সিন্ধু প্রদেশের সর্বশক্তিমান লৌকিক দেবতা ‘ঝুলেলাল’, মুসলমানেরা বলেন ‘শেখ তাহির’

Jhulelal - a symbol of interfaith harmony in Sindh, Pakistan.

0

Jhulelal

রূপাঞ্জন গোস্বামী

সিন্ধুর শেষ হিন্দু রাজা দাহির সেন রণক্ষেত্রে প্রাণ হারানোর পর,  খলিফা আল ওয়ালিদের খিলাফতের অংশ হয়ে গিয়েছিল সিন্ধুদেশ। তরবারির জোরে শুরু হয়েছিল সিন্ধুদেশের হিন্দুদের ধর্ম পরিবর্তন করবার চেষ্টা । খ্রিস্টীয় দশম শতাব্দীতে ‘সিন্ধ’ এলাকাটি চলে গিয়েছিল সুমরা রাজবংশের অধীনে। হিন্দু থেকে মুসলিম হওয়া ‘সুমরা’ রাজারা ছিলেন উদার ও  পরধর্মসহিষ্ণু । কিন্তু সুমরা রাজাদের অধীনে থাকা থাট্টা প্রদেশের শাসক মিরখশেখের (মকরব খান) দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত।

Jhulelal
ম্যাপের দক্ষিণ পশ্চিমে থাট্টা

থাট্টার প্রাক্তন শাসক শাহ সাদাত খানকে হত্যা করে শাসকের আসনে বসার পর, ৯৫০ খ্রিস্টাব্দে মিরখশেখ জারি করেছিলেন এক শাহি ফরমান। থাট্টায় বসবাসকারী হিন্দুদের ঘরে ঘরে গিয়ে পড়ে শোনানো হয়েছিল সেই ফরমান। যাতে লেখা ছিল, “থাট্টার হিন্দুদের চল্লিশ দিন সময় দেওয়া হচ্ছে,  ইসলাম ও মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে যেকোনও একটিকে বেছে নিতে হবে হিন্দুদের।” ঘরে ঘরে উঠেছিল কান্নার রোল। হিন্দু গ্রামগুলির সরপঞ্চেরা গ্রামবাসীদের বলেছিলেন, গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, ধর্ম যখন সংকটে পড়বে তখন দেখা দেবেন এক অবতার। তিনিই উদ্ধার করবেন বিপদ থেকে।

সিন্ধুর আত্মা  সিন্ধু নদ

গ্রামবাসীরা গিয়েছিল সিন্ধু নদের কাছে। সিন্ধু নদ গ্রামবাসীদের বলেছিল, এই চল্লিশ দিন ধরে জলদেবতা বরুণ দেবের পুজো করতে। কারণ তিনিই একমাত্র বাঁচাতে পারেন থাট্টার হিন্দুদের। সিন্ধু নদের তীরে থাট্টার হিন্দুরা শুরু করেছিল বরুণ দেবের আরাধনা। টানা চল্লিশ দিন ধরে থাট্টার হিন্দুরা একবেলা উপবাস করেছিলেন। চুল দাড়ি কাটেননি, জামা কাপড় পরিবর্তন করেননি।

থাট্টা দিয়ে বয়ে চলেছে সিন্ধু নদ

চল্লিশতম দিনের সন্ধ্যায় থাট্টার হিন্দুরা শুনতে পেয়েছিলেন দৈববাণী। সিন্ধু নদের বুকে জমে থাকা কুয়াশার ভেতর থেকে ভেসে এসেছিল একটি কণ্ঠস্বর,” হতাশ হয়োনা, ধৈর্য্য রাখো, আমি আসছি। নাসেরপুর গ্রামের রতনচাঁদ লোহানোর স্ত্রী দেবকীর গর্ভে জন্ম নেবো আমি। আনন্দে উদ্বেলিত হিন্দুরা গিয়েছিল অত্যাচারী শাসক মিরখশাহের কাছে। বলেছিল, “আরও কিছুটা সময় দিন শাহ। আমরা দৈববাণী শুনেছি। ভগবান নিজে আসছেন আমাদের উদ্ধার করতে।” অট্টহাসিতে প্রাসাদ কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন মিরখশাহ। হাসতে হাসতে বলেছিলেন,” তোমাদের ভগবান নিজে আসছেন! ঠিক আছে আমি অপেক্ষা করব, দেখি তিনি তোমাদেরকে মৃত্যুর হাত থেকে কীভাবে বাঁচান।”

