শুভেন্দু যদি গদ্দার হন…

প্রতিবারই ভোটের সময় নানা আজগুবি কথা শোনা যায়। এবারও শোনা যাচ্ছে। সবাইকে যেন ছাপিয়ে গিয়েছেন তৃণমূলনেত্রী। দ্বিতীয় দফার ভোটপর্বের আগে তিনি রীতিমতো একখানি বোমা ফাটিয়েছেন।

নন্দীগ্রামে ভোট আগামী বৃহস্পতিবার। ওটা এবার খুব গুরুত্বপূর্ণ আসন। মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী খোদ সেখানে প্রার্থী। বিপরীতে আছেন শুভেন্দু অধিকারী। যাঁকে বিরোধী শিবিরের একজন বড় সেনাপতি বলে ধরা যায়। এই শুভেন্দুর বিরুদ্ধেই মমতা বিস্ফোরক অভিযোগ করেছেন।

মাননীয়ার দাবি, ২০০৭ সালের ১৪ মার্চ শিশির অধিকারী ও শুভেন্দু অধিকারীরাই নন্দীগ্রামে পুলিশ ডেকে এনেছিলেন। তাঁদের অনুমতি ছাড়া সেখানে পুলিশ ঢুকতে পারত না।

এই মন্তব্যের পরে রাজ্য-রাজনীতিতে বড় ধরনের চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। শুভেন্দু অধিকারী তাঁর প্রাক্তন নেত্রীর মন্তব্যকে হতাশার বহিঃপ্রকাশ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। কিন্তু বিতর্ক তাতে থামছে না। সুযোগ বুঝে তৎপর হয়ে উঠেছে সিপিএম। তাদের বক্তব্য, মুখ্যমন্ত্রীর কথাতেই প্রমাণ হচ্ছে, সেদিন নন্দীগ্রাম নিয়ে চক্রান্ত হয়েছিল।

২০০৭ সালে বামফ্রন্ট সরকার নন্দীগ্রামে কেমিক্যাল হাব তথা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের উদ্যোগ নিতেই গন্ডগোল শুরু হয়। ওই বছরের ৩ জানুয়ারি নন্দীগ্রামের গড়চক্রবেড়িয়ার কালীচরণপুরে নয় নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতে জমি অধিগ্রহণের নোটিশ টাঙানো হয়। তারপরেই এলাকার মানুষ ক্ষেপে ওঠেন। ৬ জানুয়ারি সাঁইবাড়িখ্যাত বিনয় কোঙার নন্দীগ্রামবাসীদের উদ্দেশে হুংকার দেন, লাইফ হেল করে দেব! তারপর থেকে কৃষকদের সঙ্গে সিপিএম ক্যাডারদের সংঘর্ষ চলতে থাকে।

১১ মার্চ ব্রিগেডে প্রাদেশিক কৃষকসভার সমাবেশে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যও রীতিমতো হুমকির সুরে কথা বলেন। তার আগে তমলুকে জেলাশাসকের অফিসে বসে স্থির হয়েছিল, নন্দীগ্রামে পুলিশ ঢুকবে। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রসচিব প্রসাদরঞ্জন রায়ও বলেছিলেন, ঘরছাড়াদের ফেরাতে ও নন্দীগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পুলিশ ঢুকবে।

১৪ মার্চ সকালে খেজুরি ও সোনাচূড়ার মাঝে ভাঙাবেড়া ব্রিজের নীচে অনেকে জড়ো হয়েছিলেন। সেখানে চাঁদোয়া খাটিয়ে গৌরাঙ্গ পূজা হচ্ছিল। ন’টা বেজে ৪০ মিনিট নাগাদ ভাঙাবেড়া ব্রিজের ওপরে পুলিশ জড়ো হয়। সেখান থেকে শুরু হয় ফায়ারিং। সরকারি হিসাবমতো ১৪ জন নিহত হন। স্থানীয় মানুষ অভিযোগ করেন, অনেক দেহ লরিতে, ট্রাকে করে পাচার করা হয়েছে। কেউ কেউ নাকি পুলিশের দলের মধ্যে ‘চটি পরা’ পুলিশও দেখেছিলেন। তাঁদের ধারণা, ওরা সিপিএমের ক্যাডার। পুলিশের পোশাক পরে হামলা করতে এসেছিল।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই পুলিশি হানার সঙ্গে অধিকারী পরিবারের যোগসাজশ আবিষ্কার করেছেন। কিন্তু কীভাবে তা সম্ভব? পুলিশি অভিযানের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল খোদ রাজ্য সরকার। অধিকারীরা কি তখন সরকারে ছিলেন। পুলিশ কেন তাঁদের অনুমতি নেবে?

