পুজো থেকে বিয়ে, বাঙালি জীবনের সাতকাহনে জড়িয়ে আছে আলতা অনুষঙ্গ

0

 চকিতা চট্টোপাধ্যায়

“…. কার ললাটে সিঁদুর নিয়ে
ভোরের রবি ওঠে
আলতা পরা পায়ের ছোঁয়ায়
রক্তকমল ফোটে…”

    বিখ‍্যাত গায়ক সুধীরলাল চক্রবর্তীর জনপ্রিয় গানের লাইনেই শুধু নয়, বাংলা সাহিত্যের বৈষ্ণব পদাবলীর একাধিক পদকর্তা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল, বিভূতিভূষণ বন্দ‍্যোপাধ‍্যায় প্রমুখ কবি সাহিত‍্যিকদের লেখায় বারেবারেই এসেছে এই আলতার প্রসঙ্গ— যা শুধুমাত্র একটি প্রসাধনীই নয়, এককালে ছিল বাঙালির জীবনের অবশ্যম্ভাবী এক অঙ্গ!
বতর্মানে আলতা
 তরল অবস্থায় শিশিতে পাওয়া যায় তবে প্রাচীনকালে আলতা পাতা ব‍্যবহার করা হত। মা দুর্গার নবপত্রিকার অধিবাসে, মা লক্ষ্মীর ঝাঁপি বা চুবড়িতে ধান, কড়ি, সিঁদুরের সঙ্গে সঙ্গে আজও আলতাপাতা রাখা হয় আলতাপাতা হল তিন ইঞ্চি পুরু পাতলা লাল রঙের তুলো, যা দশ বারোটি ওপর ওপর রেখে একটি কাগজ দিয়ে জড়িয়ে রাখা হত এই তুলো এক একটি ছাড়িয়ে নিয়ে বাটির জলে ডুবিয়ে পায়ে বুলিয়ে দিলেই উজ্জ্বল লাল রঙের রেখা ফুটে উঠত।
এরপর
এল পানের রস, কুমকুম, সিঁদুর গুলে আলতা তৈরির চল্ তারও পরে আলতা তৈরি করা হত লাক্ষা দিয়ে পরবর্তীকালে ‘বেঙ্গল রোজ’ নামক কেমিক্যাল দিয়েই তৈরি করা হয়ে থাকে তরল আলতা।
দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ পূর্ববঙ্গের ফরিদপুর থেকে বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে যখন
 কলকাতায় এলেন, তখন তিনি আলতাসিঁদুরের ব‍্যবসা শুরু করেছিলেন তাঁর বিখ্যাত ব্র‍্যান্ডটির নামরাঙাজবা’

আলতা যদিও ‘এয়োস্ত্রী’ বা সধবা নারীর অন‍্যতম ভূষণ, কিন্তু কুমারী মেয়েদের মধ্যেও আলতা পরার রেওয়াজ ছিল। তাইতো দেখি ‘পথের পাঁচালি’র দুর্গা মা লক্ষ্মীর চুবড়ি থেকে আলতাপাতা লুকিয়ে নিয়ে নিজের কাছে রেখেছিল। হরিহর মেয়ের এই শখের কথাটা জানত, তাই শহর থেকে ফেরার সময় দুর্গার জন্য নতুন শাড়ির সঙ্গে আলতাপাতাও এনেছিল।

কিন্তু, এই আলতা পরার চল্ কবে থেকে শুরু হয়েছিল সে বিষয়ে সঠিক কোনও উৎস জানা যায়না। পাওয়া যায় কিছু প্রথার কথা। আগেকার দিনে যুদ্ধ তো লেগেই থাকত। যখন যে দেশ যুদ্ধে হেরে যেত, সেই দেশের নারীদের বন্দি করে তাদের পায়ে আর কপালে তাদের স্বামী, পিতা বা রক্ষাকর্তা পুরুষের কাটা শরীরের রক্ত মাখিয়ে দেওয়া হত। সবশেষে সেই নারীদের হাতে লোহার বেড়ি পরিয়ে তাদের টানতে টানতে বিজয়ী রাজ‍্যে নিয়ে যাওয়া হত সবার চোখের সামনে দিয়ে!

রক্তের সঙ্গে আলতার সাদৃশ্যের কারণে আলতাকে নারীর ঊর্বরতা, সুখ ও সমৃদ্ধির প্রতীক বলে মনে করা হত বলেও হয়তো নারীর শরীরে এই রক্তসদৃশ লাল রং লাগানোর প্রথার সৃষ্টি হয়েছিল!
ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে যেমন দক্ষিণভারত, মহারাষ্ট্র, আসাম বিহারে মেয়েবৌদের প্রসাধনী হিসেবে আলতা একসময় অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল ভারতের শাস্ত্রীয় নৃত্যের সাজে আলতা পরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভারতনাট্টম, কুচিপুরি, ওড়িশি, কত্থক, মণিপুরী সমস্ত ধ্রুপদী নৃত্যেই নারীপুরুষ উভয় শিল্পীরাই আলতা ব‍্যবহার করে থাকেন তাঁদের হাতে এবং পায়ে পরবর্তীকালে রবীন্দ‍্রনৃত‍্য ধামাইল নৃত্যের শিল্পীদের মধ্যেও আলতা পরার রেওয়াজ শুরু হয়এর অন‍্যতম কারণ আলতা রাঙা হাত, হাতের আঙুল  পায়ের সাহায্যে সৃষ্ট নাচের বিভিন্ন মুদ্রা দূর থেকে দর্শকদের দৃষ্টি ও মনোযোগ আকর্ষণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে

সারাবছর বিশেষ বিশেষ তিথিতে আলতা পরা ছিল একসময় অবশ্য কর্তব্য। তার মধ্যে পয়লা বৈশাখ, অক্ষয় তৃতীয়া, পয়লা ফাল্গুন, দুর্গা পুজোর চার দিন, লক্ষ্মীপুজো এবং লক্ষ্মীবার অর্থাৎ বৃহস্পতিবার এবং অবশ্যই গায়েহলুদ ও বিয়ের অনুষ্ঠানে। অক্ষয় তৃতীয়ার দিন একজন সধবা নারী যদি অন্য সধবা নারীকে আলতা পরিয়ে হাতে মিষ্টির থালা দিয়ে প্রণাম করে তাহলে তার নিজের সিঁথির সিঁদুর অক্ষয় হয়, এমন প্রচলিত নিয়ম ছিল।
কনেবৌ যখন প্রথম শ্বশুরবাড়িতে পা রাখে, তখন দুধে আলতার থালায় পা ডুবিয়ে একটি সাদা কাপড়ে আলতা পরা পায়ের প্রথম ছাপ ফেলতে ফেলতে শ্বশুরবাড়িতে ঢুকতে হয় এই পায়ের চিহ্নকে মা লক্ষ্মীর পায়ের চিহ্ন স্বরূপ গণ‍্য করা হয়ে থাকে অর্থাৎ নতুন বৌ তার গৃহলক্ষ্মীর আসনটি এই প্রথা পালনের মাধ্যমে চিরস্থায়ী করে নেয় শ্বশুরবাড়িতে পা রাখার পর নতুন বৌকে পরিবারের সমস্ত সধবা নারীদের নিজে হাতে আলতা পরিয়ে দিতে হয়এটা একধরনের স্ত্রীআচারের মধ্যে পরে প্রথা আজও আছেকলকাতার কোনও কোনও সুবর্ণবণিক পরিবারে নতুন বৌকে আলতা-গোলা চৌবাচ্চার ভেতরে বসিয়ে দেওয়ার রেওয়াজ এককালে ছিল বাড়ির পুরুষরা বিয়ে করতে যাওয়ার সময় দু পায়ে আলতা পরতেন এবং পায়ের পাতার ওপর গোল সূর্যের প্রতীক আঁকতেন আলতা দিয়ে

আলতা পরার ব‍্যবহারিক কারণটি হলো গ্রামবাংলায় মেয়েদের ঘরে, মাঠে ও গোয়ালে কাজ করতে হতো। ফলে হাজা জাতীয় ছত্রাকের কবলে পরতেন তাঁরা। আলতা ব‍্যবহার শুরু হয়েছিল আয়ূর্বেদিক ওষুধ হিসেবে। সারা বছর পায়ে আলতা পরলে হাজা ভালো হয়ে যেত আর শরীরও ঠাণ্ডা থাকত।

এখন যে আলতার বাক্স পাওয়া যায় তাতে শিশির সঙ্গে থাকে একটা ছোট্ট বাটি আর একটা মোটা তার, যার ডগায় থাকে একটা স্পঞ্জের টুকরো তুলি হিসেবে।

এই আলতা পরাকে কেন্দ্র করেই নারী কিন্তু একসময় খুঁজে পেয়েছিল রোজগারের একটা পথ। বনেদিবাড়িতে প্রতি বৃহস্পতিবার ও পূর্ণিমাতে আসতেন ‘আলতাবৌ’। এঁরা বাড়ির এয়োস্ত্রীদের পায়ে ঝামা ঘষে মরামাস তুলতেন, নরুণ দিয়ে নখ ও কড়া কেটে দিতেন, তারপর আলতা পরিয়ে দিতেন। বয়স ও সম্পর্ক অনুপাতে আলতা পরানো হত। তারও আবার নিয়ম ছিল। বড়রা আগে পরবে। কারণ ছোটোদের পায়ে লাগানোর পর সেই বাটিতে সেই তুলি কিংবা বুড়ো আঙুল ডুবিয়ে বড়দের পায়ে ছোঁয়ালে যে ছোটোদের ‘পাপ’ হবে! সবাইকে আলতা পরানোর পর বাড়ির ছো্টো ছেলে ও মেয়েদেরও পরিয়ে দিতেন এই আলতাবৌরা। পায়ে আলতা পরানোর শেষে ডানহাতের পাতার নীচের দিকে একটা আলতার টিপ দেওয়ার প্রথা ছিল। এই কাজের বিনিময়ে তাঁরা পেতেন নগদ অথবা মাসকাবারি টাকা।

সধবা নারীর মৃত্যুর পর তার পায়ের শেষ চিহ্ন তুলে রাখা হত আলতার ছাপ দিয়ে। এই প্রথা অবশ্য পরিবারের পুরুষ সদস‍্যদের প্রতিও প্রযোজ‍্য ছিল, তবে বিধবা নারীদের ক্ষেত্রে নয়।

সব শেষে বলি, আমরা সদ‍্য পেরিয়ে এলাম বিসর্জনের ক্ষণটিকে। মা দুর্গার দর্পণ বিসর্জনের পর দুধে-আলতায় সেই শরৎশশীর মুখ ও শ্রীচরণ দর্শন করা যে আমাদের বাঙালিদের বড় আপন এক প্রথা, যার সঙ্গেও আলতার অঙ্গাঙ্গী যোগ! আলতা আমাদের জীবনের সুখে, দুঃখে, আনন্দে, বেদনায়, সমৃদ্ধিতে, আরাধনায় মিশে আছে চিরকাল— আমরা চাইলে অযথা তার বিকল্প না খুঁজে সেই আলতাকেই আমাদের জীবনের নিবিড় অঙ্গ করে আজও রাখতে পারি!

লেখিকা সুপরিচিত গদ্যকার ও বাচিক শিল্পী। মতামত তাঁর নিজস্ব।

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.