‘বিনা চিকিৎসায় মরলেন বাবা, আপনারা কি শুধু ভোট চাইতে আসেন?’ তরুণীর প্রশ্নে নগ্ন ঝাড়খণ্ডের কোভিড-পরিস্থিতি

দ্য ওয়াল ব্যুরো: হাজারিবাগ থেকে রাঁচি। সড়কপথে মেরেকেটে ১০০ কিলোমিটারের কাছাকাছি পথ। মঙ্গলবার রিঙ্কুর কাছে সেটাই অন্তহীন যাত্রার মতো ঠেকছিল। অ্যাম্বুলেন্সে কোভিড আক্রান্ত বাবা। হাজারিবাগের সমস্ত হাসপাতালে ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই দশা। বাধ্য হয়ে তাঁকে নিয়ে রাঁচির সদর হাসপাতালে রওনা দেয় রিঙ্কু।

ঘটনার পরের ছবিটা তুলে ধরলে এক বছর আগের স্মৃতি উস্কে উঠবে। হাসপাতালে আক্রান্তদের ভিড়, শয্যার ঘাটতি, বেড না পেয়ে রোগীকে এক হাসপাতাল থেকে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া, বেড পেলে ডাক্তারের দেখা না পাওয়া—গত বছরজুড়ে এটাই ছিল সারা দেশের পরিচিত ছবি।

রিঙ্কু স্বপ্নেও ভাবেনি, এই সংকটের আঁচ একদিন তাকেও পোহাতে হবে। বছর তিরিশের মেয়েটা যখন সদর হাসপাতালের গেট ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে, একের পর এক চিকিৎসকের খোঁজে মাথা ঠুকে যাচ্ছে, তখন তার দিকে ফিরেও তাকায়নি কেউ। না, বাবাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে পারেনি রিঙ্কু। একশো কিলোমিটারের দীর্ঘ পথ উজিয়ে আসা বৃথা। বৃথা বাড়ির লোকেদের বলা সান্ত্বনাবাক্য। বাবাকে সুস্থ করে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারেনি রিঙ্কু। বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন তিনি।

শোকে-দুঃখে-হতাশায় ভাষা হারিয়ে ফেলেছিল রিঙ্কু। সেই সময় কোভিড ওয়ার্ডগুলির হালহকিকত পরিদর্শনে এসেছিলেন রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী বান্না গুপ্তা। তাঁকে দেখে ক্ষোভে ফেটে পড়ে সে। প্রশ্ন তোলে, ‘এতক্ষণ ধরে ডেকে গেলাম, একজন চিকিৎসকও এলেন না। আধ ঘণ্টা এভাবেই কাটল। আপনারা কি শুধুই ভোট চাইতে আসেন?’

এটা কোনও প্রতীকী কিংবা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং, কোভিডের প্রথম ধাক্কায় দেশের স্বাস্থ্য পরিকাঠামো যে কিছুই বদলায়নি, তার প্রমাণ ধরা পড়েছে এতে। ঝাড়খণ্ডের কোভিড-পরিস্থিতিও বাকি রাজ্যগুলির মতো উদ্বেগ বাড়িয়েছে। সরকারি হিসেব বলছে, গত তিন সপ্তাহে রাজ্যজুড়ে রেকর্ড সংক্রমণ হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের প্রায় ৯০ শতাংশ আইসিইউ বেড ইতিমধ্যে ভর্তি।

গত ২১ দিনে ঝাড়খণ্ডে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ১৪৪ জন। হাজার সক্রিয় রোগীর সংখ্যার একলাফে ১৫ হাজার পেরিয়েছে। মঙ্গলবারও ২৯ জন কোভিড রোগী মারা গিয়েছেন বলে খবর।

এদিকে গোটা বিতর্কে নিরপেক্ষ তদন্তের আশ্বাস দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের সিভিল সার্জেনকে রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে৷ সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বান্না গুপ্তা বলেন, ‘বাবা মারা যাওয়ার পর মেয়েটির কান্না দেখে আমি দুঃখিত। তদন্তের নির্দেশ দিয়েছি।’

যদিও সরকারি গাফিলতির সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রাজ্যের স্বাস্থ্যসচিব কমলকিশোর সোয়ান। তিনি জানান, আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার বিষয়টি মাথায় রেখে রাজ্যজুড়ে হাসপাতালের পরিকাঠামো ঢেলে সাজা হয়েছে। রাজেন্দ্র ইন্সটিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেস হাসপাতালে বেডের সংখ্যা বেড়েছে। জরুরি ভিত্তিতে সদর হাসপাতালে অক্সিজেন সিলিন্ডার আনা হয়েছে। যদিও আগামী কয়েক মাসে কোভিড আরও ভয়াবহ চেহারা নিলে তা মোকাবিলা কঠিন হতে চলেছে। তাই পরিস্থিতির আগাম চেহারা তিনি অতিরিক্ত স্বাস্থ্য সচিব সহ ড্রাগস কন্ট্রোলার অব ইন্ডিয়াকে চিঠি লিখে পাঠিয়েছেন।

হাসপাতালের পরিকাঠামোর উন্নতির পাশাপাশি প্রয়োজন রোগী সনাক্তকরণ। সেটাও প্রচুর সংখ্যায়। তাই গণহারে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য উপযুক্ত সংখ্যক আরটি-পিসিআর ও কোবাস মেশিনের বরাত দিয়েছেন সোয়ান। তিনি বলেন, ‘আগে ঝাড়খণ্ডে একটিও পিসিআর ল্যাব ছিল না৷ এখন সেটাই সাতে গিয়ে পৌঁছেছে। এই প্রতিটি ল্যাবরেটরিতে দিনে ১২ হাজার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়।’

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More