দীর্ঘ ছ’দশক পর ফিরছে ‘অপু’, বাবা-ছেলের জার্নি বড়পর্দায়

0

বিশ্ববরেণ্য পরিচালক সত্যজিৎ রায় ষাট বছর আগে সৌমিত্র-শর্মিলা জুটিকে নিয়ে যে ইতিহাস গড়েছিলেন, তাঁদের সেই সম্পর্কের সমীকরণ বাঙালির স্মৃতিতে আজও অমলিন। ছ’দশক পর ‘অভিযাত্রিক’ সিনেমার মাধ্যমে আবারও বড় পর্দায় ফিরতে চলেছে বাঙালির সেই অতি প্রিয় নস্টালজিক চরিত্র অপু অপর্ণা। ১ ডিসেম্বর ছবির প্রিমিয়ার। তার ঠিক আগেই চরম ব্যস্ততা সামলে আড্ডায় মুখোমুখি ছবির পরিচালক শুভ্রজিৎ মিত্র। চৈতালি দত্তর সঙ্গে তাঁর আলাপচারিতায় উঠে এল ছবি সম্পর্কে নানা অজানা কথা।

বাঙালির নস্টালজিয়া অপু, সেই চরিত্রটিকে পর্দায় ফিরিয়ে আনতে পরিচালক হিসেবে আপনি নিজে কী ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন?
শুভ্রজিৎ- পর্দায় আবার ‘অপু’ চরিত্রকে ফিরিয়ে আনার জন্য পড়াশোনা থেকে শুরু করে গবেষণা, চিত্রনাট্য, সংলাপ লেখা ইত্যাদি সব মিলিয়ে আমার দশ বছর সময় লেগেছে। সেই সঙ্গে ভালো একটা ছবি তৈরি করতে সকলকে এক ছাদের নীচে একত্রিত করতেই তো তিন বছর সময় চলে গেছে। যেমন ধরুন, এই ছবির হাত ধরেই বলিউডের বিখ্যাত প্রযোজক-পরিচালক মধুর ভান্ডারকরকে এই প্রথম বাংলা ছবিতে নিবেদকের ভূমিকায় পেতে চলেছি আমরা। এছাড়াও ‘হারমোনিয়াম’, ‘সফেদ হাতি’ ইত্যাদি বহুচর্চিত জনপ্রিয় ছবি যাঁরা প্রযোজনা করেছিলেন সেই গৌরাঙ্গ ফিলমস আবার এত বছর পর বাংলা ছবিতে পা রাখলেন। এই ছবির প্রযোজক হলেন গৌরাঙ্গ জালান, ডক্টর সুমিত আগরওয়াল। সেইসঙ্গে এই ছবিতে সেতার বাজিয়েছেন স্বয়ং অনুষ্কা শংকর। স্বনামধন্য এতজনকে এক জায়গায় নিয়ে আসা তো সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। একের পর এক স্তর পেরিয়ে তবেই তা সম্ভব হয়েছে। সেই সঙ্গে আমাকে প্রচুর ধৈর্য ধরতে হয়েছে।মধুর ভাণ্ডারকরকে রাজি করালেন কীভাবে?
শুভ্রজিৎ- আসলে যে বিষয় নিয়ে ছবি সেটি ওঁকে খুব আকর্ষণ করে। সেই কারণেই উনি এই ছবিটিতে বিনিয়োগ করতে রাজি হন।দীর্ঘ ছ’ দশক পর আবার বড় পর্দায় অপুকে ফিরিয়ে আনার তাগিদ কেন অনুভব করলেন?
