আজও তাঁর সুরের ভ্রমর বসে কাঁচা বাঁশে, তবু রিমেকের ভিড়ে ব্রাত্য সঙ্গীতসাধক অংশুমান

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

ভাদর-আশিন মাসে ভ্রমর বসে কাঁচা বাঁশে, আরো কি থাকিবে বাপের ঘরে গো? মন আমার কেমন কেমন করে। ও বধূ হে আর না থাকিও বাপের ঘরেতে… এই গান আজও মাতিয়ে দেয় সব জলসা থেকে টেলিভিশনের রিয়্যালিটি শো। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় লোকগানের বিভাগে এই গানটা প্রায়ই গেয়ে থাকেন কেউ না কেউ। গানের সুরে মুহূর্তে বদলে যায় পরিবেশ, মন দুলে ওঠে মেঠো পথের সুরে। অনেকের কণ্ঠেই এই গান আমাদের বহুশ্রুত। কিন্তু এই গানের আসল যিনি মালিক, যাঁর সুরে ও কণ্ঠে এই গান জন্ম নিয়েছে, তাঁকেই আমরা ভুলতে বসেছি। নতুন প্রজন্ম নামই শোনেনি তাঁর। অথচ তাঁর গান ‘ভাদর-আশিন মাসে’তে প্রায়ই মাতছে জেন ওয়াইদের ডান্সফ্লোর।

‘ভাদর-আশিন মাসে’ গানটির আসল স্রষ্টা অংশুমান রায়। তিনিই এই গানের প্রথম গায়ক ও সুরকার দুই-ই। গানটি লিখেছিলেন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, যাঁরা ছিলেন অভিন্নহৃদয় বন্ধুও। অংশুমান রায়ের অবদান বাংলা গান থেকে ছাড়িয়ে বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক স্তরে আজও প্রাসঙ্গিক। কিন্তু তাঁর নামটাই আজ বিস্মৃত।

অংশুমান রায়ের আরও একটা আইকনিক গান, ‘দাদা পায়ে পড়ি রে মেলা থেকে বউ এনে দে।’ এই গান তো বাংলার ঘরে ঘরে সব যুবকের প্রথম যৌবনের মনের কথা বলে দিয়েছে। এটি সর্বাধিক জনপ্রিয় কালজয়ী লোকগান। অংশুমান ওঁর সময়ে এমন গানের মাধ্যমে প্রবীন-নবীন প্রজন্মকে একসুরে বেঁধেছিলেন।

অংশুমান রায় ঝাড়গ্রামের ভূমিপুত্র। ১৯৩৬ সালের ১৯ অগস্ট বাছুরডোবা অঞ্চলে জন্ম হয় তাঁর। বাছুরডোবায় আজও আছে তাঁদের বাস্তুভিটে। লালমাটি, শাল-পিয়ালের মাঝে ছোটবেলা কাটানোর সময়ে তাঁর গলায় মেঠো সুর আত্মস্থ হয়ে গেছিল খেলার ছলেই। মাদলের তালে তালে ঝুমুর, টুসু, ভাদু গান শুনে তিনি বড় হয়ে ওঠেন। রায় তাঁদের উপাধি। তাঁর এক পূর্বপুরুষ বাঁকুড়ার জমিদারের সভাগায়ক ছিলেন এবং তাঁর গানে মুগ্ধ হয়ে সেই জমিদার তাঁকে “রায়” উপাধিতে ভূষিত করেন। সেই থেকেই তাঁদের রায় পরিবার।

অংশুমানের প্রথম সঙ্গীতশিক্ষা বড়দা শঙ্কর রায়ের কাছে। বিশেষত রবীন্দ্রসঙ্গীত তাঁর কাছেই শিখেছিলেন তিনি। ঝাড়গ্রামে তাঁর বাবার এক বন্ধুর কাছেই রাগপ্রধান সঙ্গীত ও ঠুমরীর তালিম নেন। গানের পাশাপাশি তবলা ও বেহালা বাজানোও তিনি শিখেছিলেন। এছাড়াও ঝাড়গ্রামেই তাঁর এক বন্ধুর বাবার কাছ থেকে তিনি বাঁশি ও মাদল বাজানোও শিখেছিলেন। এর পরে পাঁচের দশকে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ঝুমুর, ভাদু, টুসু – রাঢ় বাংলার লোকসঙ্গীত নিয়ে গবেষণা শুরু করেন এবং গবেষণার জন্য দীর্ঘদিন পুরুলিয়ার অযোধ্যা, বাঘমুন্ডি, পঞ্চকুটের পাহাড়ি অঞ্চলে সেখানকার অধিবাসীদের সঙ্গে বসবাস করেন। এই জন্যই তাঁর গানে রাঢ়বাংলার লোকগীতির কথা, সুর ও বাদ্যযন্ত্রের প্রভাব দেখা যায়। এর পরে তিনি চলে আসেন কলকাতা। কলকাতায় আধুনিক গানের চর্চা করেন প্রবীর মজুমদারের কাছে। জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের কাছেও গান শেখেন।

