কলকাতায় আট ঘণ্টার জটিল অস্ত্রোপচারে প্রাণে বাঁচলেন ভুটানের রোগী, দারুণ নজির মেডিকায়

0

দ্য ওয়াল ব্যুরো: হৃদযন্ত্রের অস্ত্রোপচারে ফের বড় নজির মেডিকা সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের। আট ঘণ্টার বিরল অস্ত্রোপচারে প্রাণে বাঁচলেন রোগী।

হৃদযন্ত্রের যে বিরল রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন রোগী তার নাম পালমোনারি এন্ডাটেরেক্টমি। শ্বাসের সমস্যা শুরু হয় এই রোগে। ধমনীতে জমাট বাঁধতে শুরু করে রক্ত। ভুটানের এক মহিলা সাংগে পেমা এই রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। ওপেন হার্ট সার্জারিতে ঝুঁকি থাকায় অস্ত্রোপচারের জন্য মেডিকারই দ্বারস্থ হন পেমা। এই সার্জারিতে “হার্ট-লাং বাইপাস” মেশিন ব্যবহার করে ফুসফুসের ধমনীগুলোতে জমাট বেঁধে থাকা রক্তকে সরানো হয়। তাঁর হার্ট সার্জারির দায়িত্ব নেন মেডিকা ইনস্টিটিউট অব কার্ডিয়াক সায়েন্সের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও সিনিয়র কার্ডিয়াক সার্জন ডা. কুণাল সরকার, ডা. অর্পণ চক্রবর্তী ও ডা. মৃণালবন্ধু দাস ও ডা. দীপাঞ্জন চট্টোপাধ্যায়। তাঁদের সহযোগিতা করেন অত্যন্ত দক্ষ টেকনিশিয়ান ও নার্সদের টিম। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনেন পেমাকে।

২৮ বছর বয়সি এই মহিলার রিকারেন্ট পালমোনারি এমবিলজম ছিল। তিনি শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন, এবং অক্সিজেন স্যাচুরেশন বা অক্সিজেনের মাত্রা তাঁর শরীরে কমে যাচ্ছিল বলে ভুটানেই তাঁকে তিনবার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। তাঁকে পরীক্ষা করে জানা গেল যে, তাঁর ক্রনিক পালমোনারি এমবলিজম আছে। যার ফলে বিশ্রাম নেওয়া অবস্থাতেও তাঁর অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমে যায়। পেমার ফুসফুসের পালমোনারি ধমনীতে বেশ কয়েক জায়গায় রক্ত জমাট বেঁধে ছিল। সেই জন্যই তাঁর রক্ত চলাচলে বাধা তৈরি হচ্ছিল।

ডাক্তারদের টিম তাঁর অস্ত্রোপচারের বড় চ্যালেঞ্জ নেন। তাঁরা ঠিক করেন রোগীর ফুসফুসের একেবারে ভিতরের দুটি পালমোনারি ধমনী থেকেই জমাট বেঁধে থাকা রক্ত সরাবেন। পেমার ফুসফুসের উপর চাপ প্রচণ্ড বেড়ে গিয়েছিল বলে তাঁর ডানদিকের নিলয় কাজ করছিল না। সেই জন্য ইসিএমও তৈরি রাখা হয়েছিল। রক্ত চলাচল পুরো বন্ধ করে আট ঘণ্টা ধরে অস্ত্রোপচার করার সময় রোগীর শরীরকে ১৮ ডিগ্রি পর্যন্ত ডিপ হাইপোথেমিয়াতে রাখা হয়েছিল। অস্ত্রোপচারের পর তাঁকে দু’দিন পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছিল। তার পর তাঁকে ভেন্টিলেশন থেকে বের করে আনা হয়। এখন তাঁর শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা স্বাভাবিক।  তিনি ভালই আছেন।

