নিজের জীবনের অন্ধকার পার করে শিক্ষার আলো জ্বালছেন জ্যোৎস্না দিদিমণি

মৃন্ময় পান

খড়ের চাল রোদ-বর্ষায় ক্ষয়ে গেছে কবেই। দেওয়ালও ভাঙতে ভাঙতে প্রায় শেষ পর্যায়ে। সেই ফুঁটিফাটা ঘরের দাওয়ায় প্রতিদিন জাতীয় সঙ্গীত গেয়ে ওঠে ওরা। তারপর শুরু হয় পড়াশোনার পাঠ। কখনও ‘এসেছে শরৎ হিমের পরশ’ আবৃত্তি করে। কখনও ‘তিন এককে তিন, তিন দুগুণে ছয়’। এ ভাবেই শিক্ষার আলো মাখে একেবারে প্রান্তিক পরিবারের কচিকাঁচারা। তাদের জ্যোৎস্না দিদিমণির কাছে।

শহরের ব্যস্ত পথঘাট, নামীদামি কোচিং সেন্টারের বাইরে এ এক অন্য জীবন। পাত্রসায়র ব্লকের হামিরপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের পারুলিয়া গ্রাম। এখানে রোজ সকালে খোলা আকাশের নীচে ভাঙা দাওয়ায় জড়ো হয় একরাশ কচিকাঁচা। বিয়ের পর থেকেই বছর ৫০ ধরে বাচ্চাদের পড়িয়ে আসছেন তিনি। স্বামী গোপাল সেনগুপ্তর সহযোগিতাও ছিল। এখন অবশ্য তিনি বেঁচে নেই। একমাত্র মেয়েরও বিয়ে হয়ে যাওয়ার পরে তিনি আর তাঁর বৃদ্ধা জা একসঙ্গে থাকেন কেবল।

জ্যোৎস্নার কাছে প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ নিয়ে এই পিছিয়ে থাকা এলাকার অসংখ্য ছাত্র ছাত্রী আজ জীবনে প্রতিষ্ঠিত। তাঁরাই সত্তরোর্ধ্ব জ্যোৎস্না দিদিমণির অহঙ্কার।

একসময় সব ছিল। ঘর ছিল, পরিবার ছিল। কিন্তু আজ একরকম নিঃস্ব। পরিবারের কেউ আজ আর জীবিত নেই। যে ঘরের দাওয়ায় শিক্ষাদান শুরু করেছিলেন সে ঘরও এখন ফুটিফাটা। ঝোপজঙ্গলে ঢেকে আছে চারপাশ। ঘর সারানোর সামর্থ্য নেই। আশেপাশের মানুষের দয়ায় কোনও রকমে চলে পেট।

কেউ ডাকে দিদিমা, কেউ ঠাকুমা, কেউ বা বড়মা। টাকাপয়সার কোনও মাপকাঠি নেই, যে যা দেয় তাই নেন তিনি। এক এক দিনে দু-তিন ব্যাচ করেও পড়ান তিনি।

দেখুন, জ্যোৎস্নার কাহিনি।

ভাঙা ঘরের দাওয়ায় রোজ পড়তে আসে এলাকার প্রায় ৩০ -৩৫ জন কচিকাঁচা। কড়া রোদ যদি বা সহ্য হয়, বৃষ্টি নামলে আর উপায় থাকে না কোনও। তাঁর কথায়, ‘‘শুধুমাত্র ভাল লাগা থেকেই তিরিশটা বছর ছাত্র ছাত্রীদের পড়াশোনা করিয়ে আসছি। তবে বাড়ির সমস্যা এখন ভাবায়, যদি হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে ঘরটা, যদি সাপখোপ বেরিয়ে ছোবল মারে কাউকে, এ সব চিন্তা করি সারাক্ষণ।’’

 

গ্রামের বাসিন্দা শান্তি গোপাল ভট্টাচার্য বলেন, ‘‘আর্থিক দিক থেকে পিছিয়ে পড়া পরিবারের ছেলে মেয়েদের উনি সম্পূর্ণ বিনা পয়সায় পড়াচ্ছেন। এই ছবিটা আমরা গত তিরিশ বছর ধরে দেখে আসছি। ওঁর বাড়িটা বর্তমানে ভগ্নস্তুপে পরিণত হতে চলেছে। একটি বাড়ি তৈরি হলে এই বৃদ্ধার মাথা গোঁজার মতো একটু ঠাঁই যেমন হবে, তেমনি নিরাপদে পড়াশোনার সুযোগ পাবে বাচ্চাগুলো।’’

জ্যোৎস্না দিদিমণির সঙ্গেই গোটা গ্রাম তাকিয়ে আছেন সে দিকে। আপাতত মানুষের ভালবাসাই সম্বল তাঁর। দারিদ্রের সামনে নত না হয়ে লেখাপড়ার বীজ ছড়িয়ে চলেছেন একমনে। শক্তিময়ীর প্রতীক তিনি।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More