি’ স্কোয়াড্রন। গোলাবর্ষণ করতে করতে এগিয়ে চলেছিল অরুণ ক্ষেত্রপালের স্কোয়াড্রন। সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট অরুণ নিজের হাতে চালাচ্ছিলেন ট্যাঙ্কের ওপরে বসানো মেশিনগান। ‘বি’ স্কোয়াড্রনের ধ্বংসের খবরে ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। তাঁর স্কোয়াড্রনের দিকে ছুটে আসছিল পাকিস্তানের পদাতিক সেনারা। অরুণ ক্ষেত্রপাল নির্দেশ দিয়েছিলেন পাক সেনাদের ওপর দিয়েই ট্যাঙ্ক চালিয়ে দিতে।

“না স্যর, আমি আমার ট্যাঙ্ক ছাড়ব না।”

কিন্তু জারপাল পৌঁছনোর আগেই এলাকায় এসে গিয়েছিল পাকিস্তান সেনার প্রচুর ট্যাঙ্ক। উত্তেজিত অরুণ নিজের সুরক্ষার কথা ভুলে ট্যাঙ্কের ‘হ্যাচ’ দিয়ে শরীরের প্রায় অর্ধেকটা বের করে শত্রু সেনার অবস্থান দেখছিলেন। সেই মুহূর্তে একটি গোলা এসে পড়েছিল অরুণ ক্ষেত্রপালের ট্যাঙ্কে। মারাত্মক আহত হয়েছিলেন অরুণ ক্ষেত্রপাল। রক্তে ভেসে গিয়েছিল ‘ফামাগুস্তা’। আগুন ধরে গিয়েছিল ট্যাঙ্কের একটি অংশে। নন্দ সিং রেডিওর মাধ্যমে খবর পাঠিয়েছিলেন।

অরুণকে তাঁর রেজিমেন্টের বস বলেছিলেন ‘ফামাগুস্তা’ ছেড়ে অন্য ট্যাঙ্কে উঠে ফিরে আসতে। কিন্তু ফিরতে চাননি নাছোড়বান্দা অরুণ। রক্তাক্ত শরীর নিয়ে হাঁফাতে হাঁফাতে বলেছিলেন, “না স্যর, আমি আমার ট্যাঙ্ক ছাড়ব না। আমার মেশিনগান ও কামান এখনও কাজ করছে। আমি এই বেজন্মাদের দেখে নেব।” তারপর নিজে হাতে বন্ধ করে দিয়েছিলেন রেডিও সেট, যাতে তাঁর সঙ্গে আর যোগাযোগ করতে না পারে তাঁর রেজিমেন্ট।

চক্রব্যূহের অভিমন্যু ‘অরুণ ক্ষেত্রপাল’

কিন্তু পাকিস্তানের ট্যাঙ্কের সংখ্যা অনেক বেশি। তাই একে একে ধ্বংস হতে শুরু করেছিল অরুণের স্কোয়াড্রনের ট্যাঙ্কগুলি। এক সময় তাঁর ‘ফামাগুস্তা’ নিয়ে একা হয়ে গিয়েছিলেন সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট অরুণ। নারওয়ালের বারাপিন্দ গ্রামে, ফামাগুস্তাকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরেছিল পাকিস্তানের চোদ্দটি প্যাটন ট্যাঙ্ক। চক্রব্যূহের ভেতরে থাকা অভিমন্যুর মত বীরবিক্রমে লড়াই শুরু করেছিলেন অরুণ ক্ষেত্রপাল। আহত বাঘের মত ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন পাকিস্তানের ট্যাঙ্ক বাহিনীর ওপর।

চরকির মতো ঘুরতে ঘুরতে গোলাবর্ষণ করে চলেছিল ‘ফামাগুস্তা’। নিপুণ হাতে মেশিনগান চালিয়ে যাচ্ছিলেন অরুণ। লুটিয়ে পড়ছিল পাক পদাতিক সেনারা। ফামাগুস্তার সঙ্গে লড়াইয়ে কিছুতেই এঁটে উঠতে পারছিল না পাকিস্তানি প্যাটন ট্যাঙ্কগুলি। তাদের কমান্ডাররা বুঝতেই পারছিলেন না অরুণের রণকৌশল। যেদিকে ধোঁয়া সেদিকে ছুটে যাচ্ছিল অরুণের ‘ফামাগুস্তা’। ধোঁয়ার আড়াল থেকে আঘাত হানছিল পাকিস্তানের ট্যাঙ্কগুলিতে। ধ্বংস হয়ে যাচ্ছিল একের পর এক পাকিস্তানি প্যাটন। ফামাগুস্তাকে ঘিরে ধরা চোদ্দটি ট্যাঙ্কের মধ্যে নয়টি ট্যাঙ্ককেই ধ্বংস করে দিয়েছিলেন অরুণ।

পাকিস্তানি সেনারা ভেবেছিল ফামাগুস্তাকে জিনে ভর করেছে। নাহলে এত গোলা ছুঁড়েও কেন ফামাগুস্তাকে আঘাত করা যাচ্ছে না। তাঁর দশ নম্বর শিকারটিকে মাত্র একশো মিটার দূর থেকে ধংস করে দিয়েছিলেন অরুণ। এই দূরত্বই প্রমাণ করে পাকিস্তানি ট্যাঙ্ক বাহিনীকে নিকেশ করার জন্য কতটা মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন অরুণ ক্ষেত্রপাল। পাকিস্তানি কমান্ডাররা ভেবেছিলেন ফামাগুস্তার কমান্ডারের বহু যুদ্ধের অভিজ্ঞতা আছে। নাহলে এই অবিশাস্য লড়াই করার হিম্মত সবার থাকে না।

