গরম ভাতে বা সান্ধ্য আড্ডায়, জমে যাবে মুচমুচে শিউলি পাতার বড়া

দেবীমিতা বসু বেরা

শহুরে কংক্রিটের জীবনে শৈশবের স্মৃতিতে মিশে থাকা শিশিরের সকাল,শরতের আকাশে রবির সদ্য জেগে ওঠা,সবুজ গালিচার ওপর পড়ে থাকা শিউলি ফুল,মায়ের পুজোর জন্য সাজি ভরে সে ফুল তুলে নেওয়ার ক্যানভাসটায় হাতছানি দেয় আমার গ্রামবাংলা।

শিউলির স্নিগ্ধ রূপ,শান্ত সুগন্ধ পছন্দ করেন না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।

দুর্গাপুজো আর শিউলি ফুল তো একে অপরের প্রতীকী স্বরূপ। কিন্তু জানেন কি, মাইথোলজির বিভিন্ন অধ্যায়ে শিউলি ফুলের বিশেষ অবস্থানের উল্লেখ পাওয়া যায়। দেবী দুর্গার পুজো ছাড়াও শিউলি ফুলের অর্ঘ্য নিবেদন করা হয় ভগবান শ্রীবিষ্ণু, দেবী লক্ষ্মীর পুজোতেও। ভগবান বিষ্ণুর পুজোতে শিউলি ফুলের ব্যবহার হয় বলে একে হারসিঙ্গার বলা হয়। পৌরাণিক মত বলে রাম-সীতার ১৪ বছরের বনবাসে সীতা নিজেকে শিউলি ফুল দিয়ে সাজাতেন। দেবতা ও অসুরদের সমুদ্র মন্থনের বর্ণনাতেও এই গাছের উল্লেখ পাওয়া যায়, যা কিনা স্বয়ং ইন্দ্র স্বর্গে তাঁর বাগানে রোপণ করেছিলেন। হরিবংশ পুরাণে শিউলি গাছকে কল্পবৃক্ষ বলে বর্ণনা করা হয়েছে।

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণের পাশাপাশি আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায়, হোমিওপ্যাথিক ওষুধে ও অ্যারোমাথেরাপিতে শিউলির বহুল ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যায়।

নিম শুক্তো,উচ্ছে বা করলা দিয়ে রাঁধা শুক্তো তো খেয়েছেন, কিন্তু শিউলি শুক্তো খেয়েছেন কি?একবার বানিয়ে খেয়ে দেখুন সাবেকি শিউলি শুক্তো। এমন শুক্তো রাধার জন্য মা-ঠাকুমার হেঁশেল গল্পের সঙ্গী হন, আপনার ব্যস্ততার রোজনামচা থেকে কিছুটা সময় ওঁদের দিন– আপনার এই উৎসাহে বয়স্ক মানুষগুলো ক্ষণিকের একাকিত্ব ভুলবেন। বিনিময়ে আপনি শিখে যেতে পারেন শিউলি পাতার স্বতন্ত্র তিক্ত স্বাদের দরুণ সনাতনী শুক্তো রান্নায় কচি শিউলি পাতার ব্যবহার পদ্ধতিটি।

শিউলি পাতার বড়ার রেসিপিটিও খাসা। পোস্ত দানা-বেসনের ব্যাটারে শিউলি পাতা ডুবিয়ে ছাঁকা তেলে ভেজে নিন। সঙ্গে এক বাটি ডাল আর ধোঁয়া ওঠা সাদা ভাত। গরম ভাতের সঙ্গে শিউলি পাতার বড়ার স্বাদ আপনার জিভের স্বাদকোরককে দেবে পরম তৃপ্তি।

আমার শৈশব থেকে কৈশোরের বেড়ে ওঠায় মহালয়ার ভোর মানেই রেডিওতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের ভরা কণ্ঠে স্ত্রোত্র পাঠ–“আশ্বিনের শারদ প্রাতে বেজে উঠেছে মঙ্গল শঙ্খ”, সঙ্গে কালজয়ী শিল্পীদের গান “তব অচিন্ত্য রূপ জড়িত মহিমা” আর বাতাসে ভেসে আসা শিউলির সুবাস।

সময়ের বহমানতায় এখন আর সেই সবুজ প্রান্তর নেই, নেই সবুজ ঘাসের গালিচাও। এখন এসব অতীত। শুধুই স্মৃতির ক্যানভাস। তবে হ্যাঁ, আমার বর্তমানে দু’কামরার ফ্ল্যাটে একফালি ছোট্ট বারান্দা আছে যেখানে আলো-হাওয়ার অবাধ আনাগোনায় একবুক নিঃশ্বাস নিয়ে নিশ্চিন্ত আশ্রয় নিয়েছে সবুজেরা,  যেখানে নিস্তব্ধ দুপুরের সুর হয় রঙবেরঙের পাখির কলরবে। যেখানে ইতিমধ্যে শিউলিরা আলপনা সাজানো শুরু করে দিয়েছে–জানান দিচ্ছে দুগ্গা মায়ের পদধ্বনি। আর আমিও বারান্দা থেকে ভেসে আসা শিউলির সুগন্ধে মুহূর্তের স্বর্গ স্বাদে বিভোর হব বলে প্রতিবারের মত অপেক্ষায় মহালয়ার ভোরের।

