হাড়ের বাঁশি (অষ্টম পর্ব)

মাহাতোর ঠিক করে দেওয়া একখানি টোটোয় চড়ে বন্যা যখন ভেন্দা গ্রামে পৌঁছল, তখন বেলা প্রায় দশটা, রৌদ্র আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠেছে চরাচরে, যতদূর চোখ যায় ঝুমকোলতার মতো আলো ফুল ফুটেছে সবখানে। অল্পবয়সী টোটো-চালক গাড়ি থামিয়ে বন্যার দিকে চেয়ে বলল, ‘দিদি, ইখানটোতে থুলাম গাড়ি, আপনে ঘুইর‍্যা আসেন গেঁ!’

দুপাশে উঁচু নীচু রুক্ষ জমি, কয়েকটি শাল আর মহুয়া গাছ মাথা তুলে ইতস্তত দাঁড়িয়ে রয়েছে, দূরে মালভূমি আকাশের গায়ে চালচিত্রের মতো সাজানো, ঘর-বাড়ি কিছুই নাই। বন্যা চারপাশে একবার তাকিয়ে সামান্য অবাক হয়েই জিজ্ঞাসা করল, ‘গ্রাম কি সামনে?’

–ইটোই গেরাম গ দিদি, আপনে সিজা আগাঁই যান, লুকের দেইখ্যা পাবেন!

সামনে একটি পায়ে-চলা ধুলামলিন পথ দেখিয়ে বন্যা পুনরায় জিজ্ঞাসা করল, ‘এই দিকে যাব?’

–হঁ, হুই যে কতগুলান মউলি গাছ দ্যাখছেন লয়, উখানটোতে ঘর আইছেক, আপনে সিজা যান।

 

আর কথা না বাড়িয়ে রওনা হল বন্যা। পথ নামেই, আসলে মানুষের যাতায়াতে একখানি অস্পষ্ট রেখা তৈরি হয়েছে মাত্র, দুপাশে চোরকাঁটার ঝোপ, মিহি কাপাসতুলোর মতো বাতাসে শালগাছের দু-একটি শুকনো পাতা খসে পড়ছে। দূরে কিঁচ কিঁচ শব্দে কী যেন একটা পাখি ডেকে উঠল। লাল পাতায় সাজানো একখানি বড়ো গাছের সামনে এসে একমুহূর্তের জন্য দাঁড়াল বন্যা। সেই গতবার পৃথ্বী চিনিয়েছিল গাছটি, কুসুম গাছ, নীচু হয়ে মাটি থেকে একখানি ধুলামলিন রক্তপুষ্পবর্ণ পাতা কুড়িয়ে হাতের মুঠোয় নিয়ে আপনমনে নিজেকে শুনিয়ে যেন বলল, ‘তোমাকে কুসুম পাতায় সাজাব!’

চওড়া কালোপাড় সাদা সুতির শাড়ি পরেছে আজ, স্নান শেষে ভেজা চুল পিঠের উপর আলতো ছড়ানো, মৃদু কাজলের সাজে চোখদুটি শান্ত দিঘির মতো ছায়াচ্ছন্ন হয়ে উঠেছে। বেরোনোর আগে জোনাকির মতো লাল টিপ কপালে পরতে গিয়েও কী মনে হওয়ায় রেখে দিয়েছে, আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে সামান্য হেসেছিল শুধু! আলগোছে পা ফেলে হাঁটছে যেন, কোথাও যাওয়ার তাড়া নাই। মহুয়া গাছের জটলার কাছে পৌঁছাতেই দু-চারটি খোড়ো চালের মাটির দালান চোখে পড়ল। এক কিশোরী কতগুলি ছাগল নিয়ে তার দিকেই এগিয়ে আসছে, একমাথা রুক্ষ চুল, পরনে মলিন ফ্রক, সামান্য হেসে বন্যা জিজ্ঞাসা করল, ‘এখানে সাধুবাবার কুঠিয়া কোথায় বলতে পারবে?’

অল্প দূরে একটি উঁচু টিলার পানে আঙুল তুলে ইশারা করে কিশোরী বলল, ‘হুই যো!’

হাতের লিকলিকে লাঠি দিয়ে ছাগলগুলিকে ‘হেঁও হেঁও’ বলতে বলতে বন্যার দিকে একবার মুখ তুলে চাইল, বিস্ময়ভরা দৃষ্টি, যেন কোনও অচেনা দেশ থেকে সাদা শাড়ি পরা কোনও দেবী নেমে এসেছে! ঠিক ইস্কুলের সরস্বতী ঠাকুরের মতো, ব্যাগ খুলে মুঠো ভরা চকোলেট কিশোরীর দিকে এগিয়ে দিয়ে মিষ্টি হেসে বন্যা জিজ্ঞাসা করল, ‘কী নাম তোমার?’

