মহারাজার জেদ ও একটি পোলো ম্যাচ, সুরার জগতে সে প্রথম আবির্ভাব পাটিয়ালা পেগের

ভারতের হুইস্কিপ্রেমীদের কাছে দাপটের প্রতীক হল 'পাটিয়ালা পেগ'।

রূপাঞ্জন গোস্বামী

ভারতের বেশিরভাগ মানুষ না জানলেও, হুইস্কিপ্রেমীরা জানেন ‘পাটিয়ালা পেগ’ কথাটা। সুরার গ্লাসে সুরার পরিমাণ মাপার একক হল ‘পেগ’। তিরিশ মিলিলিটার পরিমাণ অ্যালকোহলকে বলা হয়ে থাকে ‘এক পেগ’। অনেক সুরাপ্রেমী আবার এই পরিমাণকে বলেন ‘স্মল পেগ’। এর দ্বিগুণ অর্থাৎ ষাট মিলিলিটার অ্যালকোহলকে বলা হয় ‘লার্জ পেগ’। কিন্তু এই ‘লার্জ’ পেগও পাটিয়ালা পেগের কাছে শিশু। তাই পাটিয়ালা পেগকে বলা যেতে পারে লার্জ পেগের ঠাকুর্দা।

কেউ বারে বা পার্টিতে যখন পাতিয়ালা পেগের অর্ডার দেন, তাঁর গ্লাসে বারটেন্ডার ঢেলে দেন একশো কুড়ি মিলিলিটার হুইস্কি। যা দেখে চক্ষু চড়কগাছ হয়ে যায় অধিকাংশ হুইস্কিপ্রেমীরই। কারণ এরকম দুই তিন গ্লাস হুইস্কি খাওয়ার পরে মানুষটি কী অবস্থায় থাকবেন, তা নিয়ে আশঙ্কায় থাকেন তাঁরা। কিন্তু অভিজ্ঞ ও সমঝদার হুইস্কিপ্রেমীরা সপ্রশংস দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন মানুষটির দিকে। মনে মনে গুগাবাবার রবি ঘোষের মতই বলে ওঠেন, “কী দাপট।”

বর্তমান প্রজন্ম এখন কথায় কথায় তর্জনি ও কনিষ্ঠা আঙুল সমান্তরালে মেলে ধরে ‘ইয়ো’ মুদ্রা দেখান। সুরাপ্রেমীরা বলেন ওটা আসলে পাটিয়ালা পেগ অর্ডার দেওয়ার মুদ্রা। গ্লাসের গায়ে ‘ইয়ো’ মুদ্রা ধরে আঙুলদুটির মাঝের অংশটির পরিমাণ হুইস্কি গ্লাসে ঢাললে, সেটি হবে এক পাটিয়ালা পেগের সমান। উঁচু খানদানের সুরাপ্রেমীরা পার্টি বা বারে গিয়ে, বারটেন্ডারদের সঙ্গে কথা বলে নিজের গরিমা খাটো করতে চাইতেন না। তাই তাঁরা ওই মুদ্রাটি দেখিয়ে বারটেন্ডারকে বুঝিয়ে দিতেন তাঁর গ্লাসে পাটিয়ালা পেগ বা একশো কুড়ি মিলিলিটার হুইস্কি ঢালতে হবে।

সাধারণ পেগের মুদ্রা ও পাটিয়ালা পেগের মুদ্রা

কিন্ত কীভাবে বিশ্বের হুইস্কিপ্রেমীদের ডিকশনারিতে আবির্ভূত হয়েছিল সৃষ্টিছাড়া ‘পাটিয়ালা পেগ’, তা জানতে হলে জেনে নিতে হবে এক বর্ণময় চরিত্রের মানুষের কথা। তিনি হলেন পাটিয়ালার ফুলকিয়াঁ রাজবংশের মহারাজা স্যর ভুপিন্দর সিং। ১৯০০ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত অবিভক্ত ভারতের পাটিয়ালা স্টেট শাসন করেছিলেন এই রাজা।

ভুপিন্দরের বাবা ছিলেন বাবা মহারাজ রাজিন্দার সিং। তাঁর মৃত্যুর পর মাত্র ন’বছর বয়সে পাটিয়ালার সিংহাসনে বসেছিলেন ভুপিন্দর। যদিও তাঁর হয়ে পাটিয়ালা স্টেট পরিচালনার দায়িত্বে ছিল মন্ত্রিসভা। আঠেরো বছর বয়স হওয়ার পর, ১৯১০ সালে তাঁকে রাজ্যশাসনের পূর্ণ ক্ষমতা দিয়েছিলেন লর্ড মিন্টো। রাজ্যশাসনে অত্যন্ত সফল ছিলেন মহারাজ ভুপিন্দর। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতার জন্য ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালি, প্যালেস্তাইন ও ব্রিটেন তাঁকে দিয়েছিল তাদের রাষ্ট্রীয় সম্মান।