অংশুমান রায়ের প্রথম হিট গান ছিল ‘সাঁঝে ফোটে ঝিঙা ফুল, সকালে মলিন গো’, এই গান দিয়েই তিনি শ্রোতা মহলে পরিচিত হন। আকাশবাণীর শিল্পী হিসেবে তিনি বিশেষ জায়গাও করে নেন। আকাশবাণীতে রম্যগীতির অনুষ্ঠানে অংশুমান রায় ছিলেন বিশেষ ভাবে জনপ্রিয়। ‘ভাদর আশিন মাসে ভ্রমর বসে কাঁচা বাঁশে’, ‘দাদা পায়ে পড়ি রে, মেলা থেকে বৌ এনে দে’, ‘আমার বেটার বিহা দিব সময় হয়েছে’, ‘হায় হায় সাত পাকে বাঁধা পোড়ো না’–  এসব একের পর এক কালজয়ী গান গেয়ে অংশুমান রায় প্রথম সারিতে চলে এসেছিলেন। তিনি ছিলেন একাধারে গায়ক, গীতিকার, সুরকার এবং বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজানোতেও তাঁর ছিল বিশেষ পারদর্শিতা।

সে সময়ে হেমন্ত-মান্না-শ্যামল-সতীনাথের যুগ, কিন্তু অংশুমান রায় তাঁর খোলা হাওয়ার মতো দরাজ কণ্ঠ দিয়ে শ্রোতাদের মনে বিশেষ জায়গা করে নিলেন সহজেই। এসব গান তখন লোকের মুখেমুখে। সবাই গাইছে এইসব গানের সুর গুনগুনিয়ে। অংশমান রায়ের নামেই জলসা হাউসফুল।

শুধু তাই নয়, পূর্ববঙ্গেও অংশুমান রায়ের অবদান বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধু মুজিবুর রহমানকে নিয়ে অংশুমান রায়ের গাওয়া ‘শোন একটি মুজিবুরের থেকে লক্ষ মুজিবুরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি … বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ’ গানটি সারা বাংলা জুড়ে আলোড়ন তোলে। তখনকার মুক্তিযুদ্ধকালীন টালমাটাল পরিস্থিতিতেও দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে অংশুমান রায়ের নাম। স্বদেশী গান হিসেবে আখ্যা পায় গানটি।

জানা যায়, ১৯৭১ সালের ১৩ই এপ্রিল এক ঘরোয়া আড্ডায় বসে গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার এই গানটি রচনা করেন এবং সেদিনই শুধু হারমোনিয়াম বাজিয়ে গানটি গেয়ে ফেলেন অংশুমানবাবু। আকাশবাণীর ‘সংবাদবিচিত্রা’র ভারপ্রাপ্ত উপেন তরফদার সেই আড্ডায় উপস্থিত ছিলেন এবং তিনিই তাঁর টেপ রেকর্ডারে গানটি রেকর্ড করেন। সেই রাত্রেই গানটি ‘সংবাদবিচিত্রা’য় সম্প্রচারিত হয়। তার পরে বাকিটা ইতিহাস।

বাংলাদেশে ‘শোনো একটি মুজিবুরের থেকে’ গানটি জাতীয় সঙ্গীতের পরেই আজও গাওয়া হয়। এই সম্মান রায় পরিবারের কাছে গর্ব করার মতোই। এই গানটির জন্য ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজে অংশুমান রায়কে সরকারি ভাবে বাংলাদেশ থেকে ‘বঙ্গবন্ধু গোল্ড মেডেল’ দেওয়ার কথাও ঘোষণা করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমন্ত্রণপত্র হাতে নিয়েও তিনি বাংলাদেশ যেতে পারেননি, কারণ তার কিছুদিনের মধ্যেই আততায়ীর হাতে নিহত হন বঙ্গবন্ধু। তবে ২০১২ সালে অংশুমান রায়কে ‘মরণোত্তর রাষ্ট্রীয় সম্মান ও মরণোত্তর মুক্তিযোদ্ধা সম্মান’ দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ সরকারের তরফ থেকে।

