হামাস বাহিনীর অস্ত্র ভান্ডারে মিসাইল আছে প্রচুর, নেই কৌশলগত গভীরতা

দ্য ওয়াল ব্যুরো: ইজরায়েল, প্যালেস্তাইন সংঘাতে আলোড়িত বিশ্ব। হামাস জঙ্গি গোষ্ঠীর রকেট হামলার প্রত্যুত্তরে লাগাতার বিপুল শক্তি দিয়ে গাজা ভূখণ্ডে তীব্র আক্রমণ চালায় ইজরায়েলি সেনাবাহিনী। হতাহত হয় অসংখ্য প্যালেস্তিনীয় নাগরিক। তুলনামূলক বিচারে ইজরায়েলের শক্তি অনেক বেশি। তাদের বিমানবাহিনী, অস্ত্রবাহী ড্রোন ও চরবৃত্তি মাধ্যমে শত্রুশিবিরের খবর জোগাড় করার নেটওয়ার্ক খুবই জোরদার। যার জোরে যখন খুশি তারা গাজার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। তাদের দাবি, তাদের টার্গেট গাজার শুধুমাত্র সেইসব এলাকা যেগুলি সামরিক উদ্দেশে ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু ঘটনাচক্রে প্যালেস্তিনীয়দের ঘন জনবসতি, হামাস ও ইসলামিক জিহাদ গোষ্ঠীর ঘাঁটিগুলি তার বেশ কাছে হওয়ায় এবং অনেক সময় সেগুলি নাগরিক বাসস্থানের তলায় ভূগর্ভে অবস্থিত হওয়ার ফলে ইজরায়েলি হামলায় সাধারণ বাসিন্দাদের প্রাণহানি অনিবার্য হয়ে ওঠে।
হামাস, ইসলামিক জিহাদের সেই তুলনায় শক্তি কম, কিন্তু ইজরায়েলকে আঘাত করার মতো যথেষ্ট শক্তি তাদেরও আছে। নানা কলাকৌশল তাদের। ইজরায়েলি প্রতিরক্ষাবাহিনী গাজা থেকে ইজরায়েলে ঢোকার চেষ্টা করা একটি ড্রোনকে গুলি করে নামায়। ড্রোনটি সম্ভবত অস্ত্রবাহী ছিল। ইজরায়েলি সামরিক মুখপাত্রের দাবি, কোনও এলিট হামাস শাখা গাজার দক্ষিণ দিক থেকে সুড়ঙ্গপথে ইজরায়েলে ঢোকার চেষ্টা করেছিল। সম্ভবত, ইজরায়েলি গুপ্তচর বিভাগ আগেভাগে সেখবর পেয়ে গিয়ে সুড়ঙ্গটা বিস্ফোরণে উড়িয়ে দিতে সক্ষম হয় বলে জানান মুখপাত্রটি।
এখনও পর্যন্ত প্যালেস্তিনীয়দের অস্ত্রভান্ডারের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার তাদের নানা ধরনের ভূমি থেকে ভূমিতে আঘাত করার শক্তি রাখা মিসাইল। মিশরের সিনাই থেকে চোরাপথে কোরনেট চালিত ট্যাঙ্ক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র সহ এইসব মিসাইলের বেশ কিছু নিয়ে আসা হয়েছে বলে খবর। তবে গাজা খাড়িতেই সচল ও তুলনামূলক ভাবে অত্যাধুনিক অস্ত্র নির্মাণ ঘাঁটি থেকে বেশিরভাগ সমরাস্ত্র পায় হামাস ও ইসলামিক জিহাদ গোষ্ঠী। ইজরায়েলি ও বাইরের নানা দেশের বিশেষজ্ঞদের বিশ্বাস, এই অস্ত্র নির্মাণ শিল্প গড়ে তোলায় ইরানের প্রযুক্তি ও সহায়তার বড় ভূমিকা রয়েছে। সেজন্যই ইজরায়েলি হামলার টার্গেট ছিল অস্ত্র নির্মাণ কেন্দ্র ও তা মজুত রাখার ঘাঁটিগুলি। প্যালেস্তিনীয়রা নানা বৈচিত্র্যে ভরা মিসাইল ব্যবহার করছে। এগুলির কোনওটাই মৌলিক নকশার মাপকাঠিতে একেবারে নতুন বলে মনে হয় না। কিন্তু মিসাইলগুলির পাল্লা বাড়ানো ও তাদের আরও বেশি বিস্ফোরক বহনে সক্ষম করে তোলাই প্যালেস্তিনীয়দের ভাবনা। জানা গিয়েছে, হামাসের হাতে কাসাম (১০ কিমি বা ৬ মাইল দূর পর্যন্ত টার্গেটে আঘাত করতে সক্ষম), কাডস ১০১ (১৬ কিমি পর্যন্ত লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করতে সক্ষম)-এর মতো স্বল্প পাল্লার প্রচুর মিসাইল আছে। আর আছে গ্রাড সিস্টেম (৫৫ কিমি পর্যন্ত দূরের টার্গেটে আঘাত করতে পারে), সেজিল ৫৫। আর আছে প্রচুর গোলাবারুদ। তবে হামাসরা এম-৭৫, ফজর, আর-১৬০, এম ৩০২ এর মতো দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সিস্টেমও ব্যবহার করে। এগুলির কোনওটার ৭৫ কিমি, কোনওটার ১০০ কিমি, ১২০ কিমি পর্যন্ত দূরের টার্গেটে আঘাত হানার শক্তি আছে। এম-৩০২ ২০০ কিমি পর্যন্ত দূরের টার্গেটে হামলা করতে পারে। সুতরাং জেরুসালেম, তেল আভিভ-দুই জায়গাতেই হামলা করার মতো অস্ত্র হামাসের আছে, যা ইজরায়েলি জনসংখ্যার এক বড় অংশ ও তাদের নানা গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোর সামনে বিপদ হতে পারে।

