‘স্বাভিমান’ সিরিয়াল ফিরছে ২৫ বছর পর, যার বাংলা নাম ছিল ‘আত্মসম্মান’

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

সালটা ১৯৯৪। ‘স্বাভিমান’। বাংলায় ‘আত্মসম্মান’।  দূরদর্শন ন্যাশনাল চ্যানেলে দুপুর সাড়ে তিনটের জনপ্রিয় সিরিয়াল, যা প্রথম ৮০০ এপিসোডের সুপার ডুপার হিট মেগা হয়ে ওঠে। সেই ‘স্বাভিমান’ সিরিয়ালই ২৫ বছর পূর্ণ করল। সেই উপলক্ষে দর্শকদের জন্যও এল বিশেষ উপহার। আবার দেখা যাবে ‘স্বাভিমান’। তবে এবার ন্যাশানাল চ্যানেলে বা কেবল চ্যানেলে দেখানোর কথা স্থির হয়নি। সিরিয়ালটি দেখানো হবে টাটা স্কাই সিরিয়াল চ্যানেলে। যাঁরা টাটা স্কাই পরিষেবা নেন আপাতত তাঁরাই দেখতে পাবেন এই মেগা।

‘স্বাভিমান’ ছিল মেগা সিরিয়ালের সুবর্ণযুগের সূচনা। আর এই মেগার সুবর্ণ যুগের ভগীরথ ছিলেন মহেশ ভট্ট। তবে ‘স্বাভিমান’ তো হিন্দি মেগা, সেটা বাংলায় এতটা জনপ্রিয়তা পেয়েছিল কেন? অবশ্যই একটা হিন্দি মেগা বাঙালি মহলে জনপ্রিয়তা পেতেই পারে, রামায়ণ বা মহাভারত কি পায়নি? কিন্তু ‘স্বাভিমান’ যেন আলাদা ছিল সব সিরিয়ালের চেয়ে।

দুপুর সাড়ে তিনটে বাজলেই বাংলার ঘরে ঘরে বাংলায় ডাবড করে সম্প্রচার হতো এটি। বাংলা নাম ছিল ‘আত্মসম্মান’। যার জন্য সিরিয়ালটা আরও বাঙালি ঘরের মা-মাসিদের কাছের জিনিস হয়ে গেল। আসলে তখন বাংলা ধারাবাহিকের ঝাঁ-চকচকে বাজেট যুগ আসেনি। ‘জননী’ও তখন আসেনি। তার এক বছর আগে এসছিল ‘স্বাভিমান’। তাই বম্বের গ্ল্যামার যদি বাংলায় সম্প্রচার হয়, সেটাতে আর ভাষাগত সমস্যা অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় না। বাঙালি মহিলাদের অন্দরমহলে দুপুরের সাথী হয়ে উঠল ‘আত্মসম্মান’।

১৯৯৪ থেকে ১৯৯৭ পর্যন্ত চলেছিল এই মেগা। সাড়ে তিনটে বাজলেই বাড়ি-বাড়ি বেজে উঠত ‘এক পল’, সুনীতা রাওয়ের গাওয়া ‘স্বাভিমান’-এর টাইটেল সঙ। বাংলা ‘আত্মসম্মান’-এ টাইটেল সঙ বাংলাতেই হত ‘এই তো সময়’, গেয়েছিলেন হেমন্তকন্যা রাণু মুখোপাধ্যায়। আরেকটি গান ছিল সিরিয়ালে, ‘ক্যায়সে উনহে ভুল জায়ে’ যা গেয়েছিলেন আজকের স্টার সিঙ্গার শান। বলাইবাহুল্য তখন কেউ শানকে চিনত না, তবে নবাগত শান বলিউডে প্ল্যাটফর্ম পেয়েছিলেন ‘স্বাভিমান’-এ গেয়েই।

এ সিরিয়ালের স্টারকাস্ট ছিল চোখ ধাঁধানো। কিটু গিদওয়ানি (স্বেতলানা), অঞ্জু মহেন্দ্র (রঞ্জনা দেবী), রোহিত রায় (ঋষভ), দীপক পরাশর (মহিম) প্রমুখ। এই রঞ্জনা দেবী, ঋষভ, মেঘা, পূজা, মহিম, নিশা, শীলা, কেডি, ত্যাগী বা সিরিয়ালের চরিত্রদের নামগুলোই মানুষের রোজনামচার নাম হয়ে উঠল। সবার মুখে মুখে এইসব নাম। ঋষভ ওরফে রোহিত রায় তো ‘স্বাভিমান’ হিরো হয়ে তৎকালীন শাহরুখ-আমির খানদের বাজারকে রীতিমতো টক্কর দিতেন জনপ্রিয়তায়।

আবার কিটুর আভিজাত্য ও স্নিগ্ধতা আর অঞ্জু মহেন্দ্রর সাহসী অভিনয় আজও পঁচিশ বছর পর সেই সময়কার দর্শকরা ভুলতে পারেনি। রঞ্জনা দেবী, অঞ্জু, মহেন্দ্র একরঙা হলুদ, নীল বিভিন্ন রঙের শাড়ি পরতেন। ওই শাড়ি তখন পুজোর বাজারে ফ্যাশন ট্রেন্ড হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আবার ঋষভ রোহিতের হেয়ারস্টাইলও ছেলেরা নকল করতে শুরু করল।

