অলস জীবন, বেলাগাম ডায়েট, নিঃশব্দে বাড়ছে রক্তচাপ! ঝুঁকি বাড়ছে হার্টের, নিরাপদ নয় ব্রেনও

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

একটা সময় পর্যন্ত গোটা বিশ্বের স্বাস্থ্যক্ষেত্রের বড় ও অন্যতম সমস্যা ছিল সংক্রামক অসুখ। মহামারী হিসেবে বারবারই পৃথিবীর বুকে আছড়ে পড়েছে নানা অসুখ। প্লেগ, বসন্ত, যক্ষ্মা– এসব সংক্রমণে প্রাণ গিয়েছে লক্ষ লক্ষ মানুষের। কিন্তু সময় যত এগিয়েছে, সভ্যতা যত আধুনিক হয়েছে, অসুখের সেই প্যাটার্ন তত বদলেছে। সংক্রমণের সঙ্গে সম্পর্কহীন নানা অসুখের থাবা ভয়ংকর ভাবে দেখা দিয়েছে মানুষের জীবনে। ওবেসিটি, ডায়াবেটিস, রক্তচাপ—এসব নানা কারণে ঘরে ঘরে বেড়ে ওঠা হৃদরোগই যেন মহামারীর আকার নিয়েছে এখন।

1918 flu pandemic killed 12 million Indians, and British overlords'  indifference strengthened the anti-colonial movement

সকলের হৃদরোগ হয় না। যাঁদের রিস্ক ফ্যাক্টর বেশি থাকে, তাঁদেরই এই সমস্যার সম্ভাবনা বেশি হয়। এখন এই হৃদরোগের অনেকগুলো রিস্ক ফ্যাক্টর থাকে। তার মধ্যে রয়েছে ওবেসিটি, কোলেস্টেরল, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ—এই সবই। আজকের আলোচনার বিষয় হল, উচ্চ রক্তচাপ। এই সমস্যা কীভাবে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়, তাই নিয়েই আলোচনা করলেন অ্যাপোলো গ্লেনেগলসের সিনিয়ার কনসালট্যান্ট ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট, ডক্টর দেবাশিস ঘোষ।

বাড়তে থাকে রক্তের চাপ, নেই কোনও উপসর্গ

উচ্চ রক্তচাপ বা হাই ব্লাডপ্রেশার খুবই পরিচিত ও সাধারণ অসুখ। তথ্য বলছে বিশ্বের ২০ থেকে ৩০ শতাংশ মানুষ ৫০ বছর বয়স পেরোলেই এই অসুখের শিকার হন। প্রথম দিকে এই অসুখকে ইগনোর করেন প্রায় সকলেই। কারণ, এর কোনও বিশেষ উপসর্গ নেই। বাইরে থেকে এ অসুখ চেনা যায় না। কোনও সর্দি, কাশি, জ্বর বা যা যা লক্ষ্মণ দেখে একটা অসুখ চেনা যায়, তার কিছুই হয় না।

High Blood Pressure: Causes, Symptoms, Medication, Diet, and More

কিন্তু ঝুঁকির বিষয় হল, কোনও মানুষের যদি অনেক দিন ধরে হাই ব্লাড প্রেশার থাকে, তাহলে তাঁর বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ক্ষতি হতে শুরু করে ধীরে ধীরে। হার্ট, কিডনি, ব্রেন—এসবই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে হাই ব্লাড প্রেশারের জন্য। ফলে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে একেবারেই গোড়ায়। কারণ অঙ্গগুলোকে রক্ষা করাই চিকিৎসার প্রধান উদ্দেশ্য।

প্রেশার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঝুঁকি বাড়ে কয়েক গুণ

