বাংলার হেঁশেল- অতিথিদের মন ভোলাতে বিশেষ ৩ পদ

সাবিনা ইয়াসমিন রিংকু

এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে কথা বলে ভারী আরাম। যা বলার সামনাসামনি বলে। পেছনে কথা বলার সময় নেই। নেমন্তন্ন করলে বলে “শুধু মাটন কষা আর সাদা ভাত খাব। মিষ্টি ফিস্টি কিছু আনাবেন না কাকিমা। তবে আইসক্রিম খেতে পারি।”
এই আগাম ঘোষিত দু’চারটি বাক্য একটা চরম আরাম বা শান্তি এনে দেয় গৃহিণীর মনে। খাবার বানাবার সময় মনটা হালকা লাগে। মন খুশি খুশি থাকে। রান্নাতেও সেই খুশির ছাপ পড়ে। অথচ ছোটোবেলায় আমার মাকে দেখেছি অতিথির খাদ্য তালিকা নিয়ে ভীষণ নাজেহাল হতে। বলে কয়ে যেসব অতিথিরা আসতেন, আগে থেকে খাদ্যের ব্যাপারে তাঁদের কিছু জিজ্ঞাসা করা চরম অসভ্যতার পর্যায়ে পড়ত। মুসলিম পরিবারে অতিথিকে নারায়ণ রূপে না দেখলেও মেহমানদের আলাদা উচ্চ মর্যাদা ছিল। সেখানে তিনবেলা বহু রকম সুখাদ্য অতিথিদের মুখের সামনে ধরতে হত। অতিথির যে পদগুলো পছন্দ হত, সেগুলো ধামসে ধুমসে খেতেন। আর যেগুলো মনের মত হত না, সেগুলো একটু একটু করে খেয়ে এঁটো করে রেখে দিতেন। একসঙ্গে অতগুলো পদ রাঁধলে কি আর সব রান্না ভালো হয়! রাঁধুনি তো আর রোবট নয়! রান্না কী খালি মশলা আর হাত দিয়ে হয়? রান্না করতে মন লাগে। দ্যাখেন না মন না লাগা রান্না খেতে কেমন পানসে টাইপের হয়! রাগ, বিরক্তি আর তাড়াহুড়ো নিয়ে ১০:৪০ এর লোকাল ট্রেন ধরা যায় কিন্তু রান্নাটা ওভাবে করা যায় না। সব ঘেঁটে যায়।
মা ও ঘেঁটে যেত। খানেওয়ালা এবং খুঁত-ধরনেওয়ালা অতিথির আগমন ঘটলে মা হিমসিম খেত। ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ত। একটু সকালের দিকে অতিথিরা এলে নাস্তা দেওয়া জরুরি ছিল। লুচি, পরোটা, ডিম সেদ্ধ, ডিমের অমলেট, মাংস কষা,শীতকাল হলে সমস্ত সবজি দিয়ে একটা মাখা মাখা তরকারি, রসগোল্লা, মনোহরা, ঘরে তৈরি সুজির বরফি… এসবই দেওয়া হত অতিথিদের। অতিথি যদি এককাঠি সরেস হতেন, তাহলে পরোটা ছিঁড়ে মাংসের বাটিতে আঙুল ডুবিয়ে বলতেন, “ভাবি রান্না খুব ভালো হয়েছে। অনেক দিন চালের আটার রুটি খাইনি। এমন ভুনা মাংসের সঙ্গে খুব ভালো লাগত”… অতিথির মুখে এই কথা শুনে আমি রাগে দাঁত কিড়মিড় করতাম। মা দূরের বকুল গাছটার দিকে অলসভাবে তাকিয়ে থাকত।
নির্লজ্জ অতিথি বলতেন “রাতে ভাত খাব না। এই মাংস দিয়ে আলোচালের রুটি খাব।” এ কথা শোনার পর আমাদের মাথায় দুবার বাজ পড়ত।
১) অতিথি রাত্রিবাস করবেন, ব্যাপারটা নিশ্চিত হয়ে যেত।
২) কঠিনতম প্রক্রিয়ায় মাকে দীর্ঘক্ষণ ধরে আতপ চালের রুটি বানাতে হবে… এই ভয়ঙ্কর খাটনির আগাম আভাস পাওয়া যেত।অতিথির মধ্যে যদি জামাই শ্রেণির কেউ থাকতেন তাহলে গৃহিণীর তো দুঃখের শেষ থাকত না! নতুন জামাই হোক বা দাঁত পড়ে যাওয়া অশীতিপর জামাই… খাতিরদারির কোনও ত্রুটি থাকা চলত না। দুপুরে সরু চালের ভাতের সঙ্গে আলাদা একখান বিশেষ পদ সেই জামাইয়ের সামনে রাখা বাধ্যতামূলক ছিল। তখন বেশিরভাগ সময় জামাইস্থানীয় আত্মীয়কে আস্ত মুরগির রোস্ট দেওয়া হত। ওই যে মুর্গ মুসল্লম বলে না…ওইটা! সেইসময় পোলট্রি বাজারে আসেনি। গাঁয়ে-ঘরে পালা দেশি মুরগিই একমাত্র সম্বল ছিল।
গাঁয়ের একটু ভেতরের দিকে গিয়ে দরিদ্র গ্রামবাসীদের কাছ থেকে ন্যায্য মূল্যে মুরগি বা ডিম সংগ্রহ করতে হত। আজকের দামের হিসেবে বিশাল সস্তা।
বেশ কচিপানা একখান মুরগি কিনে আনতে হত মুর্গ মুসল্লমের জন্য। ঘরেই পালক ছড়িয়ে পরিষ্কার করে নিয়ে আস্ত মুরগির গা কাঁটা চামচ দিয়ে ফুটো ফুটো করে নিতে হত। তারপর মুরগিটাকে আদা রসুনবাটা, মিষ্টি দই, নুন দিয়ে অনেকক্ষণ ধরে ম্যারিনেট করে রাখতে হত।
এবার একটা কড়াইতে কিছুটা খাসির কিমা বিভিন্ন রকম মশলা দিয়ে কষিয়ে শুকনো শুকনো করে নিতে হত। বাসমতি চালের ভাত করে তাতে কিশমিশ, কাজু, পেস্তা, জায়ফল জৈত্রির গুঁড়ো মেশাতে হত। এবারে মাংসের কিমা ভাতের সঙ্গে মিশিয়ে সেটা মুরগিটার পেটের মধ্যে ভরে দিতে হত। মুরগির গলাটা টেনে পেটের মধ্যে ঢুকিয়ে ডানাসহ সুতো দিয়ে বেঁধে দিতে হত।
তারপর বড় পাত্রে ঘি গরম করে মশলা দিয়ে মুরগিটাকে অল্প আঁচে এ পিঠ ও পিঠ করে রান্না করা। জামাইরা হ্যাংলা আর নির্লজ্জ হলেও যেহেতু রাক্ষস ছিলেন না তাই ওই পুরভরা আস্ত মুরগি খেতে পারতেন না। মুরগির পা, পিঠ খুবলে খুবলে খেয়ে রেখে দিতেন। কচি বা মাঝারিবয়সি জামাইরা বউ-বাচ্চা সঙ্গে নিয়ে আসতেন। বাপের খাওয়া হলে বাচ্চারা সেই ছেঁড়াখোড়া মুরগির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ত হুলোর শিকার ধরার স্টাইলে। ওদিকে হুলো মেনিদের মা একটু দূরে দাঁড়িয়ে আহ্লাদে গদগদ হয়ে লেজ নাড়িয়ে ব্যাপারটা এনজয় করত। আমার মা মেহেমানদারি করতে করতে অবশ হয়ে যেত। প্রচুর খাবার নষ্ট হত।
তখন অতিথি খান বা না খান থালায় সব খাবার তুলে দিতেই হত। নইলে অতিথি ভাবতেন তাঁকে অসম্মান করা হচ্ছে।এখন অতিথিদের মানসিকতা অনেকটাই পাল্টে গেছে। এখন গৃহকর্তা বা গৃহকর্ত্রীকে অতটা বিব্রত করেন না তাঁরা। যে যে খাবার পরিবেশন করা হয় তাঁদের সামনে, সেগুলো তাঁরা পছন্দমাফিক চামচ দিয়ে নিজেদের প্লেটে তুলে নেন। তেমনই অতিথিদের জন্য তিনটি রেসিপি থাকল আজ…

