কলকাতার মেয়ে সুপারকপ মল্লিকা, দিল্লিতে ২০ জন কিশোরীকে পাচারকারীদের ডেরা থেকে বাঁচিয়েছিলেন

0

চৈতালী চক্রবর্তী

২০১৪ সালের সেই ঘটনা মনে আছে? দিল্লিতে তখন নারী ও শিশু পাচারকারীদের ঘাঁটি তৈরি হয়ে গেছে। শিশু পাচার চক্রের মাথাদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক যোগাযোগের কথাও শোনা যাচ্ছে। দিল্লি ও তার আশপাশের এলাকা থেকে একের পর

এক কিশোরী মেয়েরা নিখোঁজ হচ্ছে। খবর সামনে আসছে অথচ কোনও লিখিত অভিযোগ দায়ের হচ্ছে না। পাচারচক্রের সেই পাণ্ডাদের পরে পাকড়াও করে দিল্লি, ছত্তীসগড়, কলকাতা পুলিশের স্পেশাল ফোর্স। এই অভিযানে সঙ্গ দিয়েছিল দিল্লির স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘শক্তি বাহিনী’ যারা নারী ও শিশু পাচারের বিরুদ্ধে অভিযান চালায়।

মনে থাকবে হয়ত ওই বছরই রানি মুখোপাধ্যায় অভিনীত ‘মর্দানি’ সিনেমা মুক্তি পেয়েছিল। তাতে দেখানো হয়েছিল কীভাবে রানি ওরফে শিবানী শিবাজি রাও পাচারকারীদের গোপন ডেরা থেকে বাচ্চা মেয়েদের উদ্ধার করে আনে। সিনেমার চিত্রনাট্য বাস্তবের সেই ঘটনা থেকেই নেওয়া হয়েছিল সন্দেহ নেই। শিবানির চরিত্র এই সুপারকপের অনুকরণেই তৈরি হয়েছিল কিনা জানা নেই, তবে সাব-ইনস্পেকটর মল্লিকা বন্দ্যোপাধ্যায় যেভাবে বাচ্চা মেয়েদের উদ্ধার করেছিলেন এবং পাচারচক্রের মাথাদের ধরেছিলেন, তা সিনেমার থেকে অনেক বেশি রোমাঞ্চকর।

মল্লিকা যে কোনও এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট ছিলেন বা আন্ডারকভার এজেন্ট ছিলেন তেমন নয়। তবে বিভিন্ন ঘটনার সূত্র ধরে তিনি নিজেই শিশু পাচারচক্রের পর্দা ফাঁস করতে উঠেপড়ে লেগেছিলেন। যেভাবেই হোক পাচারচক্রের পাণ্ডাদের ধরতেই হবে, এই ছিল তাঁর লক্ষ্য। কাজটা সহজ ছিল না। কারণ সমাজের অনেক হোমড়া চোমড়াদের নামও জড়িয়েছিল এর সঙ্গে। কেঁচো খুড়তে যদি কেউটে বেরিয়ে পড়ে, ভয়ে অনেক পুলিশ কর্তাই এই মামলার শিকড় অবধি যাওয়ার তেমন উৎসাহ দেখাননি। ফলে তদন্তও ঢিমে গতিতেই চলছিল। তাছাড়া যে পরিবার থেকে কিশোরী মেয়েরা নিখোঁজ হয়েছিল, হুমকির ভয়ে তারাও পুলিশের কাছে এফআইআর করতে সাহস পায়নি। সেই সময়েই এগিয়ে আসেন মল্লিকা বন্দ্যোপাধ্যায়।

আরও পড়ুন: ১৪০০ নাবালিকা বিয়ে রুখেছেন, নারী পাচার, শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে লড়ছেন ‘ভারত কি বেটি’ ডাক্তার কৃতী

আসল ঘটনায় যাওয়ার আগে মল্লিকার পরিচয় জেনে নেওয়া যাক। বাঙালি ঘরের মেয়ে। মল্লিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম ছত্তীসগড়ে, তবে বাড়ি কলকাতায়। মল্লিকার জন্মের আগে তাঁর বাবা-মা কর্মসূত্রে ছত্তীসগড়ে চলে যান। পাঁচ বোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট মল্লিকা ছোট থেকেই মেধাবী। বায়োসায়েন্সে স্নাতক করার পর তাঁর বিয়ে ঠিক হয়ে যায়। কিন্তু সংসার করার বদলে মানুষের সেবা করার লক্ষ্যই স্থির করেন মল্লিকা। এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ডাক্তার নয়তো পুলিশ অফিসার হওয়ার ইচ্ছা ছিল তাঁর। ডাক্তারি পড়া হয়নি, তবে পরীক্ষা দিয়ে পুলিশের চাকরি হয়ে যায়। ট্রেনিং শেষ করে সাব-ইনস্পেকটর পদে যোগ দেন। বাবা-মা ও ঘনিষ্ঠ আত্মীয় মহলে তিনি মল্লিকা নন, ‘দারোগা’ বলেই ডাকেন সকলে।

