‘পরাক্রম’, ‘দেশনায়ক’, নাকি ‘দেশপ্রেম’, কী দিয়ে বুঝব নেতাজিকে

শ্যামলেশ ঘোষ

নেতাজি জন্মজয়ন্তীর নামকরণ নিয়ে গোল বেধেছে। নেতাজি জন্মদিনকে ‘পরাক্রম দিবস’ ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। ২৩ জানুয়ারির সংবাদপত্র মারফত সেই ঘোষণা সম্বলিত সরকারি বিজ্ঞাপন পৌঁছেও গিয়েছে আমজনতার কাছে। আবার নেতাজি জন্মজয়ন্তীকে ‘দেশনায়ক দিবস’ আখ্যা দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার। ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমে প্রকট সেই বিজ্ঞাপনও। দিবসের নামকরণ নিয়ে সকাল সকাল দুই সরকারের কাণ্ডারি নরেন্দ্র মোদি ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের টুইট-যুদ্ধও প্রকাশ্যে এসেছে। এই রাজনৈতিক আবেগ, অবস্থান ও বিরোধাভাসের পাশাপাশি বিষয়টি নিয়ে স্পষ্টত দ্বিধাবিভক্ত রাজ্যের শিক্ষাবিদ মহল।

এক একটি শব্দের এক একটি বিশেষ অর্থ আছে। আভিধানিক অর্থ এবং প্রচলিত ব্যবহারের বাইরে শব্দের বিশিষ্ট প্রয়োগ অর্থের ক্ষেত্রে নানা ধরনের ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করে। তাই শিক্ষাবিদদের বক্তব্য পড়ার আগে জেনে নেওয়া যাক ‘পরাক্রম দিবসের’ ‘পরাক্রম’ শব্দের অর্থ কী? পরাক্রম শব্দের আভিধানিক অর্থ বল বা বিক্রম। ব্যক্তিবিশেষের শৌর্যবীর্য বোঝাতে বা সাধারণভাবে শুধু ওই শক্তি ইত্যাদি বোঝাতে ব্যবহার হয়। সংস্কৃত ‘পরাক্রম’ শব্দটিকে সাধারণ অর্থে ‘বীরত্ব’ বোঝাতে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ বলছে, পরাক্রম: শক্তি, বল, সামর্থ্য, বিক্রম। আবার রাজশেখর বসুর ‘চলন্তিকা আধুনিক বঙ্গভাষার অভিধান’ বলছে, পরাক্রম মানে বিক্রম, বল, বীরত্ব। সকল অর্থে ‘বীর সুভাষের’ সঙ্গে পরাক্রম শব্দটি ব্যবহার প্রশ্নাতীত।

‘দেশনায়ক’ শব্দটিই বা কীভাবে এল? কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সুভাষচন্দ্রকে ‘দেশনায়ক’ আখ্যা দিয়ে ‘তাসের দেশ’ নৃত্যনাট্যটি তাঁকে উৎসর্গ করেন। উৎসর্গপত্রে লেখেন: ‘‘স্বদেশের চিত্তে নূতন প্রাণ সঞ্চার করবার পূণ্যব্রত তুমি গ্রহণ করেছ, সেই কথা স্মরণ ক’রে তোমার নামে ‘তাসের দেশ’ নাটিকা উৎসর্গ করলুম।’’ সত্যি অর্থেই এই ‘দেশনায়ক’ অভিধা নেতাজি সুভাষের ক্ষেত্রে মান্য। ফলে বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী নেতাজি জন্মজয়ন্তীকে ‘দেশনায়ক দিবস’ হিসেবেই দেখতে চেয়েছেন। অনেক আগে তা ঘোষণা করে নেতাজির জন্মদিনকে জাতীয় ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণার দাবিও জানিয়েছিলেন তিনি। কেন্দ্রীয় সরকার মানেনি। যেভাবে নেতাজির জন্মদিনকে ‘দেশপ্রেম দিবস’ হিসেবে ঘোষণার জন্য নেতাজি প্রতিষ্ঠিত ফরওয়ার্ড ব্লকের দীর্ঘকালের দাবিও কলকে পায়নি। অন্যদিকে গত ১৯ জানুয়ারি কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি মন্ত্রকের তরফে এক বিজ্ঞপ্তি জারি করে নেতাজির জন্মদিনকে ‘পরাক্রম দিবস’ ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় সরকার।

