সবুজের ছোঁয়ায় দূষণমুক্ত হবে ঘর, বাতাস পরিশুদ্ধ করবে এই গাছগুলি

দেবীমিতা বসু বেরা

বিপদে পৃথিবীর স্বাস্থ্য। অস্তিত্বের সংকটে সমগ্র প্রাণী জগৎ। নিরবচ্ছিন্নভাবে গাছ কাটা, মাত্রাতিরিক্ত প্ল্যাস্টিকের ব্যবহার, যানবাহন ও কলকারখানার কালো ধোঁয়ায় পৃথিবীর নিঃশ্বাসে বিষবাষ্প ভরে গেছে (Air Purification)।

তবে এমন ভাবার কোনও অবকাশ নেই যে শুধুমাত্র বাইরের জগতেই বিষাক্ত রাসায়নিক আছে। বরং আপাত পরিষ্কার আমাদের বাসস্থানটিতেও এমন অনেক ভয়ানক রাসায়নিক পদার্থ রয়েছে, যা কিনা আমাদের স্বাস্থ্যের পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকর। যেমন ধরুন, বাড়ির দেওয়ালে ব্যবহৃত রঙ, মশা মারার ধূপ, সুগন্ধি-প্রসাধনী সামগ্রী বা এয়ার ফ্রেশনারের মতো জিনিসগুলো রয়েছে রাসায়নিক পদার্থ। আর অজান্তেই, এই সকল রাসায়নিক থেকে নির্গত দূষিত বায়ু সরাসরি শ্বাস-প্রশ্বাসের মধ্যে দিয়ে গিয়ে মিশছে আমাদের শরীরে।

ইউএস এনভায়রনমেন্টাল প্রোটেকশন এজেন্সির মতে, ঘরের ভেতরের বাতাস বাইরের বাতাসের তুলনায় ২ থেকে ৫ গুণ বেশি দূষিত হয়ে থাকে। কিছুক্ষেত্রে এই দূষণের মাত্রা ১০০ গুণও হয়ে থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)-এর মতে, বিশ্বে তিন শতাংশ রোগ বাড়ির ভেতরের দূষিত বাতাসের কারণে হয়ে থাকে।

ভাবছেন তো পরিত্রাণের পথ। তাহলে বেছে নিন প্রাকৃতিক উপায়। স্বাস্থ্য ও সৌন্দর্য্যের মেলবন্ধন ঘটিয়ে বাড়ির ভেতরে স্থান দিন পরিবেশবান্ধব কিছু গাছকে, যারা ঘরের মধ্যে জমে থাকা বিষাক্ত বায়বীয় পদার্থ শোষণ করে এয়ার পিউরিফিকেশান বা বাতাস শুদ্ধিকরণের কাজ করবে। সোজা কথায়, প্রকৃতিকে হিল (heal) করুন প্রাকৃতিক উপায়েই।

নাসার ক্লিন এয়ার স্টাডি অনুসারে কিছু সাধারণ ইন্ডোর প্ল্যান্ট আমাদের বাড়ির বিষাক্ত গ্যাস যেমন ফর্মালডিহাইড, বেনজিন, অ্যামোনিয়া ইত্যাদি শোষণ করে ঘরের বাতাসকে প্রাকৃতিকভাবে বিশুদ্ধ করে।

আজকের প্রতিবেদনে রইল আমার সংগ্রহে থাকা এমনই কিছু এয়ার পিউরিফায়িং ইন্ডোর প্ল্যান্টের সুলুকসন্ধান–

১) স্নেক প্ল্যান্ট: কড়া রোদ হোক বা ছায়াযুক্ত স্থান কিংবা রুক্ষ মরুভূমি যে কোনও পরিবেশেই স্নেক প্ল্যান্ট বেড়ে উঠতে পারে। খুব অল্প খরচে টবে লাগানো যায় এই গাছ। নাসার গবেষণায় এই গাছ বাতাস পরিষ্কার করার জন্য শ্রেষ্ঠ। স্নেক প্ল্যান্ট ঘরের ভেতরের বিষাক্ত বাতাস থেকে অ্যামোনিয়া, বেনজিন, ফর্মালডিহাইড, ট্রাইক্লোরোইথিলিন, জাইলিন শোষণ করে নেয়। মূলত রাতের বেলায় এইসব গাছের অক্সিজেন ছাড়ার ক্ষমতা সর্বাধিক থাকে।