উচ্চ রক্তচাপের ক্রাইটেরিয়া ঠিক কী কী, তার আন্তর্জাতিক গাইডলাইন বেরোয় প্রায় প্রতি বছর। এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, মাপকাঠিগুলি প্রায়ই বদলে যাচ্ছে। এখন যেমন কোনও পূর্ণবয়স্ক মানুষের আইডিয়াল রক্তচাপ বলতে ধরা হয় সিস্টোলিক প্রেশার ১৩০-এর নীচে এবং ডায়াস্টলিক প্রেশার ৮৫-এর নীচে। ধরে নেওয়া যায়, এই মাত্রায় প্রেশার থাকলে অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ক্ষতি হবে না। কিন্তু মজার ব্যাপার হল, এই মাত্রার থেকে খানিকটা বেশি রক্তচাপ হলে, তা কিন্তু ক্ষতির ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় কয়েক গুণ।

High blood pressure clipart 5 » Clipart Station

যেমন ধরা যাক, কারও সিস্টোলিক রক্তচাপ আছে ১২০, আর অন্যজনের সিস্টোলিক রক্তচাপ ১৫০, এক্ষেত্রে দ্বিতীয় জনের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি কিন্তু দ্বিগুণ বেশি। মজার ব্যাপার হল, দু’জনেরই কিন্তু কোনও উপসর্গ নেই। অথচ দ্বিতীয় জনের স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি প্রায় দ্বিগুণ। তাই কারও রক্তচাপ যদি স্বাভাবিকের চেয়ে খানিকটা বেশিও থাকে নিয়মিত, তা যদি আর না বাড়ে, তবু তার চিকিৎসা করতে হবে।

কারণ এবং সমাধান

এখন এই হাই ব্লাডপ্রেশারের একটা কারণ হল বংশগতি। সেটা আটকানো মুশকিল। তবে তা যদি না হয়, বংশে কারও হাই ব্লাডপ্রেশারের সমস্যা না থাকলেও যদি কেউ এর শিকার হন, তাহলে তার প্রধান কারণগুলির মধ্যে অন্যতম হল লাইফস্টাইল।

8 Lifestyle Changes to Lower Your Blood Pressure — Anne Cohen Writes

হাইপ্রেশার এড়াতে শরীরের ওজন মেনটেন করতেই হবে। সেই সঙ্গে কমাতে হবে নুন খাওয়া। কাঁচা নুন তো খাওয়া যাবেই না, যে সব খাবারে খুব বেশি নুন থাকে, সে সব খাবার, যেমন বিভিন্ন স্ন্যাক্স এড়িয়ে চলতে হবে। নুন বেশি দিয়েই এই সব খাবারের স্বাদ বাড়ানো হয়। সপ্তাহে একদিন তাও চলতে পারে, কিন্তু বাকি ৬ দিন বাড়ির রান্না করা ঘরোয়া খাবার খেতে হবে।

এছাড়া অ্যালকোহল কেউ যদি বেশি খান, তাঁদের হাই ব্লাডপ্রেশারের ঝুঁকি বেশি। একান্ত যদি খেতেই হয় অ্যালকোহল, তবে খুবই কম পরিমাণে সোশ্যাল ড্রিঙ্কিং মেনটেন করতে হবে, যেটুকু না করলেই নয় সেটুকু।

High Blood Pressure Risk Factors, Hypertension Causes

পাশাপাশি রোজ শরীরচর্চা করতেই হবে। সময় বার করে জিমে যাওয়া সম্ভব না হলে, কিছু অন্তত করতে হবে। সে হতে পারে সাইক্লিং বা সাঁতার। একান্ত কিছু সম্ভব না হলে হাঁটতে হবে। রাস্তায় হোক বা মাঠে হোক, নিয়ম করে অন্তত আধ ঘণ্টা থেকে ৪৫ মিনিট হাঁটা জরুরি। এমনকি নিজের আবাসনের চত্বরেও হাঁটা যেতে পারে।

High blood pressure exercise: Prevent hypertension symptoms and signs with  cycling sports | Express.co.uk

