ন্যূনতম স্বীকৃতি পাননি সুলেখিকা নটী বিনোদিনী, চার দশক সাহিত্য সাধনা করেও

লেখা প্রকাশিত হয়েছিল শরৎচন্দ্রের পত্রিকাতেও।

3

Nati Binodini

রূপাঞ্জন গোস্বামী

উত্তর কলকাতার নিষিদ্ধপল্লীর পরিবেশে, ১৮৬২ সালে জন্ম নিয়েছিলেন, ঊনবিংশ শতকের বাংলা রঙ্গমঞ্চের কিংবদন্তি অভিনেত্রী নটী বিনোদিনী। তখন বাল্যবিবাহের যুগ। শৈশবেই তাঁর বিয়ে হয়েছিল পাড়ারই এক বালকের সঙ্গে। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে স্বামীর ঘর করার সৌভাগ্য হয়নি তাঁর। চরম দারিদ্রে কেটেছিল শৈশব। গঙ্গা বাঈজির হাত ধরে বারো বছরের বিনোদিনী যোগ দিয়েছিলেন ন্যাশনাল থিয়েটারে। মাসে দশ টাকা বেতন। মঞ্চে প্রথম অভিনয়ের সুযোগ পেয়েছিলেন ১৮৭৪ সালে। ‘বেণীসংহার’ নাটকে দ্রৌপদীর সখীর ভূমিকায়। এরপর আর পিছনে তাকাতে হয়নি।

নটী বিনোদিনী

নিজেকে উজাড় করে বিনোদিনীকে সেই যুগের শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী করে তুলেছিলেন, বাংলা থিয়েটারের প্রাণপুরুষ নাট্যাচার্য গিরিশ চন্দ্র ঘোষ। মাত্র বারো বছরের অভিনয় জীবন ছিল নটী বিনোদিনীর। ন্যাশনাল, বেঙ্গল ও স্টার থিয়েটারে মঞ্চস্থ প্রায় পঞ্চাশটি নাটকে, ষাটটির বেশি ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন কৃষ্ণবর্ণা, এক মাথা কোঁকড়ানো চুল ও নিটোল দেহের বিনোদিনী। বাংলার পাশাপাশি, সংস্কৃত, উর্দু, ফার্সি কখনও চোস্ত ইংরেজিতে সংলাপ বলে দর্শকদের চমকে দিতেন তথাকথিত অশিক্ষিত বিনোদিনী। তিনি মঞ্চে থাকা মানেই ‘শো’ হাউসফুল। ‘মেঘনাদ বধ’ নাটকে একাই চিত্রাঙ্গদা, প্রমীলা, বারুণী, রতি, মায়া, মহামায়া ও সীতার ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। যা দেখে বিস্মিত হয়ে গিয়েছিলেন সে যুগের তাবড় তাবড় অভিনেতারাও।

আকস্মিকভাবেই ছেড়ে দিয়েছিলেন অভিনয়

বিনোদিনী তখন খ্যাতির শীর্ষে। শিক্ষাগুরু গিরিশ ঘোষের প্রতি অভিমান ও স্টার থিয়েটার কতৃপক্ষের প্রতারণায় অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ হারিয়েছিলেন বিনোদিনী। মানসিক দিক থেকে হয়ে পড়ছিলেন অবসাদগ্রস্থ । ১৮৮৬ সালের ২৫ ডিসেম্বর, ‘বেল্লিক বাজার’ নাটকে রঙ্গিনীর ভূমিকায় অভিনয় করার পর, নাট্যজগতকে হতচকিত করে দিয়ে অভিনয় জগত থেকে বিদায় নিয়েছিলেন সে যুগের বাংলা রঙ্গমঞ্চে খ্যাতির শীর্ষে থাকা অভিনেত্রী। মাত্র চব্বিশ বছর বয়সে। এর আগে ঘটেছিল একটি ঘটনা। যা তিনি লিখে গিয়েছিলেন নিজের আত্মকথায়।

