রামায়ণের নতুন ব্যাখ্যা করে হুমকি চিঠি পেয়েছিলেন তিনি, দেখানো হয়েছিল খুনের ভয়ও

0

উত্তম দত্ত

ডাকঘর নাটকের গৃহবন্দি অমল দইওয়ালা হতে চাইলে পরম স্নেহময়তায় সেই দইবিক্রেতা তাকে বলেছিল :
‘মরে যাই! দই বেচতে যাবে কেন বাবা? এত এত পুঁথি পড়ে তুমি পণ্ডিত হয়ে উঠবে।’
তার উত্তরে বালক অমল তৎক্ষণাৎ জানিয়েছিল :
‘না, না, আমি কক্‌খনো পণ্ডিত হব না।’

প্রাণহীন শুষ্ক পাণ্ডিত্যের প্রতি রবীন্দ্রনাথের ছিল এক প্রবল অনীহা। পাণ্ডিত্যের সঙ্গে যদি রসের সমন্বয় না ঘটে, কঠিন পাথুরে নদীখাতে যদি স্নিগ্ধ জলস্রোত প্রবাহিত না হয়, রুক্ষ কঙ্কালের উপরে যদি রক্তমাংসের সরস লাবণ্য না ফুটে ওঠে তাহলে সেই পাণ্ডিত্য উপকথার সেই সিসিফাসের প্রাণহীন এক টুকরো পাথর মাত্র। যাকে প্রাণপণে ঠেলেঠুলে জ্ঞান-পাহাড়ের মাথায় তুললেও শেষ পর্যন্ত আবার তা গড়িয়ে পড়ে প্রাণহীন শুষ্কতার অতল অন্ধকারে।

রক্তকরবী নাটকের পণ্ডিত অধ্যাপকের মুখে রবীন্দ্রনাথ সেকথাই বলতে চেয়েছেন :
‘জানো নন্দিনী, আমিও আছি একটা জালের পিছনে? মানুষের অনেকখানি বাদ দিয়ে পণ্ডিতটুকু জেগে আছে। আমাদের রাজা যেমন ভয়ংকর, আমিও তেমনি ভয়ংকর পণ্ডিত।’

কিন্তু প্রাণহীন, আত্মাহীন পাণ্ডিত্যের প্রতি রবীন্দ্রনাথের এই উন্নাসিক বীতরাগকে আশ্চর্য মনীষায় বদলে দিয়েছিলেন যিনি, তিনি হলেন ভারতবর্ষের জাতীয় অধ্যাপক ও পদ্মবিভূষণ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়। তাঁর বয়স যখন মাত্র ৩৮ তখনই রবীন্দ্রনাথ তাঁকে ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্থান দিয়েছিলেন। শিলং পাহাড়ের পটভূমিকায় তরুণ নায়ক অমিত রায়ের যাপনচিত্র আঁকতে গিয়ে তিনি লিখেছিলেন :

‘কিছুদিন ওর কাটল পাহাড়ের ঢালুতে দেওদার গাছের ছায়ায় বই পড়ে পড়ে। গল্পের বই ছুঁলে না, কেননা, ছুটিতে গল্পের বই পড়া সাধারণের দস্তুর। ও পড়তে লাগল সুনীতি চাটুজ্যের বাংলা ভাষার শব্দতত্ত্ব, লেখকের সঙ্গে মতান্তর ঘটবে এই একান্ত আশা মনে নিয়ে।’

পরবর্তীকালে সুনীতিকুমার পরম বিস্ময়মুগ্ধ কৃতজ্ঞতায় বলেছিলেন, আমার সব কীর্তির কথা ভুলে গেলেও ওই ‘শেষের কবিতা’র জন্যই মানুষ মনে রাখবে আমাকে।

রবীন্দ্রনাথ ও সুনীতিকুমার

ব্রিটিশ আমলের এক সদাগরি অফিসের একজন সাধারণ কেরানি হরিদাস চট্টোপাধ্যায়ের সন্তান সুনীতিকুমার জন্মেছিলেন হাওড়ার শিবপুরে ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দের ২৬ নভেম্বর। ৮৬ বছরের দীর্ঘ জীবনে তিনি লিখেছেন ইংরাজি ও বাংলায় অজস্র গ্রন্থ, তৈরি করেছেন বহু গুণী ছাত্র। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বৈচিত্র্যময় ভাষা ও ভারতীয় সংস্কৃতি বিষয়ে বক্তৃতা দিয়েছেন এই বহুভাষাবিদ মানুষটি। এই ‘ভাষাচার্য’ গুরুর মৃত্যুর পর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে প্রিয় ছাত্র ড. সুকুমার সেন বলেছিলেন-

