কে বেশি গুণী- আদরের ইলিশ না প্রাণসখা চিংড়ি

রাখী চট্টোপাধ্যায়

কবে থেকে যে চিংড়ি ইলিশের লড়াই শুরু হয়েছিল কে জানে! এ বলে আমায় দ্যাখ ও বলে আমাকে দ্যাখ। স্বাদে গন্ধে রূপে বর্ণে তো প্রতিযোগিতা আছেই, গুণেও কেউ কারও থেকে কম নয়। ইলিশ চিংড়ির গুণাগুণ নিয়ে চুলচেরা বিচার করলেন ডায়েটিশিয়ান রাখী চট্টোপাধ্যায় ।

বাঙাল-ঘটি, মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গলের মতো আমাদের মধ্যে আজীবন লড়াই চলে ইলিশ ও চিংড়ি নিয়ে। ইমোশন তো নাহয় বুঝলাম, কিন্তু পুষ্টিগুণ? যে মাছদুটি এভাবে আমাদের রসনাতৃপ্তি ঘটিয়ে চলেছে তারা পুষ্টিগতভাবে কতটা সমৃদ্ধ? সেটাই আজ জানব…
মাছের রানি ইলিশ
প্রথমেই আসি মাছের রানি ইলিশের কথায়। আমাদের আদরের ইলিশ একটু বেশিই উপকারী।

পুষ্টিগুণ:  ১০০ গ্রামে প্রোটিন ও ফ্যাট রয়েছে যথাক্রমে ২২ ও ১৯.৫ গ্রাম। এর স্বাদ লুকিয়ে থাকে এর ফ্যাটি এসিডের উপস্থিতির ওপর। ওলেইক, লিনলেইক, স্টিয়ারিক, EPA, DHA, ও আরাচিদনিক এসিড রয়েছে এতে, যা হল পুফা(PUFA)। যথেষ্ট পরিমাণে PUFA-র উপস্থিতির কারণে করোনারি আর্টারি ডিসিজ, স্ট্রোক, হাই ব্লাড প্রেসার, ডায়াবেটিস, রিউমাটোয়েড আর্থ্রাইটিস ও ডিপ্রেশনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে বেশ উপযোগী। ইলিশের শরীরে প্রচুর ওমেগা ৩ ফ্যাটি এসিডের উপস্থিতি মস্তিষ্কে গ্রে ম্যাটার বৃদ্ধি করে ডিমেনশিয়া বিলম্বিত করে, অস্টিও অর্থ্রাইটিসের প্রকোপ কমায়, প্রস্টেট ও ব্রেস্ট ক্যানসারের জন্য দায়ি কোষগুলির মৃত্যু ত্বরান্বিত করে।রক্তে ভালো ফ্যাট HDL-এর পরিমাণ বাড়ায় ও খারাপ ফ্যাট LDL-এর পরিমাণ কমাতেও সাহায্য করে।
ইলিশে খনিজ লবণের উপস্থিতি হল এর সর্বোচ্চ উপকারিতা। এতে রয়েছে প্রচুর পরিমানে সোডিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, পটাসিয়াম, জিঙ্ক, আয়রন, কপার ও ক্যালসিয়ামের মতো উপাদান। আমাদের দেহের এনজাইমগুলির সাথে মিশে এগুলি দেহের স্বাভাবিক মেটাবলিজম প্রক্রিয়া বজায় রাখে।কারা খাবেন না?
যাদের কিডনির সমস্যা ও রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা খুব বেশি তারা ইলিশ মাছ একটু এড়িয়ে চলুন। তবে সব জায়গায় ইলিশের পুষ্টিগুণ সমান নয়, আমাদের এই মাছের দেহের বিভিন্ন অংশেও পুষ্টিগুণ আলাদা আলাদা হয়।
গুণী চিংড়ি:
এ তো গেল ইলিশের গুণাগুণ, তবে বাংলার সংস্কৃতির সঙ্গে রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে চিংড়িও। নিখাদ ঘটিবাড়ি মানেই মোহনবাগান প্রেম আর বাড়িতে চিংড়ির সমারহ। এছাড়া অন্য যে কোনও আমিষ জাতীয় খাবারের সঙ্গে টক্কর দিতে পারে চিংড়ি। এতে প্রোটিন প্রায় ৫৮-৬২%। ফ্যাটের পরিমাণও মাছ-মাংসের তুলনায় কম, মাত্র ৪-৬%। রক্তে যাদের কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি তারা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিয়ে তবেই চিংড়ি খান। চিংড়ি সর্বদা রান্না করুন আনস্যাচুরেটেড তেলে যেমন সয়াবিন বা সানফ্লাওয়ার তেলে। এতে EAA ও EFA দুটিরই পরিমাণ বেশ বেশি, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে ও স্ট্রোক প্রতিরোধ করে।
এতে রয়েছে প্রচুর মাত্রায় DHA, যা শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে সহায়ক। এছাড়াও চিংড়ির শরীরে ধাতব পদর্থগুলির উপস্থিতি যেমন ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, পটাসিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, ফসফরাস, ও লোহার উপস্থিতি একে পুষ্টিগুণের দিক থেকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।চিংড়িতে রয়েছে সেলেনিয়াম ও, যা ইমিউনিটি থাইরয়েড ও রিপ্রোডাক্টিভ হেলথ ভালো রাখতে সাহায্য করে। ভিটামিন এ, ডি, ই, বি1, বি2, বি3 নার্ভাস সিস্টেম ভালো রাখে, ক্যালসিয়াম ও আয়রন ব্লাড ফরমেশন ও ক্লটিং-এর জন্য বিশেষ দরকার।এলার্জি থেকে সাবধান
তবে চিংড়িতে উপস্থিত রয়েছে বেশ কয়েকটা এলার্জিক যৌগ যেমন ট্রোপোমায়সিন, আর্জিনিন কাইনেজ ইত্যাদি, যা আমাদের দেহে বিভিন্ন রকম সমস্যা তৈরি করতে পারে, ত্বকের প্রদাহ, শ্বাসকষ্ট, চোখের সমস্যা ইত্যাদি। এর মারাত্মক আকার দেখা যায় অনাফেলাইটিক শক হিসাবে, যা অত্যন্ত সঙ্কটজনক পরিস্থিতি তৈরি করে। তবে এটি খুবই কম ক্ষেত্রেই হয়ে থাকে।
তাই ইলিশের তেল-ঝাল হোক বা চিংড়ির মালাইকারি, পাতে থাকতেই পারে, তবে ডায়াবেটিস, কিডনি, ডিসলিপিডমিয়া ইত্যাদির সমস্যা থাকলে অবশ্যই পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিয়ে তবেই খান। দেখবেন পেট মন দুইই ভালো থাকবে…

লেখিকা হাওড়ার নারায়ণা মাল্টিস্পেশালিটি হসপিটালের সিনিয়ার ডায়েটিশিয়ান

মন ভালো রাখতে ঘরেই বানান অনন্য স্বাদের ডার্ক চকলেট

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More