নীলনদের বুকে ইতিহাসের গন্ধমাখা জলবিহার

অয়ন গঙ্গোপাধ্যায়

বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন নদী-সভ্যতার নিদর্শন দেখতে শীতের মরশুমে বেড়াতে এসেছি মিশরে। পিরামিড সহ আরও কিছু দ্রষ্টব্য দেখে এবার গন্তব্য আসোয়ান। কায়রো থেকে রাতের আরামদায়ক ট্রেনে চেপে পরদিন ভোরে পৌঁছলাম নীলনদের তীরে আসোয়ান শহরে। ইতিহাসের গন্ধমাখা এই জনপদ থেকেই শুরু হবে অসাধারণ এক বিলাসী জলসফর। রেলস্টেশন থেকে গাড়িতে পৌঁছলাম খেয়াঘাটে। চোখের সামনে বয়ে চলেছে নীলনদ। তার ঘন নীল জলরাশির চারপাশে মনোরম প্রাকৃতিক শোভা। রুক্ষ টিলা পাহাড়ের ফাঁকফোকর দিয়ে উঁকি দিচ্ছে সবুজ গাছগাছালি। মিশরের এমন প্রাকৃতিক বৈপরীত্য নীলনদেরই দান। মরু প্রকৃতির সঙ্গে বিরাজমান নীল নদের দুকূল জোড়া সবুজ প্রান্তর।

ইতিহাসের গন্ধমাখা ফারাও মূর্তি

আসোয়ানের নদী-বন্দরে ঠেস দিয়ে পর্যটকদের জন্যে অপেক্ষমান একাধিক বিলাসবহুল জাহাজ। এমনই এক প্রমোদ-তরণীতে সিঁড়ি বেয়ে উঠে এলাম। ভেতরে রুচিশীল অভিজাত অঙ্গসজ্জা। নদীবক্ষে এই জলযানেই কয়েকরাত কাটাব। এখান থেকে জলযাত্রায় পৌঁছব লাক্সার শহরে। জাহাজে চেক-ইন করে এরপর বাসে চেপে বেরোলাম শহর ঘুরতে। একে একে নীলনদের হাইড্যাম,ওবেলিক্স স্তম্ভ দেখে চলে এলাম নাসের হ্রদের তীরে। নীলনদে বাঁধ দেওয়ার ফলে সৃষ্টি হয়েছে বিশালাকার এর সরোবর। হ্রদের ধারে ছোটো মোটরবোট দাঁড়িয়ে। এতে চড়ে চললাম এজিলিকা দ্বীপে। যেতে যেতে চোখে পড়ল টিলার গায়ে নুবিয়া আদিবাসীদের গ্রাম। দ্বীপের একমাত্র দ্রষ্টব্য তিনশো খ্রিস্টপূর্বের ফিলে মন্দির। বিশাল এলাকা জুড়ে দৃষ্টিনন্দন এই মন্দির কমপ্লেক্স গড়ে উঠেছে। এই মন্দির দেখে এরপর আসোয়ান শহরটাকে আরেকবার চরকিপাক দিয়ে দুপুরবেলা ফিরে এলাম জাহাজে।

দৃষ্টিনন্দন ফিলে মন্দির কমপ্লেক্স

বিকেলে আবার নীলনদে জলভ্রমণ। এবার বাহন মিশরের ঐতিহ্যবাহী পালতোলা ফেলুকা নৌকা। হাওয়ার টানে তর তর করে জল কাটিয়ে ভেসে চলেছে ফেলুকা। মাঝি গাইছে স্থানীয় লোকগান। এই জলপথে দেখলাম এলিফ্যান্টাইন দ্বীপ, কিচেনার দ্বীপের বোটানিক্যাল গার্ডেন, আগা খাঁর সৌধ, আদিবাসী গ্রাম। দেখতে দেখতে সূর্য ঢলে পড়ল নীলনদের বুকে। সন্ধেটা কাটল শহরের বাজার ঘুরে আর জাহাজে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখে।