‘উচ্চতা অনেক রকমের হয়। অট্টালিকাও উচ্চ, আবার মহীরূহও উচ্চ। একটি নিষ্প্রাণ, অন্যটি জীবনরসে সমৃদ্ধ। সুনীতিবাবুর ছিল সেই বনস্পতির উচ্চতা।’

১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ইন্দোনেশিয়া, জাভা, সুমাত্রা, তাইল্যান্ড, মালয়, বালিদ্বীপ ভ্রমণের আশ্চর্য অভিজ্ঞতার কথা তিনি লিখে গেছেন তাঁর ‘রবীন্দ্র-সঙ্গমে দ্বীপময় ভারত ও শ্যামদেশ’ নামক গ্রন্থে।

সেই যাত্রায় স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ পেয়েছিলেন সুনীতিকুমারের বিশাল ও মহৎ আত্মার পরিচয়। একজন বিদগ্ধ পণ্ডিতের মধ্যে তিনি আবিষ্কার করেছিলেন প্রাণের সহজ সজীবতা- ‘আমাদের দলের মধ্যে আছেন সুনীতি। আমি তাঁকে নিছক পণ্ডিত বলেই জানতুম। অর্থাৎ, আস্ত জিনিসকে টুকরো করা ও টুকরো জিনিসকে জোড়া দেওয়ার কাজেই তিনি হাত পাকিয়েছেন বলে আমার বিশ্বাস ছিল। কিন্তু এবার দেখলুম, বিশ্ব বলতে যে ছবির স্রোতকে বোঝায়, যা ভিড় করে ছোটে এবং এক মুহূর্ত স্থির থাকে না, তাকে তিনি তালভঙ্গ না করে মনের মধ্যে দ্রুত এবং সম্পূর্ণ ধরতে পারেন আর কাগজে-কলমে সেটা দ্রুত এবং সম্পূর্ণ তুলে নিতে পারেন। এই শক্তির মূলে আছে বিশ্ব-ব্যাপারের প্রতি তাঁর মনের সজীব আগ্রহ।’

ব্রাহ্মণসন্তান সুনীতিকুমার একসময় কঠোরভাবে ব্রাহ্মণ্য আচার-অনুষ্ঠান মেনে চলতেন। প্রতিদিন গায়ত্রী মন্ত্র উচ্চারণ করতেন, পুজোর আগে উপোস করতেন। মহালয়ায় তর্পণ করতেন। আবার পরবর্তীকালে প্রবল যুক্তিবাদী সুনীতিকুমার বলতেন, তিনি বিশ্বাস করেন না যে তাঁর প্রদত্ত অন্ন-জল-পিণ্ড তাঁর পূর্বপুরুষেরা গ্রহণ করছেন। লৌকিক আচার অনুষ্ঠান পালন ও যুক্তিবাদের এক স্ববিরোধী ব্যক্তিত্ব ছিল তাঁর মধ্যে। তাই প্রতিদিন ঠাকুরঘরে গিয়ে পুজো করার সময় গীতা-উপনিষদ-বাইবেল-কোরান-রামায়ণ-মহাভারত-হোমার-রবীন্দ্রনাথ- গ্রিক নাটক- সব কিছুই পাঠ করতেন পূজার আসনে বসে। আসলে ধর্মীয় অন্ধতার চাইতে তাঁর মধ্যে বড় হয়ে উঠেছিল ঐতিহ্যের অনুসন্ধান।

রামায়ণের প্রাচীন উৎস অনুসন্ধান করে তিনি দেখিয়েছিলেন রাম-সীতার মধ্যে সহোদর সম্পর্ক আছে। ভাই-বোনের মধ্যে বিবাহের কথা উচ্চারণ করার জন্য সুনীতিকুমারকে একবার ভয়ংকর গালাগাল শুনতে হয়েছিল। কেউ কেউ মৃত্যুভয় দেখিয়ে হুমকি-চিঠি দিয়েছিল তাঁকে। সারাদেশ জুড়ে প্রবল বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। তথাপি সুনীতিকুমার ছিলেন আমরণ প্রখর ও অটল যুক্তিবাদী। তিনিই সাহস করে বলতে পেরেছিলেন : ভারতীয়রা যে দিন এক হাতে ডিমের অমলেট খেতে খেতে অন্য হাতে বেদ পড়তে পারবে, সে দিনই বেদের যথার্থ মূল্যায়ন সম্ভব।

