‘তুই’ ডেকে ক্ষমা চেয়েছিলেন স্বয়ং শ্রীরামকৃষ্ণ, পুজো করেছিলেন ষোড়শী রূপে

0

দ্য ওয়াল ম্যাগাজিন ব্যুরো: গেরস্ত বাড়ির মেয়ে ক্ষেমংকরী থেকে সবার মা সারদা হয়ে ওঠা- আসলে এক নারীর দীর্ঘ পথচলার গল্প। সন্তানজন্ম না দিয়েও কী আশ্চর্যভাবে তিনি হয়ে উঠেছিলেন হাজার হাজার সন্তানের মা। সেই সন্তানের কেউ দিন-আনি-দিন-খাই গরিব, কেউ বড়লোক, কেউ ব্রাহ্মণ, কেউ চণ্ডাল কেউ বা মুসলমান ঘরামি। কেউ উচ্চশিক্ষিত, উচ্চপদে আসীন সমাজের উঁচুতলার মানুষ। আবার কেউ বা সমাজের চোখে অপরাধী, লুটেরা ডাকাত। কিন্তু স্নেহের পথে যে ছোট-বড় হয়না তা নিজের জীবন দিয়ে দেখিয়ে গেছেন সারদামণি। জ্ঞান দিয়ে, তত্ত্ব দিয়ে, বিজ্ঞানমনস্কতা দিয়ে যা হয়নি- স্নেহের স্রোতধারায় সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করে দেখিয়েছেন শ্রীমা সারদা। তিনি বলতেন ‘আমি পাতানো মা নই, গুরু মাও নই, নিছক মুখে বলা মাও নই৷ আমি সত্যিকারের মা। সবাই আমারই সন্তান৷’ শুধুমাত্র মাতৃস্নেহকে আঁকড়ে ধরে, ভক্তদের মুখে মুখে মা ডাক শুনতে শুনতে প্রকৃত জগজ্জননী হয়ে ওঠার এই দীর্ঘ পরিক্রমা এক গ্রামীণ নারীর পক্ষে কতটা কঠিন ছিল, তা হয়তো এ সময়ে দাঁড়িয়ে আন্দাজ করাও মুশকিল।১৮৫৩ সালে বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুর মহকুমার অন্তর্গত জয়রামবাটিতে এক গরিব ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মেছিলেন ক্ষেমংকরী৷ বাড়ির বড় মেয়ে ফলে যেমন আদর যেমন ছিল, তেমনই ছিল দায়িত্ব আর কর্তব্যের গুরুভার৷ কিশোরী সারদার সারাদিন কেটে যেত সংসারের কাজে, ছোটো ভাইদের দেখাশোনা করে, আধকোমর জলে নেমে পোষা গোরুদের জন্য দলঘাস কেটে। কখনও ধানখেতে মুনিষদের জন্য মুড়ি নিয়ে যেতেন, কখনও বা অন্য মেয়েদের পাশাপাশি যোগ দিতেন ধান কুড়ানোর কাজেও।

ছোট্টবেলা থেকেই সারদা বড় গম্ভীর প্রকৃতির মেয়ে। শিশুসুলভ ছটফটানি ছিল না একেবারেই। মাটি দিয়ে দেব–দেবীর মূর্তি গিড়ে খেলা করতে ভালবাসতেন। ফুল–চন্দন দিয়ে মূর্তি সাজিয়ে তিনি একদৃষ্টিতে সেদিকে চেয়ে থাকতেন। গ্রামে মেয়েদের পড়াশোনার চল তেমন ছিল না সে যুগে। তবে বিয়ের পরে ঠাকুরের ভ্রাতুষ্পুত্রী লক্ষ্মীর কাছে কিছু কিছু পড়তে শিখেছিলেন সারদা। তা থেকেই তিনি রামায়ণ, মহাভারত পাঠ করতেন। এছাড়া গ্রামের যাত্রা, কথকতা শুনে শুনে তাঁর মধ্যে স্বাভাবিক ধর্মপ্রবণতা জেগেছিল।