গোটা রসুনে খাসির মাংস
উপকরণ- খাসির মাংস ৫০০ গ্রাম, পেঁয়াজ বাটা ১ টেবিল চামচ, ২ টি ঝিরিঝিরি করে কুচনো পেঁয়াজ, ৫ টা মাঝারি সাইজের গোটা রসুন, ২চা চামচ আদা বাটা, হলুদ গুঁড়ো আধ চা চামচ, শুকনো লংকা গুঁড়ো ১ চা চামচ, জিরে গুঁড়ো ২চা চামচ, গোটা শুকনো লংকা ২ টো, ৪ টে ছোটো এলাচ, ৪ টে লবঙ্গ, ১ টা দারুচিনি, ১ টা তেজপাতা, সর্ষের তেল, নুন পরিমাণ মত।প্রণালী- হাঁড়িতে সর্ষের তেল গরম করে তেজপাতা, শুকনো লংকা আর আস্ত গরম মশলা ফোড়ন দিতে হবে। তারপর পেঁয়াজ কুচি ব্রাউন করে নিয়ে পেঁয়াজ বাটা, আদা বাটা দিয়ে একটু নেড়ে নিয়ে মাংস দিয়ে দিতে হবে। নুন, হলুদ, জিরের গুঁড়ো দিয়ে মাংসটাকে কষাতে হবে। ৪ কাপ গরম জল দিয়ে আঁচ কমিয়ে মাংসের হাঁড়ি ঢেকে দিতে হবে।মাংস অর্ধেক সেদ্ধ হলে গোটা রসুনগুলো ধুয়ে মাংসে দিয়ে দিন। এবার মাংস প্রেশার কুকারে দিয়ে দুটো সিটি দিলেই রেডি। খাওয়ার সময় রসুনগুলো আস্ত থাকবে। অথচ হাত দিলে মাখনের মত। আর খেতে? দুর্ধর্ষ।