শিল্পীর কল্পনায় মিরখশাহ

আবির্ভূত হয়েছিলেন অবতার

তিনমাস পর ‘আসু চাঁদ’ বা আশ্বিনের পূর্ণিমায় এসেছিল সুখবর। রতনচাঁদ লোহানোর স্ত্রী দেবকী গর্ভবতী হয়েছেন। আনন্দে মেতে উঠেছিলেন থাট্টার হিন্দুরা।  পোহি চাঁদ বা পৌষ পুর্ণিমায় আবার হিন্দুরা গিয়েছিলেন সিন্ধুর তীরে। বরুণ দেবের পুজো আরাধনা করে তাঁকে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন প্রতিশ্রুতির কথা। এসে গিয়েছিল চেতি চাঁদ বা চৈত্র পুর্ণিমা। গভীর রাতে এক পুত্র সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন দেবকী। চাঁদের আলোয় ভাসতে থাকা রুক্ষ থাট্টার আকাশে হঠাৎই জমেছিল বাদল মেঘ। শুরু হয়েছিল আকাশভাঙা বৃষ্টি। রুক্ষ থাট্টার বন্ধ্যা জমি সরস হয়ে সাদর অভ্যর্থনা জানিয়েছিল নবজাতককে।

ভূমিষ্ঠ হওয়ার কিছুক্ষণ পরই ঘটেছিল একটি অলৌকিক ঘটনা। শ্বাস নেওয়ার জন্য হাঁ করেছিল শিশুটি। হতবাক হয়ে সবাই দেখেছিল শিশুটির মুখের ভিতরে বইছে সিন্ধু নদ। জলের স্রোতে ভাসছে একটি অতিকায় পাল্লো (ইলিশ) মাছ। তার ওপর বসে আছেন এক বরুণ দেব। সাদা চুল সাদা দাড়ি এবং মাথায় সোনার মুকুট। স্বচক্ষে বরুণ দেবকে দেখার  পর, পার্বতী শিশুটিকে নিয়ে গিয়েছিলেন সিন্ধু নদের কাছে। বরুণ দেবতার আশীর্বাদ নেওয়ার জন্য। সিন্ধু নদকে দেখেই খিল খিল করে হেসে উঠেছিল নবজাতক।

শিশুর মা পার্বতীকে দেখা দিয়েছিলেন বরুণ দেব

হিন্দুরা ভিড় করেছিলেন রতন চাঁদের বাড়িতে

সদ্যজাত শিশুটিকে দেখতে এসেছিলেন জ্যোতিষীরাও। শিশুটির কোষ্ঠী বিচার করে এক জ্যোতিষী বলেছিলেন, এ ছেলে সাধারণ ছেলে নয়। শিশুটি নিশ্চিতভাবেই জলদেবতা বরুণের  অবতার। তাই তিনি শিশুপুত্রের নাম দিয়েছিলেন দরিয়ালাল।  তাই এক পাঞ্জাবী জ্যোতিষী শিশুটির নাম দিয়েছিলেন উদেরোলাল। জন্মের কিছুদিন পরেই, আর একটি অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী হয়েছিলেন গ্রামবাসীরা। সারাদিন ধরে নিজে থেকেই দুলতো শিশুটির ঝুলা বা দোলনা। তাই শিশুটির নাম হয়ে গিয়েছিল ‘ঝুলেলাল’। ঝুলেলালকে জন্ম দেওয়ার পর, বেশি দিন বাঁচেননি দেবকী। শিশুটিকে দেখাশুনা করার জন্য পুনরায় বিবাহ করেছিলেন রতনচাঁদ।

আরও পড়ুন:সত্যিই কি হিমালয়ের বুকে লুকিয়ে আছে ‘জ্ঞানগঞ্জ’, ইয়েতির মতোই অন্ধকারে রেখেছে বিশ্বকে

অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী শিশুটির খবর গিয়েছিল থাট্টার শাসক মিরখশাহের কাছে । মিরখশাহ সরপঞ্চদের ডেকে ক্রুদ্ধকণ্ঠে জানতে চেয়েছিলেন, তাঁকে আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে।  আরও কিছুদিন সময় চেয়েছিলেন হিন্দু সরপঞ্চেরা। তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে মিরখশাহ বলেছিলেন,”  আমিও এখন মরছি না, তোমরাও দেশ ছেড়ে পালাতে  পারছো না। ঠিক আছে, আমি আরও কিছুদিন অপেক্ষা করবো। তোমাদের পয়গম্বর যদি ইসলাম গ্রহণ করতে বলে। আশাকরি তোমরা সেটা মেনে নেবে।”

