এক ঐতিহাসিক হিন্দু মন্দিরকে আগলে রেখেছে শিয়া ইরান, একশো আঠাশ বছর ধরে

ইরানের মাখরানা শৈলী ও ভারতীয় স্থাপত্যকলার মেলবন্ধনে তৈরি হয়েছিল অপুর্ব সুন্দর এই মন্দিরটি।

রূপাঞ্জন গোস্বামী

তেহরান থেকে ১৫০১ কিলোমিটার দূরে, দক্ষিণ ইরানের হরমুজগান প্রদেশে আছে প্রাচীন নদী বন্দর। নাম ‘বন্দর আব্বাস’। পারস্য উপসাগরের উপকূলে অবস্থিত বন্দরটিতে, সুদীর্ঘ কাল ধরে ভিড়েছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের জাহাজ ও নৌকা। আলেকজান্ডারের সময়ে বন্দর আব্বাসের নাম ছিল ‘হরমিজাদ’।

বিভিন্ন সময় বন্দরটি ছিল ডাচ,পর্তুগীজ ও ব্রিটিশদের দখলে। পর্তুগীজরা বন্দর আব্বাস-এর নাম দিয়েছিল ‘পোর্ট কমোরাও’। ব্রিটিশরা বলত ‘গোমবারান’, ডাচেরা ‘গামরুন’। ইরানের শাহ ‘আব্বাস-প্রথম’, ১৬২২ সালে ব্রিটিশ ও পর্তুগীজদের পরাজিত করে বন্দরটিকে ইরানের দখলে নিয়ে এসেছিলেন। সেই ঘটনাটিকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে বন্দরটির নাম হয়েছিল ‘বন্দর আব্বাস’।

বন্দর আব্বাস

বহু উত্থান-পতনের সাক্ষী বন্দর আব্বাস, ঊনবিংশ শতাব্দীতে হয়ে উঠেছিল ভারতীয় ব্যবসায়ীদের বানিজ্যিক  বিপণন কেন্দ্র। অবিভক্ত ভারতের বড় বড় ব্যবসায়ীদের অনেকেই এই বন্দর আব্বাস দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার নানা জায়গায় তাঁদের পণ্য পাঠাতেন। বেশিরভাগ ভারতীয় ব্যবসায়ী ও তাঁদের শ্রমিকেরা ছিলেন হিন্দু। দেশ থেকে বহু দূরে, বছরের পর পর বছর কাটাতে হতো তাঁদের। তাই একত্রিত হওয়ার জন্য প্রয়োজন হয়েছিল একটি ধর্মস্থানের।

হিন্দু ব্যবসায়ীদের তরফ থেকে একটি মন্দির স্থাপনের অনুমতি চাওয়া হয়েছিল, ‘বন্দর আব্বাস’ শহরের গভর্নর মোহাম্মদ হাসান খান সা’দলমালেকের কাছে। সহৃদয় গভর্নর হিন্দু ব্যবসায়ীদের হয়ে অনুরোধ করেছিলেন ইরানের তৎকালীন শাহ বা সম্রাট নাসের আল-দীন শাহ কাজারকে।

ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে ইরানের মসনদে ছিলেন, কাজার সাম্রাজ্যের চতুর্থ সম্রাট নাসের আল-দীন শাহ কাজার। মধ্যপ্রাচ্যের অনান্য শাসকদের মতো ছিলেন না তিনি। নিজে ছিলেন একজন অসামান্য চিত্রশিল্পী ও কবি। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন সাহিত্য ও চিত্রকলার পৃষ্ঠপোষক। তাঁর লেখা ২০০ টি কবিতা লিপিবদ্ধ করা আছে ‘মাজমা’উল ফুসাহা’ বইটিতে।

নাসের আল-দীন শাহ কাজার

সম্রাট নাসের আল-দীনই ছিলেন প্রথম ইরানি গল্পকার, যিনি আধুনিক ইউরোপীয় আঙ্গিকে গল্প লিখেছিলেন। তিনিই ছিলেন ইরানের প্রথম চিত্রগ্রাহক। তাঁর প্রাসাদে ছিল বিশাল লাইব্রেরি। তাতে ঠাসা ছিল পৃথিবীর নানা দেশের সাহিত্য, ইতিহাস ও ভূগোলের বই। ইংরেজি ও ফরাসি ভাষা জানতেন। ফলে তাঁর শাসনকালে ইরানে বইছিল মুক্তচিন্তার খোলা হাওয়া।