মেয়ের বয়স যখন সবেমাত্র পাঁচ, তখনই মেয়ের বিয়ে দিতে তৎপর হয়ে ওঠেন সারদার বাবা-মা। ব্রাহ্মণ বাড়ির মেয়েদের গৌরিদান তখনকার সমাজে খুবই সাধারণ ঘটনা। কিন্তু সারদার বিয়েটা আর পাঁচটা গ্রামের মেয়ের মতো সাধাসিধে ব্যাপার ছিল না। কামারপুকুরের গদাধর মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে শিশু সারদার বিয়ে নিয়ে লোকমুখে চালু আছে একটা মজার কাহিনি। শোনা যায় গ্রামের এক কথকতার আসরে শ্রীরামকৃষ্ণকে প্রথম দেখেন সারদা। তখন অবশ্য তিনি শ্রীরামকৃষ্ণ নয়, দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের পূজারী চট্টোপাধ্যায়ের ভাই গদাধর। সেদিন এক প্রতিবেশিনীর রসিকতা মেশা প্রশ্নের উত্তরে কিশোরী সারদা গদাধরের দিকে আঙুল তুলে বলেছিলেন, ‘ঐ আমার বর।’ সরল কিশোরীর অবোধ উত্তর শুনে সেদিন কি আড়াল থেকে হেসেছিলেন মহাকাল?

দাম্পত্য কী, তা বোঝার বহু আগে ১৮৫৯ সালে ২৪ বছরের গদাধরের সঙ্গে বিয়ে হয়ে যায় ৬ বছরের শিশু সারদার। বিয়ের পরে সারদা ফিরে এলেন বাপ-মায়ের ঘরে। গদাধরও ফিরে গেলেন গঙ্গার পাড়ে দক্ষিণেশ্বরে মা ভবতারিণীর আশ্রয়ে। ১৪ বছর বয়স হলে তাঁকে ফিরিয়ে আনা হয় কামারপুকুরে শ্বশুরবাড়িতে। সেই তাঁর প্রথম স্বামী-সহবাস। তারপর আরও বছর তিনেক পেরিয়ে গেছে। দক্ষিণেশ্বরের দিব্যভাবাপন্ন গদাইঠাকুরকে নিয়ে তখন কলকাতার আকাশে-বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে নানান অতিলৌকিক গল্প। লোকের মুখে মুখে রং চড়ে সে গল্প পৌঁছে যায় কামারপুকুর জয়রামবাটিতেও। কেউ বলে ছেলে পাগল হয়ে গেছে। কেউ বলে সন্ন্যাসী হয়ে গেছে। সেসব শুয়ে ভয়ে কেঁপে ওঠে কিশোরী বধূ সারদামণির বুক। ঠিক করে যে করেই হোক, পৌঁছতে হবে দক্ষিণেশ্বরে।কোথায় বাঁকুড়া। আর কোথায় কলকাতা! পড়াশোনা না জানা সহায়সম্বলহীন এক গৃহবধূ পায়ে হেঁটে পাড়ি দেন এক দীর্ঘ অজানা পথে। পথকষ্ট, মৃত্যুভয়, ডাকাতের আক্রমণ- সব পার করে এ যেন সেই বৈষ্ণবীয় অভিসার… আর এখান থেকেই শুরু হল সারদামণি থেকে সারদাদেবী হয়ে ওঠার সূচনা।দক্ষিণেশ্বরে পৌঁছে স্বামীর দর্শন পেয়ে সব আশঙ্কার অবসান ঘটল ঠিকই, কিন্তু স্বামীকে কাছে পাওয়ার আশা পূর্ণ হল না। গদাধর ঠাকুরের ঘরে স্থানাভাব, তাই গ্রাম থেকে আসা পুরোহিত-ঘরনির ঠাই হয় উত্তর-পশ্চিমের নহবত ঘরের একতলার ছোট্ট ঘরে। শুরু হল সংসারসাধনা। ভক্তসমাগমের আগে কাকডাকা ভোরে উঠে গঙ্গাস্নান সেরে শুরু হত দিন। ঠাকুরের ভোগ রান্না থেকে সংসারের কাজ- সবই একার হাতে করতেন সারদা।তেমনই এক দিনে দরজার দিকে পিছন ফিরে বসে এক মনে মায়ের নাম জপ করছেন ঠাকুর। দুপুরের খাবার এল। এই কাজটি সাধারণত এক দাসী করে থাকেন। পায়ের আওয়াজ শুনে মাথা না ঘুরিয়েই শ্রীরাকমৃষ্ণ বললেন, ‘ওখানেই রেখে দে’। তারপরেই কী মনে হওয়ায় ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন খাবারের থালাটি রেখে একগলা ঘোমটা টেনে সারদা দেবী দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন। এইবার যারপরনাই লজ্জিত হলেন ঠাকুর। মায়ের কাছে গিয়ে বারবার ক্ষমা চাইলেন, না বুঝে ‘তুই’ বলে ফেলেছেন বলে। সামান্য বিষয় নিয়ে এমন ক্ষমাভিক্ষার বহর দেখে ততক্ষণে বেশ অপ্রস্তুত সারদা। কিন্তু যাঁকে পরে সাক্ষাৎ দেবী ষোড়শী ভেবে আসনে বসিয়ে পুজো করবেন তাঁকে কী করে অসম্মান করবেন শ্রীরামকৃষ্ণ?অবশ্য রামকৃষ্ণদেব একা নন, সারদার মধ্যে এর আগেও দেবীদর্শন করেছেন অনেকেই। সেবার বেশ ধুমধাম করে জগদ্ধাত্রী পুজো হচ্ছে জয়রামবাটিতে। আশপাশের গ্রাম থেকে মান্যগণ্য অনেকেই এসেছেন পুজোয়। কিশোরী সারদার বিয়ে হয়নি তখনও। দেবীমূর্তির সামনে করজোড়ে ধ্যানরতা সারদাকে দেখে সেদিন চমকে উঠেছিলেন হলদেপুকুর গ্রামের রামহৃদয় ঘোষাল। ‘এ কে?’ কিশোরীর মুখে এমন স্বর্গের আলো এল কী করে? মোহাবিষ্টের মতো প্রৌঢ় রামহৃদয় দেখেছিলেন ছোট্ট সারদার মুখে স্বয়ং জগদ্ধাত্রীকে।