আড়চোখে চকোলেটের দিকে একবার চেয়ে মৃদু স্বরে বলল, ‘দোপদি!’

–বাহ! কী সুন্দর নাম! ইস্কুলে পড়ো তুমি?

ঘাড় নেড়ে হাসল শুধু দোপদি।

বন্যা কয়েক পা কাছে এগিয়ে এসে হাতখানি ধরে চকোলেটগুলি দিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘খুব ভালো মেয়ে, কোন ক্লাস তোমার?’

–ফোর!

–বেলপাহাড়ির ইস্কুল?

চকোলেট মুঠোয় নিয়ে মাথা একপাশে কাত করে সম্মতি জানাল দোপদি!

–সে তো অনেক দূর! কী করে যাও?

–সেকেলে!

–তুমি সাইকেলও চালাতে পারো! বাহ বাহ! বাবা কিনে দিয়েছে বুঝি সাইকেল?

খিলখিলে হাসির মুখে হাত চাপা দিয়ে দোপদি বলল, ‘পঞ্চাত থিকি দিছেক!’

–আজ ইস্কুল যাবে না?

–আজকো ছুটি!

অল্প হেসে দোপদির মাথায় হাত দিয়ে একটু আদর করে সামনে টিলার দিকে এগিয়ে চলল বন্যা। সরু পথখানি চুলের ফিতার মতো বয়ে গেছে। টিলাটি বেশ উঁচু, চারপাশে কতগুলি শাল গাছ পরস্পরের হাত ধরে যেন আগলে রেখেছে, অপরাজিতা কুসুমরঙা আকাশ মুখ নীচু করে আলতো আদরের মতো নেমে এসেছে টিলার কাছে। সেদিকে তাকিয়ে বন্যার হঠাৎ মনে হল এমন দেশে এমন ঠিকানায় চিঠি লিখতে হয়, যে চিঠির অক্ষরে জড়িয়ে থাকবে মানুষের অন্তরতম কথা!

 

খাড়া চড়াই বেয়ে টিলার উপর ওঠার আগে বন্যা একমুহূর্তের জন্য ভাবল শাড়ি না পরে এলেই হত, পরমুহূর্তেই মন স্থির করে দু-পা ওঠার চেষ্টা করতেই বুঝতে পারল কাজটি খুব সহজ নয়! দাঁড়িয়ে ভাবছে কী করবে, আশেপাশে লোকজন কেউ কোথাও নাই, ব্যাগ থেকে মোবাইল বের করে সাধুকে ফোন করতে যেতেই উপর থেকে ভেসে এল সস্নেহ কণ্ঠস্বর, ‘মা, ওখানেই দাঁড়ান। আমি একজনকে পাঠাচ্ছি, একা পারবেন না, পথ বেশ উঁচু!’

মুখ তুলে দেখে দুটি যুবক সুঠাম শালবৃক্ষের মাঝে দাঁড়িয়ে রয়েছেন নির্মলানন্দ, গেরুয়া বসনে নরম রৌদ্র অলঙ্কারের মতো ঝলমল করছে, হাসিমুখে তাকিয়ে আছেন বন্যার দিকে, বন্যা গলা তুলে বলল, ‘মনে হয় পারব!’

–না না, দাঁড়ান, শেষে বিপদ হবে একটা। জগবন্ধু এখনই যাচ্ছে।

কথা শেষ হওয়ার আগেই বন্যা দেখল একজন শক্ত সমর্থ পুরুষ দ্রুত পায়ে তরতর করে নিচে নেমে আসছে, মেহগিনি কাঠের মতো দেহ, পরনে শুধু মালকোঁচা দেওয়া সাদা ধুতি, হাতে একখানি লাঠি, বন্যার সামনে এসে দরাজ গলায় বলল, ‘আসেন দিদি! লাঠিটো ল্যান, ভর দেয়ে ওঠেন। কিছু হবেক লাই।’

 

