কোভিডের মাঝেও দরজা খুলে রেখেছে লাদাখ

অয়ন গঙ্গোপাধ্যায়

গিরিবর্ত্মের দেশ লাদাখ। ভারতের শিরস্থানে অবস্থিত প্রকৃতির এই নন্দনকাননের পথে-প্রান্তরে ছড়িয়ে আছে অজস্র দ্রষ্টব্য। জম্মু কাশ্মীরের গা-ছোঁয়া লাদাখ এখন কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল। গ্রেট হিমালয় বিভাজিকা পেরোলেই লাদাখের সীমানা শুরু। জাঁসকার – লাদাখ – কারাকোরাম গিরিশ্রেণির ঘেরাটোপে বন্দি এই স্বপ্নিল দুনিয়ায় ছড়িয়ে আছে অজস্র সরোবর। লাদাখবাসীর অধিকাংশই বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। তাই এখানে গড়ে উঠেছে একাধিক বৌদ্ধ মনাস্ট্রি।

রূপসি লাদাখ

জুন থেকে সেপ্টেম্বর লাদাখের ভ্রমণ মরশুম। করোনাকালেও লাদাখের দরজা পর্যটকদের জন্য খোলা রয়েছে। তবে মানতে হবে কোভিড বিধি আর সঙ্গে রাখতে হবে প্রবেশের ৭২ ঘণ্টা আগে করা কোভিড RTPCR নেগেটিভ রিপোর্ট। সম্প্রতি জারি হওয়া নির্দেশিকায় বলা হয়েছে ভারতীয় পর্যটকদের লাদাখ ভ্রমণে ইনারলাইন পারমিট লাগবে না।
লাদাখের প্রধান শহর লে। একে কেন্দ্র করেই চারপাশ ঘুরতে হবে। দিল্লি থেকে নিয়মিত বিমান যাচ্ছে লে-র পথে। সময় লাগে সোয়া এক ঘণ্টা। সড়ক পথেও গাড়িতে লে যাওয়া যায় শ্রীনগর (৪৩৪ কিলোমিটার) ও মানালি (৪৭৩ কিলোমিটার) থেকে।

লাদাখের পথে

এ এক রোমাঞ্চকর পথযাত্রা। লে জেলাসদর শহর। চারপাশে পাহাড় ঘেরা। অদূরে বইছে ইতিহাসখ্যাত সিন্ধু নদ। লে শহর ও তার চারদিকে ঘুরতে এখানে দিন তিনেক থাকুন। রুক্ষ পাহাড়ি সৌন্দর্য লাদাখের প্রকৃতিকে সযত্নে সাজিয়ে তুলেছে। লে থেকেই দেখা যায় লাদাখ পর্বতমালার স্তোক কাংড়ি হিমশৃঙ্গ।
লে শহরের মাঝে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে লে প্রাসাদ। এর গঠনশৈলীতে লাসার পোতালা প্রাসাদের মিল রয়েছে। অদূরেই টিলার ওপর ভগ্নপ্রায় সেমো দুর্গ। শহরের অন্যান্য দ্রষ্টব্য জামিয়া মসজিদ, শংকর গুম্ফা, শান্তি স্তুপ, হল অফ ফেম মিউজিয়াম। শহরের বাইরে স্পিতুক গুম্ফা, স্টাকনা গুম্ফা, শে প্রাসাদ দেখে চলে আসুন থিকসে গুম্ফায়। টিলার ওপর দৃষ্টিনন্দন এই গুম্ফায় রয়েছে অপরূপ এক বুদ্ধ মূর্তি।

থিকসে গুম্ফা

দেখে নিন সিন্ধু নদের তীরে সিন্ধু দর্শন নদীঘাট। লাদাখের সর্ববৃহৎ বৌদ্ধ গুম্ফা হেমিস অবশ্যই দেখবেন। এখানেই অনুষ্ঠিত হয় বিখ্যাত হেমিস সেচু উৎসব। এছাড়াও নিমুতে সিন্ধু ও জাঁসকার নদীর মিলনস্থল,
পাথারসাহিব গুরুদ্বার, ম্যাগনেটিক হিল, স্তোক প্রাসাদ প্রভৃতি লে থেকেই দিনে দিনে দেখে নেওয়া যায়।
এবার চলুন লাদাখের জনপ্রিয়তম স্পট প্যাংগং হ্রদ দেখতে। লে থেকে দূরত্ব ১৫৪ কিলোমিটার। অনবদ্য প্রকৃতির মধ্যে দিয়ে সফর। যাত্রাপথে দেখে নিন চেমড়ে গুম্ফা, শাকতি গ্রাম, চাংলা পাস।