আরও পড়ুন: সংযুক্তার ‘মর্দানি’, এই মহিলা আইপিএসের নামে থরথর করে কাঁপে জঙ্গিরা

ছত্তীসগড়ের প্রত্যন্ত জাসপুর এলাকায় পোস্টিং হয় মল্লিকার। সেই সময় ছত্তীসগড়ের গ্রামগুলি থেকে কিশোরী মেয়েদের নিখোঁজ হওয়ার খবর আসছিল। মল্লিকা বলেছেন, “আমি শুনে আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলাম যে বাচ্চা মেয়েরা একের পর এক নিখোঁজ হচ্ছে, অথচ ঘটনার কোনও তদন্ত হচ্ছে না। এমনকি নিখোঁজ মেয়েদের পরিবারও থানায় এসে অভিযোগ দায়ের করছে না। গ্রামে সকলের মুখেই কুলুপ। এই নিয়ে কেউ কোনও কথা বলতে রাজি নয়।”

ঘটনার তদন্ত শুরু করলেন মল্লিকা বন্দ্যোপাধ্যায়। অনেক বাধা এসেছিল। এমনকি উপর মহল থেকেও চাপ আসে। কিন্তু মল্লিকা তাঁর তদন্ত থেকে সরে আসেননি। ঘটনার সূত্র ধরে তিনি দেখেন ছত্তীসগড় শুধু নয়, এর শিকড় ছড়িয়ে রয়েছে দিল্লি ও তার আশপাশের এলাকাতেও। সেই সময় রাজধানীতেও একের পর এক কিশোরী মেয়েদের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ঘটছিল। মল্লিকা রিপোর্ট করেছিলেন, এর যোগ রয়েছে বড়সড় শিশু পাচারচক্রের সঙ্গে। পাচারকারীরা দেশের নানা শহর, গ্রাম থেকে বাচ্চা মেয়েদের অপহরণ করে হয় যৌনপল্লীতে বিক্রি করে দেয় না হলে তাদের বিদেশে পাচার করে দেয়। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক যোগাযোগও আছে।

মল্লিকার তদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট সামনে আসার পরে সংবাদমাধ্যমে হইচই শুরু হয়ে যায়। মামলা গড়ায় আদালত অবধি। পুলিশি নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ ওঠে। দ্রুত পাচারকারীদের গ্রেফতার করে রিপোর্ট পেশ করার নির্দেশ দেয় সুপ্রিম কোর্ট। জেগে ওঠে গোটা পুলিশ মহল।

ছত্তীশড়, দিল্লি পুলিশের স্পেশাল ফোর্স তৈরি হয়। এর সঙ্গে যোগ দেয় দিল্লির ‘শক্তি বাহিনী’। অভিযানের মুখ ছিলেন ছত্তীসগড়ের অ্যান্টি-হিউম্যান ট্রাফিকিং নোডাল অফিসার মল্লিকা বন্দ্যোপাধ্যায়। শুরু হয় মিশন-দিল্লি।

মল্লিকা বলেছেন, পাচারচক্রের দুজন মাথার নাম উঠে আসে নির্মলা ও গুড্ডু। তাদের নিজস্ব এজেন্সি ছিল। এর আড়ালেই শিশু পাচারচক্রের কাজ করত। দিল্লি-মিশন টিমের পাঁচজন অফিসারকে সঙ্গে নিয়ে মোতিনগর ও শকুরপুরে গুড্ডু ও নির্মলার এজেন্সিতে হানা দেন মল্লিকা। শুরুতে কিছু বোঝা যায়নি। বাচ্চা মেয়েদের ধরে কোথায় রাখা হয়েছে তার খোঁজও মেলেনি। সেবার ফিরে আসতে হয় মল্লিকা ও তাঁর টিমকে। তবে পাচারকারীদের ওপরে ২৪ ঘণ্টা নজর রেখেছিলেন তিনি।

পুলিশের রেড পড়ার পরেই চারজন নাবালিকা মেয়েকে অন্য জায়গায় পাচার করে দেওয়ার চেষ্টা করে তারা। তক্কে তক্কেই ছিলেন মল্লিকা। অম্বিকাপুর-সীতাপুর রেঞ্জে ট্রেন থেকে উদ্ধার হয় চার নাবালিকা। ধরা পড়ে পাচারচক্রের চারজন এজেন্ট। তাদের জেরা করে নির্মলার ডেরার খোঁজ পান মল্লিকা।