অনভ্যস্ত ঈষৎ ভীরু পায়ে বন্যাকে উঠে আসতে দেখে নির্মলানন্দের একমুহূর্তের জন্য মনে হল মেয়েটি ভারি সুলক্ষণা, সংস্কারও বেশ ভালো, সেজন্যই হয়তো রূপে উদাসী গোধূলি বাতাসের স্পর্শ লেগে রয়েছে। পরমুহূর্তেই গুরু শ্রী শ্যামানন্দের কথাটি মনে ভেসে উঠল। কতদিন পূর্বে নর্মদাতীরস্থ প্রাচীন মুণ্ড মহারণ্যে তিনি বলেছিলেন, জগতের সকল নারীকে মা নর্মদা হিসাবে চিন্তা করবে, শংকর কন্যার কৃপা হলে নিশ্চয়ই তোমার ভব-বন্ধন নিমেষে ছিন্ন হবে।

আজ কতদূরে এই নির্জন রুক্ষ মালভূমির প্রান্তে বন্যাকে দেখে সহসা নির্মলানন্দ কলকলনাদিনী নর্মদার কথা স্মরণ করলেন। গুরুদেবের দেহত্যাগের পর পরিক্রমণকালে কী বিচিত্র অভিজ্ঞতাই না হয়েছে, প্রতিক্ষেত্রে করজোড়ে দেবী নর্মদার কৃপা প্রার্থনা করেছেন আর কী আশ্চর্য স্নেহশীলা জননী যেমন তাঁর সন্তানকে কোলে তুলে নেন, ঠিক সেভাবেই সকল বিপদ-সংশয় ও চঞ্চল মনোবৃত্তি স্রোত থেকে নির্মলানন্দকে সতত রক্ষা করেছেন। মনে মনে সেই ঘটন-অঘটনপটিয়সীকে পুনরায় প্রণাম জানিয়ে স্বগতোক্তির মতো খুব মৃদুস্বরে নির্মলানন্দ উচ্চারণ করলেন, ‘ইদং তু নর্মদাষ্টকং ত্রিকালমেব যে সদা, পঠন্তি তে নিরন্তরং ন যান্তি দুর্গতিং কদা।’

একটানা এতটা চড়াই ভেঙে উপরে উঠে কয়েকবার জোরে শ্বাস নিয়ে দুহাত জড়ো করে নির্মলানন্দকে প্রণাম জানিয়ে বন্যা বলল, ‘বড়ো সুন্দর আপনার কুঠিয়া।’

মৃদু হেসে সন্ন্যাসী জিজ্ঞাসা করলেন, ‘খুব কষ্ট হল তো?’

আরও কয়েকবার শ্বাস নিয়ে সামান্য ক্লান্ত গলায় বন্যা উত্তর দিল, ‘না না, কষ্ট কী! আসলে অভ্যাস নেই তো তাই একটু হাঁপিয়ে গেছি!’

ইতিমধ্যেই জগবন্ধু কুঠিয়ার উঠানে একখানি কাঠের চেয়ার এনে পেতে দিয়েছে, সেদিকে ইশারা করে নির্মলানন্দ বললেন, ‘মা, আপনি আগে একটু বসে বিশ্রাম নিন, তারপর কথা হবে।’

চেয়ারে বসে ছায়া খেয়াল করতেই মুখ তুলে বন্যা দেখল পেছনে একটি রুদ্রপলাশ গাছ ডালপালা আকাশে বিছিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে, তার নীচেই টিনের চাল ছাওয়া লম্বাটে মাটির বাড়ি, সামনে টানা বারান্দা, সম্ভবত দুখানি ঘর রয়েছে। পরম যত্নে গিরিমাটি দিয়ে সাজানো হয়েছে গৃহ, তকতকে নিকোনো মাটির উঠোনে কতগুলি শুকনো শালপাতা আনমনে পড়ে রয়েছেট। বামদিকে বেড়া দিয়ে ঘেরা একচিলতে জমির উপর শাকসবজির গাছ, দু-একটি ফুলের গাছও রয়েছে। মরশুমি বাহারি ফুল নয়, অচেনা কোনও বনকুসুম, নীচ থেকে তিরতিরে বাতাস কার্তিকের নরম আলো মেখে অবিরল বয়ে আসছে, দূরে কোথাও একটি পাখি সুর তুলে ডাকছে, মালভূমির কোলে নির্জন কুঠিয়াটি যেন কারোর পরম মমতায় অপরূপ শ্রীমণ্ডিত হয়ে উঠেছে। নির্মলানন্দের দিকে তাকিয়ে নির্ভার গলায় বন্যা বলল, ‘কী শান্তি আপনার এখানে!’

জগবন্ধুর এনে রাখা আরেকটি কাঠের চেয়ারে বসে নির্মলানন্দ বন্যার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আপনার মন আজ শান্ত হয়ে রয়েছে তাই আপনি এখানে শান্তি খুঁজে পেয়েছেন!’