“পতিতপাবন পরমহংসদেব রামকৃষ্ণ মহাশয়ের দয়া পাইয়াছিলাম। কেন না সেই পরম পূজনীয় দেবতা, চৈতন্যলীলা অভিনয় দর্শন করিয়া আমায় তাঁর পাদপদ্মে আশ্রয় দিয়াছিলেন! অভিনয় কার্য্য শেষ হইলে আমি শ্রী চরণ দর্শন জন্য যখন আপিস ঘরে তাঁহার চরণ সমীপে উপস্থিত হইতাম, তিনি প্রসন্ন বদনে উঠিয়া নাচিতে নাচিতে বলিতেন,”হরি গুরু, গুরু হরি”, বল মা “হরি গুরু, গুরু হরি”, তাহার পর উভয় হস্ত আমার মাথার উপর দিয়া আমার পাপ দেহকে পবিত্র করিয়া বলিতেন যে,”মা তোমার চৈতন্য হউক।”(এই নিবন্ধে উল্লেখিত নটী বিনোদিনীর কাব্য ও প্রবন্ধ থেকে নেওয়া অংশগুলির বানান অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে)

যে বছর বিনোদিনী অভিনয় ছেড়ে দিয়েছিলেন, সেই ১৮৮৬ সালেই প্রয়াত হয়েছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ। বিনোদিনীর থিয়েটার ছাড়ার এটিও অন্যতম কারণ বলে মনে করেছিলেন অনেকে। কারণ শ্রীরামকৃষ্ণের আগমন তাঁর জীবনে এনেছিল আধ্মাত্মিক চেতনা। নিজের জন্মগত হীনমন্যতা কাটিয়ে উঠেছিলেন। তাই বুঝি পরের নির্দেশে নয়, নিজের ইচ্ছামত বাঁচার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বিনোদিনী।

সাহিত্যের প্রতি অনুরাগের জন্ম দিয়েছিলেন গিরিশ ঘোষই

গিরিশ ঘোষের সংগ্রহে ছিল সারা বিশ্বের সাহিত্য সম্ভার। নিজের চেষ্টায় ইংরেজি শেখা বিনোদিনী গিরিশ বাবুর কাছ থেকে বই নিয়ে এসে বাড়িতে পড়তেন। অন্যান্য বিদগ্ধ মানুষদের সঙ্গে গিরিশ বাবুর সাহিত্য আলোচনায় উপস্থিত থাকতেন। এভাবেই বাংলা, ইংরেজি, গ্রিক, ফরাসি ও জার্মান সাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল বিনোদিনীর।

একটি অভিনয় দৃশ্যে গিরিশ ঘোষ ও নটী বিনোদিনী

বইগুলি কেবলমাত্র পড়েই ক্ষান্ত হতেন না বিনোদিনী। চরিত্রগুলির মধ্যে থাকা ভাব সংগ্রহ করতেন। সুযোগমত সেগুলি ব্যবহার করতেন নাটকে। একবার বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর লেখা মৃণালিনী উপন্যাসের নাট্যরূপ দেখতে এসেছিলেন। মৃণালিনী নাটকে মনোরমার ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন বিনোদিনী। বঙ্কিমচন্দ্র বলেছিলেন, আমি মনোরমার চরিত্র লিখেছিলাম। কিন্তু কখনও তাকে স্বচক্ষে দেখব এটা ভাবিনি। আজ মনোরমাকে দেখে মনে হল, আমি আমার মনোরমাকেই দেখছি। যেকোনও চরিত্রকে এতটাই নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলতেন নটী বিনোদিনী।

