স্ত্রীর গয়না বেচে অটোকেই বানালেন অ্যাম্বুলেন্স, ভোপালে করোনা রোগীদের ত্রাতা জাভেদ

দ্য ওয়াল ব্যুরো: অশীতিপর বাবা-মা। কোভিডে আক্রান্ত। হাসপাতালে না নিয়ে গেলে প্রাণে বাঁচানো যাবে না। কিন্তু উপায়? চাই অক্সিজেন সিলিন্ডার, অক্সিমিটার। আর সবার উপরে অ্যাম্বুলেন্স। না হলে হাসপাতাল ভর্তিই নেবে না। ধার-দেনা করে যাঁরা পারছেন, তাঁরা কিছু একটা ব্যবস্থা করছেন। আর পারছেন না যাঁরা, তাঁরা কাঁধে করে মুমূর্ষু বাবা-মাকে হাসপাতাল নিয়ে যাচ্ছেন।

রুজিরুটির টানে রাস্তায় বেরিয়ে প্রায়দিনই এমন দৃশ্য দেখতেন ভোপালের মহম্মদ জাভেদ খান। পেশায় অটোচালক। দিনের শেষে ভাড়ার টাকা গুনে বাড়ি ফিরতেন ঠিকই। কিন্তু ঘুম আসত না। দুঃস্বপ্নের মতো আছড়ে পড়ত একের পর এক হাড়হিম করা ছবি। ধুঁকতে থাকা অসহায়, তাঁর চেয়েও গরীব মানুষগুলোর জন্য কিছু করা যায় না? হতাশার আড়াল থেকেও দিনের পর দিন উঁকি দিত এই চিন্তা।

COVID-19: Bhopal autorickshaw driver turns his vehicle into free ambulance

শেষমেশ একদিন মাথা খাটিয়ে একটা রাস্তা বেরও করে ফেললেন জাভেদ। অ্যাম্বুলেন্স কেনার ক্ষমতা তাঁর নেই বটে। কিন্তু অটোরিকশাটা তো দিব্যি সার্ভিস দিচ্ছে। সেটাকেই ক’দিনের জন্য অ্যাম্বুলেস বানিয়ে ফেললে কেমন হয়? হ্যাঁ, কয়েক মাস পেটে টান পড়বে। এটা সত্যি। কিন্তু অনেক করোনা রোগীকে হয়তো নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে ফেরানো সম্ভব হবে। এটাই বা কম কী!

প্ল্যানটা একবার মাথায় আসতে দ্বিতীয়বার ভাবেননি জাভেদ। হাতে নগদ পুঁজি তেমন নেই। তা ছাড়া অটোকে অ্যাম্বুলেস বানানোও তো চাট্টিখানি কথা নয়! চাই অক্সিজেন সিলিন্ডার, অক্সিমিটার ও আরও জরুরি সামগ্রী। অসুস্থ রোগী বসবে। তাই পেছনের সিটটাও খানিক পাল্টাতে হবে। সিলিন্ডার রাখার জন্য বসাতে হবে নয়া কলকব্জা।

এতশত ভেবে স্ত্রীর কাছে হাতে পাতেন জাভেদ। চেয়ে নেন গয়না। তারপর সেগুলো বেচে আর হাতের টাকা দিয়ে কিনে ফেলেন প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। একঝলক দেখে অ্যাম্বুলেন্স বলে মনে না হলেও অটোর ভেতরের ব্যবস্থা কিন্তু চোখ কপালে তুলতে বাধ্য। কোভিড রোগীর কাজে লাগার মতো সমস্ত ছোটখাট উপকরণও সেখানে মজুত রয়েছে।

Bhopal man has turned his rickshaw into an 'ambulance', complete with  oxygen. And he won't charge a rupee | Condé Nast Traveller India | Trends

নিজের পরিকল্পনা নিয়ে অবশ্য খোলামেলা জাভেদ। তাঁর স্পষ্ট কথা, ‘হ্যাঁ, আমি জানি, আমার অটোয় বসে তেমন আরাম নেই। কিন্তু এতে চড়ে গেলে আপনি প্রাণে বেঁচে যাবেন।’ এরপর খানিক থেমে যোগ করেন, ‘তরুণ তরতাজা ছেলেমেয়েরা পর্যন্ত অক্সিজেনের অভাবে মারা যাচ্ছে। অ্যাম্বুলেন্স ডাকলে হয় পাওয়া যাচ্ছে না। নয়তো ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা ভাড়া হাঁকছে। গরীব মানুষদের পক্ষে এটা মেটানো সম্ভব? বিশেষ করে যখন মহামারীর সময় অনেকে কাজ হারিয়েছেন!’

গোটা কৃতিত্ব অবশ্য একা নিজের হাতে নিতে নারাজ জাভেদ। তিনি বলেন, ‘সিলিন্ডার আর অক্সিমিটার কিনতে আমায় পরিচিত বন্ধুরা সাহায্য করেছে। হাসপাতালের অনেক চিকিৎসক দেখিয়ে দিয়েছেন, কীভাবে অক্সিজেন সিলিন্ডার সেট করতে হয়। আপাতত যতদিন না করোনা বিদায় নিচ্ছে, আমি সার্ভিস চালু রাখব।’

Bhopal man has turned his rickshaw into an 'ambulance', complete with  oxygen. And he won't charge a rupee | Condé Nast Traveller India | Trends

এর মধ্যে যে ঝামেলা আসেনি, এমনটা নয়। অটোয় চড়িয়ে রোগী নিয়ে যাওয়া আর অ্যাম্বুলেন্সের পরিকাঠামো সাজানো নিয়ে আপত্তি তোলে ট্রাফিক পুলিস। জাভেদের লাইসেন্স বাতিলের হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়। কিন্তু খবর সামনে আসতেই পাশে দাঁড়ায় নেটিজেনদের বড় অংশ। নেটদুনিয়ায় বিক্ষোভের জেরে পিছু হটে প্রশাসন।

আপাতত কাজ জারি রেখেছেন জাভেদ। সামনে আরও কঠিন লড়াই। দিনের গুনতি কমছে। কিন্তু সংক্রমণ লাগামে আসেনি এখনও। কিন্তু তবু কিছুতেই ভোপালের রাস্তায় করোনা রোগীর মৃত্যু দেখতে চান না তিনি— শপথে একরোখা জাভেদ।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More