–তা হয়তো ঠিকই বলেছেন, কিন্তু পরিবেশের একটা ভূমিকাও তো থাকে, তাই না?

–আমার তা মনে হয় না মা। আপনার মন চঞ্চল হয়ে উঠলে মৌনী হিমালয়ে বসেও শান্তি পাবেন না, আসলে কী জানেন, আপনি দেখছেন তাই জগৎ রয়েছে, না দেখলে জগৎও নেই!

দু-এক মুহূর্ত চুপ করে কী যেন ভাবল বন্যা, তারপর নম্র স্বরে বলল, ‘কিন্তু দেখুন আমি যখন থাকব না, মানে মারা যাব, তারপরেও তো জগৎ থাকবে, একইরকম থাকবে, আপনার এই কুঠিয়া ওই মালভূমি পলাশগাছ সবই তো থাকবে!’

অল্প হেসে বালিকাকে প্রবোধ দেওয়ার সুরে নির্মলানন্দ বললেন, ‘এসব যে থাকবে তা আপনি বুঝলেন কী করে? আপনি তো আর দেখার জন্য ফিরে আসছেন না!’

–থাকে তো! কত মানুষ মারা যান তারপরেও তো জগৎ ঠিক নিজের নিয়মে বয়ে চলে!

–সেই বয়ে চলা কিন্তু আপনি প্রত্যক্ষ করছেন, যিনি মারা গেলেন তার কাছে তো আর কিছু নেই! তার দিক থেকে ভাবুন একবার বিষয়টি!

 

দূরের মাঠে নতুন আলু আর সর্ষে ক্ষেতের উপর কে যেন রৌদ্র বিছিয়ে রেখেছে। রুদ্রপলাশের গাছে একটি বসন্তবৌরি মাঝে মাঝে আপনমনে শিস দিয়ে ডেকে উঠছে, চঞ্চলা কিশোরীর মতো বাতাসে দু-একটি চুলের গুছি মুখের উপর পড়তেই আলতো হাতে তাদের সরিয়ে পাখিটির পানে চেয়ে চিন্তিত স্বরে বন্যা জিজ্ঞাসা করল, ‘কিন্তু শুধু তো আমি একা দেখছি না জগৎ, আপনিও দেখছেন, আরও কত মানুষ একইসঙ্গে দেখছেন, এ যদি শুধু আমার মনের কল্পনা হত তাহলে আপনারা কী করে দেখছেন?’

–আচ্ছা, স্বপ্নে আপনি অন্য মানুষকে দেখেন না? তারাও তো আপনাকে দেখে, কথা বলে, এমনকি স্পর্শও করে। কিন্তু আপনার ঘুম ভেঙে যাওয়ার পর তাদের কি আর অস্তিত্ব থাকে?

ভারি অবাক গলায় বন্যা শুধোল, ‘তার মানে এই জগতও স্বপ্ন?’

প্রশান্ত হাসিতে ভরে উঠল নির্মলানন্দের মুখ। ধীর স্বরে বললেন, ‘অনেকে বলেন স্বপ্নবৎ, তবে আমার স্বপ্ন বলেই মনে হয়!’

–তাহলে স্বপ্ন ভাঙলে, মানে ঘুম ভেঙে গেলে কী হবে? সেই কি তবে মুক্তি?

–আপনি তো মুসলিম, আপনার শাস্ত্রে মুক্তির কথা তেমন কিছু শুনিনি। কয়ামতের দিনে হয় জন্নত নাহলে দোজখ। এ আপনি কোথা থেকে জানলেন?

চোখ তুলে অল্প হেসে বন্যা বলল, ‘ছোটবেলা থেকে জানেন এই কয়ামতের দিনটিকে আমি ঠিক বিশ্বাস করতে পারিনি! বারবার মনে হয়েছে শিশুর কল্পনা!’

বিস্মিত স্বরে সন্ন্যাসী জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তাই এত প্রশ্ন আপনার?’

শাড়ির আঁচলটি গায়ে টেনে বন্যা একটু ইতস্তত করে উত্তর দিল, ‘ঠিক সেই কারণে নয়, তবে ক’দিন আগে একটা স্বপ্ন’, মাঝপথে কথা শেষ না করেই চোখ নামিয়ে চুপ করে রইল।

বন্যার কথা শুনে স্নেহকণ্ঠে বেজে উঠলেন সন্ন্যাসী, ‘কী স্বপ্ন মা? খুব ব্যক্তিগত কিছু না হলে আমায় বলতে পারেন!’

