ভাঙা গড়ার খেলায় দেবলীনা তথাগত, দুজনের মাঝে তৃতীয় কেউ?

0

দেবলীনা ও তথাগত দুজনকেই কাজের সূত্রে অনেক বছর ধরে খুব কাছ থেকে দেখেছেন সোমা লাহিড়ী। সম্প্রতি দুজনের সম্পর্কের ভাঙন নিয়ে এবার কলম ধরলেন তিনি…

বছর দুয়েক আগে একটা ফোটোশ্যুটে সকাল থেকেই আমার সঙ্গে কাজ করছিল দেবু , মানে দেবলীনা দত্ত মুখোপাধ্যায়। লাঞ্চব্রেকে ওর সঙ্গে দেখা করতে এল একটি মেয়ে। দেবু আলাপ করিয়ে দিয়ে বলল, “ও বিবৃতি। তথার ‘ভটভটি’ ছবিতে কাজ করছে। খুব ভালো কাজ করছে গো। ওকে তোমাদের ফ্যাশন শ্যুটে নিও প্লিজ। ইনফ্যাক্ট তোমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেব বলেই বিবৃতিকে এখানে আসতে বলেছিলাম।” বলতে বলতে মেয়েটিকে জড়িয়ে ধরে আদর করছিল দেবলীনা। একেবারে ছোট বোনের মতো করে।
দিনকয়েক আগে দেবলীনা-তথাগতর ব্রেকিং নিউজটা পড়ে এই দৃশ্যটাই চোখের সামনে ভেসে উঠল।
আরও অনেক কথাই মনে পড়ছে একে একে।মনে হয় ২০১২-১৩ হবে। মন্দিরে পুজো দেওয়া নিয়ে কোনও একটা কভার স্টোরির শ্যুট হবে। আমাদের আর্ট ডিরেক্টর ইন্দ্রদা (ইন্দ্রনীল ঘোষ) বললেন, দেবলীনাকে বল, আর সঙ্গে মানানসই একজন ছেলেকে ডেকে নাও কভার শ্যুটের জন্য। আমি দেবুকে বললাম, তোমার সঙ্গে মানাবে এমন একজন ছেলের নাম বল প্লিজ। কভার শ্যুটে লাগবে।
দেবু হাসতে হাসতে বলল, তথাকে বলবো? তথাগত মুখোপাধ্যায়। সিরিয়ালে অভিনয় করছে আমার সঙ্গে। আমার থেকে অনেক ছোটো, কিন্তু মানাবে ভালোই। তোমাদের শ্যুটের জন্য পারফেক্ট ম্যাচ হবে।
সত্যিই পারফেক্ট ম্যাচ। খুব ভালো করে কাজ হল। দারুণ কভার হল। ফ্যাশন শ্যুটের কাজও অসাধারণ হল। ফোটোগ্রাফার, আর্ট ডিরেক্টর দুজনেই এক বাক্যে স্বীকার করলেন, দুজনেই ম্যাচ ফর ইচ আদার। দেবুর কাছে শুনেছি আমাদের ওই শ্যুট থেকেই নাকি ওদের প্রেমের সূত্রপাত।তথাগতকে দেখে আর সবার থেকে আলাদা মনে হয়। শান্ত, কথা কম বলে, আমাদের শ্যুটের সময় বই নিয়ে আসত। শটের মাঝে গ্যাপ থাকলেই মেকআপ রুমে বসে নানা ধরনের বই পড়তে দেখতাম। এই তো মাস ছ’য়েক আগে একটা ওয়েবিনারে এল দুজনে। গল্পে গল্পে মাতিয়ে দিল সন্ধে। মনে হল কী সুন্দর বন্ডিং দুজনের!