শেষমেশ ভরসা ওষুধ, না সারলেও ধরে রাখবে লাগাম

স্বাস্থ্যকর লাইফস্টাইল মেনটেন করেও যদি কেউ হাই ব্লাডপ্রেশারে আক্রান্ত হন, তখন তাঁকে ওষুধের শরণাপন্ন হতেই হয়। অনেকে মনে করেন, হাই ব্লাডপ্রেশারের ওষুধ খাওয়া একবার শুরু হয়ে গেলে আর ছাড়া যাবে না। আসলে, এই অসুখটা সারে না। নিয়ন্ত্রণে থাকে। ওষুধ খেলে নিয়ন্ত্রণে থাকবে, ছাড়লে বাড়বে। ওষুধের ডোজটা বদলাতে পারে, তবে ওষুধটা খেয়ে যেতে হবে।

খুব আর্লি স্টেজে ব্লাডপ্রেশার ধরা পড়লে অনেক সময় কেবল লাইফস্টাইল বদলালে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়। তবে তা কেবল স্টেজ ওয়ানের ক্ষেত্রেই। একবার স্টেজ টু-তে পৌঁছে গেলে, অর্থাৎ ব্লাডপ্রেশার ১৬০/১০০ বা তার বেশি হয়ে গেলে, তখন ওষুধ ছাড়া উপায় থাকে না।

Which blood pressure drug is right for you? - Harvard Health

ওষুধেরও রকমফের আছে। খাদ্যাভ্যাস লাইফস্টাইল, বয়স—এসবের উপর নির্ভর করে হাই ব্লাডপ্রেশারের ওষুধও বদলায়। একজন বৃদ্ধ মানুষ যে ওষুধ খাবেন হাই ব্লাডপ্রেশারের, একজন তরুণ তা খাবেন না। এটা একজন চিকিৎসকই ঠিক করে দিতে পারবেন। তাই প্রেশার ধরা পড়লেই যেমন তেমন ওষুধ না খাওয়াই বাঞ্ছনীয়।

ব্লাডপ্রেশার নিয়ন্ত্রণের উপকারিতা

১. স্ট্রোক বা সেরিব্রাল অ্যাটাকের ঝুঁকি কমিয়ে দেয় ৩-৪ গুণ।

২. হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি ২ গুণ কমিয়ে দেয়।

হাই ব্লাডপ্রেশার বেশি থাকলে অনেক সময়ে কোলেস্টেরলও বেশি থাকে। কারও আবার থাকে ডায়াবেটিস। এইরকম একাধিক ফ্যাক্টর থাকলে সব কটিই কিন্তু নিয়্ন্ত্রণ করতে হবে। তবেই ঝুঁকি কমবে।

Natural Ways to Combat High Cholesterol and High Blood Pressure | ADW  Diabetes

সতর্ক থাকুন, সুস্বাস্থ্যে থাকুন

৩৫ বছরের উপর পুরুষদের এবং ৪০ বছরের উপর মহিলাদের অন্তত দু’বছরে একবার ব্লাডপ্রেশার, লিপিড প্রোফাইল, ডায়াবেটিস পরীক্ষা করাই উচিত। বয়স আর একটু বাড়লে আরও ঘনঘন করা যেতে পারে পরীক্ষা।

ইদানীং দেখা যাচ্ছে, কমবয়সি ছেলেমেয়েরা লাইফস্টাইলের কারণে বেশি করে আক্রান্ত হচ্ছেন হাই ব্লাডপ্রেশারে। যত বেশি অলস হচ্ছে জীবনযাত্রা, বাড়ছে বাইরের খাবার খাওয়ার প্রবণতা, শরীরের ওজন বাড়ছে, তত বাড়ছে হাই ব্লাডপ্রেশার। ফলে সাবধান হতেই হবে। নিত্যসঙ্গী করতে হবে শরীরচর্চাকে। লাগামছাড়া ডায়েট চলবে না। হাই ব্লাডপ্রেশার একবার হলে আর সারে না, বরং একের পর এক বড় অসুখের ঝুঁকি বাড়ায় ক্রমাগত।

The Importance of Healthy Lifestyle During Pandemic

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More