এখানেই শেষ নয়। বাংলা ছায়াছবির গানেও অংশুমান রায় প্লেব্যাক করেছিলেন এবং পুরস্কারও পেয়েছিলেন। অংশুমান রায় যেমন যৌবনের মনের কথা বলে গেছেন ‘দাদা পায়ে পড়ি রে’ গানে, তেমনই আমাদের ছোটবেলার সেই টেনিদার ‘চারমূর্তি’ ছবিতে ‘ঘচাং ফু খাবো তোকে’ গানটিও অংশুমান রায়েরই গাওয়া। মনে পড়ে ভয়ার্ত সেই দৃশ্যটা, সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়, রবি ঘোষ আর শম্ভু ভট্টাচার্য ভয়ানক সাজে নেচে নেচে গাইছেন চারমূর্তির এক মূর্তিকে নরবলি দেবার জন্য, ‘ঘচাং ফু’ গান। দেখলেই গায়ের রোম খাড়া হয়ে যায়। শিবদাস বন্দোপাধ্যায়ের কথায় ও অজয় দাসের সুর দেওয়া এই গানটি তাঁর সঙ্গীতজীবনে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। এই গানের জন্য অংশুমান বাবু ১৯৭৮ সালে বাংলার শ্রেষ্ঠ প্লে ব্যাক গায়কের সম্মানও পান।

অংশুমান রায়ের সঙ্গীতজীবনে অপরিসীম ভূমিকা ছিল তাঁর স্ত্রী কমলা রায়ের। স্ত্রীর ভরসা ও সাহচর্যেই এতটা পথ পেরোতে পারেন তিনি লোকগানকে আঁকড়ে। কিন্তু নিয়তির খেলা এমনই যে স্বামী-স্ত্রী দুজনেরই অকাল প্রয়ান ঘটে। ১৯৯০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কমলা রায়ের মৃত্যু হয়। এত অকালে স্ত্রীর মৃত্যু মানতে পারেননি অংশুমান বাবু। গানের জগত থেকে সরে এসে স্ত্রীর শোকে একেবারে গভীর অবসাদে চলে যান। ১৯৯০-এর ২২শে এপ্রিল, স্ত্রীর মৃত্যুর দেড় মাসের মাথায় অংশুমান রায় মাত্র ৫২ বছর বয়সে আত্মহত্যা করেন। আগের রাতে ফাংশনও করেছিলেন তিনি। পরপর দুজনের চলে যাওয়া তাঁদের সন্তানদের কাছেও বিশাল শোক ও ধাক্কা ছিল।

অংশুমানের স্ত্রী কমলা রায়

তাঁর অবদান নিয়ে পরবর্তীকালে গানের জগতে আর তেমন আলোচনা বা গবেষণা হয়নি। কিন্তু অংশুমান রায়ের বড় ছেলে ভাস্কর রায় পিতার সঙ্গেই শেষ দিকের প্রোগামগুলিতে গাইতেন। তিনি এখন প্রতিষ্ঠিত শিল্পী বাংলা গানের জগতে। ভাস্কর বাবু এখন অংশুমান রায়ের গানগুলোই পরিবেশিত করেন। বাংলা গানে বাবার অবদানকে বাঁচিয়ে রাখতে ও শ্রোতাদের সেই নস্ট্যালজিয়ায় ফিরিয়ে দিতে নিঃশব্দে লড়ে যাচ্ছেন তিনি।

অংশুমান রায় এ যুগের কাছে এক বিস্মৃত প্রতিভা। মেঘে ঢাকা তারা তিনি। অথচ তিনিই লালমাটির ঝুমুর গানের ধারাকে জনপ্রিয়তা দিয়েছেন বাংলা গানে। লোকগানে অংশুমান রায় নামটা উল্লেখযোগ্য কিন্তু তাঁর অবদান নবীন প্রজন্ম জানলই না। অন্য শিল্পীদের কণ্ঠে তাঁরই গান নানাভাবে শুনছে এ প্রজন্ম। তাই এই শিল্পীর কাজ সামনে আনা ইতিহাসের দাবিতেই খুব জরুরি।

বাবা অংশুমানের সঙ্গে ছেলে ভাস্কর রায়

অংশুমান রায় তাঁর প্রাপ্য সম্মান পাননি একেবারেই। লোকশিল্পীদের সে অর্থে তেমন সম্মানই নেই গানের জগতে। কিন্তু অংশুমানের গানগুলি রয়ে গেছে। এ যুগের প্রতিষ্ঠিত শিল্পীরা অবশ্য আসল স্রষ্টার নামটাও উল্লেখ করেন না। এই কি প্রাপ্তি একজন প্রকৃত সঙ্গীত সাধকের? গীতিকার, সুরকার ও গায়ক, লেজেন্ড অংশুমান রায়ের জন্মদিনে তাঁকে শ্রদ্ধা জানাচ্ছে ‘দ্য ওয়াল’। আগামী প্রজন্মের কাছে পরিচিত হোক অংশুমান রায়ের নাম ও অবদান।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More