পণ্ডিত হলেও জীবনের প্রতি মুহূর্তে তাঁর আশ্চর্য সজীব প্রাণরসের পরিচয় ফুটে উঠত। নিজের বিয়ের সময় বন্ধুদের নিমন্ত্রণ করেছিলেন মন্দাক্রান্তা ছন্দে চিঠি লিখে।

একবার সাহিত্যিক নারায়ণ সান্যালের মেয়ের বিয়েতে গিয়ে একটা খাবারের নাম শুনলেন : ‘ফিস ওলী’। অচেনা শব্দটি শুনেই একটু থমকে গেলেন তিনি। নারায়ণ সান্যাল সেদিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জানিয়েছেন :

খেতে খেতেই সুনীতিবাবু জানতে চাইলেন ‘ফিশ-এর ওলী’ মানে কী?

খাবারের দেশ ও গোত্রের পরিচয় দেওয়া উপস্থিত সকলের পক্ষেই বেশ কঠিনতম কাজ হল৷ অগত্যা বিজলি গ্রিলের ম্যানেজারবাবু জানালেন যে সেটি ভেটকি মাছের ফিশ ওলী৷ এবার তিনি বানান জানতে চাইলেন৷ জানানো হল ‘ও’ আর ‘লয়ে দীর্ঘঈ’৷ সুনীতিবাবু জানালেন যে “সেটা তো সাঁত্রাগাছির ওল ‘স্ত্রীয়াম্ ঈপ্’।” তিনি রোমান হরফে বানানটা চাইছেন৷ হয় জার্মান নয় ফ্রেঞ্চ এমন উত্তর শুনে তিনি জানালেন, ‘জার্মান ভাষায় ভাজাকে বলে gebacken অথবা gebraten; ফরাসী ভাষায় ভাজা মাছ হচ্ছে frit poissons’ স্প্যানিশে মাছ ভাজাকে বলে frito pescado, ইতালিয়ান ভাষায় fritte pesce৷ তাহলে ওলীর উৎপত্তি কোথা থেকে? পরিস্থিতি বুঝে নারায়ণবাবুর মেজদা বললেন, ব্যুৎপত্তি না জানলেও এর উৎপত্তি রান্নাঘরে। আপাতত রান্নাঘর থেকে এল এই মাছভাজা- এভাবেই ধরুন৷ এহেন রসিকতায় খুশি হয়ে তিনিও রসিকতা করে বললেন— “তাই বলুন! মাছ ভাজা ! ওলী নয়! তাহলে ওপিঠটা খাওয়া যেতে পারে৷ ওলীর এ-পিঠ ও-পিঠ কিছুই চিনি না, ভাজামাছ উল্টে খেতে জানি!

সুনীতিকুমারের একটি বই আছে— ‘পথচলতি’। এতে তাঁর বিদেশে বসবাসের বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথা রয়েছে। তিনি তখন জার্মানিতে রয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ তখন সবে নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন। ইউরোপে তাঁকে নিয়ে মস্ত হইচই। কেউ বিমুগ্ধ, কেউ বিক্ষুব্ধ। সেই অবস্থায় সুনীতিকুমার একদিন শুনলেন, এক জায়গায় একদল লোক ‘রাবিনড্রোনাট টাগোরে! রাবিনড্রোনাট টাগোরে’ বলে চিৎকার করছে। কিছুটা কৌতূহলী হয়ে তিনি গেলেন ব্যাপারটা কী জানতে। গিয়ে শুনলেন, প্রত্যেকটি লোকই প্রচুর পরিমাণে মদ্যপান করেছে। কিন্তু তারা দাবি করছে তারা কেউই মাতাল হয়নি, তারা আরও মদ খেতে পারে। কিন্তু দোকানদার রাজি হচ্ছে না। তখন তারা ঠিক করল, তারা একটি শক্ত শব্দ বেছে নিয়ে উচ্চারণ করবে। যদি শব্দটা শুদ্ধভাবে উচ্চারণ করতে পারে, তাহলে ধরে নিতে হবে তারা মাতাল হয়নি। সেই শক্ত শব্দ হিসেবে তারা নির্বাচন করেছে ‘রবীন্দ্রনাথ টেগোর’ নামটিকে।

এই ঘটনাটি জানিয়ে পরে সুনীতিকুমার সরস ভঙ্গিতে মন্তব্য করেছেন,
যে-ভাষায় ঘোড়ায় টানা ট্রামগাড়িকে বলে ‘pferdstrasseisenbahnwagen’ সেই ভাষার মানুষদের কাছে ‘রবীন্দ্রনাথ টেগোর’ যে কেন শক্ত শব্দ মনে হল কে জানে!

মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান সুনীতিকুমার জানতেন, বিদ্যা হল একটা অস্ত্র, যা দিয়ে জীবনের অজস্র প্রতিকূলতাকে জয় করা যায়।
শৈশব থেকেই চোখের পাওয়ার মাইনাস। এইসব শারীরিক ন্যূনতাকে অক্লেশে জয় করে তিনি একের পর এক পরীক্ষায় সাফল্য লাভ করেন। মতিলাল শীল ফ্রি স্কুল থেকে ১৯০৭ সালে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় ৬ষ্ঠ স্থান অধিকার করে কুড়ি টাকা বৃত্তি লাভ করেন। তারপর স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে ১৯০৯ সালে ৩য় স্থান অধিকার করে এফ.এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। অতঃপর প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ১৯১১ সালে ইংরেজিতে অনার্সসহ বি.এ ক্লাসে ১ম স্থান অধিকার করেন। ১৯১৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে এম.এ পরীক্ষায় ১ম স্থান অর্জন করেন।

১৯১৮ সালে সংস্কৃতের শেষ পরীক্ষায় পাস করে প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ বৃত্তি এবং জুবিলি গবেষণা পুরস্কার পান।এম.এ পাশ করার পরেই তিনি কলকাতা বিদ্যাসাগর কলেজে ইংরেজির অধ্যাপক হিসেবে চাকরি শুরু করেন। ১৯১৪ – ১৯১৯ সাল পর্যন্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে একই বিষয়ের অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯১৯ সালে তিনি ভারত সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় লন্ডনে যান এবং লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ধ্বনিবিজ্ঞানে ডিপ্লোমা পান। ১৯২১ সালে সেখান থেকেই ডি.লিট উপাধি লাভ করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল : ‘ইন্দো-আরিয়ান ফিললজি’। লন্ডনে থাকার সময় ধ্বনিতত্ত্ব ও ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাতত্ত্ব ছাড়াও প্রাকৃত ভাষা, ফার্সি ভাষা, প্রাচীন আইরিশ ভাষা, পুরনো ইংরেজি ও গোথিক ভাষায় গভীর জ্ঞান সঞ্চয় করেন তিনি।

এরপর লন্ডন থেকে তিনি চলে যান প্যারিসে। সেখানে তিনি প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ে স্লাভ ও ইন্দো-ইউরোপিয়ান ভাষাতত্ত্ব, প্রাচীন খোতানি ভাষা, গ্রিক ও লাতিন ভাষার ইতিহাস সম্পর্কে নিবিড় অনুশীলন করেন।

১৯২২ সালে দেশে ফিরে আসার পর স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের উদ্যোগে ভারতীয় ভাষাতত্ত্বের ‘খয়রা’ অধ্যাপক হিসেবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পুনর্বার কাজ আরম্ভ করেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ ৩০ বছর কাজ করার পর ১৯৫২ সালে এমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে সম্মানিত হন।

অধ্যাপক তারাপুরওয়ালার কাছে আবেস্তা অধ্যয়ন করে বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ সম্পর্কে ৩ খণ্ডের ‘দি অরিজিন এন্ড ডেভেলপম্যান্ট অব দ্য বেঙ্গলি ল্যাঙ্গুয়েজ’ বইটি লিখে তিনি সুগভীর বৈদগ্ধ্যের স্বাক্ষর রাখেন।

একের পর এক সাফল্য ও সম্মানে ভরে ওঠে সুনীতিকুমারের জীবন।
১৯৩৫ সালে তিনি রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হন।
১৯৪৮ সালে হিন্দি ভাষায় বিশেষ অবদানের জন্য সাহিত্য বাচস্পতি উপাধি লাভ করেন।
১৯৫০ সালে লন্ডনের সোসাইটি অব আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সের সদস্য পদ লাভ করেন।
১৯৫২-১৯৫৮ সাল পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের বিধান পরিষদের অধ্যক্ষ পদে বহাল ছিলেন।
১৯৫৫ সালে অসলোর নরওয়েজিয়ান অ্যাকাডেমির সদস্য পদ লাভ করেন।
১৯৬৩ সালে ভারত সরকার কর্তৃক পদ্মবিভূষণ উপাধিতে ভূষিত হন।
১৯৬৬ সালে ভারতের জাতীয় অধ্যাপকের মর্যাদা লাভ করেন।
১৯৬৯ সালে সাহিত্য অকাদেমি সভাপতি নির্বাচিত হন।তাঁকে ‘ভাষাচার্য’ উপাধি দিয়েছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ।
মানুষ সুনীতিকুমার ছিলেন বিচিত্র চরিত্রের অধিকারী। নিজের নামের আদ্যক্ষর দিয়ে একটি মজার স্বাক্ষর বানিয়েছিলেন তিনি : সু-কু-চ। সংস্কৃতভাষায় যার অর্থ : ভালো এবং মন্দ।

