রবিবার, ফেব্রুয়ারি ২৪

তিন বছর ধরে লড়ে, একাই অরণ্য গড়ে, প্রকৃতিকে ফিরিয়ে দিলেন জমি!

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

পেশায় তিনি ওয়াইল্ডলাইফ ফোটোগ্রাফার। সেই সঙ্গে ট্যুর অপারেটর হিসেবেও কাজ করতেন। কিন্তু নেশায়, আরণ্যক। ভালবাসেন গাছপালা, পশুপাখি, পোকামাকড়। আর এই অরণ্যের প্রতি তাঁর তীব্র ভালবাসা শুধু চোখে দেখে বা ছবি তুলেই শেষ হয়নি। নিজে হাতে বানিয়ে ফেলেছেন আস্ত একটা জঙ্গল! আর সেখানেই আর পাঁচ জন অরণ্যপ্রেমীর থেকে আলাদা হয়েছে কর্নাটকের পমপায়া মালেমাথ।

কর্নাটকের হসপেট থেকে ১১ কিলোমিটার দূরে কমলপুরে, মাত্র তিন বছর আগেও জায়গাটা ছিল আবর্জনার স্তূপ। ওই এলাকাতেই পারিবারিক সূত্রে বেশ কিছু জমি-জায়গা ছিল পমপায়ার। কাজের সূত্রে তিনি নানা জায়গায় থাকলেও, কমলপুরে যাওয়া-আসা প্রায়ই ছিল তাঁর। তখনই এক সময় মনে হয়, আবর্জনায় ভরে থাকা ওই জায়গাটায় যদি কয়েক জনের থাকার ব্যবস্থা করা যায়। মানুষের জন্য নয়। তবে পশুপাখি, গাছপালা, পোকামাকড়দের জন্য।

তত দিনে ওয়াইল্ডলাইফ নিয়ে কাজ করার সুবাদেই পমপায়া জেনেছেন, সারা পৃথিবী বিপন্ন। গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের আঁচে হু হু করে পুড়ছে সভ্যতা। গাছপালার প্রাচুর্যই একমাত্র সমাধান, যা দিয়ে পাঁচানো যাবে প্রাণিকূলকে।

“আমি প্রথমে স্থানীয় প্রশাসনের কাছে প্রস্তাবটি নিয়ে গিয়েছিলাম। কারণ জমিটা তো আমার নয়, তাই আমি নিজের ইচ্ছেয় কিছু করতে পারি না। তবে ওই জমির কাছেই আমার জমিজমা ছিল, আমি জানতাম ওখানে চাষ ভাল হয় না। তবে গাছ তো হতে পারে! সেটাই বলি প্রশাসনকে।”– বললেন পমপায়া। প্রশাসন সে প্রস্তাব সমর্থন করলেও, তা কাজে পরিণত করতে এগিয়ে আসেনি।

পমপায়ার কথায়, “স্বপ্ন যখন আমি দেখেছিলাম, তখন কেউ এগিয়ে না এলেও তা পূরণ আমাকেই করতে হতো। তাই লেগে পড়লাম।” প্রথমে অনেকটা সময় চলে যায়, গোটা জমি থেকে সমস্ত আবর্জনা সরাতে। তত দিনে জমিটা সবাই চিনে ফেলেছেন আবর্জনা ফেলার জায়গা হিসেবে। ফলে এক হাতে যতই সাফাই করেন পমপায়া, অন্য দিকে ততই তা ভরতে থাকে। শেষমেশ কয়েক মাসের চেষ্টায় ফাঁকা হয় জমি। কিন্তু তখন সে মাটির যা অবস্থা, কোনও গাছই বাঁচছে না। ফলে আবার নতুন লড়াই। দু’ফুট গভীর করে গোটা জমি খুঁড়ে ফেলেন পমপায়া। তার পরে নতুন, ভাল মাটি এনে ফের ভর্তি করেন সেই জমি।