প্যাংগং লেক

প্যাংগং পৌঁছে প্রথমদর্শনে এর রূপ দেখে চমকে যাবেন। বিশাল হ্রদ। তবে এর বেশিরভাগই চিনের অধীনে। হ্রদের ধারে স্পাংমিক গ্রামে বিলাসবহুল তাঁবুতে রাত কাটানোর ব্যবস্থা রয়েছে। লাদাখের আর এক সুন্দর হ্রদ সো মোরিরি। লে থেকে দূরত্ব ২৪০ কিলোমিটার। এখানেও হ্রদ লাগোয়া কোরজোক গ্রামে গেস্ট হাউস বা তাঁবুতে রাত কাটানো যায়।
যাত্রাপথে চুমাথাং
 উষ্ণপ্রস্রবণ আর নামসাংলা পাস পেরিয়ে এখানে পৌঁছতে হবে। এই হ্রদ লাগোয়া রুক্ষ পাহাড়ি প্রকৃতির ফাঁক দিয়ে উঁকি মারে তুষারশৃঙ্গ। প্যাংগংয়ের মতো এই হ্রদের জলেও সূর্যালোকে রং-বদলের খেলা অপরূপ।

সো মোরিরি হ্রদ

লাদাখের মায়াবী রূপ দেখতে পাড়ি দিন নুব্রা উপত্যকায়। এপথে প্রথমেই চড়তে হবে দুর্গম খারদুংলা পাসের মাথায়। সেখানে ছড়িয়ে থাকে বরফের চাদর। চারপাশে অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। লে থেকে ১২০ কিলোমিটার যাত্রা শেষে পৌঁছবেন নুব্রা উপত্যকার দেসকিট গঞ্জে। এখানে বয়ে চলেছে শিয়ক আর নুব্রা নদী। উপত্যকার একাংশে চাষাবাদ হচ্ছে। সবুজ প্রকৃতির মাঝে থাকার জন্য রয়েছে হোটেল, গেস্টহাউস, সুইস ক্যাম্প। সামনেই কারাকোরাম পর্বতমালার হাতছানি।

নুব্রা ভ্যালির সবুজ সৌন্দর্য

দেসকিটে রয়েছে খাদান তাসিচোলিং গুম্ফা। তার কাছেই খোলা আকাশের নীচে স্থাপিত অতিকায় বুদ্ধমূর্তি। দেসকিট থেকে ৭ কিলোমিটার এগোলেই হুন্ডার গ্রাম। এদিকে ছড়িয়ে সাদা বালির শীতল মরুপ্রান্তর। দেশের একমাত্র এখানেই দেখা মেলে দু-কুঁজওয়ালা ব্যাকট্রিয়ান উট। এতে চড়ে বালিয়াড়িতে ঘোরা যায়। হুন্ডার থেকে ঘুরে আসুন ৭৭ কিলোমিটার দূরে সীমান্তবর্তী তুরতুক গ্রাম। এছাড়াও নুব্রায় সুমোর, পানামিক গ্রামও দেখে আসা যায়। নুব্রায় একরাত কাটিয়ে পরদিন আবার ফিরে আসুন লে শহরে।

কোথায় থাকবেন:

লে ➖ নোবেল হাউস, লুম্বিনী, লাদাখ ইন, স্পিক ইন স্প্যান, লা রিমো
প্যাংগং হ্রদ ➖ প্যাংগং রিট্রিট ক্যাম্প, রিগাল ক্যাম্প, হুইসপারিং ওয়েভস ক্যাম্প, হিমালয়ান উডেন কটেজ
সো মোরিরি হ্রদ ➖নোম্যাডিক ক্যাম্প, সো মোরিরি ক্যাম্প, লেক ভিউ গেস্টহাউস
নুব্রা উপত্যকা ➖ হোটেল ওলাথাং, হোটেল স্নো লেপার্ড, নুব্রা এথনিক ক্যাম্প, হুন্ডার সরাই ক্যাম্প

খরচ কেমন:

লে থেকে লেখায় দেওয়া জায়গাগুলো ঘুরতে সর্বমোট গাড়ি ভাড়া লাগবে আনুমানিক পঞ্চাশ হাজার টাকা । এখানে ঘুরতে বড় গাড়ি প্রয়োজন। একটি গাড়িতে ছয় জন যাত্রী নেবে ।
লাদাখে থাকা খাওয়া ঘোরা নিয়ে দুজনের খরচ হবে প্রায় এক লাখ টাকা ।

ছবি: সুবীর কাঞ্জিলাল

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More