ফেলুকা নৌকায় জলভ্রমণ

পরদিন বাসে চেপে সারাদিনের ট্যুরে ঘুরে এলাম আবু সিম্বেল মন্দির। আসোয়ান থেকে সেখানে পথ গিয়েছে সাহারা মরুভূমির বুক চিরে। নাসের হ্রদের অন্যপ্রান্তে এই মন্দিরের অবস্থান। কয়েক হাজার বছরের পুরোনো এই দৃষ্টিনন্দন মন্দিরের স্রষ্টা ফারাও দ্বিতীয় রামেসিস।

দ্বিতীয় রামেসিসের তৈরি আবু সিম্বেল মন্দির

আসোয়ানকে বিদায় জানিয়ে দিনান্তে জাহাজ রওনা হল নতুন গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। মন্থর গতিতে ভেসে চলেছি নীলনদের বুকে। মধ্য আফ্রিকার ভিক্টোরিয়া হ্রদ থেকে জন্ম নিয়েছে পৃথিবীর দীর্ঘতম এই নদী। আরবিতে এর নাম নহর আন – নিল। মিশরের ইতিহাস আর প্রকৃতি এই নীলনদকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে।

নাসের লেক

জাহাজের ছাদটা চমৎকার সাজানো। রয়েছে সুইমিংপুল আর আরামদায়ক বসার ব্যবস্থা। এখানে বসে নদী প্রকৃতির শোভা দেখতে দেখতেই সময় কাটানো যায়। সন্ধেবেলা পৌঁছলাম কোম অম্বো। নদীর ধারেই আলোকিত বিখ্যাত কোম অম্বো মন্দির। জাহাজ থেকে নামলাম সেই মন্দির দেখতে। জাহাজে ফিরতেই নোঙর তুলে সে আবার দুলে উঠল।

নীলনদের লাক্সারি ক্রুজ

আজ সারারাত ধরে জাহাজ চলেছে নদীবক্ষে। ভোরে ঘুম থেকে উঠে দেখি জাহাজ ভিড়েছে এক নতুন ঘাটে। জায়গাটা এডফু। এও এক প্রাচীন জনপদ। নীলনদের দুই তীরে আজও অক্ষত রয়েছে প্রাচীন নদী-সভ্যতার একাধিক নিদর্শন। ব্রেকফাস্ট সেরে ঘোড়ায় টানা টাঙ্গায় চেপে দেখতে গেলাম এডফু মন্দির। এটি মিশরের গ্রিক রাজা টলেমির তৈরি। মন্দিরের গায়ে নিখুঁত শিল্পকর্ম। ফিরতি পথে শহরের জনজীবন দেখতে দেখতে ফিরে এলাম নদীঘাটে। জাহাজ আবার এগিয়ে চলেছে জল কাটিয়ে। নদীতীরের সবুজ প্রকৃতিকে টপকালেই মরুভূমির হাতছানি।

কায়রো থেকে আসোয়ান রেলপথের বেশ কিছুটা অংশ গিয়েছে নীলনদের ধার দিয়ে। সে পথে মাঝেমধ্যে দেখতে পেলাম ছুটন্ত রেলগাড়ি। নদীতীরের নিরালা গ্রাম, চাষের খেত চোখে পড়ল। নদীর পরিচ্ছন্ন টলটলে জল। কানে ভেসে আসছে পাখির ডাক। জলে ভেসে চলেছে আমাদের মতো পর্যটক-বোঝাই আরও প্রমোদতরী। এপথেই পেরোলাম এসনা লক ড্যাম।
অবশেষে শেষ বিকেলে অসাধারণ জলযাত্রার অন্তিম লগ্নে জাহাজ ভিড়ল ঐতিহাসিক শহর ‘লাক্সার’-এ । সে গল্প নাহয় পরে কখনও।

লেখক ভ্রমণ বিশারদ অয়ন গঙ্গোপাধ্যায়
ছবি : সুবীর কাঞ্জিলাল

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More