শুভ্রজিৎ অপু অপর্ণাকে বড় পর্দায় ফিরিয়ে আনার তাগিদ নয়, সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘অপরাজিত’ উপন্যাসের শেষ দেড়শো পাতা বলার তাগিদ অনুভব করেছি। বিভূতিবাবুর লেখা ‘অপরাজিত’ উপন্যাস থেকে ‘অপু’ চরিত্রকে নিয়ে পরিচালক সত্যজিৎ রায় ‘পথের পাঁচালী’, ‘অপরাজিত’, ‘অপুর সংসার’ ছবিতিনটি করেছিলেন। ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসের একাংশ নিয়ে হয়েছে ‘পথের পাঁচালী’ সিনেমা। উপন্যাসের শেষ ভাগ এবং ‘অপরাজিত’ উপন্যাসের প্রথম কিছু অংশ নিয়ে ‘অপরাজিত’ সিনেমা তৈরি হয়েছিল। বাকি টু থার্ড অংশ নিয়ে ‘অপুর সংসার’ তৈরি হয়েছিল। উনি দুটো উপন্যাসকে একত্র করে একটা জার্নি সম্পূর্ণ করেছিলেন। কিন্তু ‘অপরাজিত’ উপন্যাসের শেষ এক-তৃতীয়াংশ বাকি থেকে যায়। সেখানে অপুর আরও জার্নি রয়েছে, যা ফ্রেমবন্দি করা হয়নি। আমার সিনেমা ‘অপরাজিত’ উপন্যাসের সেই শেষ এক-তৃতীয়াংশকে নিয়ে।‘অপুর সংসার’ যেখানে শেষ হয় তারপর থেকেই আমার ‘অভিযাত্রিক’ সিনেমা শুরু। অপু কাজলকে কাঁধে নিয়ে চলে গেলে তার কয়েকমাস পর থেকেই বাবা-ছেলের সম্পর্কের সমীকরণের গল্প নিয়ে এই ছবি। অপু-কাজলের সম্পর্ক কীভাবে দানা বাঁধে তাই নিয়ে কাহিনির বিস্তার। আমরা ‘অপুর সংসার’ ছবির শেষে দেখেছি যে কাজল অপুকে জিজ্ঞাসা করছে, ‘তুমি কে’? অপু বলে, ‘বন্ধু’। কাজল বলে, ‘তুমি আমাকে বাবার কাছে নিয়ে যাবে?’ অপু বলে ,’চলো’… এই যে বন্ধু থেকে বাবা হয়ে ওঠার জার্নি, সেই গল্পই রয়েছে এই ছবিতে।ছবির চিত্রনাট্যের স্বার্থে গল্পের কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে কি?
শুভ্রজিৎ- হ্যাঁ। তবে সেটা বড় কিছু নয়। বিভূতিবাবু যা লিখে গেছেন, সেই মূল কাঠামো একই রয়েছে।
১৯৪০ সাল অর্থাৎ আশি বছর আগের ঘটনা। এত বছরের পুরোনো কিছু জিনিস ছবির স্বার্থে রিক্রিয়েট করতে হয়েছে?
শুভ্রজিৎ- পুরোটাই রিক্রিয়েট করতে হয়েছে। সেই সময় পুরোটাই ছিল আলাদা। একটা অন্য যুগ।
নামী-দামি
দেশি বিদেশি ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ইতিমধ্যেই এই ছবি দেখানো হয়েছে। শোনা যায় যে ছবির ঝুলিতে রয়েছে বহু পুরস্কার?
শুভ্রজিৎ-
 এই ছবি দেশি বিদেশি ৪০ টি ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে প্রদর্শিত হয়েছে। নানা বিভাগে ২৮ টি পুরস্কার পেয়েছে(হেসে)।অপু ও কাজলের কী ধরনের সম্পর্ক এই ছবিতে দেখা যাবে?
শুভ্রজিৎ- বন্ধু থেকে বাবার ভূমিকায় যে উত্তরণ ঘটে এবং সম্পর্কের যে একাত্মতা, সে সবই রয়েছে এই ছবিতে। যেহেতু অপু একজন লেখক, তাঁর বহির্জগতের প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ রয়েছে এবং অজানাকে জানার তাঁর যে প্রবল নেশা, সেটাই অপু ছেলে কাজলের মধ্যে সঞ্চারিত করে। এটি অন্তর এবং বাইরের অভিযান। সেজন্যই ছবির নাম ‘অভিযাত্রিক’। স্তরের পর স্তর ঘটনা পরম্পরায় যা প্রকাশিত হবে। অপু নিজেকে ছেলের মধ্যে দিয়ে আবিষ্কার করবে। ছোট্ট অপুর জীবনে যে ঘটনাগুলো ঘটত, সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি কাজলের জীবনে অন্যভাবে ঘটছে। সেটি ছবিতে কীভাবে পরিস্ফুট হয় সেটাই দেখাতে চেয়েছি। এই ছবির চিত্রনাট্য ও সংলাপ আমার নিজের লেখা।বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে ছবিটি আপনি সাদা-কালোয় করলেন কেন?