ক্লাসে ছাত্রদের ‘আপনি’ করে সম্বোধন করতেন। কেউ তাঁকে পা ছুঁয়ে প্রণাম করতে চাইলে ডিরোজিওর মতোই ঘোর আপত্তি জানাতেন। তরুণদের প্রায়ই বলতেন : শরীর মজবুত হওয়া চাই। রোজ সকালে ব্যায়াম করবে। আমি এখনো ফ্রি-হ্যান্ড করি।

ভোজনরসিক সুনীতিকুমার জানতেন কোন দেশের কোন অঞ্চলের কোন খাবার বিখ্যাত : জনাইয়ের মনোহরা, মুর্শিদাবাদের ছানাবড়া, নদীয়ার সরভাজা, দিল্লির ঘণ্টেওয়ালার জিলিপি ও ঝুরিভাজা, লখনৌয়ের খাসির মাংস, ইস্তান্বুল ও এথেন্সের কাবাব, জার্মানি, ইতালি ও মেক্সিকোর কফি আর কাপুচিনোর পার্থক্য, সমস্তই ছিল তাঁর নখদর্পণে।

একবার আফ্রিকায় একটা মজার ঘটনা ঘটেছিল। রাস্তার পাশে মাঠের মাঝখানে কিছু অর্ধউলঙ্গ স্থানীয় মানুষ পাতায় ঢেলে কিছু একটা খাচ্ছিল। তিনি তাদের দেখিয়ে গাড়ির চালককে প্রশ্ন করলেন : ‘গোল হয়ে বসে কী খায় ওরা? চাইলে আমাকে চাখতে দেবে?’
তারপর গাড়ি থেকে নেমে সেই অদ্ভুত তেতো ও টক খাবার দিব্যি মুখে নিয়ে খেয়ে দেখলেন।
‘ভয় করল না, যদি শরীরে না সয়?’
সম্পূর্ণ অচেনা খাবার শরীরে সহ্য নাও হতে পারত। কিন্তু তিনি অকুতোভয়ে বললেন : ‘সইবে না কেন, মানুষই তো ওটা খাচ্ছিল।’

বাড়ির দরজার মাথায় উৎকীর্ণ করে রেখেছিলেন গ্রিক কবির একটি কবিতার অংশবিশেষ। যার বাংলা তর্জমা : ‘এই অপূর্ব শোভাময় বিশ্ব কে সৃষ্টি করেছে, কেন করেছে, কে সে, কিছুই জানি না। এই এক বিস্ময়। এই বিস্ময়কে প্রণাম করি।’

তাঁর দোতলা বাড়ির প্রায় প্রত্যেক দরজার মাথায় সাদা মার্বেল পাথরে খোদাই করা ছিল বিভিন্ন ভাষার বিভিন্ন লিপির বিভিন্ন শাস্ত্র ও সাহিত্য থেকে নানা মূল্যবান উদ্ধৃতি এবং মাঙ্গলিক চিহ্ন। একটি ফলকে রবীন্দ্রনাথের হাতের লেখা খোদাই করা কবিতাও ছিল।

তিনি বিশ্বাস করতেন, পশুত্ব থেকে মনুষ্যত্বের দিকে ক্রম উত্তরণই হল সংস্কৃতির মূল কথা।

২৯ মে ১৯৭৭ এই প্রবাদপ্রতিম জাতীয় অধ্যাপকের জীবনাবসান ঘটে।

পণ্ডিত অধ্যাপক সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ছিলেন আমাদের ভারতবর্ষের জাতীয় জীবনের সশ্রদ্ধ বিস্ময়ের প্রতিমূর্তি। কিন্তু মানুষ সুনীতিকুমার ছিলেন আমাদের আত্মার আত্মজন।

 

 প্রাবন্ধিক  স্বনামধন্য কবি,ছোটোগল্পকার এবং বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক। ইউ জি সি-র প্রাক্তন ফেলো। একাধিক কবিতাসংকলন ও গবেষণা-গ্রন্থের লেখক।

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.