রোজ রাতে ধর্ষণ করতেন স্বামী, সেই মেয়ের স্টান্ট অ্যাকশন আজ কাঁপাচ্ছে বলিউড

শাশ্বতী সান্যাল

গীতা ট্যান্ডনের জীবনের গল্পটা কোনও বলিউড সিনেমার টানটান চিত্রনাট্যের থেকে কোনও অংশে কম নয়৷ হ্যাঁ, একটা ফারাক আছে৷ গীতার জীবনসংগ্রামটা রুপোলি পর্দার মনগড়া স্ক্রিপ্ট নয়। তাঁর সমস্যাগুলো সত্যি, যন্ত্রণা-কষ্টগুলো সত্যি, আর সেই সমস্যার বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে যে লড়াইটা সে লড়েছে, সেই জীবনযুদ্ধটাও একইরকম সত্যি। জীবনে খুব কুসুমাস্তীর্ণ চলার পথ পাননি গীতা। পদে পদে এসেছে বাধা, লাঞ্ছনা, চরিত্র নিয়েও একসময় প্রশ্ন তুলেছে লোকে।

কিন্তু হার মানেননি গীতা। অপমান অসম্মানে ভরা রোজকার বিবাহিত জীবন থেকে বেরিয়ে আসা, নতুন করে পড়াশোনা শুরু করা, কোনও প্রশিক্ষণ ছাড়াই দুম করে স্টান্টম্যানের ভূমিকায় বলিউডে পা রাখা, প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে দিনের পর দিন কাজে ফেরা- একের পর এক হার্ডল ডিঙিয়ে আজ লড়াকু মেয়েদের কাছে গীতা ট্যান্ডন এক অনুপ্রেরণার নাম।

কেমন ছিল ফেলে আসা সেই অন্ধকার জীবন? বম্বের এক পাঞ্জাবি পরিবারে জন্ম গীতা ট্যান্ডনের। খুব কম বয়সেই মা’কে হারান গীতা। অর্থোডক্স পাঞ্জাবি পরিবারের মেয়ে, উচ্চশিক্ষার ইচ্ছে থাকলেও তা পূর্ণ হয়নি। আত্মীয়-স্বজন আর সমাজের চাপে বিয়ের বয়স হওয়ার আগেই সাতপাকের পিঁড়িতে বসতে হয় তাঁকে। বন্ধ হয়ে যায় পড়াশোনা।

অথচ ছোটোবেলাটা একেবারে অন্যরকম ছিল গীতার। সোসাইটির আর পাঁচটা মেয়ের তুলনায় অনেক খোলামেলা আর স্বাধীনভাবে বড় হয়ে উঠেছিলেন৷ কিন্তু মাত্র ১৫ বছর বয়সে দাম্পত্য কাকে বলে সেটা বুঝে ওঠার আগেই সম্পূর্ণ অচেনা এক পুরুষের সঙ্গে বিয়ে হয়ে যায় কিশোরী গীতার। মাতৃহারা মেয়ে, শাশুড়ির মধ্যে প্রথম প্রথম মা-কে খুঁজে পেতে চেয়েছিল্রন। যে আদর ভালোবাসা সে ছেলেবেলায় পায়নি, সেই মাতৃস্নেহের জন্য লোভী হয়ে উঠেছিল মন।

কিন্তু বিয়ের প্রথম রাত কাটতেই ভুল ভাঙে গীতার। ফুলশয্যার রাতে সদ্যবিবাহিত স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কোনও দৈহিক সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি, একথা শুনে রেগে আগুন হয়ে উঠেছিলেন গীতার শাশুড়ি। ছেলেকে সেদিন খোলাখুলিই কিশোরী বউয়ের সঙ্গে বলপূর্বক মিলিত হওয়ার নিদান দেন তিনি, সেটাই না কি দাম্পত্যজীবনে পুরুষত্বের প্রতীক! মাতৃস্থানীয়া একজনের মুখে এমন অমানবিক নিদান শুনে সেদিন ভয়ে চুপ করে গেছিলেন ১৫ বছরের গীতা। মেনেও নিয়েছিলেন। সুস্থ দাম্পত্য কাকে বলে, সত্যি কথা বলতে তা নিয়ে কোনও স্পষ্ট ধারণাই তৈরি হয়নি গীতার। সহবাসের নামে রোজ রোজ শারীরিক নির্যাতন আর ধর্ষণকেই দাম্পত্য বলে জেনেছিলেন তিনি।

