ছন্দ হারাচ্ছে হার্ট! বুক ধড়ফড়, আচমকা অজ্ঞান, হৃদস্পন্দনের অসুখ হতে পারে যে কোনও বয়সেই

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

হৃদযন্ত্র তার নিজের মর্জিতে চলে। হার্টকে তাই বলে রিদমিক অর্গ্যান। তার ছন্দেই ছন্দ পায় সারা শরীর। সারাদিনের দৌড়ঝাঁপ, অফিসকাছারি সেরে সংসারের ভারী কাজ সামলানো—সবই ছন্দমাফিকই করতে পারি আমরা, হৃদপিণ্ড নিজস্ব ছন্দে সুস্থ ও চাঙ্গা থাকলে তবেই। কিন্তু এই ছন্দে যদি বদল আসে? প্রতিদিনের জীবনে আমরা তো হৃদয়ের ওপর কম অত্যাচার করি না। নিয়ম মেনে খাওয়া নেই, শরীরচর্চার বালাই নেই, তার ওপর ক্ষতিকর নেশা তো আছেই।

Cancer passes heart disease as top killer in 12 European countries | Gephardt Daily

আমরা প্রায়ই ভুলে যাই, শরীরের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হার্টেরও বয়স বাড়ে। তাই দেখা যায় আচমকা একদিন চিনচিনে বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, বুকে চাপ থেকে হার্ট অ্যাটাকের কবলে ঢলে পড়া। তখন পরীক্ষা করালে ধরা পড়ে হৃদযন্ত্র এবার ছুটি নেওয়ার পথে। তার স্পন্দনেই গোলমাল হচ্ছে। হৃদস্পন্দনের যে অসুখ তা কিন্তু মারাত্মক, বলে কয়ে আসে না, তাই সতর্ক থাকা সবচেয়ে আগে দরকার। অনিয়মিত বা অনিয়ন্ত্রিত হৃদস্পন্দন কীভাবে কার্ডিওভাস্কুলার রোগের কারণ হয়ে উঠতে পারে সে নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় অ্যাপোলো গ্লেনেগলস হাসপাতালের ডাক্তার ও অধ্যাপক শঙ্খ শুভ্র দাস, কনসালট্যান্ট ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট।

অনিয়ন্ত্রিত হৃদস্পন্দন! হার্ট কিন্তু আগাম সঙ্কেত দেয়

ডাক্তারবাবু বলছেন, হার্টের যে রোগই হোক না কেন, তা কিন্তু রাতারাতি বাসা বাঁধে না। হৃদযন্ত্রের যে বয়স বাড়ছে বা হার্ট তার ছন্দ হারাচ্ছে সে সঙ্কেত কিন্তু আগেভাগেই আসতে থাকে। শুধু সচেতনতার অভাবে তা বোঝা যায় না বা বুঝেও ডাক্তারের পরামর্শ নিতে দ্বিধা করা হয়। যে কারণে দেরি হয়ে যায় অনেকটাই। হৃদপিণ্ডের রোগ মানে করোনারি আর্টারি ডিজিজ বলে মনে করা হয়, যেখানে কার্ডিয়াক ধমনীতে মেদ জমে বা ক্যালসিয়ামের স্তর জমে তা ব্লক হয়ে যায়। বয়স যত বাড়ে এই সমস্যাও তত বাড়ে। ফলে সারা শরীরে বিশুদ্ধ রক্তপ্রবাহ বন্ধ হতে থাকে, হার্টে ব্লকেজ দেখা দেয়। এর বাইরেও কিন্তু হার্টের রোগ হয় যাকে আমরা বলি অনিয়ন্ত্রিত হৃদস্পন্দন।

Cancer study stumbles onto potential way to regenerate heart cells

সুস্থ মানুষের হৃদযন্ত্র এক মিনিটে ৬০-৮০ বার পাম্প করে অক্সিজেনযুক্ত বিশুদ্ধ রক্ত শরীরের কোষে কোষে পৌঁছে দেয়। এই পাম্প করার ক্ষমতাকে চালনা করার জন্য হার্টের নিজস্ব পেসমেকার থাকে যাকে বলে সাইনাস নোড (এসএ নোড)। এই সাইনাস নোডের কাজ হল হার্টবিট তৈরি করা। ২৪ ঘণ্টাই কাজ করছে হার্টের এই নিজস্ব পেসমেকার। ইলেকট্রিক্যাল স্পন্দন তৈরি করছে, যে কারণে হৃদস্পন্দন তৈরি হচ্ছে এবং হার্ট পাম্প করে বিশুদ্ধ রক্ত সারা শরীরে ছড়িয়ে দিচ্ছে।

