জর্জ ফ্লয়েডের স্মৃতি আগলে মিনেয়াপোলিসের রাস্তায় পরিজনরা, মিছিলে পা মেলাল বিশ্ব

0

দ্য ওয়াল ব্যুরো: গত বছর ২৬ মে। ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডে শিউরে উঠছিল যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা। কোনও জঙ্গি হানা নয়, খাস মিনেপলিসের বুকে ৪ জন পুলিশ অফিসারের নৃশংসতায় প্রাণ গেছিল এক কৃষ্ণাঙ্গ যুবকের। নাম তাঁর জর্জ ফ্লয়েড। পৃথিবী মনে রেখেছে সেই নাম। জর্জের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে ঘনিয়েছিল হাজারো প্রশ্ন! একবিংশ শতাব্দীতেও মানুষ বর্ণবিদ্বেষের শিকার, কোথায় মানবতা!

মার্কিন প্রশাসনের প্রতি চরম ঘৃণায় সেদিন দিকে দিকে ধিক্কার উঠেছিল। মানুষ স্লোগান দিয়েছিল, ‘আমরা শ্বাস নিতে পারছি না!’ ঠিক যেমন করে মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে বারবার বলেছিলেন ৪৫ বছরের জর্জ। কিন্তু সেদিন শ্বাস নিতে দেওয়া হয়নি তাঁকে। পুলিশ অফিসার ডেরেক শোভিনের হাঁটু একটানা ৮ মিনিট চেপে বসেছিল জর্জের গলায়। দুমড়ে মুচড়ে নিজের গাড়ির পাশে পড়ে থেকে থেকে একসময় নিথর হয়ে যান জর্জ। কী তাঁর অপরাধ? সেটা তেমন প্রমাণিত নয়। আসল অপরাধ তাঁর চামড়াটা কালো।

জানা যায়, মিনেয়াপলিসের রাস্তার একটি দোকানেই এক প্যাকেট সিগারেট কিনতে গেছিলেন জর্জ। সেই দোকানে প্রায়ই যেতেন। কিন্তু ঘটনাচক্রে দোকানের মালিক সেদিন ছিলেন না। সহকারী এক কর্মী জর্জের হাত থেকে ২০ ডলারের নোট নিয়ে বলেন সেটা জাল! এদিকে জর্জ পাত্তা দেন না। সদ্য কেনা সিগারেটের প্যাকেটও ফেরত দেন না। এতেই ক্ষেপে যায় দোকান কর্মী। সঙ্গে সঙ্গে পুলিশে খবর দিতেই পুলিশ চলে আসে। আর তারপরই পৃথিবী প্রত্যক্ষ করে সেই মর্মান্তিক পৈশাচিক সাজা।

অপরাধের সততা বিচার না করেই জবরদস্তি জর্জকে গাড়িতে তুলতে চেয়েছিলেন পুলিশ অফিসাররা। জর্জ তাতে প্রতিবাদ জানালে তাঁকে রাস্তায় ফেলে গলায় পা তুলে দেন অফিসার ডেরেক। সেভাবেই একসময় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিলেন জর্জ। পৈশাচিক বর্বরতায় ঘটনাস্থলেই কেঁদে ওঠেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। বাধা দিতে এসেও কনও লাভ হয়নি। তিন খানা পুলিশের গাড়ি আর এতজন অফিসার মিলে ততক্ষনে ঘিরে রেখেছেন জর্জকে। পথচারীদের কেউ কেউ সন্তর্পণে গোটা দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করেন।

অত্যাচার চলছিল জর্জের নিথর দেহের ওপরও। তখনও পা সড়াননি অফিসার। শেষে স্বাস্থ্যকর্মীরা এসে জর্জের নিথর দেহ উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। একঘণ্টার মধ্যেই তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়। জনতার প্রতিক্রিয়ায় অবশ্য নড়েচড়ে বসে মিনেসোটা বিচার বিভাগ। অভিযুক্ত পুলিশ অফিসার ডেরেকের বিরুদ্ধে তিন ধারায় খুনের মামলা রুজু হয়। দেরিতে হলেও সাজা পান বাকি অফিসাররাও। কিন্তু তাতে কী শিক্ষা হয় মানবতার? আজও জানা নেই জর্জের পরিজনদের।

তাঁরা এদিন রাস্তায় নেমে জর্জের স্মৃতিতে তুলে ধরলেন অগণিত প্ল্যাকার্ড। তাতে লেখা, ‘ কালো হলেও আমরা মানুষই’। জর্জের উচ্চারিত শেষ শব্দগুলো মনে রেখে তাঁরা বললেন, শ্বাস নিতে চাই, এই শহরে। এই পৃথিবীতে। জর্জের পারিবারিক সেই পদযাত্রায় এদিন পা মেলালেন আরও অনেক নাগরিক।

গত সেপ্টেম্বরে জর্জের স্মৃতিতে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গড়ে তোলা হয়। জর্জ ফ্লয়েড মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশন। শহরের আনাচে কানাচে যদি কোথাও বৈষম্যের ফণা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে, মানুষ যেখানে অপমানিত হন তাঁর জাত কিংবা চামড়ার রঙের জন্য, সেখানেই পৌঁছে যায় এই সংগঠনের সদস্যরা। চলতি সপ্তাহে জর্জের সম্মানে বেশ কয়েকটি কর্মসূচির আয়োজন করেছে জর্জ মেমোরিয়াল। চলছে তার প্রস্তুতি।
ওয়াশিংটনের মানবাধিকার কর্মী আল শার্পটন বললেন, জর্জ কেবল পুলিশ অফিসারের হাঁটুর তলায় পিষে মরা একটা কালো মানুষ নন। চোখে আঙুল দিয়ে প্রশাসনের বর্বরতা এবং সমাজিক বৈষম্যের ব্যাধি তুলে ধরেছিলেন তিনি। ইতিহাস তাঁকে সেভাবেই মনে রাখবে।

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.