সেই অনিচ্ছার সহবাসেও পরপর দুই সন্তানের জন্ম দেন গীতা। প্রতি রাতের লজ্জা আর কষ্ট ততদিনে সহ্যের সীমা ছাড়িয়েছে। নিজের বাচ্চার সামনে দাম্পত্যের নামে রোজকার এই যৌন হেনস্থা মুখ বুজে মেনে নেওয়া যাচ্ছিল না। কিন্তু প্রতিবাদ করলে তার ফল কী হবে, তাও অজানা ছিল না। বাইরের বিরাট পৃথিবীতে শেয়াল-শকুনের মধ্যে দুটো দুধের বাচ্চাকে নিয়ে ভর‍যুবতী এক নারীর জীবনধারণের লড়াইটা যে কত কঠিন হতে পারে, তা আগেই আঁচ করেছিলেন গীতা।

মেয়েদের নিয়ন্ত্রণ করার, তাদের উপর কর্তৃত্ব করার একটা আশ্চর্য গোপন ইচ্ছে কমবেশি সব পুরুষই লালন করে বোধহয়। আর সেই অন্যায় ইচ্ছেয় শিলমোহর বসায় আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ। শুধু তো শরীর নয়, রোজ রোজ ধর্ষিত হচ্ছিল গীতার আত্মমর্যাদাও। প্রতিকার করার চেষ্টা করেও লাভ হয়নি, উলটে বেড়ে গেছিল অত্যাচারের মাত্রা। বাপেরবাড়ি ফিরে গিয়ে লাভ নেই, তা আগেই বুঝেছিলেন। তাহলে কোথায় যাবেন? কার কাছে আশ্রয় পাবেন? এসব প্রশ্নের উত্তর না জানলেও গীতা জানতেন, এই লড়াই তাঁকে একাই লড়তে হবে। জনে জনে এসে সমবেদনা জানালেও বিপদের সময় পাশে পাবেন না কাউকেই। তাই সেভাবেই মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে দুই শিশুর হাত ধরে অপমানের ঘর ছেড়ে পথে নামেন গীতা। আশ্রয় নেন গুরুদোয়ারায়।

ইচ্ছে থাকলেও পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি একদিন। হয়তো সেইজন্যই নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিলেন ছেলেমেয়েদুটোকে শিক্ষিত করার জন্য। হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে, একটু একটু করে টাকা জমিয়ে ছেলেমেয়েদের স্কুলে ভর্তি করেন গীতা। এইসময় ২০০৮ সাল নাগাদ আচমকাই আলাপ হয়ে যায় ভাংরা কোম্পানির এক মহিলার সঙ্গে। তখন কে জানতো, এই আলাপই জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেবে একুশ বছরের গীতার!

এই ভদ্রমহিলাই প্রথম স্টান্টের কাজ করার অফার এনে দেন গীতার সামনে। ব্যাপারটা শুনতে যত সোজা, বাস্তবে তা নয়। মুম্বইয়ের মতো জায়গাতেও একজন স্টান্টম্যানের জীবন বেছে নেওয়ার আগে একজন মহিলা হাজারবার ভাববে। কিন্তু নিজেকে নিয়ে অত ভাবনাচিন্তা করার মতো সময় ছিল না গীতার। যতই ঝুঁকি থাক, অভাবের সংসারে যেচে আসা চাকরি ছেড়ে দেওয়ার কথা সেদিন কল্পনাও করতে পারেননি। সাহস সঞ্চয় করে ভদ্রমহিলার পিছুপিছু পৌঁছে গিয়েছিলেন শুটিং ফ্লোরে৷ তারপর… বাকিটা ইতিহাস।