থিয়েটার ছেড়ে ডুবে গিয়েছিলেন সাহিত্য সাধনায়

সাহিত্যের প্রতি প্রবল অনুরাগ থেকেই একদিন নটী বিনোদিনী হাতে তুলে নিয়েছিলেন কাগজ ও কলম। ১৮৮৫ সালে হরিদাস গড়গড়ি সম্পাদিত ভারতবাসী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর প্রথম লেখা ‘রঙ্গালয় বিষয়ক পত্রাবলী’। অত্যন্ত সাবলীলভাবে বিনোদিনী বাংলা রঙ্গমঞ্চের আলো-আঁধারি জগতকে নিজের মত ব্যাখ্যা করেছিলেন। লেখাটি অবাক করেছিল সে যুগের সুশীল সমাজকে। অনেকে ভেবেছিলেন লেখাটি গিরিশ ঘোষের, যা বিনোদিনী দাসীর নামে ছাপা হয়েছিল।

এরপর টানা দশ বছর লোকচক্ষুর অন্তরালে সাহিত্য সাধনা করে গিয়েছিলেন বিনোদিনী। কারণ থিয়েটার ছাড়ার পর তাঁর হাতে ছিল অফুরন্ত সময়। নিভৃতে শুরু করেছিলেন কবিতা লেখা। ১৮৯৫ সালে, গিরিশ ঘোষ সম্পাদিত সৌরভ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল বিনোদিনীর লেখা ‘হৃদয়রত্ন’ ও ‘অবসাদ’ নামে দুটি কবিতা ও কুড়ি পাতার কাহিনিকাব্য ‘আভা’। এবারও বিস্মিত হয়েছিলেন কলকাতার উচ্চকোটির সাহিত্য অনুরাগীরা। কারণ গিরিশ ঘোষের মত একজন পণ্ডিত মানুষের পত্রিকায়, বিনোদিনীর মত একজন বারাঙ্গনা ও নটীর কবিতা স্থান পেতে পারে, এটা ছিল তাঁদের কল্পনার বাইরে। কিন্তু প্রথম কবিতাতেই সাহিত্যরস পিপাসু পাঠককে বিনোদিনী জানিয়েছিলেন তাঁর কাব্য প্রতিভা। ‘হৃদয়রত্ন’ কবিতাটির কয়েকটি লাইন যার সাক্ষ্য দেবে।

এস হে হৃদয়ে এস হৃদয়রতন।
অনন্তশূন্যেতে সদা করি অন্বেষণ॥
বাসনা বিবশ আজি খুঁজিয়া তোমায়।
তাইতে কাতর প্রাণ স্মরণ যে চায়॥
জ্ঞানময় চিদানন্দ চৈতন্যস্বরূপ।
বিরাজিত আছে যাঁর প্রতি লোমকূপ॥

প্রকাশিত হয়েছিল প্রথম বই

১৮৯৭ সালে প্রকাশিত হয়েছিল বিনোদিনীর লেখা একচল্লিশটি কবিতার সংকলন ‘বাসনা’। বইটি তিনি উৎসর্গ করেছিলেন তাঁর জনম দুখিনী মা’কে। এই বইটিতে থাকা একটি কবিতা বুঝি তাঁর যন্ত্রণাক্লিষ্ট জীবনের নির্যাস। কবিতাটির প্রথম দু’টি ছত্রে বিনোদিনী লিখেছিলেন,

তৃষিত চাতকী প্রাণ কাতর রহিল
জীবন শুকাল তবু বারি না মিলিল;
নবীন নীরদ পানে, চাহিত তৃষিত প্রাণে
এই আশা ছিল মনে বুঝি বারি পাব,
জানি না জগতে আমি এরূপে শুকাব॥

শীতল বারির তরে কাতর হইয়া
শত বজ্র ধরিয়াছি হৃদয় পাতিয়া
খেলিত দামিনী-বালা, গগন করিয়ে আলা
এ হৃদয়ে দিত ঢেলে আঁধারের রাশি
আমারে দেখিয়া হাসিত ঘৃণার হাসি॥ (কবিতা-পিপাসা )