এই নামকরণের যাথার্থ নিয়ে রাজ্যের শিক্ষাবিদদের মতামত আমরা দেখে নিতে পারি। শিক্ষাবিদ, গবেষক ও সাহিত্যিক ড. পবিত্র সরকারের কাছে ‘দেশপ্রেম দিবস’টিই উপযুক্ত মনে হয়েছে। কারণ ব্যাখ্যাও করেছেন তিনি। বলেছেন, একজনকে উপলক্ষ করে একটা দিনের নাম দেওয়া হয় সদ্ভাবনা ও সুচিন্তার কথা উদযাপনের জন্য। আমার মতে, দেশপ্রেম দিবসটিই ঠিক ছিল। পরাক্রম শব্দটায় কেমন যুদ্ধবাজ যুদ্ধবাজ গন্ধ আছে। যেন তাল ঠুকছি, আমরা কিন্তু খুব শক্তিশালী, আমাদের সঙ্গে কেউ লাগতে এসো না। এইধরনের একটা চ্যালেঞ্জের ব্যাপার আছে। আমি এটা পছন্দ করি না। আমি মনে করি, দেশপ্রেম দিবস হলেই সবচেয়ে ভাল হত। দেশনায়ক হলে একজনের ওপর নজরটা পড়ে। নেতাজিকে কেন্দ্র করে দেশ সম্বন্ধে একটা ভাল চিন্তার কথা যদি সকলের মধ্যে ছড়িয়ে হয় তাহলে দেশপ্রেম শব্দটিই যথার্থ।

আবার শিক্ষাবিদ, গবেষক ও সাহিত্যিক ড. অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য বিষয়টি নিয়ে কোনও সিদ্ধান্তে উপনীত হতে চাননি। তিনি এই নামকরণের প্রচেষ্টাকে ‘রাজনৈতিক কূটকচালি’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, আমি কেবল এটুকুই বলতে পারি, পরাক্রম বা বীরত্ব বলতে মহাপরাক্রমী আলেকজান্ডারের কথা মনে আসে। সুভাষচন্দ্র বসুকে একটি শব্দেই চেনা যায়, নেতাজি। সহজ এবং বহুপ্রচলিত। আবার যেমন দেশবন্ধু শব্দটি উচ্চারণ করলেই চিত্তরঞ্জন দাশের কথা মনে পড়ে। এক একটা নামের সঙ্গে এক একটা অভিধা জুড়ে গিয়েছে। এটা খুব সত্য। তাই ‘দেশনায়ক’ বলি আর ‘পরাক্রম’, নেতাজি বললেই নেতাজিকে বুঝি। নেতাজি, নেতাজি। তিনি সকলের নেতা, নেতাজি। নেতাজি দিবস বললেই তো যথেষ্ট হত। এসব রাজনীতির কূটকচালি।

অন্যদিকে, শিক্ষাবিদ রাজাগোপাল ধর চক্রবর্তী ‘পরাক্রম’ শব্দটিকে সাদরে গ্রহণ করতে চেয়েছেন। তিনি বলেছেন, নেতাজি আমাদের শুধু বাঙালির নয়, গোটা ভারতবর্ষের মানুষের কাছে একটা আলাদা আবেগ। যাঁরা দেশকে ভালবাসেন এবং যারা মনে করেন দেশকে ভালবাসতে গেলে একটা শক্তিপ্রদর্শনেরও জায়গা আছে, তারা নেতাজিকে অন্য অনেকের আগে রাখেন। সেটা আমি পাঞ্জাব বা কাশ্মীর বা দেশের নানা জায়গায় গিয়েও দেখেছি। গান্ধিজি অহিংসার পথ নিয়েছিলেন। নেতাজি ব্রিটিশকে দেখিয়ে দিতে চেয়েছিলেন আমরাও পাল্টা দিতে জানি। সেই কাজে তিনি অত্যন্ত সফল। তাঁর সেই বিক্রমকে আমাদের স্বীকার করে নিতেই হবে। তাই আমার মনে হয়েছে নেতাজির জন্মদিনকে একটা বীরত্বের দিন হিসেবে দেখাতেই পারি। এই নামকরণ যথাযথ। এ নিয়ে বিতর্কের খুব একটা অবকাশ আছে বলে মনে করি না।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More