পাটিয়ালার মহারাজা ভুপিন্দর সিং

লিগ অফ নেশনে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন মহারাজ ভুপিন্দর সিং। উপস্থিত ছিলেন গোলটেবিল বৈঠকেও। স্টেট ব্যাঙ্ক অফ পাটিয়ালার প্রতিষ্ঠাতাও ছিলেন তিনি।  ছেচল্লিশ বছরের জীবনে ভারত জুড়ে অসংখ্য প্যালেস ও সংস্থা তৈরি করিয়েছিলেন। সেগুলো গুনতে বসলে বা বলতে গেলে লিখতে হবে পাতার পর পাতা।

ব্যক্তিগত জীবনে মহারাজ ভুপিন্দর ছিলেন খুবই বেপরোয়া, অমিতব্যয়ী ও সৌখিন প্রকৃতির। পাঁচ স্ত্রী, অসংখ্য উপপত্নী ও ৮৮ জন সন্তান ছিল তাঁর। বর্তমান পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ক্যাপ্টেন অমরিন্দর সিং হলেন মহারাজা ভুপিন্দর সিংয়েরই এক নাতি। ভুপিন্দরই ছিলেন প্রথম ভারতীয় যাঁর নিজস্ব বিমান ছিল। ১৯১০ সালে পূর্ণ শাসনক্ষমতা পাওয়ার পর, বিমানটি আনিয়েছিলেন ইংল্যান্ড থেকে।

রাজা যখন কোথাও যেতেন, তাঁর শোভাযাত্রায় থাকত বিশ্বের সব থেকে দামি মডেলের কুড়িটি ‘রোলস রয়েস’। তাঁর ব্যাক্তিগত সংগ্রহে ছিল বিশ্ববিখ্যাত পাটিয়ালা নেকলেস। যে নেকলেসে বসানো ছিল ২৯৩০ টি হিরে। লকেট হিসেবে লাগানো ছিল পৃথিবীর সপ্তম বৃহত্তম হিরে “De Beers”

হাজার কোটির পাটিয়ালা নেকলেস

প্রবল প্রতাপশালী মহারাজা হলেও, ভুপিন্দর সিং ছিলেন একজন চৌকস ক্রিকেটার। ১৯১১ সালে ইংল্যান্ড সফরকারী ভারতীয় ক্রিকেট দলের ক্যাপ্টেন ছিলেন। সাতাশটি প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট ম্যাচ খেলেছিলেন। এমনকি ১৯৩২ সালে, ভারতের প্রথম টেস্ট দলের ক্যাপ্টেনও নির্বাচিত হয়েছিলেন । কিন্তু তিনি অসুস্থ হয়ে পড়ায়, পোরবন্দরের মহারাজ নটবর সিংজি ভাবসিংজি ভারতের ক্যাপ্টেন হয়ে ইংল্যান্ড গিয়েছিলেন।

মহারাজা যখন ক্রিকেটার

মহারাজা ভুপিন্দর সিংয়ের ছিল নিজস্ব ক্রিকেট ও পোলো টিম। ক্রিকেট টিমের নাম ছিল ‘পাটিয়ালা ইলেভেন’ ও পোলো টিমের নাম ছিল ‘পাটিয়ালা টাইগারস’। পাটিয়ালা টাইগারস দলে ছিল তাঁর অশ্বারোহী বাহিনীর ভয়ঙ্কর সব শিখ যোদ্ধারা। তাঁদের সব থেকে প্রিয় খেলা ছিল ‘স্কাল-পেগিং’।

এই খেলায় মাঝমাঠে রাখা থাকত শত্রুর খুলি। সেটির দু’দিকে নির্দিষ্ট দূরত্বে দাঁড়িয়ে থাকত দুটি ঘোড়সওয়ার দল। খেলা শুরু হলে, ঘোড়ার পিঠে বসা খেলোয়াড়েরা বর্শার ফলার সাহায্যে খুলি ফুটো করে, মাটি থেকে খুলিটি তুলে নেওয়ার চেষ্টা করত। তারপর বর্শার ফলায় গাঁথা খুলিটিকে নিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছবার চেষ্টা করত। প্রতিপক্ষ চেষ্টা করত বাধা দেওয়ার। রক্তারক্তি কাণ্ড ঘটে যেত বেশিরভাগ সময়েই। কারণ এই ভয়ঙ্কর খেলা শুরু হওয়ার আগে, উভয়পক্ষের খেলোয়াড় এমনকি ঘোড়াগুলিকেও খাওয়ানো হত ভাঙের সরবত।