মুখ তুলে নির্মলানন্দের দিকে এক মুহূর্ত তাকাল বন্যা, গাছের পাতার মধ্য দিয়ে নেমে আসা আলো এখন ওঁর মুখে, শান্ত গম্ভীর দুটি নয়ন অথচ কী করুণা স্রোতে টলোমলো, পরনের গেরুয়া বসন যেন উদাসী চৈত্র বাতাস-বন্যার মনে হল এই অকাল-বসন্তে সন্ন্যাসীর শরীরে সহস্র রুদ্রপলাশ ফুটে উঠেছে। মৃদু স্বরে বলল, ‘গতকাল ট্রেনেই বলতে চেয়েছিলাম। আপনাকে বলব বলেই আজ এখানে এসেছি!’

কোনও কথা না বলে স্থির দৃষ্টিতে বন্যার দিকে চেয়ে রইলেন সন্ন্যাসী, মুখে স্মিত হাসি। প্রায় নির্জন টিলার উপর খেলাচ্ছলে শুধু বয়ে চলেছে কাল, সে কারোর জন্য অপেক্ষা করে না, নিরন্তর বয়ে চলাই তার ধর্ম। 

 

দু-এক মুহূর্ত পর নীরবতা মুছে ধীর কণ্ঠে বন্যা বলল, ‘নর্মদা তীরে কোনও এক অচেনা ঘন অরণ্যে দুই সন্ন্যাসীকে দেখেছি আমি। নিজেদের মধ্যে তাঁরা যে কথা বলছিলেন তাও শুনেছি। একটি ভাঙা মন্দিরের চাতালে বসে ছিলেন ওঁরা’, বন্যার কথা শেষ করতে না দিয়েই নির্মলানন্দ খুব মৃদু স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ওঁরা কি বলেছিলেন ওইটি জানকী মায়ের মন্দির?’

প্রচণ্ড অবাক হয়ে উত্তেজিত গলায় বন্যা শুধোল, ‘কিন্তু আপনি কী করে জানলেন?’

কথার উত্তর না দিয়ে স্মিত হেসে এক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করলেন নির্মলানন্দ, পরমুহূর্তেই চোখ খুলে আবার প্রশ্ন করলেন, ‘দুই সন্ন্যাসী কি খেতে বসেছিলেন? রুটি, আমলকি আর দুধ? খাঁটি ঘিয়ের গন্ধে ভরে উঠেছিল বাতাস?’

ছিলাটানা ধনুকের মতো চেয়ার ছেড়ে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াল বন্যা। সন্ন্যাসীর চোখে দৃষ্টি রেখে শান্ত অচঞ্চল গলায় জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনি আসলে কে?’

ঝরা কুসুমপাতার মতো হেসে উঠলেন নির্মলানন্দ, জগতের সমস্ত মলিনতা যেন সহসা মুছে গেল সেই হাসির স্পর্শে। শিশুর গলায় বললেন, ‘আমি কেউ নই মা, দরিদ্র মানুষ, ভিক্ষান্নে দিন চলে, পূর্বাশ্রমের অর্জিত বিদ্যায় মানুষের অসুখে সেবা করার চেষ্টা করি মাত্র!’, একমুহূর্ত চুপ করে থাকার পর পুনরায় ধীর স্বরে বললেন, ‘জানকী মায়ের পায়ের কাছে আজ বহু বছর হল পড়ে রয়েছি।’

টিলার উপর রৌদ্র আর বাতাসে ঝলমল করছে সন্ন্যাসীর ক্ষুদ্র সাধন-কুটির, চরাচরে অশ্রুত আখ্যানের মতো জেগে উঠছে হেমন্তকাল। সন্ন্যাসীর কথার মাঝেই কাঁখালে এক-দেড় বছরের শিশু নিয়ে এক মা এসে দাঁড়ালেন উঠানে- অঙ্গে মলিন বসিন, মাথার চুল রুক্ষ শ্রীহীন, পোড়া কাঠের মতো শরীর যেন পাতলা চামড়া দিয়ে হাড় ক’খানি ঢাকা দিয়ে রাখা হয়েছে। শিশুটি ঘাড় নেতিয়ে কোলে প্রায় অচৈতন্যের মতো পড়ে রয়েছে, তরুণীকে দেখে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন নির্মলানন্দ তারপর বন্যার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘মা, আপনি একটু বসুন আমি একে দেখে একটু ওষুধ দিয়ে ফিরে আসছি।’

এক পলক হতদরিদ্র ওই জননীর দিকে চেয়ে বন্যা অনুমতি প্রার্থনার সুরে বলল, ‘আমিও যাই আপনার সঙ্গে?’