বন্দর আব্বাসে হিন্দু মন্দির প্রতিষ্ঠার জন্য, সম্রাট নাসের আল-দীনের অনুমতি পেতে সময় লাগেনি। অবিভক্ত ভারতের শিকারপুর নিবাসী (বর্তমানে পাকিস্তানের সিন্ধ প্রদেশে অবস্থিত) এক ধনী ব্যবসায়ীর অর্থানুকুল্যে, ইরানের মাটিতে তৈরি হয়েছিল সুদৃশ্য এক হিন্দু মন্দির।

এই সেই মন্দির

পাথর, কাদা, কোরাল স্টোন, বালি ও চুনের মিশ্রণে, ইরানের মাখরানা শৈলী ও ভারতীয় স্থাপত্যকলার মেলবন্ধনে তৈরি হয়েছিল অপুর্ব সুন্দর এই মন্দিরটি। মন্দিরটির উত্তর দিকে আছে তিনটি কক্ষ। মাঝের আয়তাকার কক্ষটি কাঠের তৈরি। পশ্চিমদিকে একটি ও দক্ষিণ দিকে আরও দু’টি কক্ষ আছে।

মন্দিরের মাঝখানে থাকা বিশাল বর্গক্ষেত্রাকার কক্ষটির ওপরে আছে সুদৃশ্য গম্বুজ। কক্ষের পাশ থেকে ঘোরানো সিঁড়ি উঠে গিয়েছে গম্বুজের দিকে। ইরানের মাকরানা স্থাপত্যে তৈরি গম্বুজটিকে ঘিরে আছে ৭২টি ছোট ছোট পদ্মকুঁড়ি আকৃতির চূড়া। এই ধরনের চূড়া সাধারণত দেখা যায় ভারতীয় শিব মন্দিরে। 

মন্দিরটির চূড়া

মন্দির তৈরির কাজ শেষ হওয়ার পর, ১৮৯২ সালে হিন্দুদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছিল মন্দিরের দরজা। মন্দিরে কোন কোন বিগ্রহ ছিল জানা না গেলেও, স্থানীয় মানুষেরা বলেন মন্দিরে স্থাপন করা হয়েছিল শিবলিঙ্গ ও বিষ্ণুর বিগ্রহ। নিত্যপূজা করতেন পুরোহিত। বর্গক্ষেত্রাকার কক্ষটিতে ধূপ ও প্রদীপ জ্বালাতেন ভক্তরা।

মন্দির উদ্বোধনের মাত্র চার বছর পর, ১৮৯৬ সালের পয়লা মে, আততায়ীর গুলিতে প্রাণ হারিয়েছিলেন ইরানের শাহ নাসের আল-দীন শাহ কাজার। নাসের আল-দীন শাহকে হত্যা করেছিলেন আরব দুনিয়ার ধর্মগুরু জামাল আল-দিন আল-আফগানির শিষ্য, মির্চা রেজা কারমানি। ইরানের বুকে মুক্তচিন্তার খোলা হাওয়া বইতে দেওয়ার জন্য হয়ত জীবন দিতে হয়েছিল শাহ নাসের আল-দীনকে।

মন্দিরের ভেতরের ছবি।

সারা ইরান জুড়ে তৈরি হওয়া অস্থিরতার ঢেউ এসে লেগেছিল বন্দর আব্বাসেও। একে একে ইরান ছাড়তে শুরু করেছিলেন হিন্দু ব্যবসায়ীরা। যাঁর অর্থানুকুল্যে তৈরি হয়েছিল মন্দির, সেই ব্যবসায়ী ইরান থেকে ভারতে ফেরার সময় নিয়ে গিয়েছিলেন মন্দিরের বিগ্রহগুলি।

ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল বন্দর আব্বাসের ঐতিহাসিক মন্দিরটি। এরপর কেটেছে দশকের পর দশক। ক্রমে অশান্ত হয়ে উঠেছিল ইরান। একসময় এসেছিল বহুকাঙ্খিত শান্তি।

একশো বছরের পুরোনো দেওয়াল চিত্র।

কিন্তু দীর্ঘদিনের অযত্নে মন্দিরটির গম্বুজে দেখা দিয়েছিল ফাটল। উঁইপোকায় কুরে কুরে শেষ করে দিয়েছিল এক অসামান্য ইতিহাস। মন্দিরটি ধূলিস্যাৎ হওয়ার আগেই, মন্দিরের ওপর পড়েছিল ইরানের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য মন্ত্রকের নজর।

সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য মন্ত্রকের নেওয়া ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের পর, নতুন পলেস্তারা পড়েছিল মন্দিরটির গায়ে। বিশেষজ্ঞদের সাহায্য নিয়ে সারানো হয়েছিল গম্বুজের ফাটলগুলি। ফিরিয়ে আনা হয়েছিল ভেতরের অনবদ্য কারুকার্য্যের আগের রূপ। মন্দিরে আনা হয়েছিল বিদ্যুৎ। মন্দিরের চূড়ায় লাগানো হয়েছিল রঙিন বাতি।

রাতে মায়াবী আলোয় ভাসে মন্দিরটি।

বহু অর্থ ব্যয় করে ১৯৯৭ সালে মন্দিরটির আমূল সংস্কার করেছিল ইরান। ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল মন্দিরের আগের সৌন্দর্য। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য মন্ত্রকের আদেশে, ইরানের ন্যাশনাল মনুমেন্টের তালিকায় আনা হয়েছিল মন্দিরটিকে। মন্দিরের ভেতরে কোনও বিগ্রহ না থাকায়, ইরান সরকার মন্দিরের মধ্যে রেখেছিল তাদের সংগ্রহ করা বিভিন্ন ভারতীয় দেবদেবীর ভাস্কর্য।

মন্দিরের ভেতরের দেওয়ালগুলির মধ্যে কিছু দেওয়ালে আঁকা হয়েছিল, হিন্দুদের ধর্মবিশ্বাস সংক্রান্ত বিভিন্ন ছবি। ১৯৯৭ সালে তালা খোলার পর মন্দিরের গর্ভগৃহে খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল শ্রীকৃষ্ণের দেওয়াল জোড়া ছবি। ছবিটিকেও পুনরুদ্ধার করা হয়েছিল।

মন্দিরের ভেতরে হিন্দু দেবতার মূর্তি।

আজ বন্দর আব্বাসে আসা পর্যটকদের কাছে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুই হলো এই মন্দির। দূর দূর থেকে ইরানিরাও আসেন ভারতীয় মন্দির দেখতে। মন্দির চত্ত্বরে আছে ভারতীয় হস্তশিল্পের দোকান। সকাল আটটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত খোলা থাকে এই মন্দির।

তবে দুপুর একটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত বন্ধ থাকে। মন্দিরে প্রবেশের জন্য কাটতে হয় টিকিট। ইরানের নাগরিক হলে  টিকিটের দাম পড়বে ভারতীয় টাকার মূল্যে প্রায় ২০ টাকা। বিদেশীদের জন্য ৮০ টাকা। ভারতীয় হলে নেওয়া হয় না প্রবেশমূল্য।

মন্দিরটি সংস্কারের সময় খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল শ্রীকৃষ্ণের এই দেওয়াল চিত্রটি।

তবে মন্দিরটির প্রতিষ্ঠা নিয়ে একসময় বিতর্ক শুরু হয়েছিল ইতিহাসবিদদের মধ্যে। কেউ বলেছিলেন পর্তুগিজরা ভারত থেকে দাস নিয়ে গিয়েছিল বন্দর আব্বাসে। তারাই বানিয়েছিল এই মন্দির। কেউ বলেছিলেন, মন্দিরটি বানিয়েছিল বন্দর আব্বাস দখলে রাখা, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভারতীয় সৈন্যরা। কেউ বলেছিলেন মন্দিরটি বানিয়েছিল আর্য সমাজ।

কিন্তু আর্যসমাজ একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী ও মূর্তিপূজার বিরোধী। আর্যসমাজ মন্দিরটি বানালে সেই মন্দিরে বিগ্রহ থাকার কথা নয়। তাহলে শিকারপুরের ব্যবসায়ীর বিগ্রহ স্থাপন করা ও পরবর্তীকালে সেগুলি গুলির ভারতে নিয়ে যাওয়ার তত্ত্বটি নস্যাৎ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু মন্দিরের দেওয়ালে শ্রীকৃষ্ণের প্রায় শতাধিক বছরের প্রাচীন দেওয়াল চিত্রটি তাহলে কারা এঁকেছিল! একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী আর্যসমাজ আঁকবে বলে মনে হয় না।

বিতর্ক থাকুক বিতর্কের জায়গায়। তবে আজও বন্দর আব্বাসের ইমাম খোমেইনি স্ট্রিটে আছে এই মন্দিরটি। যে মন্দিরকে ইরানিরা চেনেন ইন্দুস টেম্পল বা বট-ই-গোউরান নামে। সেই ঐতিহাসিক মন্দির, যেটি আজও মৈত্রীর বন্ধনে বেঁধে রেখেছে ভারত ও ইরানকে।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More