এর কিছুদিন পরে নির্মলা ধরা পড়ে। জেরায় সে জানায়, ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা দাম ওঠে এক একজন কিশোরীর। দেখতে সুন্দর হলে দাম ওঠে আরও বেশি। বিদেশে পাচার করা গেলে হাজারে নয়, তখন লাখে কেনাবেচা করে তারা। আবার প্রতি মাসে পাঁচ হাজার টাকা কিস্তিতেও মেয়েদের কিনে নিয়ে যায় দাললরা। যৌনপল্লীতে বিক্রি করে দেওয়া হয় তাদের।

মেয়ে পাচারের ভয়ঙ্কর তথ্য জমা করেন মল্লিকা। দাবানলের মতো খবর ছড়িয়ে পড়ে জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যগুলিতে। তখনও সব নাবালিকাদের উদ্ধার করা যায়নি। কারণ মেয়েদের কোথায় বন্দি করে রাখা হয়েছে তার খোঁজ একমাত্র ছিল গুড্ডুর কাছে। আর সেই ছিল অধরা। এদিকে দেরি হয়ে গেলে মেয়েদের বিদেশে পাচার করে দেওয়া হতে পারে। তাই অন্য চাল চালেন মল্লিকা।

তিনি জানতে এই পাচারকারীদের হ্যান্ডলার আছে, যারা শহরের পথে পথে ঘুরে বেড়ায়। কোন বাড়িতে কিশোরী মেয়ে আছে তার খোঁজখবর পৌঁছে দেয়। এমনই এক তরুণীকে শণাক্ত করেন মল্লিকা। মেয়েটি বাড়ি বাড়ি ঘুরে নানা রকম বডি-ম্যাসাজের প্রোডাক্ট বিক্রি করত। নিজের পরিচয় লুকিয়ে মেয়েটির সঙ্গে আলাপ জমান মল্লিকা। কথার মারপ্যাঁচে ফেলে জেনে নেন মেয়েটির সঙ্গেও পাচারকারীদের যোগাযোগ আছে। তাকে গ্রেফতার করে থানায় এনে জেরা করতেই ভেঙে পড়ে সে। অনেক গোপন খবর জানিয়ে দেয় পুলিশকে।

গুড্ডুর এজেন্সির ঠিকানা পেয়ে আচমকা একদিন সেখানে হানা দেন মল্লিকা। গুড্ডুকে ধরা যায়নি, তবে ১২ বছরের একটি মেয়েকে উদ্ধার করেন। মেয়েটিকে অন্ধকার ঘরে আটকে রাখা হয়েছিল। তার ওপর অত্যাচারও চলেছিল। মেয়েটিকে বের করে আনার পরেই ক্রমাগত নানা অজানা নম্বর থেকে হুমকি ফোন আসতে শুরু করে মল্লিকার কাছে। জানিয়েছেন, একদিন রাতে সরাসরি গুড্ডু তাঁকে ফোন করে হুমকি দেয়, “ম্যাডাম তদন্ত বন্ধ করে দিল্লি ছেড়ে চলে যান। আমি কেমন লোক কল্পনাও করতে পারবেন না। আপনার সঙ্গে এরপরে যা হবে তা আরও ভয়ঙ্কর।” এই ফোন পেযেই গুড্ডুকে পাল্টা ফোন করে দেখা করতে বলেন মল্লিকা। মেয়েদের খোঁজ বলে দিলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে এমন আশ্বাসও দেন। সেই টোপ গিলে পেলে পাচারকারীদের পাণ্ডা।

এরপরের ঘটনা আরও নাটকীয়। দারিয়াগঞ্জ পার্কিং এলাকার কাছে গুড্ডু আসতেই তাকে ঘিরে ফেলে পুলিশ। গুলির লড়াই চলে। তাকে পাকড়াও করে গোপন ডেরায় পৌঁছে ২০ জন কিশোরীকে উদ্ধার করে মল্লিকা ও তার টিম। ধরা পড়ে পাচারচক্রের সঙ্গে জড়িত আরও অনেকে। ২৫টি এজেন্সির খোঁজ পায় পুলিশ যারা নারী পাচারের সঙ্গে জড়িত ছিল।

মল্লিকা তাঁর অভিযান বন্ধ করেননি। নারী ও শিশু পাচার রুখতে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে চলেছে তাঁর টিম।

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.