জীবনে নেমে এসেছিল সবথেকে বড় আঘাত

১৯০৫ সালে প্রকাশিত হয়েছিল নটী বিনোদিনীর পরের বই ‘কণক ও নলিনী’। এক বালক ও এক বালিকার মধুর সম্পর্ক ও শোচনীয় পরিণাম নিয়ে লেখা পঁয়তাল্লিশ পাতার কাব্যোপন্যাস। প্রকাশ্যে এসেছিল বিনোদিনীর কাব্য চেতনার গভীরতা। লেখাটির দুটি ছত্র তুলে ধরা হল পাঠকদের জন্য।

কনক নলিনী দুটি, তাপসের ঘরে ফুটি,
বেড়াইত আলো ক’রে এই তপোবন।
তাপস তনয়া তারা  সরলা সুধার ধারা,
 মূর্ত্তিমতী বনদেবী মূরতি মোহন।

নাহি জানে মাতৃ স্নেহ, পিতা বই নাই কেহ,
জানে শুধু পিতা আর তারা দু’টি ব’ন।
সঙ্গিনী হরিণীগণ, নদী আর এ কানন,
ইহা ভিন্ন আছে কিছু ভাবেনি কখন॥ 

‘কণক ও নলিনী’ বইটির প্রথম পাতায় লেখা ছিল,“আমার স্বর্গগতা ত্রয়োদশ বর্ষিয়া বালিকা কন্যা শ্রীমতি শকুন্তলা দাসীর উদ্দেশ্যে এই ক্ষুদ্র পুস্তক অর্পিত হইল।”  বইটি প্রকাশের দু’বছর আগে বিনোদিনী জীবনে নেমে এসেছিল সবথেকে বড় আঘাত। ১৯০৩ সালে, মাত্র তেরো বছর বয়েসে মারা গিয়েছিল মেয়ে শকুন্তলা। সে ছিল বিনোদিনীর শেষ আশ্রয়। বিনোদিনীর আত্মকথায় তার সম্পর্কে লেখা কয়েকটি লাইন পড়লে হয়ত পাঠকেরও মন ভরে উঠবে এক অব্যক্ত বেদনায়।

” এই দুঃখময় জীবনে একটী সুখের অবলম্বন পাইয়াছিলাম। একটি নির্ম্মল স্বর্গচ্যুত কুসুমকলিকা শাপ ভ্রষ্টা হইয়া এ কলঙ্কিত জীবনকে শান্তিদান করিতেছিল, কিন্তু এই দুঃখিনীর কর্ম্মফলে তাহা সহিল না…এই নৈরাশ্যময় জীবনকে জ্বালার জ্বলন্ত পাবকে ফেলিয়া স্বর্গের জিনিস স্বর্গে চলিয়া গিয়াছে…অসীম যন্ত্রণার ভার বহিয়া আমি মৃত্যু পথপানে চাহিয়া বসিয়া আছি।”

‘কণক ও নলিনী’ বইটি লেখার পর, লেখিকা নটী বিনোদিনী হারিয়ে গিয়েছিলেন কিছুদিনের জন্য। আবার লেখার জগতে ফিরে এসেছিলেন ১৯১০ সালে। শুরু করেছিলেন নিজের মতো করে নিজের কথা বলা। অমরেন্দ্রনাথ দত্তের নাট্যমন্দির পত্রিকায় লিখতে শুরু করেছিলেন ‘অভিনেত্রীর আত্মকথা’। তাঁর মতো একজন কিংবদন্তি অভিনেত্রীর জীবনের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা দুঃসহ যন্ত্রণা, প্রতারণা ও ঘাত প্রতিঘাত, একে একে উঠে আসতে শুরু করেছিল তাঁর লেখায়। কিন্তু ভাদ্র, আশ্বিন ও কার্তিক সংখ্যার পর লেখাটি ছাপা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। হয়ত অশনি সংকেত দেখেছিলেন কেউ কেউ।