শিশুটিকে প্রাণে মারার চক্রান্ত হয়েছিল

মিরখশাহের আচরণে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন তাঁর পরামর্শদাতারা। তাঁরা বলেছিলেন এটা হিন্দুদের পাতা ফাঁদ। এতে মিরখশাহের পা দেওয়া উচিত হবে না। মিরখশাহ বলেছিলেন, “ওদের মৃত্যু তো আমার হাতে। তবে এখনই রক্ত গঙ্গা বইয়ে কী লাভ। আরও কিছুদিন দেখা যাক।” এরপর মিরখশাহ তাঁর সবথেকে বিশ্বস্ত মন্ত্রী আহিরিওকে পাঠিয়েছিলেন নাসেরপুর গ্রামে। মিরখশাহের অজান্তেই শিশুটিকে হত্যার ঘৃণ্য চক্রান্ত করেছিলেন আহিরিও। শিশুটির জন্য নিয়ে গিয়েছিলেন বিষ মাখানো একটি গোলাপ ফুল।  আদর করার অছিলায় শিশুটির জিভে বুলিয়ে দিয়েছিলেন বিষাক্ত গোলাপ। শিশুটির মুখে ফুটে উঠেছিল অদ্ভুত এক হাসি।

জানলা দরজা বন্ধ করা ঘরের মধ্যে  প্রবেশ করেছিল দমকা হাওয়া। চোখ বন্ধ করে ফেলেছিলেন আহিরিও।চোখ খোলার পর আহিরিও দেখেছিলেন শিশুটি দোলনায় নেই। ঘরের ভেতর দাঁড়িয়ে আছেন এক বৃদ্ধ মানুষ। সাদা চুল, সাদা দাড়ি, মাথায় মুকুট। মুহুর্তের মধ্যে পালটে গিয়েছিল দৃশ্যপট। ঘরটি হয়ে গিয়েছিল রণক্ষেত্র। চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল রক্তাক্ত শবদেহ। তার মাঝে ঘোড়ায় চড়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন অত্যন্ত রূপবান এক তরুণ যোদ্ধা। হাতে খাপখোলা তরবারি। পরের মূহুর্তেই যোদ্ধাটি হয়ে গিয়েছিল এক সুদর্শন কিশোর। পিছনে বইছে সিন্ধু নদ। হাওয়ার বেগ কমে যাওয়ার পর আহিরিও দেখেছিলেন, দোলনাতে শুয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে খিলখিল করে হাসছে শিশু ঝুলেলাল। অশ্রুসিক্ত চোখে, শিশুটির সামনে মাথা ঝুঁকিয়ে আহিরিও বলেছিলেন, “আমায় ক্ষমা করুন সিন্ধু দেবতা।”Jhulelal

আহিরিওর কথা বিশ্বাস করেননি মিরখশাহ। কিন্তু সেই রাতেই তিনি দেখেছিলেন একটি স্বপ্ন। তাঁর বুকে বসে আছে একটি শিশু। কিছুক্ষণের মধ্যেই সাদা চুল ও দাড়িওয়ালা এক বৃদ্ধ মানুষে পরিণত হয়েছিল শিশুটি।  বৃদ্ধটি পরিণত হয়েছিলেন এক যোদ্ধায়। যাঁর সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে ক্রমশ পিছিয়ে যাচ্ছিলেন মিরখশাহ। পরদিন সকালে স্বপ্নটির কথা আহিরিওকে বলেছিলেন মিরখশাহ। আহিরিও বলেছিলেন, “শাহ, আরও কিছুদিন অপেক্ষা করুন। কিন্তু ভুলেও শিশুটির ক্ষতি করার চেষ্টা করতে যাবেন না। ”

