আবর্জনার স্তূপে পড়ে থাকে কত পুরনো বই! খুঁজে এনে আস্ত লাইব্রেরি গড়েছেন ময়লাবাহী ট্রাকের চালক

দ্য ওয়াল ব্যুরো: পুরনো বই নিয়ে সাধারণত কী করে মানুষ? কেউ বিক্রি করে দেয়, কেউ বন্ধুদের পড়তে দিয়ে দেয়, কেউ হয়তো পরিচিত কোনও লাইব্রেরিতে ডোনেট করে। কিন্তু এ সব কিছুর পরেও বহু বহু সংখ্যক বই আবর্জনায় পরিণত হয় প্রতি বছর। সারা বিশ্ব জুড়েই এর ব্যতিক্রম নেই। অবহেলায় ফেলে দেওয়া হয় বহু বই। কিন্তু সেই ফেলে দেওয়া বই খুঁজে খুঁজেই আস্ত একটা লাইব্রেরি বানিয়ে ফেলেছেন পেশায় ট্রাক চালক, জোস অ্যালবার্টো গুতিয়ের্জ!

যে সে ট্রাক নয়, আবর্জনাবাহী ট্রাক চালান তিনি। আর সেই ট্রাক নির্দিষ্ট জায়গায় উপুড় করার সময়েই খুঁজে-পেতে বার করেন, কোনও বই লুকিয়ে রয়েছে কি না! সেই আবর্জনা হয়ে যাওয়ার বইগুলি জমিয়েই সারা বিশ্বকে চমকে দিয়েছেন কলোম্বিয়ার বাসিন্দা গুতিয়ের্জ! তাঁর বানানো এই লাইব্রেরি এখন রীতিমতো বড় লাইব্রেরির সঙ্গে পাল্লা দেয়।

বহু বছর ধরে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে আবর্জনা কুড়িয়ে ট্রাকে করে সেগুলি নিয়ে আসের কাজ করেন গুতিয়ের্জ। এক দিন হঠাৎই আবর্জনার মধ্যে একটি বইকে ভাল অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে, নিজের বাড়িতে নিয়ে এসে রাখেন গুতিয়ের্জ। লিওটলস্টয়ের আনা কারেনিনা নামের বইটিই ছিল লাইব্রেরির প্রথম বই। তখন অবশ্য লাইব্রেরির কথা ভেবে বইটি এনে রাখেননি। নিছকই কৌতূহলে এবং প্রাণে ধরে নষ্ট করতে না পেরে তুলে এনেছিলেন সেটি। কিন্তু এখন গুতিয়ের্জের বইয়ের সংখ্যা ২৫ হাজার। সব ক’টিই ফেলে দেওয়া বই, আবর্জনা থেকে কুড়োনো।

প্রথম বইটি কুড়িয়ে আনার পর থেকেই যেখানে যত বই ভাল অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখতেন, নিয়ে এসে বাড়িতে রাখতেন গুতিয়ের্জ। ক্রমে তাঁর বাড়ির একতলাটা পুরো ভরে যেতে থাকে নানা রকমের বইয়ে। এক সময়ে স্থানীয় মানুষদের চোখে পড়তে, আনাগোনা শুরু করেন তাঁরা। কেউ কেউ বই পড়তে চান সেই সংগ্রহ থেকে। কেউ আবার বাচ্চাদের জন্য চেয়ে নিয়ে যান পুরনো গল্পের বই। 

এ দিকে গুতিয়ের্জের সংগ্রহ কিন্তু থামেনি। কোনও কিছু ভেবে শুরু না করলেও, এক সময়ে আবর্জনার স্তূপ থেকে ফেলে দেওয়া বই খুঁজে আনাটা নেশায় পরিণত হয় তাঁর। কাজে বেরিয়ে আবর্জনা সংগ্রহ করার সময়ে খেয়াল রাখতেন, কেউ কোথাও কোনও বই ফেলে দিয়েছে কি না। এবং সকলকে অবাক করে, বেড়েই চলে এই বইয়ের কালেকশন। এত মানুষ এত বই স্রেফ ফেলে দিয়েছেন! এটা ভেবেই অবাক হয়ে যান অনেকে।

এখন গুতিয়ের্জের এই সংগ্রহের নাম, ‘লা ফুয়ের্জা দে লাস প্যালাব্রাস।’ স্পেনীয় এই শব্দবন্ধের অর্থ হল, ‘শব্দের শক্তি’।গুতিয়ের্জ একা তাঁর পেশার মাঝে এই কাজ শুরু করলেও, তাঁর পরিবারও এখন যুক্ত হয়েছেন একই কাজে। তাঁরাও আবর্জনা থেকে বই খুঁজতে সাহায্য করেন গুতিয়ের্জকে। দেখাশোনা করেন লাইব্রেরিটিরও।

শুধু তা-ই নয়। গুতিয়ের্জের সংগ্রহ করা ফেলে দেওয়া বইযের মধ্যে যে হেতু প্রচুর সংখ্যক শিশুপাঠ্য বই থাকে, স্কুলের বই থাকে, তাই সেগুলি কাজে লাগানোর ব্যবস্থা করেছেন গুতিয়ের্জ। ২৩৫টি স্কুলে, গরিব বাচ্চাদের উদ্দেশে সে সব বই পাঠিয়ে দেন তিনি।

এখন গুতিয়ের্জের লাইব্রেরি দেখতে পর্যটকেরাও আসেন দেশ-বিদেশ থেকে। অনেকে সাহায্য করেন এই লাইব্রেরির উন্নতিতে। স্থানীয় বইমেলায় স্টল দেন গুতিয়ের্জ।

কিন্তু এ সবের মাঝে কিন্তু পুরনো পেশা থেকে মোটেই ছুটি নেননি গুতিয়ের্জ। রোজ বেরোন ট্রাক নিয়ে, সংগ্রহ করেন আবর্জনা। তার মধ্যে থেকেই খুঁজে বার করেন বই। শুধু তা-ই নয়। গুতিয়ের্জের পরিচিত, আবর্জনা সংগ্রহকারী অন্যান্য ট্রাক-চালকেরাও জানেন, নোংরার মধ্যে কোনও ফেলে দেওয়া বই পেয়ে গেলে, সেটির ঠিকানা গুতিয়ের্জের লাইব্রেরি।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More