লিখেছিলেন এক অসামান্য আত্মজীবনী

‘অভিনেত্রীর আত্মকথা’ পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন গিরিশ ঘোষ। তিনি বিনোদিনীকে তাঁর অসমাপ্ত আত্মকথা একটি আত্মজীবনীর মাধ্যমে সমাপ্ত করতে বলেছিলেন। বলেছিলেন বিনোদিনীর আত্মজীবনীর ভূমিকা তিনিই লিখে দেবেন। সত্যি সত্যিই বিনোদিনী লিখে ফেলেছিলেন তাঁর আত্মজীবনী। বিনোদিনীর লেখা শেষ হলেও, ভূমিকা লেখা নিয়ে দোটানায় ছিলেন গিরিশ ঘোষ। বিনোদিনী বার বার তাগাদা দেওয়ায় গিরিশ ঘোষ বলেছিলেন, তোমার ভূমিকা লিখে না দিয়ে আমি মরব না।

নটী বিনোদিনীর একশো চব্বিশ পৃষ্ঠার আত্মজীবনী ‘আমার কথা’ (প্রথম খণ্ড) প্রকাশিত হয়েছিল ১৯১২ সালে। গিরিশ ঘোষ বিনোদিনীর আত্মজীবনীর জন্য লিখে দিয়েছিলেন ভাল ও মন্দ মেশানো একটি ভূমিকা। বিনোদিনীর পছন্দ না হওয়ায় ভূমিকাটি প্রথম সংস্করণে ছাপা হয়নি। যদিও পরের বছরেই নব সংস্করণে ভূমিকাটি ছাপা হয়েছিল। কিন্তু ততদিনে প্রয়াত হয়েছিলেন গিরিশ ঘোষ।

আত্মজীবনীর ভূমিকাতে বিনোদিনী লিখেছিলেন, “আমার এই মর্ম-বেদনা গাথার আবার ভূমিকা কি?… ইহা কেবল অভাগিনীর হৃদয় জ্বালার ছায়া! পৃথিবীতে আমার কিছুই নাই, সুধুই অনন্ত নিরাশা, সুধুই দুঃখময় প্রাণের কাতরতা! কিন্তু তাহা শুনিবার লোক নাই! মনের ব্যথা জানাইবার লোক জগতে নাই- কেননা, আমি জগৎ মাঝে কলঙ্কিনী,পতিতা।”

নটী বিনোদিনীর আত্মজীবনীটি হল পাঠককে লেখা একটি সুবিশাল চিঠি। গিরিশ ঘোষ যার মধ্যে খুঁজে পেয়েছিলেন রচনাচাতুর্য্য ও ভাবমাধুর্য্য। আত্মজীবনীতে বিনোদিনী বার বার পাঠককে সম্বোধন করেছেন ‘মহাশয়’ বলে। কেন আত্মজীবনী লিখেছিলেন তাও জানিয়েছিলেন। তিনি লিখেছিলেন,“আমি ঘৃণিতা, সমাজবর্জ্জিতা, বারবণিতা, আমার মনের কথা বলিবার বা শুনিবার কেহ নাই। তাই কালি-কলমে লিখিয়া আপনাকে জানাইলাম। আমার কলুষিত কলঙ্কিত হৃদয়ের ন্যায় এই নির্মল সাদা কাগজকেও কলঙ্কিত করিলাম। কি করিব! কলঙ্কিনীর কলঙ্ক ব্যাতীত আর কি আছে?”