এক্ষেত্রে একটা নৈতিক প্রশ্ন উঠতে বাধ্য।

মাননীয়া নাকি জানতে পেরেছিলেন, ১৪ মার্চের গণহত্যার পিছনে অধিকারী পরিবারের সম্মতি ছিল।

তা যদি জানতেনই, এতদিন বলেননি কেন?

শুধু তাই নয়, শুভেন্দু অধিকারী, শিশির অধিকারী ও সেই পরিবারের আরও কয়েকজনকে ভোটের টিকিট দিয়েছিলেন কেন? তাঁদের তৃণমূলে উঁচু উঁচু পদ দিয়েছিলেন কেন?

নন্দীগ্রামের সময় থেকে শুভেন্দু রাজ্যে বড় নেতা হয়ে ওঠেন। পরবর্তীকালে মাওবাদী অধ্যুষিত জঙ্গলমহলে শান্তি ফেরানোর কাজে তাঁর বড় ভূমিকা ছিল। একসময় সশস্ত্র মাওবাদীদের ভয়ে রাজনীতিকরা জঙ্গলমহলে ঢুকতেই সাহস পেতেন না। তখন নেত্রীর আদেশে শুভেন্দু সেখানে যান এবং রাজনৈতিক কার্যকলাপ শুরু করেন। সেজন্য কেন্দ্রে তৎকালীন ইউপিএ সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চিদম্বরম ও গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রী জয়রাম রমেশ শুভেন্দুর বিশেষ প্রশংসা করতেন।

তারও পরে শুভেন্দু সাংগঠনিক ক্ষমতার পরিচয় দিয়েছেন। একসময় মালদহ, মুর্শিদাবাদ, উত্তর দিনাজপুরে তৃণমূলের কোনও সংগঠন ছিল না। ২০১৬-র ভোটে মালদহে তো তৃণমূল একটাও আসন পায়নি। সেখানে নেত্রী দলের সংগঠন গড়ে তোলার জন্য পাঠিয়েছিলেন শুভেন্দুকে।

সেই শুভেন্দু দল ছাড়ার পরেই হয়ে গেলেন গদ্দার। মাননীয়া নাকি আগে থেকেই জানতেন, শুভেন্দু আদৌ নির্ভরযোগ্য নন। তাহলে তাঁকে এত দায়িত্ব দিয়েছিলেন কেন? তিনি কি জেনেশুনে গদ্দারের ওপরে নির্ভর করেছিলেন?

আর সিপিএমেরও এত উল্লসিত হওয়ার কী আছে বোঝা গেল না। তারা বলছে, ‘ষড়যন্ত্রের কুটিল চিত্রনাট্য’ তৈরি হয়েছিল। প্রশ্ন হল, কে কার সঙ্গে ষড়যন্ত্র করেছিল? আক্রমণ করল বুদ্ধদেবের পুলিশ আর ষড়যন্ত্র করল অন্যে? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা শুনলে তো মনে হয়, পুলিশ তথা সরকার অধিকারী পরিবারের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে নন্দীগ্রামে জমি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে হামলা চালিয়েছিল।

সিপিএম নেতারা বিপাকে পড়লেই ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব খাড়া করেন। যেন আলিমুদ্দিনের পলিতকেশ নেতারা সব শিশুর মতো সরল। কারও বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেন না। তাঁরা শুধু ভাল ভাল কাজ করতে চেষ্টা করেন আর দুষ্টু লোকেরা তাঁদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করে।

সিপিএম নেতারা মানুষকে এও বিশ্বাস করাতে চান যে, সুশান্ত ঘোষ, দীপক সরকার, তপন-শুকুর প্রমুখ হরিণশিশুর মতো নিরীহ। আসলে মানুষকে তাঁরা বড্ড বোকা ভাবেন।

যে দল মানুষকে বোকা ভাবে তাদেরই পতন হয়। সিপিএম ওই জন্য ডুবেছে। এখন তৃণমূলনেত্রী যেভাবে অধিকারী পরিবারকে গদ্দার প্রমাণ করতে চাইছেন, তাতে মনে হয়, তিনিও ওই ভুলটি করছেন।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More