২) পিস লিলি: ইন্ডোর প্ল্যান্ট হিসাবে পিস লিলি বিশেষ জনপ্রিয়। নাসার গবেষণা থেকে জানা গেছে, এই গাছটি বিপজ্জনক বায়বীয় পদার্থ যেমন ট্রাইক্লোরোইথিলিন, ফর্মালডিহাইড, জাইলিন, বেনজিন ইত্যাদি শোষণ করে বায়ু শোধনে সাহায্য করে। পাশাপাশি গ্রীষ্মকালে এর চমৎকার সাদা ফুল আপনার বাড়ির অভ্যন্তরীন সৌন্দর্য্যকেও দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেবে।

৩) অ্যালোভেরা: অ্যালোভেরা আমাদের সকলের কাছেই এক পরিচিত নাম। বাতাস বিশুদ্ধকারী হিসাবে এই গাছের ভূমিকা অতুলনীয়। কিন্তু জানলে অবাক হবেন, যখন বাতাসে ক্ষতিকর রাসায়নিকের পরিমাণ খুব বেড়ে যায় তখন এই গাছের পাতায় ছোট ছোট বাদামি স্পট তৈরি হয়। এর ফলে আপনি সহজেই আপনার ঘরে থাকা বিষাক্ত পদার্থের মাত্রা বুঝে নিয়ে পারবেন। তাই আজই আপনার ঘরের পর্যাপ্ত সূর্যের আলো আসা স্থানটিতে জায়গা করে দিন অ্যালোভেরাকে।

৪) মানিপ্ল্যান্ট: বাস্তুশাস্ত্রে এই গাছের বিশেষ অবস্থান আছে। কিন্তু জানেন কি, এই গাছটি বাতাস থেকে বেনজিন, ট্রাইক্লোরোইথিলিন,ফর্মালডিহাইড শোষণ করে ঘরের বাতাসকে করে তোলে পরিশুদ্ধ। সুতরাং ঘরের যে কোনও কোণায় এই লতানো গাছটি রাখলে সুস্থ থাকবে আপনার ফুসফুস।

৫) পথোস: হৃৎপিণ্ডের মতো পাতা বিশিষ্ট ঝোপালো এই ইন্ডোর প্ল্যান্টটি বাতাস থেকে ফর্মালডিহাইড, কার্বমনোক্সাইড শোষণ করে ঘরের বাতাসকে করে তোলে স্বাস্থ্যকর।

৬) তুলসী গাছ: হিন্দু ধর্মে তুলসী দেবী রূপে পূজিত হন। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ ছাড়াও এর গুণাগুণ সম্পর্কে আলাদা করে কিছু বলার নেই। গবেষণায় জানা গেছে ঘরের ভেতরে এই গাছ রাখলে ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত অক্সিজেন সরবরাহ করতে পারে। পাশাপাশি বাতাস থেকে বিষাক্ত কার্বন-মনোক্সাইড, কার্বন-ডাই-অক্সাইড, সালফার-ডাই-অক্সাইড শোষণ করে ঘরের বাতাসকে করে বিশুদ্ধ।

৭) স্পাইডার প্ল্যান্ট: নাসার ক্লিন এয়ার স্টাডি থেকে জানা যায় এই গাছ ২৪ ঘণ্টা আবদ্ধ কাচের ঘরের বাতাস থেকে ৯৫ শতাংশ বিষাক্ত ফর্মালডিহাইড শোষণ করতে সক্ষম। এমনকি কার্বন-মনোক্সাইড, বেনজিন, চামড়া ও রাবার থেকে নির্গত বিষাক্ত বায়ু শুষে বাতাসকে করে তোলে পরিশুদ্ধ। নিশ্চিন্তে আপনার বাড়ির যে কোনও কোণে, বারান্দায় বা কর্মস্থলে রাখতে পারেন স্পাইডার প্ল্যান্টের একটি টব।

৮) জারবেরা: রঙবেরঙের জারবেরার ফুল যেমন বাগানের শোভা বাড়ায় তেমনই এই গাছ বিপুল পরিমাণ অক্সিজেন উৎপাদন ও বাতাস থেকে দূষিত বায়বীয় পদার্থ শোষণ করার ক্ষমতা রাখে।

সৌন্দর্য্য আর সুস্থ বাতাসের সমন্বয়ে আপনার চোখ ও মন যেমন আরাম পাবে তেমনই নিশ্চিন্তে একবুক বিশুদ্ধ বায়ুর পরশ পাবে আপনারই ফুসফুস।

পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা সুখপাঠ

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More