সার্জারির প্রসঙ্গে ডা. অর্পণ চক্রবর্তী বলেন, “এই ধরনের পালমোনারি এন্ডারটেরেক্টমি সার্জারিতে সব সময় ঝুঁকি বেশি থাকে এবং তা মারাত্মকও হয়। বিশেষ করে রোগীরর বয়স যদি খুব কম হয়। রোগীকে পুরো মাত্রায় অ্যান্টিকো-অ্যাগুলান্ট ওষুধ দেওয়া সত্ত্বেও তাঁকে খুব কম বয়সেই অক্সিজেন নিয়ে থাকতে হচ্ছিল। আট ঘণ্টা ঘরে অস্ত্রোপচার করার কাজটা ডাক্তারদের পক্ষে বেশ কঠিন ছিল। ফুসফুসের জায়গায়-জায়গায় রক্ত জমাট বেঁধে ছিল বলে আমরা পালমোনারি ধমনীকে পুরো খুলে নিয়ে রক্ত চলাচলের বাধা দূর করার জন্য আর্টারি লাইনিংকে সরিয়ে দিয়েছিল। পালমোনারি হাইপারটেনশন থাকা রোগীর যখন পালমোনারি এন্ডারটেরেক্টমি করাতে হয়, তখন তাঁকে কখনও-কখনও পালমোনারি হাইপারটেনশনের ওষুধ খেতে হয়, যাতে তিনি অস্ত্রোপচারের জন্য তৈরি হতে পারেন। আমাদের খুব ভাল লাগছে যে, ভুটান থেকে আসা একজন রোগীর অস্ত্রোপচার আমরা খুব সফল ভাবে করতে পেরেছি। তাঁকে আমরা ১০ দিন পর ছুটি দিয়েছি। তখন তিনি বেশ ভাবেই শরীর চর্চা ও চলাফেরা করতে পারছিলেন। কয়েক দিন আগে আমরা তাঁর ফের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেছি। দেখলাম, তিনি এখন পুরোপুরি সুস্থ।”

সিনিয়র কার্ডিয়াক সার্জন ও প্রধান ডা. কুনাল সরকার জানালেন, “গত ১৫ বছর ধরে বহু রোগীকে মৃত্যুর মুখ থেকে বাঁচিয়ে নিয়ে এসে একের পর এক মাইল ফলক ছুঁয়ে ফেলছে মেডিকা। জটিল অস্ত্রোপচার করতে-করতে অত্যন্ত সাবলীল ভাবে ও অনন্য উপায়ে ক্রমশ উন্নতি করতে থাকাটা মেডিকার একটা আলাদা পরিচয় হয়ে থেকেছে সব সময়। মেডিকার লক্ষ্যই হল, পৃথিবীর এই প্রান্তে বিশ্ব মানের জটিল পরিচর্যা ও গুরুতর সার্জারির সুবিধাকে নিয়ে আসা। আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে আমাদের এখানে রোগীরা নিয়মিত আসেন, এবং সফল ভাবে তাঁদের চিকিৎসা করার পর আমাদের ডাক্তারদের টিমের মনোবলও অনেক বেড়ে যায়। ডাক্তার হিসাবে আমরা সব সময় রুগিদের সবচেয়ে ভাল চিকিৎসা দিতে চাই, এবং এখন আমরা যে-মহিলার চিকিৎসা করেছি, তার সেরে ওঠাটা খুবই দরকার ছিল। কেননা, তার বয়স খুবই কম। পালমোনারি ধমনী থেকে জমাট বাঁধা রক্ত সরানোর কাজে খুব ঝুঁকি থাকে। কেননা, এই ধমনী ফুসফুসের একেবারে ভিতরের দিকে থাকে। এমন অস্ত্রোপচার হয়ে যাওযার পর ডাক্তারদের এককাট্টা হয়ে কাজ করে যেতে হয়। ঠিকঠাক পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল বলে ওই মহিলা জটিল পরিস্থিতিকে পার করে যেতে পেরেছেন। তিনি নিজের অসুস্থতার জন্য গত কয়েক মাস ধরে পুরো শয্যাশায়ী হয়েছিলেন এবং তাঁকে অক্সিজেন নিতে হচ্ছিল।”

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.