সমাজ পরিত্যক্তা, তিনবার হাত বদল হওয়া এক রক্ষিতার মর্মব্যথা এভাবেই ফুটে উঠেছিল বিনোদিনীর আত্মজীবনীতে। ফুটে উঠেছিল তীব্র হতাশা ও ক্রোধ। অকপটে নিজেকে বার বার বারাঙ্গনা, বারবণিতা, পতিতা বলে তথাকথিত ভদ্রসমাজকে নগ্ন করে দিয়েছিলেন। কেন বারাঙ্গনাদের মন বলে কিছু থাকতে নেই, তার বর্ণনা দিয়েছিলেন এক অনবদ্য উপমার সাহায্যে।

“অবস্থার গতিকে নিরাশ্রয় হইয়া স্থানাভাবে আশ্রয়াভাবে বারাঙ্গনা হয় বটে। কিন্তু তাহারাও প্রথমে রমণী-হৃদয় লইয়া সংসারে আসে। যে রমণী স্নেহময়ী জননী, তাহারাও সেই রমনীর জাতি! যে রমণী জ্বলন্ত অনলে পতি সনে পুড়িয়া মরে, আমরাও সেই একই নারী জাতি। তবে গোড়া হইতে পাষাণে পড়িয়া আছাড় পিছাড় খাইতে খাইতে একেবারে চুম্বক ঘর্ষিত লৌহ যেরূপ চুম্বক হয়, আমরাও সেইরূপ পাষাণে ঘর্ষিত হইয়া পাষাণ হইয়া যাই।”

জীবন বিনোদিনীকে বার বার ঠেলে দিয়েছিল আলো থেকে অন্ধকারে। বুকে এক সাগর শোক নিয়ে মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলতে হয়েছিল। তাই বুঝি আত্মকথা শেষও করেছিলেন হৃদয় মুচড়ে দেওয়া এই’কটি বাক্য দিয়ে,

“এই আমার পরিচয়। এখন আমি আমার ভাগ্য লইয়া শ্মশানের যাতনাময় চিতাভস্মের উপর পড়িয়া আছি। এখন যেমন অযাত্রার জিনিস দেখিলে কেহ রাম, রাম, কেহ শিব শিব, কেহবা দুর্গা দুর্গা বলেন, আবার কেহ মুখ ঘুরাইয়া লইয়া হরি হরি বলিয়া পবিত্র হয়েন- যাঁহার যে দেবতা আশ্রয়, তিনি তাঁহাকে স্মরণ করিয়া এই মহাপাতকীর পাপ কথাকে বিস্মৃত হউন। ভাগ্যহীনা, পতিতা কাঙ্গালিনীর এই নিবেদন।”  আমার কথার প্রথম খণ্ডের পর বিনোদিনী দ্বিতীয় খণ্ড লেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনি। কারণ জীবন কখনওই তাঁর মসৃণ পথে চলেনি।

প্রকৃতির প্রাণসত্তা অনুভব করতেন বিনোদিনী

বিনোদিনীর চরিত্রের একটি দিক খুব কম মানুষই জানতেন। উত্তর কলকাতার এঁদো গলির বিনোদিনীর মন, মুক্তি খুঁজতো প্রকৃতি মায়ের কোলে। অভিনয় সূত্রে তিনি বেশ কয়েকমাস কাটিয়েছিলেন লখনউ, মেরঠ, দিল্লি, লাহোর ও উত্তর বঙ্গে। অভিনয়ের অবসরে তিনি হারিয়ে যেতেন প্রকৃতির বুকে। কান পেতে শুনতেন প্রকৃতির হৃদস্পন্দন। আত্মকথায় বিনোদিনী লিখছেন,

“আমি কোথায় বন-পুষ্প শোভিত নির্জ্জন স্থান তাহাই খুঁজিতাম। আমার মনে হইত যে আমি বুঝি এই বনের মধ্যে থাকিতাম, আমি ইহাদের চিরপালিত! প্রত্যেক লতাপাতার সৌন্দর্য্যের মাখামাখি দেখিয়ে আমার হৃদয় লুটাইয়া পড়িত। আমার প্রাণ যেন আনন্দে নাচিয়া উঠিত।… কখন কোন নদী তীরে যাইয়া আমার হৃদয় যেন তরঙ্গে তরঙ্গে ভরিয়া যাইত। আমার মনে হইত আমি বুঝি এই নদীর তরঙ্গে তরঙ্গেই চিরদিন খেলা করিয়া বেড়াইতাম। এখন আমার হৃদয় ছাড়িয়া এই তরঙ্গগুলি আপনা আপনি লুটোপুটি করিয়া বেড়াইতেছে।” 