এক মুহূর্ত কী যেন চিন্তা করলেন সন্ন্যাসী, তারপর সামান্য হেসে বললেন, ‘আসুন!’

 

বারান্দার ওপারে প্রথম ঘরটি সন্ন্যাসীর কাজের ঘর, পাশের ঘরের দরজা বন্ধ দেখে বন্যা আন্দাজ করল ওইটি সম্ভবত নির্মলানন্দের শোওয়ার ঘর, এই ঘরে দুটি কাঠের বেঞ্চ পাতা রয়েছে, বড়ো একখানি জানলার পাশে কাঠের ছোটো টেবিলে রক্তচাপ মাপার যন্ত্র, থার্মোমিটার, স্টেথোস্কোপ, কতগুলি ডিসপোজেবল ইনজেকশন সিরিঞ্জ, ওষুধের বাক্স সুন্দর করে সাজানো, পাশে একমুঠি তাজা বেগনে রঙা অচেনা কোনও ফুল রাখা-দেখে মনে হয় কেউ যেন যত্ন করে পূজার উপচার সাজিয়ে দিয়েছে। দেওয়ালে হেলান দেওয়া টিনের লম্বা তাকে বেশ কিছু বই রাখা-বেদান্ত দর্শনের বই, একখানি যোগবাশিষ্ট রামায়ন, বিবেকানন্দ পত্র সংকলন, এছাড়া বাংলা গল্প উপন্যাসও রয়েছে কয়েকটি, কাছে গিয়ে বন্যা দেখল রবি ঠাকুরের গল্পগুচ্ছের পাশে বিভূতি রচনাবলীর দুটি খণ্ড বঙ্কিম রচনাবলীর একটি খণ্ড আর বিদেশি কোনও অচেনা লেখকের একটি পুরাতন বই রয়েছে। নামটি পড়ে চেনা মনে হলেও ঠিক বুঝতে পারল না কোথায় দেখেছে, বইটির নাম দ্য লাস্ট টেমটেশন অব ক্রাইস্ট। বন্যাকে বইয়ের কাছে দাঁড়াতে দেখে পেছন থেকে নির্মলানন্দ অল্প হেসে বললেন, ‘ওসব বহু পুরনো বই, আপনার হয়তো ভালো লাগবে না!’

পেছন ফিরে ইংরাজী বইটির দিকে ইশারা করে বন্যা জিজ্ঞাসা করল, ‘নামটা এত চেনা লাগছে কিন্তু আগে কখনও পড়িনি!’

শিশুটির বুকে পিঠে স্টেথোস্কোপ বসিয়ে মন দিয়ে কী যেন শুনলেন নির্মলানন্দ, তারপর জামা তুলে পেটের বামদিকে ডানদিক আঙুল দিয়ে টিপে দেখে বন্যার দিকে না তাকিয়েই উত্তর দিলেন, ‘আপনি সম্ভবত ছবি মানে চলচ্চিত্রটি দেখেছেন, তাই চেনা লাগছে!’

নতুন কিছু খুঁজে পাওয়ার মতো চকিতে বন্যার মনে পড়ে গেল ছবির কথা, তাই তো, পৃথ্বী দেখিয়েছিল, সন্ন্যাসীর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ মনে পড়েছে এইবার, স্করসেজের ফিল্ম!’

কোনও উত্তর না দিয়ে বন্যার পানে চেয়ে শুধু সামান্য হাসলেন নির্মলানন্দ, তারপর সন্তান কোলে বসে থাকা তরুণীকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘জ্বরটো আইছেক রেতে?’

–হঁ, শরীরটো বকনার লাগি ছঁটফঁট করছিক সারাটো রেত। মাঈ মুখেটো দেওনছেক লাই।

কয়েকমুহূর্ত চুপ করে কী যেন ভাবলেন নির্মলানন্দ, তারপর গলা তুলে জগবন্ধুকে ডাকলেন, সে দরজার কাছে এসে দাঁড়াতেই বললেন, ‘শোন, একবার এখনই বেলপাহাড়ি চলে যা, একটা ওষুধ লিখে দিচ্ছি আর একটা ইঞ্জেকশন, শিগগির নিয়ে আয়, জলদি যা।’

খসখস করে দ্রুত হাতে প্রেসক্রিপশন লিখে টেবিলের ড্রয়ার খুলে টাকা আর কাগজটি জগবন্ধুর দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘সিরিয়াস ব্যাপার, একদম দেরী করিস না পথে!’