সারদা দেবী সম্পর্কে বরাবরই অন্যরকম ভাবাবেগ ছিল পরমহংসদেবের। নানা কথাপ্রসঙ্গে বারবার নিজেই বলেছেন তিনি কোনওদিনই তাঁর সাধন-লক্ষ্যে পৌঁছতে পারতেন না, যদি না মা সারদা চলার পথে আগাগোড়া সঙ্গ দিতেন তাঁকে৷ এমন সহধর্মিণী ছাড়া ধর্মসাধনা তো দূর, জীবনের অনেকটাই শূন্য হয়ে যেত৷ ঈশ্বরের সেবায় নিজেকে কখনই মননিবেশ করতে পারতেন না৷নিজের সন্তান নেই তো কী হয়েছে, তিনি ছিলেন সবার মা। সন্ন্যাসী সন্তানদের যেমন বুকে করে আগলেছেন, তেমনই আশ্রয় দিয়েছেন ভক্ত গৃহী সন্তানদেরও। শ্বেতাঙ্গ বিদেশিনীও তাঁর আদরের ছোঁয়ায় ঘরের মেয়েটি হয়ে গেছে। এমনকি দেশের জন্য প্রাণ দেওয়া, হাতে বন্দুক তুলে নেওয়া তরুণ বিপ্লবীদেরও আশ্রয় দিয়েছিলেন তিনি। এ সবের জন্য একসময় রীতিমতো ‘রাজরোষে’ পড়তে হয়েছিল রামকৃষ্ণ মিশনকে। ব্রিটিশ শাসনের রক্তচক্ষু দিয়েও স্নেহের বাঁধন ছেঁড়া যায়নি।

শ্রীমা নিজেই বলতেন ‘আমি সতেরও মা, অসতেরও মা। আমি সত্যিকারের মা।’ নিজের সমস্ত জীবন দিয়ে যেন সেই সত্যিকেই প্রতিষ্ঠা করে গেছেন সারদামণি। কেবলমাত্র রামকৃষ্ণদেবের সহধর্মিণীর পরিচয়ে নিজেকে আটকে রাখেননি তিনি, হয়ে উঠেছেন সৎ অসৎ, সন্ন্যাসী-ডাকাত সবার মা, সত্যিকারের আশ্রমজননী।

 

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.