‘শাকিরা: দ্য এন্ড অফ ইভিল’ – এই নামে একটা টিভি সিরিজে প্রথম স্টান্টম্যানের ভূমিকায় ক্যামেরার সামনে এসে দাঁড়ান গীতা ট্যান্ডন। পরিচালক তাঁকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন কী করতে হবে। বেশ লম্বা একটা বিল্ডিংয়ের শেষ প্রান্ত থেকে নীচে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে তাঁকে। এটুকুই কাজ। ঠিকমতো করতে পারলেই হাতে আসবে কড়কড়ে কিছু নোট। ছেলেমেয়েদের ক্ষুধার্ত মুখ, বকেয়া স্কুল ফি- সব সমস্যার সমাধান, ওই একটা লাফ।

অন্য কেউ হলে কী করত জানিনা, কিন্তু গীতা সেদিন নিজের সব ভয়, আশঙ্কা, কষ্ট বুকে চেপে দিয়েছিলেন লাফটা৷ আর ঐ এক লাফেই পেরিয়ে এসেছিলেন জীবনযুদ্ধের অনেকখানি পথ। তারপর আর তেমনভাবে পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে৷ কাজ এসেছে একের পর এক৷ এডভেঞ্চারের নেশা পেয়ে বসেছে গীতাকেও।

এ এমন এক পেশা যেখানে পায়ে পায়ে জড়িয়ে থাকে দুর্ঘটনার ভয়, মৃত্যু-সম্ভাবনা৷ কিন্তু সেই শরীরী মৃত্যু বোধহয় আত্মার মৃত্যুর থেকে অনেক স্বস্তির৷ বিবাহিত জীবনে একসময় যে অপমান অসম্মান তাঁকে নিয়মিত ভোগ করতে হয়েছে, সে ছিল মৃত্যুযন্ত্রণার অধিক। স্টান্টম্যানের জীবনে মৃত্যুভয় আছে বটে, কিন্তু সম্মানও আছে। স্বীকৃতিও আছে।

আসতে থাকে একের পর এক নতুন কাজ, একের পর এক চ্যালেঞ্জ। লাদাখে একটা শ্যুটিং-এ স্টান্টম্যান হিসাবে আগুনের উপর দিয়ে লাফ দেওয়ার সময় গায়ে আগুন ধরে যায় গীতার। ঝলসে যায় মুখের কিছুটা। কিছুদিন পর অন্য আরেকটা শ্যুটিং-এ পড়ে গিয়ে মেরুদণ্ডে চোট পান। বিছানা নেন বেশ কয়েক মাসের জন্য। কিন্তু এসব আঘাত যন্ত্রণা, সাময়িক শয্যাশায়ী হওয়া, কোনওটাই থামিয়ে রাখতে পারেনি গীতাকে। আরও পরিশ্রম করেছেন, আরও সুচারু, নিখুঁত করে তুলেছেন নিজের প্রত্যেকটা স্টান্ট।

শুধু পেশার জগতেই নয়, একটু ভালোভাবে বাঁচার জন্য রোজকার জীবনেও কম লড়াই করতে হয়নি গীতাকে। মুম্বইয়ের মতো ঝাঁ-চকচকে শহরেও সিঙ্গল মাদারদের দিকে মানুষ ভুরু কুঁচকে তাকায় এখনও। যেন তারা অপরাধী। একটা সময় ছিল, যখন ছোট দুটো বাচ্চাকে নিয়ে থাকার জন্য ভদ্রপাড়ায় ঘর জুটতো না। লোকেরা রীতিমতো সভা ডেকে আলোচনা করে ঠিক করত একজন বিবাহবিচ্ছিন্নাকে ঘর দেওয়া ঠিক হবে কী না! অনেক টাকা দিয়ে বাড়ি ভাড়া নেওয়ার, বা ফ্ল্যাট কেনার ক্ষমতা ছিল না। তাই, সমস্যা এড়াতে ক্ষেত্রবিশেষে মিথ্যে কথাও বলতে হয়েছে গীতাকে।