বসন্তর যুদ্ধে ধ্বংস হওয়া পাকিস্তানি ট্যাঙ্ক। যার মধ্যে দশটি ধ্বংস হয়েছিল অরুণ ক্ষেত্রপালের হাতে।

মুগ্ধ হয়েছিল শত্রু সেনাও

পাকিস্তানের বাকি ট্যাঙ্কগুলিকে ধ্বংস করার জন্য মরিয়া অরুণ ক্ষেত্রপাল আবার ভুলে গিয়েছিলেন নিজের সুরক্ষা। অরুণের ট্যাঙ্কে এসে পড়েছিল পাকিস্তানের মেজর নাসেরের ট্যাঙ্কের গোলা। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই শহিদ হয়েছিলেন রেডিও অপারেটর নন্দ সিং। ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট অরুণ ক্ষেত্রপালের শরীর। তবুও শেষঘুমে ঢলে পড়ার আগে মেশিনগানের ট্রিগারে শেষ চাপটি দিয়েছিলেন অবিস্মরণীয় যুদ্ধের নায়ক অরুণ ক্ষেত্রপাল। জ্বলতে থাকা ফামাগুস্তার দিকে এগিয়ে আসা পাকিস্তানের কয়েকজন পদাতিক সেনা লুটিয়ে পড়েছিল।

তারপর ট্রিগার থেকে সরে গিয়েছিল অরুণ ক্ষেত্রপালের হাত। লুটিয়ে পড়েছিলেন ট্যাঙ্কের ভেতরে। পাকিস্তানি সেনারা দৌড়ে এসেছিল জিনে ভর করা ফামাগুস্তার কমান্ডারকে দেখবার জন্য। তারা ভেবেছিল, ফামাগুস্তার কমান্ডার হবেন কোনও মধ্যবয়স্ক ফৌজি। স্তম্ভিত হয়ে তারা দেখেছিল ট্যাঙ্কের ভেতর ছিন্নভিন্ন হয়ে লুটিয়ে থাকা এক মিষ্টি চেহারার সদ্য যুবককে। যাঁর পরনে ছিল কমান্ডারের পোশাক। দুঃসাহসী অরুণের লড়াই দেখে সেদিন মুগ্ধ হয়েছিল শত্রু সেনারাও।

থেমে গিয়েছিল যুদ্ধ

ফামাগুস্তা থেকে প্রয়াগ সিং ও নাথু সিংকে বের করে এনেছিল পাকিস্তানি সেনারা। তাঁদের থেকে পেয়েছিল ফামাগুস্তার কমান্ডারের পরিচয়। ফামাগুস্তা থেকে পাকিস্তানি সেনা উদ্ধার করেছিল কমান্ডার অরুণ ক্ষেত্রপাল ও নন্দ সিংয়ের দেহ। কিন্তু যুদ্ধ জয়ের আনন্দ ছিল না পাকিস্তানি কমান্ডারদের চোখে মুখে। কারণ যে ক্ষতি করে দিয়ে গিয়েছেন অরুণ ক্ষেত্রপাল, তাতে ভারতের দিকে এগোনো আর কোনও মতেই সম্ভব নয়।

তাছাড়া পূর্ব পাকিস্তান থেকে এসেছিল চরম দুঃসংবাদ। একুশ বছরের অরুণ ক্ষেত্রপাল যখন জীবনের শেষ যুদ্ধ লড়ছিলেন, ঢাকায় তখন ভারতীয় বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণের চুক্তিতে সই করছিলেন পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল নিয়াজি।

ভারতীয় সেনার হাতে অরুণ ক্ষেত্রপাল ও নন্দ সিংয়ের দেহ তুলে দিয়েছিল পাকিস্তানি সেনা। তুলে দিয়েছিল আহত প্রয়াগ সিং ও নাথু সিংকেও। ভারতীয় সেনা নিয়ে গিয়েছিল অরুণ ক্ষেত্রপালের ঐতিহাসিক লড়াইয়ের সাক্ষী ‘ফামাগুস্তা’ ট্যাঙ্ক। ১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১, সাম্বা জেলার বসন্তর নদীর তীরে, চিতার আগুনে বিলীন হয়ে গিয়েছিলেন ‘বসন্তর’ যুদ্ধের নায়ক অরুণ ক্ষেত্রপাল।

অরুণ ক্ষেত্রপালের স্মৃতিমাখা ফামাগুস্তার সামনে গানার নাথু সিং ( অবসরের পর)

পাকিস্তানের আর্মার কোরের মেজর আমিন পরবর্তীকালে বলেছিলেন, “বসন্তর যুদ্ধে একবারই আমরা জেতার জায়গায় এসেছিলাম। কিন্তু জয়ের পথে একলাই পাহাড় হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ভারতের সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট ‘পরমবীর চক্র’ জয়ী অরুণ ক্ষেত্রপাল। আমাদের জয়ের আশা একাই চুর্ণবিচুর্ণ করে দিয়েছিলেন তিনি। তাঁর দুঃসাহসী লড়াই দেখলে, শত্রু সেনারাও উঠে দাঁড়িয়ে সম্মান জানাতে বাধ্য হবে।”

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More