 সিন্ধু তীরে ঘটেছিল আরও এক অলৌকিক ঘটনা

বালক ঝুলেলাল বেদ শিক্ষা সম্পূর্ণ করার পর, পিতা রতনচাঁদ তাকে নিয়ে গিয়েছিলেন গুরু গোরক্ষনাথের কাছে। বালক ঝুলেলালকে ‘গুরুমন্ত্র’ দিয়েছিলেন গোরক্ষনাথ। ধর্মের দিক থেকে ঝুলেলালেকে সরিয়ে আনার জন্য  তার মধ্যে উপার্জনের ইচ্ছা জাগাতে চেয়েছিলেন সৎ-মা। একদিন তিনি বালক ঝুলেলালকে এক পাত্র সেদ্ধ কড়াইশুঁটি দিয়েছিলেন, হাটে বিক্রি করার জন্য। সেদ্ধ কড়াইশুঁটি বেচে ঝুলেলাল যে অর্থ পাবে সেটা দিয়ে  সে যেন চাল কিনে আনে।

সিন্ধু নদের তীরে বসা হাটে  গিয়েছিল ঝুলেলাল। পাত্রের অর্ধেক কড়াইশুঁটি সে বিলিয়ে দিয়েছিল ভিক্ষুকদের মধ্যে। বাকিটা সে পাত্রসহ উৎসর্গ করেছিল সিন্ধু নদকে। তারপর সারাদিন কাটিয়েছিল, সিন্ধু নদের তীরে ধর্ম আলোচনা করে। সন্ধ্যার সময় সিন্ধু নদের ঢেউ ফিরিয়ে দিয়েছিল সেই পাত্রটি। পাত্রে ছিল  সুগন্ধী চাল। ঝুলেলাল বাড়ি ফেরার পর, পাত্রে থাকা দামি সুগন্ধি চাল দেখে অবাক হয়েছিলেন সৎ-মা।

ঝুলেলালকে পরদিন আবার পাঠিয়েছিলেন হাটে। সেদিন সন্ধ্যায় আরও সুগন্ধি চাল নিয়ে ফিরেছিল ঝুলেলাল। এরপর সৎ-মা, স্বামী রতনচাঁদকে পাঠিয়েছিলেন ঝুলেলালকে অনুসরণ করার জন্য। দূর থেকে রতনচাঁদ প্রত্যক্ষ করেছিলেন সেই অবিশ্বাস্য দৃশ্যটি। পুত্র ঝুলে লালকে দূর থেকে প্রণাম করেছিলেন পিতা হয়েও। ঝুলেলালের অলৌকিক ক্ষমতার কথা ছড়িয়ে পড়েছিল সিন্ধুদেশের গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে।

ফরমান ফিরিয়ে নিয়েছিলেন মিরখশাহ

মিরখশাহের মন্ত্রী আহিরিও ইতিমধ্যে জলদেবতার অবতার ‘দরিয়া সাহিব’ ঝুলেলালের ভক্ত হয়ে গিয়েছিলেন। ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন মিরখশাহের পরামর্শদাতারা। তাঁরা মিরখশাহকে বলেছিলেন, “হিন্দুদের মাথায় তুললে জন্নত পাবেন না শাহ। আর সময় নষ্ট করবেন না। বালকটিকে এখনই হত্যা করার আদেশ জারি করুন। আরও সময় দিলে, আপনিই কাফের হয়ে যাবেন।” বাধ্য হয়ে মিরখশাহ সেনা নিয়ে গিয়েছিলেন সিন্ধু নদের তীরে উপাসনারত ঝুলেলালকে হত্যা করার জন্য।

ঘোড়ার পিঠে থাকা সশস্ত্র মিরখশাহকে দেখে হেসেছিলেন বারো বছরের ঝুলেলাল। মৃদুকন্ঠে বলেছিলেন, “শাহ, আপনার চারদিকে যা দেখছেন, সবই একই প্রভুর সৃষ্টি। যাকে আপনি  সর্বশক্তিমান ‘আল্লাহ’ বলেন, তিনিই আমাদের ‘ঈশ্বর’। আমরা সবার তাঁরই সন্তান। তাই আপনি আমার পরম আত্মীয়।” মিরখশাহের পাশেই ছিলেন পরামর্শদাতারা। তাঁরা বলেছিলেন, ঝুলেলাল কাফের। এক্ষুণি একে হত্যা হত্যা করুন শাহ। চাপের মুখে ভেঙে পড়ে, উদেরোলাল বা ঝুলেলালকে হত্যা করার আদেশ দিয়েছিলেন মিরখশাহ।