অবাক হচ্ছেন তো ব্যালকনির টবে  শিউলি ফোটাবেন কি করে? কথাতেই তো আছে “ইচ্ছে থাকলেই উপায় হয়”।

 

কোন সময় শিউলি ফুল পাবেন?

আপামর বাঙালির কাছে শিউলি ফোটা শুরু মানেই দুর্গাপুজোর কাউন্টডাউন শুরু। সাধারণত শিউলি গাছ অগস্টের মাঝামাঝি থেকে জানুয়ারির মাঝ পর্যন্ত ফুল দেয়। সেপ্টেম্বর ও নভেম্বরে সবচেয়ে বেশি ফুল হয়। তবে কোনও কোনও গাছ সারাবছরই অল্পবিস্তর ফুল দিয়ে থাকে। নার্সারিতে অতি সহজে এমন গাছের কলমচারা পেয়ে যাবেন।

টবে শিউলি ফোটাবেন কী করে?

টবে শিউলি ফুল ফোটানোর জন্য কলমের চারাই শ্রেষ্ঠ। নার্সারি থেকে ছোট কলমচারা কিনে বা পাড়ার মোড়ের ফুল বিক্রেতা গাছ-দাদাটির থেকে চারা কিনে বারান্দায় বা ছাদে বসাতে পারেন এই গাছ। সঠিক সময়ে ফুল পেতে এপ্রিল মাসকে বেছে নিন।

সারাদিনে তিন থেকে চার ঘণ্টা পর্যাপ্ত আলো বাতাসযুক্ত আপনার বারান্দার কোণটি শিউলি গাছের জন্য আদর্শ। আর যদি ছাদবাগানের সুযোগ থাকে তাহলে তো কথাই নেই। প্রথম অবস্থায় চার থেকে ছয় ইঞ্চির টবে গাছটি প্রতিস্থাপন করতে হবে। গাছ একটু বড়ো হলে, গোড়া শক্ত হলে আট থেকে দশ ইঞ্চির টবে স্থানান্তরিত করতে হবে।

সর্ষের খোলজল, গোবর সার, চাল ধোওয়া জল, আপনার নিত্যদিনে রান্নায় ব্যবহৃত সব্জির খোসার মত জৈব সার শিউলি গাছের সেরা খাদ্য।

ফুল দেওয়া শেষ হলেই গাছের ডগার দিকের ডাল কেটে দেবেন। ডাল ছেঁটে দিলে আপনার ছোট্ট বারান্দায় সুখে শান্তিতে বেড়ে উঠবে শিউলি গাছ। তাছাড়াও এর দরুন গাছের গঠন আরও সুন্দর ও দৃষ্টিনন্দন হবে।

আপনার শিউলি টবের ওপরের অংশে শিকড় দেখা দিলে বুঝবেন শিকড় ছাঁটার সময় এসেছে। এই কাজটি নিজে পারলে তো খুবই ভাল,না পারলে পাড়ার গাছ বিক্রেতা দাদার সাহায্য নিন। এতে তারও কিছু উপরি আয় হবে।

অধিক আর্দ্রতায় কুঁড়ি ঝরে যাওয়ার সম্ভবনা আছে। তাই গোড়ায় যাতে কোনওভাবেই জল না জমে সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।

শিউলি গাছকে সাধারণ পোকামাকড় ও শুঁয়োপোকার উপদ্রব থেকে রক্ষা করতে প্রয়োজন শুধুমাত্র নজরদারি।  সাধারণ পোকামাকড়ের ক্ষেত্রে নিম পাতা ফোটানো জল ঠান্ডা করে স্প্রে করতে হবে আর শুঁয়োপোকার ক্ষেত্রে রাসায়নিক কীটনাশক স্প্রে করতে হবে। আর যদি দেখেন কোনও পাতার নীচে ছোট ছোট দানার মতো কিছু আছে,তাহলে জানবেন ওটি আসলে প্রজাপতির ডিম। এক্ষেত্রে পাতাটি ছিঁড়ে ফেলে দিতে হবে। তবে উৎসাহ ও ধৈর্য থাকলে,অনাবিল আনন্দ উপভোগ করতে চাইলে, ওই ডিমগুলো কাচের জারে সংগ্রহ করে পুনরায় প্রজাপতির রূপান্তর চাক্ষুস করতে পারেন–ইচ্ছে আপনার।

পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা ‘সুখপাঠ’

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More