মেথি মুরগি
উপকরণ: মুরগির মাংস ৫০০ গ্রাম, দই হাফ কাপ, পেঁয়াজ কুচি এক কাপ, রসুন সাত কোয়া, আদা ছোটো একটা খণ্ড, হলুদ গুঁড়ো আধ চা চামচ, ধনে গুঁড়ো ১ চা চামচ, শুকনো লংকা গুঁড়ো ১ চা চামচ, টমেটো হাফ কাপ, কসুরি মেথি ১ টেবিল চামচ, ধনেপাতা অল্প, ছোটো এলাচ ৩টে, বড় এলাচ ১ টা, লবঙ্গ ২ টো, দারচিনি ১ টা, তেজপাতা ১ টা, জয়িত্রি এক চুটকি। কাঁচা লংকা ৩ টে। নুন এবং ঘি পরিমাণমত।প্রণালী: মাংসে নুন আর টক দই মাখিয়ে ৩০ মিনিট জারিয়ে রাখুন। রসুন আর আদার খোসা ছাড়িয়ে কুচি কুচি করে কাটুন। কিছুটা আদা সাজানোর জন্য দেশলাই কাঠির মত লম্বা এবং ঝিরি ঝিরি করে কেটে নিন। কাঁচা লঙ্কার বীজ ফেলে লম্বালম্বিভাবে কেটে রাখুন। টমেটো এবং ধনেপাতা কুচিয়ে নিন।
এবার একটা হাঁড়িতে ঘি গরম করে গরম মশলা ফোড়ন দিন। পেঁয়াজ কুচি সোনালি করে ভাজুন। এবার কুচনো আদা রসুন আর কাঁচা লংকা দিন। আধ কাপ জল দিয়ে মশলা কষিয়ে টমেটো দিন। মশলা থেকে তেল ছেড়ে এলে দই দিয়ে ম্যারিনেট করা মাংস হাঁড়িতে ঢেলে দিন। হাঁড়ি ঢেকে দিয়ে কম আঁচে মাংস নরম হতে দিন। জল লাগলে হাফ কাপ গরম জল দিন। মাংস সেদ্ধ হয়ে এলে এতে কসুরি মেথি, ঝিরি ঝিরি করে কাটা আদা আর ধনেপাতা ছড়িয়ে ঢাকা দিয়ে দিন।
এবার আটার লেচি বানিয়ে হাঁড়ির মুখটা আটা দিয়ে সিল করে দিন। তাওয়া গরম করে ঢিমে আঁচে হাঁড়িটা তাওয়ার ওপর বসিয়ে মিনিট দশেক দম দিন।

গুলাব কা ক্ষীর
উপকরণ: দুধ ১ লিটার, শুকনো গোলাপের পাপড়ি ২ টেবিল চামচ, কাজুবাদামের গুঁড়ো ২ চা চামচ, চিনি পরিমাণমত।
প্রণালী- গোলাপের পাপড়ি দুধে মিশিয়ে দুধ ফোটাতে হবে। দুধ গাঢ় হয়ে যখন অর্ধেক পরিমাণ হয়ে যাবে তখন কাজুর গুঁড়ো আর চিনি মেশান। বেশ থকথকে হয়ে এলে আঁচ থেকে নামিয়ে ঠান্ডা করে ফ্রিজে রেখে দিন। টাটকা গোলাপ পাপড়ি ছড়িয়ে সার্ভ করুন।

লেখিকা পেশায় স্কুলশিক্ষিকা, ভালোবাসেন রকমারি রান্না আর রন্ধনবিষয়ক আড্ডা।

বাংলার হেঁশেল- শাপলার তিন পদ

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More