 আরও পড়ুন: ১৫ আগস্ট ১৯৪৭, এই অবিস্মরণীয় ঘটনাগুলির সাক্ষী ছিল আনন্দে দিশেহারা কলকাতা

অসমাপ্ত থেকে গিয়েছিল শেষ লেখাটিও 

রূপ ও রঙ্গ পত্রিকায়, ১৯২৪ সালের মাঘ মাস থেকে, এগারোটি কিস্তিতে প্রকাশিত হয়েছিল বিনোদিনী দাসীর লেখা ‘আমার অভিনেত্রী জীবন’। পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও নির্মল চন্দ্র। তখন বিনোদিনীর বয়স বাষট্টি বছর। এই লেখাটিও অসমাপ্ত থেকে গিয়েছিল। আত্মজীবনীর কথাগুলিই অন্যভাবে ফিরে এসেছিল লেখাটিতে। তবে লেখা থেকে সরে গিয়েছিল বিষাদের মেঘ, এসেছিল হাস্যরস। নিজস্ব এক গদ্যরীতিই তৈরি করে ফেলেছিলেন বিনোদিনী। ভাষা হয়ে উঠেছিল আরও আধুনিক। ‘আমার অভিনেত্রী জীবন’ লেখাটির কয়েকটি লাইন তুলে ধরলেই, আগের লেখার সঙ্গে এই লেখার পার্থক্য চোখে পড়বে।

“জীবনের পথে ঘুরতে ঘুরতে ,- সংসারের অতিথি শালা থেকে যখন বিদায় নেবার সময় এসেছে, মরণের সিন্ধু-কুল থেকে আমার জীর্ণশীর্ণ দেহখানি টেনে এনে, আমার সেই কত দিনের পুরানো স্মৃতিকে ঘ’সে মেজে জাগিয়ে তোলার আবার চেষ্টা করছি কেন? এ কেন’র উত্তর নেই। উত্তর খুঁজে পাইনা। তবে একটা কথা আমার মনে হয়। মনে হয়, বালিকা ও কৈশোরে আমার শাদা মনের উপর প্রথমে লাল রঙের ছোপ পড়ে, বহু-বর্ণবিপর্য্যয়েও সে আদিম লালের আভা আজও আমার কুয়াসাচ্ছন্ন মন থেকে একেবারে মিলিয়ে যায়নি। কালের যবনিকা ভেদ ক’রে এখনও সে রঙ মনের মাঝে উঁকিঝুঁকি মারে…।”

লেখা থেকেও নিয়েছিলেন স্বেচ্ছা নির্বাসন

লেখার জগত থেকেও হারিয়ে গিয়েছিলেন বিনোদিনী। হয়ত জীবনের প্রতি চরম অভিমানে। শেষ জীবনে কেমন ছিলেন তা জানতে চায়নি কেউ। সকলের অগোচরেই, ১৯৪১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ৭৯ বছর বয়সে প্রয়াত হয়েছিলেন বাংলা রঙ্গমঞ্চের শ্রেষ্ঠতম অভিনেত্রী নটী বিনোদিনী। মৃত্যুর কয়েক দশক পর, তাঁর এক পুরোনো ভাড়াটে দিয়েছিলেন কিছু তথ্য। জানা গিয়েছিল, বিনোদিনী শেষ বয়সে ধর্মকে আঁকড়েই বাঁচতেন। নারায়ণ শিলা ও রাধাকৃষ্ণের নিত্য পূজা হত বাড়িতে। মাঝে মাঝে বেলুড় মঠে যেতেন। প্রচুর বই পড়তেন। অর্গান বাজিয়ে গান গাইতেন। পায়রা পুষতেন। বৃদ্ধাবস্থায় মাথায় ঝুঁটি বেঁধে বারান্দায় একাই বসে থাকতেন। কারও কথা বা কাজ পছন্দ নাহলে মুখ খারাপ করতেন।