অস্ত্র উঁচিয়ে সেনারা এগোতে শুরু করেছিল ঝুলেলালের দিকে। অকস্মাৎ ফুঁসে উঠেছিল, শান্ত হয়ে থাকা সিন্ধু নদ। প্রবল জলস্রোত ধেয়ে আসতে শুরু করেছিল সেনাদের দিকে। তলিয়ে যেতে শুরু করেছিল মিরখশাহের সেনারা। মিরখশাহকেও ঘিরে ধরতে শুরু করেছিল অশান্ত সিন্ধুর উন্মত্ত ঢেউ। দূর থেকে ভেসে এসেছিল অগনিত মানুষের চিৎকার। প্রবল এক বজ্রপাতে মিরখশাহের প্রাসাদ জ্বলতে শুরু করেছিল দাউদাউ করে।

ফুঁসে উঠেছিল সিন্ধু নদ

মিরখশাহ শুনেছিলেন ঝুলেলালের কণ্ঠ, “শাহ আর একবার ভেবে দেখো। আমাদের মালিক কিন্তু আলাদা নয়। যদি আল্লাহ চাইতেন, তিনি হিন্দুদের মুসলিম করেই পাঠাতে পারতেন। কারণ তিনিই সারা পৃথিবীর মালিক।” মিরখশাহের চোখে এসেছিল জল। তিনি বালক ঝুলেলালকে বলেছিলেন, “আমি বুঝতে পেরেছি আমার অপরাধ। আপনি শান্ত করুন সিন্ধুকে, রক্ষা করুন আমার সাথীদের।” বাক্যটি শেষ হওয়া মাত্র শান্ত হয়ে গিয়েছিল সিন্ধু নদ। মেঘভাঙা বৃষ্টি এসে নিভিয়ে দিয়েছিল প্রাসাদের আগুন।

অনুতপ্ত মিরখশাহকে ঝুলেলাল বলেছিলেন, ” হে শাহ, আপনি সবাইকে তাঁদের ইচ্ছামতো আরাধনা করার সুযোগ দিন। মহান আল্লাহ আপনার ওপর খুশি হবেন। আসুন আমরা সিন্ধের সকল হিন্দু ও মুসলিম আবার আগের মতো আত্মার আত্মীয় হয়ে যাই।” সেদিনের পর থেকে বদলে গিয়েছিলেন মিরখশাহ। ফিরিয়ে নিয়েছিলেন তাঁর শাহি ফরমান। নিজের ইসলাম ভক্তি অটুট রেখে, ভক্ত হয়ে গিয়েছিলেন ঝুলেলালের।

শিল্পীর কল্পনায় বালক ঝুলেলাল

এসেছিল দরিয়াপন্থী ধারা

এরপর দরিয়াসাহিব ঝুলেলাল হিন্দু ধর্মের এক বিশেষ ধারার প্রবর্তন করেছিলেন।  ‘দরিয়াপন্থী’ ধারা নামে যা আজও পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশে বিখ্যাত। খুড়তুতো দাদা পাগড় ছিলেন বালক ঝুলেলালের প্রথম শিষ্য।  ভক্ত পাগড়কে উদেরোলাল ঝুলেলাল দিয়েছিলেন সাতটি সাংকেতিক বস্তু। সেগুলি হলো পবিত্র আংটি,মাটির প্রদীপ, খান্তা বা চাদর, একটি ধাতব পাত্র, তেগ বা তরবারি, ডমরু ও কলস। আজও দরিয়াপন্থীদের কাছে যেগুলি পরম পবিত্র বস্তু।

ছায়াসঙ্গী পাগড়কে নিয়ে ঝুলেলাল এরপর গিয়েছিলেন মিরখশাহের সঙ্গে শেষ দেখা করতে। কিছুদিন মিরখশাহের আতিথেয়তায় কাটানোর পর ঝুলেলাল গিয়েছিলেন কালাচির (বর্তমানে করাচি) মানোহারো দ্বীপে। সেখানে ঝুলেলালের ভক্তেরা তৈরি করেছিলেন বরুণ দেবতার মন্দির। সেই মন্দির প্রাঙ্গনে তৈরি হয়েছিল দরিয়াসাহিব ঝুলেলালের মন্দিরও।

এরপর ঝুলেলাল ফিরে এসেছিলেন নাসেরপুরে। তাঁর বয়স তখন তেরো। নাসেরপুরের কাছে হালা নামক  স্থানে নির্মিত হয়েছিল উদেরোলাল-জো-মন্দির। মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব উদেরোলাল ঝুলেলাল দিয়েছিলেন মামুন নামে এক মুসলমান বৃদ্ধকে। আজও আছে সেই মন্দির। আজও মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণ করেন মুসলমানেরা। যাঁদের কাছে ঝুলেলাল হলেন জিন্দা-পীর ‘শেখ তাহির’। কেউ বলেন ‘খাজা খিজির’।