পাটিয়ালা টাইগারস

এই খেলাটির পরিশীলিত রূপের নাম ‘টেন্ট পেগিং’। এই খেলায় ছুটন্ত ঘোড়ার পিঠে বসে মাটিতে পোঁতা ধাতব গজাল বর্শার সাহায্যে উপড়ে নিতে হয়। এই খেলাটির পিছনেও আছে এক ভয়ঙ্কর ইতিহাস । সাধারণত কোনও তাঁবুকে মাটিতে ধরে রাখতে গেলে ধাতব গজাল বা পেগ লাগে। প্রাচীনকালে যুদ্ধের সময় অশ্বারোহী বাহিনী শত্রুসেনার শিবিরে ঢুকে দ্রুত তাঁবুর পেগ বা গজালগুলি উপড়ে ফেলত। ফলে তাঁবু চাপা পড়ে যেত শত্রু সেনা। তারপর ফাঁদে পড়া শত্রু সেনাকে বর্শার ফলা দিয়ে খুঁচিয়ে মেরে ফেলা হত।

যুদ্ধের এই কৌশল একসময় প্রবেশ করেছিল পোলো খেলাতেও। মহারাজা ভুপিন্দর সিংয়ের ‘পাটিয়ালা টাইগারস’ দল ভারতে ‘টেন্ট পেগিং’ খেলাতে চাম্পিয়ন ছিল। ব্রিটিশ দলগুলিকেও নাকানিচোবানি খাওয়াত তাঁর পাটিয়ালা টাইগারস।নিজের দলের এহেন কৃতিত্বে গর্বিত মহারাজ তাঁর স্টেটে একটি ফ্রেন্ডলি ‘টেন্ট পেগিং’ ম্যাচ খেলার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন বিশ্ববিখ্যাত আইরিশ দল ‘ভাইসরয় প্রাইড’কে।

টেন্ট পেগিং খেলা

অসম্ভব শক্তিশালী আইরিশ দলটি ‘টেন্ট পেগিং’ খেলাতে প্রায় অপরাজেয় ছিল। তবে প্রতিপক্ষকে মাঠে নাকাল করার জন্য, মাঠের বাইরেও একটি চাল চেলে রাখত ‘ভাইসরয় প্রাইড’। তাদের প্রতাপ দেখাবার জন্যই ম্যাচের আগের রাতে প্রতিপক্ষের সঙ্গে মদ্যপানের একটা আসর রাখত। প্রতিপক্ষ যখন আইরিশদের সঙ্গে মদ্যপানের লড়াইয়ে হেরে মাথা নিচু করে আসর ছেড়ে যেত, তখনও আইরিশরা চালিয়ে যেত মদ্যপান।

ম্যাচের আগেই মানসিক দিক থেকে হেরে থাকা প্রতিপক্ষকে ম্যাচে হারিয়ে দিত আইরিশ দল। আগের রাতে তুমুল মদ্যপান করার পরেও। এহেন দলটি ভারতে আসার পর দলের খেলোয়াড় ও ঘোড়াগুলির চেহারা দেখে চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলেন মহারাজা ভুপিন্দর সিং। যদি আইরিশদের কাছে তাঁর পাটিয়ালা টাইগারস হেরে যায়, তাহলে আর মুখ দেখানো যাবে না। চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলেন পাটিয়ালা টাইগারসের খেলোয়াড়রাও। যদি তাঁরা খেলায় হেরে যান, তাঁদের খুলি ফুটো করে ‘স্কাল পেগিং’ খেলবেন মহারাজ।

সিংহ শিকারের পর মহারাজা

অনেক ভেবেচিন্তে, নিজের দলের জয় সুনিশ্চিত করার জন্যে মহারাজ ভুপিন্দর সিং নিয়েছিলেন অন্য এক কৌশল। মহারাজের সংগ্রহে ছিল বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নামী ও দামি হুইস্কির অসামান্য সম্ভার। যা দেখে চমকে গিয়েছিল আইরিশ দল। এত হুইস্কি একসঙ্গে তারা চোখেও দেখেনি। ম্যাচের আগের দিন সন্ধ্যার পার্টিতে একত্রিত হয়েছিল দুটি দল। সে দুটি দলকেই সার্ভ করা হয়েছিল বিশ্বের সেরা হুইস্কি।