শুভ্রজিৎ- এই ছবির হাত ধরে আমরা ষাট বছর আগে ফিরতে চলেছি। ছ’ দশক আগের সেই ফিল তুলে ধরার জন্যই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আর অভিযাত্রিকের আবেদন তো আন্তর্জাতিক মানের। ১৯৪০ সালের ঘটনা যদি ধরি, তবে আশি বছর আগের ঘটনা। সাদা-কালো ছবির পাশাপাশি সেই সময় মানুষের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ থেকে শুরু করে বাচনভঙ্গি, শব্দচয়ন, আচার অনুষ্ঠান ইত্যাদি সুক্ষ্ম জিনিসগুলো রিক্রিয়েট করা ছবিতে খুবই কঠিন ছিল।ছবিতে তো সঙ্গীতের বড় ভূমিকা রয়েছে…
শুভ্রজিৎ- অবশ্যই। তবে ইন্সট্রুমেন্টাল। ইন্ডিয়ান ক্লাসিক্যাল মিউজিকের বড় ভূমিকা রয়েছে। মাত্র দুটি সিচুয়েশনাল গান রয়েছে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসের লেখায় আছে যে অপু ভালো রবিবাবুর গান গায়, যেটা ‘অপু’ ট্রিলজিতে এক্সপ্লয়েট করা হয়নি। আমি সেটি করেছি। কারণ আমি বিভূতিবাবুর উপন্যাস পুরোটাই অনুসরণ করেছি। তাই অপু ওরফে অর্জুনের লিপে সাহেব চট্টোপাধ্যায়ের গাওয়া ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা’ রবীন্দ্রসঙ্গীতটি শোনা যাবে। এছাড়াও উজ্জয়িনীর কণ্ঠে একটি কীর্তনগান রয়েছে। ছবিতে একজন কীর্তনীয়া হিসেবে উজ্জয়িনীকে এই গানের দৃশ্যে দেখা যাবে। ছবির সঙ্গীতের দায়িত্বে রয়েছেন পণ্ডিত বিক্রম ঘোষ। ভারতীয় সিনেমায় এই প্রথমবার অনুষ্কাশঙ্কর সেতার বাজিয়েছেন। হলিউডের ‘ওয়ারনার’ মিউজিক থেকে ছবির মিউজিক প্রকাশিত হয়েছে, যা সারা বিশ্বে রিলিজ করেছে।ছবিতে পোশাকেরও তো একটা বড় ভূমিকা রয়েছে-
শুভ্রজিৎ- ছবির লুকস এবং কস্টিউম আমি নিজে রিসার্চ করেছি। ফ্যাশন ডিজাইনার অগ্নিমিত্রা পল ছবিতে অসাধারণ কাজ করেছেন। লুক সেট করেছেন মেকআপ আর্টিস্ট অনিরুদ্ধ চাকলাদার। ১৯৪০ এর ভারতের সেই সময়ের লুক পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে তুলে ধরা হয়েছে। যাতে ‘অপু’ ট্রিলজির সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় থাকে। সাজপোশাক থেকে শুরু করে জামা-কাপড়ের টেক্সচার পর্যন্ত হুবহু এক রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।অগ্নিমিত্রা তাঁতিদের কাছ থেকে মেটিরিয়াল কিনে তাই দিয়ে পোশাক তৈরি করেছেন। আমি যেহেতু নিজে খুব খুঁতখুঁতে একজন মানুষ, তাই যখন যেটা পছন্দ হয়নি সেটা বাতিল করে আবার নতুন করে সেই কাজ করাতে হয়েছে। সেই সময় স্টিচিং প্যাটার্ন ছিল অন্যরকম। তখন ডাবল স্টিচিং হত। জামার বোতাম এবং টেক্সচার প্রতিটি ১৯৪০ এর মতো। সেই সময় শাড়ির সঙ্গে বর্ডার অন্যরকম হত। অবিকল তা রাখা হয়েছে।এই ছবি তো মাল্টি-কাস্টিং!
শুভ্রজিৎ- একদম। অপু এবং অপর্ণা চরিত্রে যথাক্রমে অভিনয় করেছেন অর্জুন চক্রবর্তী ও দিতিপ্রিয়া রায়।কাজলের ভূমিকায় দেখা যাবে আয়ুষ্মান মুখোপাধ্যায়কে। অন্য শিল্পীরা হলেন সোহাগ সেন, সব্যসাচী চক্রবর্তী, তনুশ্রী শংকর, বরুণ চন্দ, শ্রীলেখা মিত্র, অর্পিতা চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ।এই ছবির ইউএসপি কী হতে চলেছে?
শুভ্রজিৎ- ছ’দশক পর বড়পর্দায় অপু ফিরছে। আমার মনে হয় বাঙালির কাছে এর থেকে বড় কিছু ইউএসপি আর হতে পারে না। পশ্চিমবঙ্গে ৩ ডিসেম্বর এবং সমগ্র ভারতবর্ষে ১০ ডিসেম্বর এই ছবি মুক্তি পাবে। আগামী বছর বিদেশেও এই ছবিটি মুক্তি পেতে চলেছে।

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.