 

জগবন্ধু বেরিয়ে যেতেই বন্যা উৎকণ্ঠিত হয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘কী হয়েছে? ও তো নেতিয়ে পড়েছে একেবারে।’

শিশি থেকে এক চামচ প্যারাসিটামল নিয়ে শিশুটির মুখে ঢেলে নির্মলানন্দ বললেন, ‘হুঁ, মনে হচ্ছে টাইফয়েড, কিন্তু এখনই জ্বরটা নামানো দরকার নাহলে কনভালশন শুরু হয়ে যাবে।’

–ঠাণ্ডা জলে স্নান করালে হয় না?

বন্যার কথা শুনে স্থির চোখে একবার মুখের দিকে তাকালেন নির্মলানন্দ, তারপর ধীর স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনি পারবেন? তাহলে আমি জল ঢালব আর আপনি দাওয়ায় ঠিক যেভাবে দেখিয়ে দেব সেভাবে কোলে নিয়ে বসবেন।’

‘পারব।’, বন্যার দৃঢ় কণ্ঠস্বর শুনে নির্মলানন্দ মনে মনে ভাবলেন, বিচিত্র তাঁর খেলা, কাকে কোন উদ্দেশ্যে যে কোথায় পাঠান তা তিনি ছাড়া আর কেউ জানেন না।

মাটির দাওয়ায় কোলে শিশুটিকে নিয়ে পা মুড়ে বসল বন্যা, বালতি থেকে মগে করে ধীরে ধীরে মাথায় জল ঢালছেন নির্মলানন্দ, বন্যা শিশুটির ব্রহ্মতালুর উপর হাত রেখেছে-হাত থেকে গড়িয়ে আসা জল মাথা বেয়ে ঝিরিঝিরি ঝর্ণাধারার মতো নেমে আসছে, মাঝে মাঝে ছটফট করছে শিশু আবার পরক্ষণেই এলিয়ে পড়ছে শরীর, অভ্যাসবশে এক-আধবার শীর্ণ বামহাত দিয়ে বন্যার স্তন স্পর্শ করছে, হয়তো খুব খিদে পেয়েছে। সকলের সামনে স্তনের উপর অচেনা স্পর্শে প্রথমে সামান্য লজ্জা পেল বন্যা, মুহূর্ত পর শিশুর মলিন মুখপানে চেয়ে ভাবল, আহা কী কষ্টই না হচ্ছে, ওইটুকু প্রাণ কেমন জ্বরের ঘোরে অসহায় পড়ে রয়েছে, হয়তো মনপটচিত্রে মায়ের মুখখানি ভেসে উঠেছে এখন, আনমনে ডানহাত পায়ের পাতায় রাখতেই চমকে উঠে নির্মলানন্দের দিকে তাকিয়ে উদ্বিগ্ন স্বরে বলল, ‘পা তো বরফের মতো ঠাণ্ডা।’

বন্যার কথা শুনে একমুহূর্তের জন্য জল ঢালা থামিয়ে নির্মলানন্দ বললেন, ‘একবার পেটে হাত দিয়ে দেখুন তো।’

জামা তুলে পেটে হাত দিয়ে বন্যা ব্যাকুল গলায় বলল, ‘ঠাণ্ডা, বেশ ঠাণ্ডা।’

‘পালস? পালস দেখুন শিগিগির’, বলেই খেয়াল হল বন্যা নার্স নয়, নিজেই বালতি মগ ফেলে উবু হয়ে বসে পাখির পালকের মতো কবজির উপর আঙুল রাখলেন।

শিশুটির মা অদূরে দাওয়ার উপর বসে রয়েছে, চোখের দৃষ্টি কেমন ম্রিয়মান, ক্লান্ত শরীরটি যেন জগত সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন, হেমন্ত বাতাসে পলাশ গাছ থেকে দু-একটি শুকনো পাতা খসে পড়ছে আপনমনে, মঞ্চের উপর বৃত্তাকার আলোর মতো আকাশ হতে একফালি রোদ্দুর নেমে এসেছে শিশুর মুখে, চোখ দুটি বন্ধ, নাক থেকে গড়িয়ে আসা সর্দি আর ধুলো লেগে রয়েছে সারা মুখে, রুক্ষ তেলহীন ভেজা চুলগুলি কেমন যেন মৃত কুসুমদলের মতো লেপ্টে আছে সারা মাথায়, দু-এক মুহূর্ত পর বন্যা উদ্বিগ্ন স্বরে সন্ন্যাসীকে জিজ্ঞাসা করল, ‘কী হল?’

–পালস খুব ক্ষীণ, মনে হয় প্রেশার ফল করেছে, স্যালাইন দিতে হবে এখনই।

–আছে আপনার কাছে স্যালাইন?