পাটিয়ালা টাইগারস দলটি বসেছিল ‘ভাইসরয় প্রাইড’ দলটির থেকে কিছু দূরে। মহারাজা ভুপিন্দর সিংয়ের নির্দেশে পাটিয়ালা টাইগারসকে দেওয়া হয়েছিল এক পেগ বা তিরিশ মিলিলিটার হুইস্কি। তাতে মেশানো হয়েছিল নব্বই মিলিলিটার জল। অন্যদিকে আইরিশদের গ্লাসে ঢালা হয়েছিল জল ছাড়া একশো কুড়ি মিলিলিটার হুইস্কি।

আইরিশ দল ভেবেছিল দূরের টেবিলে বসা পাটিয়ালার দলকেও একই পরিমাণে হুইস্কি দেওয়া হয়েছে। তাই গ্লাসে এক পেগের বেশি পরিমাণে হুইস্কি দেখেও তারা কিছু বলেনি। একসময় ‘পাটিয়ালা টাইগারস’ টেবিল ছেড়ে উঠে পড়েছিল। মদ্যপানের আসরে পাটিয়ালার দল হাল ছেড়ে দেওয়ায়, উল্লসিত আইরিশরা আরও হুইস্কি নিতে শুরু করেছিল। রাত যত গভীর হচ্ছিল, তত বাড়ছিল ভাইসরয় প্রাইডের নেশা।

গোঁফ চুমরে হাসতে হাসতে নিজের কক্ষে ফিরে গিয়েছিলেন মহারাজ ভুপিন্দর সিং। যাওয়ার আগে আইরিশ দলকে বলে গিয়েছিলেন, যত খুশি যতক্ষণ খুশি তাঁর প্রাসাদের সেরা হুইস্কি খেতে পারে ‘ভাইসরয় প্রাইড’। গভীর রাত পর্যন্ত দুষ্প্রাপ্য হুইস্কি পান করে আইরিশ খেলোয়াড়রা কোনওমতে ফিরেছিলেন হোটেলে। যিনি যে অবস্থাতে ছিলেন সেই অবস্থাতেই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন বিছানায়।

পরের দিন দুপুরের পর ঘুম থেকে উঠেছিল ‘ভাইসরয় প্রাইড’। কান ভোঁ ভোঁ, মাথা ঝনঝন, গা ম্যাজ ম্যাজ করছিল আইরিশ খেলোয়াড়দের। খেলার মতো অবস্থায় ছিল না দলটি। তবুও লজ্জার খাতিরে সেই অবস্থাতেই মাঠে নামতে বাধ্য হয়েছিল ভাইসরয় প্রাইড। সেই ম্যাচে বিশ্বসেরা ভাইসরয় প্রাইডকে নাকানিচোবানি খাইয়েছিল মহারাজার পাটিয়ালা টাইগারস।

ম্যাচে গোহারান হেরে স্তম্ভিত হয়ে যাওয়া ‘ভাইসরয় প্রাইড’ গিয়েছিল মহারাজার কাছে নালিশ জানাতে। দলটি মহারাজাকে জানিয়েছিল, গত রাতের পার্টিতে তাদের পেগ মেপে হুইস্কি দেওয়া হয়নি। প্রতিবারে এক পেগের অনেক বেশি পরিমাণ হুইস্কি দেওয়া হয়েছিল। তাই তারা ম্যাচে হেরেছে।

আইরিশদের কথা শুনেস গোঁফ চুমরে ভুপিন্দর সিং বলেছিলেন, “হ্যাঁ ঠিকই বলেছ, এটা পাটিয়ালা। এখানে আমাদের হিসাবে হুইস্কির পেগ ঢালার নিয়ম। এর নাম ‘পাটিয়ালা পেগ’। এই পেগ নেওয়ার জন্য কলজের দম লাগে। আমরা এই পেগ নিতেই অভ্যস্ত। আমার দলের খেলোয়াড়রা গতরাতে তোমাদের সঙ্গে এই পেগ নিয়েও মাঠে আজ তোমাদের হারিয়েছে।”

আর কথা বাড়ায়নি আইরিশ দল। মাথা নীচু করে বিদায় নিয়েছিল পাটিয়ালা থেকে। সেই থেকে পাঞ্জাব সহ সারা ভারতে হুইস্কিপ্রেমীদের কাছে দাপটের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘পাটিয়ালা পেগ’। এই ‘পাটিয়ালা পেগ’ পান করেও যিনি না টলে হাঁটতে পারবেন তিনিই হুইস্কিপ্রেমীদের মধ্যে বীরশ্রেষ্ঠ।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More