Know Your Heart Beat – The Somerville Foundation

কোনও ভাবে যদি এই সাইনাস নোড ক্ষতিগ্রস্থ হয় তাহলে হৃদস্পন্দন তার স্বাভাবিক ছন্দ হারায়, কখনও বেড়ে যায় আবার কখনও কমে যায়। ডাক্তারি ভাষায় আমরা একে বলি অনিয়ন্ত্রিত হৃদস্পন্দন। অনেক সময়েই এই অনিয়ন্ত্রিত হৃদস্পন্দন বুঝতে পারি না আমরা, তবে কিছু আগাম ইঙ্গিত দেয় হার্ট। যেমন বুক ধড়ফড় করতে পারে, মাথা ঘোরা বা ব্ল্যাক আউট হতে পারে রোগীর, ঘনঘন সোডিয়াম-পটাশিয়াম লেভেলে বদল হতে পারে। পরীক্ষা করালে দেখা যাবে হার্টবিট হয়তো প্রতি মিনিটে বেড়ে ১৫০ থেকে ২০০-তে পৌঁছে গেছে। তখন সতর্ক হতে হবে।

Fast Heart Rate - Symptoms, Causes and Treatments • MyHeart

হার্টবিট আচমকা কম? কখন বসাতে হবে পেসমেকার?

ডাক্তারবাবু জানালেন, হার্টের স্বাভাবিক স্পন্দন হল মিনিটে ৬০-৮০ বার। কিন্তু যদি হঠাৎ করেই হার্টবিট প্রতি মিনিটে ৫০ বা তার নীচে নেমে যায়, তাহলে সঙ্গে সঙ্গেই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। হার্টবিট আচমকা কমে যাওয়া মানেই গোলমাল বেঁধেছে হার্টের নিজস্ব পেসমেকারে। অর্থাৎ গন্ডগোলটা গোড়াতেই। আমাদের হৃদযন্ত্র হল একটা ইলেকট্রিকাল সার্কিটের মতো। হার্টের নিজের পেসমেকার তথা সাইনাস নোড সেখানে ইলেকট্রিক ইমপালস্ তৈরি করে। তবে শুধু সাইনাস নোডই নয়, হার্টের নানা জায়গা থেকেই ইমপালস তৈরি হতে পারে, যেমন এভি নোড ও হিস বান্ডিল। সাইনাস নোডের ঠিক নীচেই থাকে এভি নোড। যদি কোনও ভাবে সাইনাস নোডে অসুখ হয়, তখন হৃদপিণ্ডে তড়িৎ পরিবহনের কাজটা করে এভি নোড।

How Does the Heart Work? | AED Superstore Resource Center

এখন হার্টবিট প্রতি মিনিটে ৪০-৫০ হয়ে যাওয়া মানেই হল সাইনাস নোডের অসুখ করেছে, যাকে ডাক্তারি ভাষায় বলে ‘সিক সাইনাস সিন্ড্রোম’ বা ‘সাইনাস নোড ডিসফাংশন’। এই অসুখে সাইনাস নোড আর স্পন্দন তৈরি করতে পারে না। সেই কাজটা তখন করে সাইনাস নোডের ঠিক নীচেই থাকা এভি নোড। কিন্তু যদি এভি নোডেও অসুখ করে তখন হৃদপিণ্ডের ওপরের ও নীচের প্রকোষ্ঠ তথা অলিন্দ ও নিলয়ের মধ্যে বোঝাপড়াটা নষ্ট হয়ে যায়। যার ফলে হৃদপিণ্ডের এই ইলেকট্রিকাল সার্কিট ঠিকমতো কাজ করতে পারে না। তখন হৃদগতি একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় নিয়ে যাওয়ার জন্য পেসমেকার বসাতে হয়। পেসমেকার হৃদস্পন্দন নিয়মিত রাখার কৃত্রিম বৈদ্যুতিক যন্ত্র। যা ইলেকট্রিক্যাল ইমপা‌ল্‌স তৈরি করে হৃদপেশিকে সরবরাহ করে এবং হৃদপিণ্ডের গতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে।

Pacemaker Replacement Due to Low Battery

বুক ধড়ফড়, বাড়ছে হৃদগতি, সাবধান

হৃদস্পন্দন কমে যাওয়ার অসুখের কথা তো হল, কিন্তু যদি হৃদস্পন্দন আচমকা বেড়ে যায় তখন কী হবে? সাধারণত দেখা যায়, বয়স বাড়লে এই অসুখ বেশি হয়। হার্টরেট বেড়ে যেতে পারে, ছন্দ হারাতে পারে হার্ট। ডাক্তারি ভাষায় এই রোগকে বলে অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশন (এএফ)। করোনারি আর্টারি ডিজিজ থাকলে বা হার্ট ফেলিওর থাকলে অথবা হার্টের ভালভের রোগ থাকলে অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশন হতে পারে।

এই অসুখ হলে ভয়ের কারণ আছে। হার্টে রক্ত জমাট বাঁধতে পারে, সেই ব্লাড ক্লট শরীরের অন্যান্য জায়গাতেও ছড়াতে পারে। অনেক সময় হাত ও পায়ের শিরাতে ব্লক হতে দেখা যায়। তাই এএফ হলে সাবধান থাকতে বলা হয় কারণ রোগীর স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেকটাই বেড়ে যায়। হাত-পা বাদ দেওয়ার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।

Diabetes and Blood Clots | Guadalupe Regional Medical Center

কীভাবে চিকিৎসা হয়?

অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশনের রোগীদের আমরা রক্ত পাতলা হওয়ার ওষুধ (স্পেশাল ক্লট থিনার) দেওয়া হয় যাতে রক্ত জমাট না বাঁধতে পারে। আরও দু’ভাবে চিকিৎসা হতে পারে যেমন হার্টরেট কন্ট্রোল ও হার্টের রিদম কন্ট্রোল। হার্টের ছন্দ ঠিক জায়গায় ফিরিয়ে আনার ওষুধ আছে। তাছাড়া ইলকট্রো ফিজিওলজিক্যাল পরীক্ষা করে দেখা হয় অনিয়মিত হৃদস্পন্দন ঠিক কোথা থেকে তৈরি হচ্ছে। তখন তার চিকিৎসা সেভাবে করা হয়।

হার্টের সার্কিটে শর্ট সার্কিট! ভয় নেই চিকিৎসা আছে

কম বয়সিদের এই রোগ বেশি দেখা দেয়। হার্ট রেট আচমকা বেড়ে যায়। অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশনের মতো অনিয়মিত হার্টরেট হয় না, শুধু হৃদগতি বেড়ে যায়। রোগী অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে, মাথা ঘুরতে পারে। ডাক্তারি ভাষায় একে বলে এসভিটি (সুপারভেন্ট্রিকুলার ট্যাকিকার্ডিয়া)। তবে চিন্তা নেই, ইলকট্রো ফিজিওলজিক্যাল পরীক্ষা করে এই রোগের চিকিৎসা একইভাবে করা হয়।

What Is the Most Common Cause of Atrial Fibrillation (AFib, AF)?

আরও একটা অসুখ হয়, যা বর্তমান সময় চিন্তার কারণ। তা হল ভিটি। সহজ করে বললে, ধরা যাক মানুষের হার্টের পাম্পিং ক্ষমতা ৬০%, যদি তা কমে ৩০% এ নেমে যায় তাহলে আচমকা হার্টরেট অনিয়মিত হয়ে যেতে পারে। থেমে যেতে পারে স্পন্দন। অনেক সময় রাস্তাঘাটে, খেলার মাঠে দেখা যায় রোগীর আচমকা হার্ট অ্যাটাক হয়েছে, সময়ও পাওয়া যায়নি চিকিৎসার, রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এই ভিটি হল সাডেন কার্ডিয়াক ডেথের অন্যতম রিস্ক ফ্যাক্টর।

সাডেন কার্ডিয়াক ডেথের রোগীরা যদি বেঁচে যান তাহলে তাঁদের ইমপ্ল্যান্টেবল কার্ডিওভার্টার ডিফিব্রিলেটর (আইসিডি) নামের পেসমেকার বসানো হয়। এই আইসিডি-র কাজ হল ফের যদি এমন অনিয়মিত হৃদস্পন্দন শুরু হয় তাহলে এই পেসমেকার তাকে রুখে দিতে পারে। হার্টবিট বেড়ে যাক বা কমে যাক, দুই ক্ষেত্রেই কার্যকরী হয় এই আইসিডি।

Health Advice for Women with Defibrillators

ভাল থাক হৃদয়, লাইফস্টাইল ম্যানেজমেন্টের বিকল্প নেই

করোনারি আর্টারি ডিজিজ থাকলে যেমন ভিটি হতে পারে, আবার জেনেটিক কারণে অর্থাৎ পরিবারে হার্টের রোগের ইতিহাস থাকলেও হতে পারে। তবে সেই সঙ্গে লাইফস্টাইলের গন্ডগোলও এর অন্যতম কারণ। অনিয়ম, খাওয়াদাওয়া, রাত জাগা, অত্যধিক চিন্তা, শরীর নিয়ে সচেতনতার অভাবে অনেক সময় হৃদযন্ত্রের উপর চাপ পড়ে। এগুলি এড়ানোর চেষ্টা করতে হবে। সাধারণত শাকসব্জি এবং ফলমূল হৃদযন্ত্রকে ভাল রাখে। তৈলাক্ত, রিচ খাবার হৃদযন্ত্রের ক্ষতি করে। এছাড়া খাবারে পরিমিত লবণ খেতে হবে। মদ্যপান, ধূমপানের নেশা কমিয়ে দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

Cardiopulmonary rehabilitation - Asghar Poly Clinic

নিয়মিত শরীরচর্চা দরকার, ব্লাড সুগার এবং ব্লাড প্রেসার থাকলে নিয়মিত পরীক্ষা করাতে হবে। হৃদরোগ সন্দেহ হলে করা হয় ইসিজি, ইকোকার্ডিওগ্রাফি, করোনারি অ্যাঞ্জিওগ্রাফি বা ইপি স্টাডি এগুলো করাতে হবে, সেই সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া আবশ্যক।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More