আজ সেই দিনগুলোর কথা ভাবলে কষ্ট হয় গীতার। এক সাক্ষাৎকারে নিজেই বলেছেন, “একা মেয়েকে আশ্রয় দিতে চায়না কেউ। তাই আইনি বিবাহবিচ্ছেদের পরেও ‘স্বামী বিদেশে থাকে’ এই কথা বলে ঘরভাড়া নিতাম।” তবে সেসব দিন এখন অতীত। এখন আর মিথ্যে স্তোকের আশ্রয়ে বাঁচেন না গীতা ট্যান্ডন। শুনলে আশ্চর্য হবেন, স্কুলের পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়া, ডিগ্রিহীন, আশ্রয়হীন সেই গীতাই এখন প্রতিবছরে ৭-৮ লাখ টাকা উপার্জন করেন। মালাড এলাকাতে বাড়ি করেছেন, সেখানেই বাচ্চাদের নিয়ে থাকেন গীতা। ছেলেমেয়েরাও বড় হয়েছে। কলেজে পড়ছে।

মুম্বই ইন্ডাস্টির পরিচিত নাম গীতা ট্যান্ডন। বডিস্টান্ট হিসাবে কাজ করেছেন করিনা কাপুর, আলিয়া ভাট, পরিণীতি চোপড়া বা দীপিকা পাড়ুকোনের মতো নামকরা বলিউড স্টারেদের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার দিয়েছেন নামীদামী বহু পত্র-পত্রিকায়। তাঁর এই জীবনসংগ্রামের কথা এখন অনেকেই জানেন। নিজের কথা বলার জন্য আর ভয় পান না গীতা। বিশ্বাস করেন একজন পুরুষের মতো একজন মেয়েরও সমান অধিকার আছে এ সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচার।

মেয়েদের অক্ষম, হীন, অবলা করে দেখানোর যে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা তার বিরুদ্ধেই চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছিলেন গীতা। তিনি জানতেন, সমাজ প্রতিটি নারীকে একটা নির্দিষ্ট কাঠামোয় বেঁধে রাখতে চায়। কেউ যদি যেই কাঠামোকে অস্বীকার করে, নিজের শর্তে বাঁচতে চায়, তখনই তাঁর বিরুদ্ধে রে রে করে তেড়ে আসে পুরুষতন্ত্র। তেড়ে আসে তাঁর নিজের পরিবার,পরিজন, বন্ধুবান্ধবেরাও। এই মান্ধাতা আমলের পচে যাওয়া মানসিকতার ধারক-বাহক শুধু পুরুষেরাই নয়, গীতার শাশুড়ির মতো বহু নারীই আগলে রেখেছেন এই সেকেলে ঘুণ ধরা সামাজিক কাঠামোটাকে। তাই আজও ম্যারিটাল রেপের মতো অপরাধ করেও কোনও শাস্তি হয়না এদেশের পুরুষদের। উলটে ভয়ে, অপমানে কুঁকড়ে থাকে নিরপরাধ গৃহবধূটিই।আর সেখানেই ব্যতিক্রম গীতা ট্যান্ডনের জীবনের গল্প। তথাকথিত সমাজের বিরুদ্ধে খুব নীরবেই চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছিলেন গীতা। সব হারিয়ে প্রায় শূন্য থেকে শুরু করেছিলেন। শুধু আত্মবিশ্বাস আর মরিয়া জেদ নিয়ে পুরুষশাসিত এই সমাজে মাটি কামড়ে পড়ে থেকেছেন, আদায় করে নিয়েছেন নিজের প্রাপ্য সম্মান। সাম্মাণিকও। বিয়ে নামক নাগপাশে জড়িয়ে দেশের নানাপ্রান্তে যেসব মেয়েরা আজও ক্ষতবিক্ষত, রক্তাক্ত হয় রোজ, গীতা ট্যান্ডন তাদের কাছে শুধু অনুপ্রেরণাই নয়, অবলম্বনও। গীতার মতো মেয়েরাই আজ এ দেশে নারী স্বাধীনতার মূর্ত প্রতীক।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More