অভিনয়ের সঙ্গে পাঁচ দশক সম্পর্ক না থাকলেও, নিয়মিত থিয়েটার দেখতে যেতেন নটী বিনোদিনী । প্রবাদপ্রতিম অভিনেতা অহীন্দ্র চৌধুরী স্টার থিয়েটারে অভিনয় করার সময় দেখেছিলেন বৃদ্ধা বিনোদিনীকে।

“বিনোদিনী তখন প্রায় থিয়েটার দেখতে আসতেন। যথেষ্ট বৃদ্ধা হয়েছেন। তবুও থিয়েটার দেখার আগ্রহটা যায়নি। নতুন বই হলে উনি তো আসতেনই। এক কর্ণার্জুন যে কতবার দেখেছেন তার ইয়ত্ত্বা নেই। মুখে হাতে তখন তাঁর শ্বেতী বেরিয়েছে। একটা চাদর গায়ে দিয়ে আসতেন। এসে উইংসের ধারে বসে পড়তেন। অমনি আমাদের মেয়েরা যে যেখানে থাকত এসে একটা মোড়া পেতে দিত। আর ‘দিদিমা’ বলে একেবারে ঘিরে ধরত। কথা বলতেন খুব কম। থিয়েটারের সবাই খুব সম্ভ্রম করতেন ওঁকে।”

ব্রাত্য থেকে গিয়েছিলেন সাহিত্যের আঙিনাতেও

নটী বিনোদিনী কেমন করে কিংবদন্তি অভিনেত্রীর পাশাপাশি সুলেখিকাও হয়ে উঠেছিলেন, সে সম্পর্কে লিখে গিয়েছিলেন গিরিশ ঘোষ।

“কেমন ক’রে বিনোদিনী এতখানি মার্জিত ও উন্নতমনের অধিকারিণী হলেন? সম্ভবত “নীচকূলোদ্ভবা” বলেই এ-প্রশ্ন কারো কারো মনে উদিত হতে পারে। নিজের জন্মগত হীনতা, কঠিন দারিদ্র ও জীবনের নিষ্করুণ অভিজ্ঞতাই বোধ হয় তাঁর মনে উচ্চাকাঙ্খা, মহত্ব ও সংবেদনশীল কবি চিত্তের জন্ম দিয়েছিল।”

তা সত্ত্বেও মূল্যায়ন হয়নি সংবেদনশীল লেখিকা বিনোদিনীর। অনেক গবেষক মনে করেন, মানের দিক থেকে তাঁর কবিতা সমকালীন মহিলা কবিদের থেকে কোনও অংশে কম ছিল না। তা সত্ত্বেও বাংলা সাহিত্যের মহিলা কবিদের গোত্রে কখনই তিনি স্থান করে নিতে পারেননি। নিজেকে বার বার ‘হীন বারাঙ্গনা’ বলাটাই কি তাঁর কাল হয়েছিল! পতিতার ছোঁয়া সাহিত্যে লেগে যাওয়ার ভয়েই কি ভদ্রলোকের সাহিত্য থেকে তাঁকে ব্রাত্য করে রাখা হয়েছিল! নিষিদ্ধ পল্লীতে জন্ম নেওয়াতেই কি মেলেনি স্বীকৃতি! চার দশক সাহিত্য সাধনা করেও!

তথ্যসূত্র: আমার কথা ও অন্যান্য রচনা (সম্পাদক নির্মাল্য আচার্য্য, ১৯৬৯)

পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা ‘সুখপাঠ’

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.