তথাগতর লেখার হাত খুব ভালো। ছবি তোলে অসাধারণ। দেশ বিদেশে বেড়ানোর নেশা দুজনেরই। আফ্রিকার কয়েকটা জঙ্গলে বেড়ানোর গল্প আর ছবি চেয়েছিলাম তথার কাছে। দিয়েছিল একটা পার্ট আগস্টের মাঝামাঝি। ভিডিও লিংক দিয়েছিল আমাদের দ্য ওয়ালের ট্রাভেল সেকশনের জন্য ‘ডেস্টিনেশন দেবলীনা’ থেকে। ওখান থেকে নিলে লিগ্যাল কোনও সমস্যা হবে কিনা জানতে চেয়েছিলাম। এখনও হোয়াটসঅ্যাপে জ্বলজ্বল করছে তথার লেখা শব্দগুলো- “কিছু সমস্যা নেই। ওটা আমাদের চ্যানেল।”
অবাক লাগছে ১১ই আগস্ট যেটা ‘আমাদের’ ছিল, এই ক’দিনে সেটা…দেবুকে একটু আগে ফোন করেছিলাম। গলাটা খুব ক্লান্ত, ধরা ধরা। বলল, জানো তো সব। কী যে হল! ভাবতেই পারছি না। আমরা খুব ভালো ছিলাম জানো তো। মাস তিনেকের মধ্যে… তথা তো ওরকম নয়, আর বিবৃতিকে তো আমি খুব ভালবাসতাম…
বুঝতে পারলাম দেবুর গলা ধরে আসছে। বলল, “আমি কাউকে কিচ্ছু বলতে চাই না, এটা একেবারেই আমার নিজের ব্যাপার। কাজের মধ্যে আছি। ভালো থাকার চেষ্টা করব।”
জিগ্গেস করলাম, ‘তুমি কি ফ্ল্যাট ছেড়ে চলে গেছো?’
দেবু বলল, “না গো, এটা তো আমার ফ্ল্যাট। আমি আছি। তথা চলে গেছে।”
খুব খারাপ লাগছিল। কিচ্ছু করার নেই। আবার মনে হল করার আছে। তথাকে হোয়াটস অ্যাপ করলাম। এই প্রথম কোনও উত্তর পেলাম না। ঘণ্টাখানেক পর ফোন করলাম। এই প্রথম তথা আমার ফোন ধরল না। অবাক হলাম। বরং দেবু অনেকসময় ফোন ধরত না, তথাকে বলতাম দেবু ফোন ধরছে না ওকে কল করতে বলো। তাহলে কি তথা আমাকে ফেস করতে চাইল না!  ব্যস্ত ছিল কি? ওর কথা ওর মুখ থেকে শোনা দরকার ছিল।বিবৃতিকে আমি চিনি না। একবারই দেখেছি। অন্য একটি সংবাদমাধ্যমে তার বিবৃতি পড়লাম। সে বলেছে, স্বামী-স্ত্রীর (প্রেমিক -প্রেমিকা) সম্পর্কের মাঝে তৃতীয় ব্যক্তি ঢুকে পড়লে সম্পর্ক নষ্ট হয়- এমন কথা তার জানা নেই এবং সে বিশ্বাস করে না। তাহলে তো বিশ্ব সাহিত্য মিথ্যা হয়ে যায়! মিথ্যা হয়ে যায় শিল্প সৃষ্টির সব মাধ্যম। মিথ্যা হয়ে যায় সমাজ সংসারের সব জটিলতা। বিষয়টা তা নয়, আদিম আকর্ষণ আসতেই পারে যেকোনও নারী পুরুষের মধ্যে। কিন্তু রুচি, শিক্ষা আর আমাদের দেশের সনাতন সামাজিক পরম্পরা জোগায় সংযম শক্তি। আর এটাই তৃতীয়কে সরিয়ে দুটো মানুষকে বেঁধে রাখে।

বিবৃতি চট্টোপাধ্যায়

এরপরও যেটা থেকে যায়, তা হল জটিল মনস্তত্ত্ব। দুটো মানুষের মানসিক সম্পর্কের রসায়ন কেমন, তা বাইরে থেকে বোঝা সম্ভব নয়। হয়তো দুজনের মনের গভীরে এমন কিছু আছে যা তথাগতর মতো ইনট্রভার্ট মানুষের পক্ষে বলা সম্ভব নয়। এখানে রুচির প্রশ্নও এসে যায়। হয়তো দেবুর এমন কিছু সমস্যা আছে যা  ধীরে ধীরে তথাকে ওর থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। এ সবই আমার অনুমান মাত্র।
দেবু অনেক সময়েই অনেক ক্ষেত্রে আমার কাছে সাজেশন চাইত। এক্ষেত্রে চায়নি। তবু দুজনকেই বলি,  সারদা মা বলতেন, ”ভাঙতে তো সবাই পারে। গড়তে পরে ক’জন?” গড়া সম্পর্ককে আদরে লালন করাও একটা আর্ট। তোমরা আর্টিস্ট। তোমরা চেষ্টা করো। পারবে।

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.