পরাজিত সৈনিকের মতো মাথা নিচু করে নির্মলানন্দ বললেন, ‘না, নেই।’

–তাহলে? কী হবে এখন?

–বিপদে মাথা ঠাণ্ডা রাখুন মা, আমি নুন-চিনি মিশিয়ে জল নিয়ে আসছি, আপনি মুখে খুলে খাওয়াবেন, খাওয়াতেই হবে।

 

নির্মলানন্দ প্রায় দৌড়ে ঘরে চলে যেতেই একমুহূর্তের জন্য নিজেকে ভারি অসহায় মনে হল বন্যার, যেন এই জগতে আপনার জন বলতে তার কেউ নাই, কতকাল এভাবেই মাটির দাওয়ায় শিশুপুত্র কোলে নিয়ে বসে রয়েছে-দিন আসে তারপর সন্ধ্যার গর্ভে মিলিয়ে যায়, কত খর চৈত্র দ্বিপ্রহর পার হয়ে বর্ষা আসে, সোঁদা গন্ধে ভরে ওঠে চরাচর…ওই সুবাসও একসময় মুছে যায় কালচক্রে, মলিন সন্ধ্যায় আকাশপ্রদীপ জ্বালিয়ে কোন দূর জগতে নিজ গৃহ ফিরে যায় হেমন্ত বালিকা, তারপর জীর্ণ শরীরে জরার মতো নেমে আসে বিগতযৌবনা শীতকাল…অচৈতন্য শিশুটির মাথা নিজের আঁচলে মুছে দিতে গিয়ে দেখে শাড়ির একপাশ ভিজে সপসপে, ভেজা আঁচল দিয়েই যত্ন করে মুখ মুছিয়ে দিয়ে বুকের কাছে শিশুটিকে জড়িয়ে ধরল হঠাৎ, অদূরে মা নির্বিকার বসে আছে, ভুবনডাঙা তখন রৌদ্র আর বাতাসের রিনিঝিনি নুপূরের শব্দে বিভোর। 

 

গেলাস আর চামচ বন্যার দিকে এগিয়ে নির্মলানন্দ বললেন, ‘কয়েক চামচ অন্তত খাওয়ানোর চেষ্টা করুন।’

বামহাতে মুখটি কোনওক্রমে হাঁ করিয়ে এক চামচ নুন-চিনি জল দিতেই কষ বেয়ে গড়িয়ে চিবুকের উপর নেমে এল, আরও বারদুয়েক চেষ্টার পরেও না খাওয়াতে পেরে অসহায় মুখে নির্মলানন্দের দিকে তাকিয়ে বন্যা শান্ত স্বরে বলল, ‘ঠোঁটদুটো খুব ঠাণ্ডা।’

 

দ্রুতহাতে নাড়ি দেখে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকলেন সন্ন্যাসী, তারপর উঠে ধীর পায়ে উঠানের একপাশে গিয়ে সামনে রৌদ্র ঝলমল মালভূমির দিকে চেয়ে রইলেন, হয়তো কোনও পুরাতন কথা তাঁর মনে সেই মুহূর্তে ভেসে উঠেছিল।

দুই নারী অদূরে নির্মলানন্দের সাধন কুটিরের দাওয়ায় বসে রয়েছে, আসলে দুইজন নয়, তিনজন, ভেতরের ঘরে সীতা দেবীও রয়েছেন, বন্যার কোলে দরিদ্র বালক তখন পরম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়েছে, সকল সূতা কেটে আকাশগঙ্গার পারে বেড়াতে যাওয়ার আগে তার কি খুব খিদে পেয়েছিল? কে জানে!

 

তিনি যে কত প্রসন্না, বালককে নিজের কোলে তুলে নিয়েছেন এইবার, কৃপাময়ী হয়তো সকল বাসনাপাশ ছিন্ন করবেন এখনই অথবা হয়তো আবার নিয়ে আসবেন তাকে এই ভবনদীর কুলে, যেমন তাঁর ইচ্ছা, সঙ্গী নিয়ে ঘুঁটি সাজিয়ে না বসলে যে ইচ্ছাময়ীর খেলা জমে ওঠে না!

  চিত্রকর: শুভ্রনীল ঘোষ                                   পরের পর্ব :  আগামী মাসের দ্বিতীয় শনিবার

সায়ন্তন ঠাকুর, গদ্যকার, সরল অনাড়ম্বর একাকী জীবনযাপনে অভ্যস্ত। পূর্বপ্রকাশিত উপন্যাস নয়নপথগামী ও শাকম্ভরী। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ, বাসাংসি জীর্ণানি।  

 

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More