কেমন ছিল ‘স্বাভিমান’ এর গল্প? স্বেতলানা এক ডাকসাইটে সুন্দরী, একলা নারী। কিন্তু সে বড়লোক অভিজাত কেশব মালহোত্রার সেকেন্ড ওম্যান। কেশব মালহোত্রার মৃত্যুর পর অভিজাত মালহোত্রা পরিবারের সঙ্গে এই দুসরি অউরাতের সম্পত্তির দাবিদার, প্রতিপত্তির রেষারেষি নিয়ে গল্প। কেশব মালহোত্রার স্ত্রী রঞ্জনা দেবী আর ছেলে ঋষভ। মূল গল্প এটাই।

এই সিরিয়াল থেকে উঠে এসছে অনেক এখনকার বড় স্টার অভিনেতা। যেমন মনোজ বাজপেয়ী, আশুতোষ রানা বা সন্ধ্যা মৃদুল। আবার জনপ্রিয় মুখেদের মধ্যে ছিলেন মিতা বশিষ্ঠ, অচিন্ত কৌর, হর্ষ ছায়া, কণিকা প্রমুখ।

রোহিত রায় তাঁর ঋষভ চরিত্র নিয়ে বলেছেন, “এই সিরিয়াল ছিল আমার ডেবিউ সিরিয়াল। একজন বাঙালি হয়ে হিন্দি সর্বভারতীয় মেগার হিরো হতে পেরেছিলাম একমাত্র মহেশ ভাটের জন্য। উনি আমার শুধু মেন্টর নন, উনি আমার ভগবান। আমি ব্যর্থ প্রেমিক রোলে সিরিয়ালের মদ্যপ দৃশ্যগুলিতে অমিতাভ বচ্চনকে নকল করতাম কিন্তু মহেশজি বলতেন, ‘আমি রোহিত রায়কে দেখতে চাই’– এভাবে নিজের স্বতন্ত্রতা তৈরি করতে পেরেছিলাম।”

স্বাভিমান সিরিয়ালের চিত্রনাট্যকার ছিলেন শোভা দে এবং বিনোদ রঙ্গনাথন। স্বাভিমান ২৫ বছর উপলক্ষে শোভা দে-র সঙ্গে সদ্য তোলা ছবিও সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে পোষ্ট করেছেন রোহিত রায়। সিরিয়াল আসছে টাটা স্কাই সিরিয়ালে, সেই সুখবর দিয়ে ইন্সটাগ্রামে পোস্ট করেছেন অঞ্জু মহেন্দ্র নিজেই।

তবে বলিউডে এই মেগা যেমন সোনালি যুগ তৈরি করেছিল, টলিউডে তেমনই অন্ধকার যুগ করতে চলেছিল এই মেগা। কারণ হিন্দি সিরিয়ালের বাংলা ডাবিং। যা অনেকাংশে বাংলা পর্বভিত্তিক ধারাবাহিকের দর্শক কমিয়ে দিচ্ছিল। বাজার পড়ে যাচ্ছিল অল্প বাজেটের বাংলা কম স্লটের ধারাবাহিকগুলির। বাংলায় কেন হিন্দি ডাবড করা সিরিয়াল দেখানো হবে, এ তো বাংলা ভাষার অপমান। এই দাবি নিয়ে সোচ্চার প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন অপর্ণা সেন-সহ আরও অনেক বিশিষ্ট বাংলার শিল্পী মুখ। সম্ভবত মামলাও হয় এই নিয়ে। যার ফলে মাঝে কিছু মাস বন্ধ হয়ে যায় বাংলা ডাবড ‘আত্মসম্মান’।

কিন্তু হিন্দি ‘স্বাভিমান’ বাঙালি দর্শকরা দেখতে পেতেন। তবে তখন অত হিন্দি প্রভাব আসেনি তাই ভাষাগত সমস্যা বাঙালি মা-মাসিদের হত। কিন্তু কোনও কিছুই ‘স্বাভিমান’ র জনপ্রিয়তা আটকাতে পারেনি। অপ্রতিরোধ্য ভাবে তিন-তিন বছর চলেছিল এই মেগা। পরে তো ১৯৯৫-এ বাংলায় প্রথম মেগা ‘জননী’ ও সাহসী পদক্ষেপ নিয়ে শুরু করলেন বিষ্ণু পালচৌধুরী।

পঁচিশ বছর পর ছোট পর্দা, বড় পর্দা, সামাজিক, অর্থনৈতিক পরিবেশ– সব বদলে গেছে, কিন্তু বদলায়নি সেই ‘স্বাভিমান’ নিয়ে মানুষের নস্ট্যালজিয়া। তাই আবার বছর পঁচিশ পর ‘স্বাভিমান’ ফিরছে পুরনো আত্মসম্মান নিয়েই। নতুন প্রজন্মও এবার স্বাদ পাবে সেই সুবর্ণযুগের।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More