ইজরায়েলি সেনার বক্তব্য, গত কয়েকদিনে ইজরায়েলের ওপর আছড়ে পড়া হাজারের বেশি রকেটের মধ্যে প্রায় ২০০টা গাজা খাড়ির মধ্য়েই পড়ে গিয়েছে, বেশি দূর যেতেই পারেনি। এটা সম্ভবতঃ প্রমাণ করছে যে, দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি অস্ত্র নির্মাণ প্রক্রিয়া বেশি কাজ দেয় না। ইজরায়েলি ডিফেন্স ফোর্স বলেছে, ইজরায়েলে ঢুকে পড়া সব মিসাইলের ৯০ শতাংশকেই তাদের আয়রন ডোম অ্যান্টি-মিসাইল সিস্টেম রুখে দিয়েছে।
ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মোকাবিলায় সীমিত উপায় আছে। অ্যান্টি-মিসাইল প্রতিরোধী সিস্টেম চালু করা, শত্রুপক্ষের অস্ত্রের মজুত করা ঘাঁটি, নির্মাণকেন্দ্রগুলিকে পাল্টা নিশানা করা, সমতলে অভিযান চালিয়ে মিসাইল হামলাকারীদের পিছনে হটিয়ে দেওয়া। কিন্তু সেটা প্যালেস্তিনীয়দের পক্ষে সম্ভব বলে মনে হয় না। কেননা তাদের কৌশলগত গভীরতা নেই। অতীতে ২০১৪ সালে গাজায় ইজরায়েলের সর্বশেষ বড়সড় অভিযানে ২২৫১ জন প্যালেস্তিনীয় নিহত হয়েছিল। এদের ১৪৬২ জনই সাধারণ নাগরিক। উল্টোদিকে মাত্র ৬৭ জন ইজরায়েলে সেনা জওয়ান ও তাদের ৬ জন নাগরিক প্রাণ হারিয়েছিলেন। সামগ্রিকভাবে এই রকেট হামলা, তার পাল্টা আঘাত, আগ্রাসন-এতে কোনও পক্ষেরই তেমন লাভ হয় না। বড়জোর কোনও এক পক্ষ কিছুটা অ্যাডভান্টেজ পেতে পারে। অনেকে বলতে পারেন, চলতি সংঘাতের সূত্রপাত জেরুসালেমের টেনশন থেকে। ফের দেখা গেল, ইজরায়েল-প্যালেস্তাইন সংঘাত চিরকালের জন্য এড়িয়ে যাওয়ার বিষয় নয়।

Leave a comment

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More