নাসেরপুরের উদেরোলাল -জো-মন্দির

ডাক এসেছিল ফিরে যাওয়ার

যে কর্তব্যপালনের জন্য পৃথিবীতে এসেছিলেন ঝুলেলাল, তা আগেই সমাপ্ত হয়ে গিয়েছিল। তাই হয়তো এসেছিল ফিরে যাওয়ার ডাক। ভক্ত পাগড়কে বালক ঝুলেলাল বলেছিলেন, তাঁর দিন শেষ হয়ে আসছে।  তাই শেষের ক’দিন তিনি কাটাতে চান ‘ঝিঝান’ গ্রামে।  হিন্দু ও মুসলমান ভক্তদের থেকে বিদায় নিয়ে দরিয়াসাহিব উদেরোলাল ঝুলেলাল চলে গিয়েছিলেন ‘ঝিঝান’ গ্রামে। এক বাবলা গাছের নীচে বেঁধেছিলেন কুঁড়ে ঘর। সেই কুঁড়েঘরেই কাটিয়েছিলেন  ক্ষুদ্র জীবনের শেষ দিনগুলি। সারাদিন ঝুলেলাল নিমগ্ন থাকতেন বরুণ দেবের আরাধনায়। উপবাস করা বালক ঝুলেলালের চোখের জলে ভিজে যেত রুক্ষ মাটি। কয়েকমাস পর,  তপস্যারত অবস্থাতেই পৃথিবী ছেড়েছিলেন তেরো বছরের উদেরোলাল ঝুলেলাল।

দরিয়াসাহিব উদেরোলাল ঝুলেলালের মহাপ্রয়াণের খবর পেয়ে ঝিঝান গ্রামে ছুটে এসেছিলেন সিন্ধের লক্ষ লক্ষ মানুষ। এসেছিলেন মিরখশাহের প্রতিনিধিরাও। হিন্দু ভক্তেরা বলেছিলেন আমরা এখানে ঝুলেলালের মন্দির করবো, মুসলমান ভক্তেরা বলেছিলেন আমরা তৈরি করব দরগা। বিতর্ক যখন সংঘাতের আকার ধারণ করেছিল, ঠিক সেই সময় হয়েছিল দৈববাণী। মেঘের  অন্তরাল থেকে ভেসে এসেছিল দরিয়াসাহিবের কণ্ঠ,”  তোমরা এমন একটি স্মৃতিসৌধ তৈরি করো। যেখানে হিন্দু ও মুসলমান, যে যার প্রভুর আরাধনা করতে পারবে।”

পাল্টে গিয়েছিল ঝিঝান গ্রামের নাম। গ্রামটির নতুন নাম হয়েছিল ‘উদেরোলাল’। বিভেদ ভুলে হিন্দু মুসলমান ভক্তেরা একত্রিত হয়ে বানিয়েছিলেন সিন্ধের দরিয়াসাহিবের স্মৃতিসৌধ। যা আজ বিখ্যাত ‘দরগা উদেরোলাল’ নামে। দরগার ভেতরে সোনার সিংহাসনে স্থাপন করা হয়েছিল, বালক উদেরোলাল ঝুলেলালের সেই বৃদ্ধ রূপের বিগ্রহ।

দরগায় বিরাজমান বরুণদেবতার অবতার ঝুলেলালের সেই বৃদ্ধ রূপ

আজও পাকিস্তানে আছে সেই দরগা। যে বিস্ময়কর দরগায়  উদেরোলাল ঝুলেলালের পুজো করেন সিন্ধের হিন্দুরা, পাশে বসেই নামাজ আদায় করেন মুসলমানেরা। প্রতি সন্ধ্যায় জ্বলে ওঠে হাজার হাজার বাতি। যাকে সিন্ধের হিন্দুরা বলেন ‘দিয়া’, মুসলমানরা বলেন ‘শাম্মা’। নাম আলাদা হলেও, একই ভক্তির আলোকে আলোকিত হন দরিয়াসাহিব উদেরোলাল ঝুলেলাল, কিংবা  জিন্দা-পীর শেখ তাহির।

পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা ‘সুখপাঠ’

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.