এর পরেই শুরু হয় নানা রকম গাছ লাগানো। তবে একেবারে একা হাতে একটা আস্ত অরণ্য নির্মাণ করা যে খুব সহজ নয়, তা বুঝেছিলেন তিনি। তাই এলাকায় তাঁর পরিচিতিকে কাজে লাগিয়ে পঞ্চায়েত ভোটে দাঁড়ান পমপায়া।  জিতেও যান। তার পরেই গোটা এলাকা জুড়ে শুরু করেন সচেতনতা প্রচার। সকলকে বোঝান, সারা দুনিয়ার যা পরিস্থিতি, তাতে গাছপালা কতটা জরুরি। বোঝান, অরণ্যের অভাবে কত পশুপাখি ঘর হারাচ্ছে, মারা যাচ্ছে, বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এবং এ সব কিছু বিলুপ্ত হয়ে গেলে মানুষও টিকবে না শেষমেশ।

পঞ্চায়েতে নির্বাচিত হওয়ার পরে অরণ্য দফতরের সঙ্গেও যোগাযোগ সহজ হয় পমপায়ার। তত দিনে বেশ কিছু গাছ লাগিয়ে ফেলেছেন পমপায়া। তাঁর কাজ দেখে খুশি হয়ে অরণ্য দফতর থেকে বিনামূল্যে গাছের চারা দেওয়া হয় তাঁকে। গাছগুলিতে জল দেওয়ার জন্য এলাকার মানুষ তাঁদের কুয়ো ব্যবহারের জন্য খুলে দেন।

“বছর তিনেক লেগে ছিলাম। এখন প্রায় হাজার খানেক গাছ ঘিরে রয়েছে জায়গাটাকে। অরণ্য হয়ে উঠেছে আস্ত। বাসা বেঁধেছে ৭০ রকমের পাখি। আছে শ্লথ ভালুক, চিতাবাঘ, উদবিড়াল।”– বলেন তৃপ্ত পমপায়া। জঙ্গলের মাটি এমন ভাবে ফুটো ফুটো করে রাখা হয়েছে, যাতে সারা বছর জল ধরে রাখে মাটি। গ্রীষ্মেও শুকিয়ে না যায়।

পমপায়া জানান, এই তিন বছরে তাঁর পকেট থেকে তিন লাখ টাকা খরচ হয়েছে এই জঙ্গলের পেছনে। তবে শুধু জঙ্গলেই থামেননি তিনি। জঙ্গলের গা ঘেঁষে গিয়েছে সরকারি জল সরবরাহের একটি পাইপ। হঠাৎই তাতে ফাটল দেখা যায়। প্রচুর জল নষ্ট হতে থাকে।  প্রশাসনকে জানান পমপায়া। তিনি বলেন, “ওরা সব শোনে, কিন্তু ফাটল সারানোর জন্য গা করেনি। তখনই আমি ঠিক করি, জঙ্গলেই একটা পুকুর করব। ওই নষ্ট হওয়া জল কাজে লাগিয়েই।”

আবারও যেমন ভাবা তেমন কাজ। খোঁড়া হয় গভীর পুকুর। জলের পাইপের ফাটল থেকে বেরোনো জল এনে ফেলা হয় সেখানে। চাষ করা হয় মাছ। তবে এক দিন ঘটে যায় আশ্চর্য এক বিষয়। হঠাৎ দেখা যায় দু’টি ছোটো কচ্ছপ। পমপায়া বলেন, “ওই দিন আমার আনন্দ বাধ মানেনি। নিজেকে সব চেয়ে বেশি সফল মনে হয়েছিল। মনে হয়েছিল, আমি এটাই চেয়েছিলাম। জঙ্গল-জল মিলে একটা আস্ত বাস্তুতন্ত্র গড়ে উঠুক, যেখানে প্রাণীরা ঘর বাঁধবে স্বেচ্ছায়।”

পমপায়ার মতে, লাখ লাখ গাছ পোঁতাটাই একমাত্র সমাধান নয়। কিন্তু একটি শিশুকে যেমন যত্ন করে বড় করতে হয়, এক একটা ছোটো গাছকেও তাই। চারা অবস্থা থেকে সময়, পরিশ্রম, ভালবাসা দিয়ে তাকে যত্ন না করলে, তবেই তা বড় হয়ে প্রকৃতিকে সমৃদ্ধ করে। “আমি বলব, খরচ করে দামি-দামি গাছ নয়, সকলেই নিজের এলাকার পরচিত গাছ চিহ্নিত করুন, তার পর সেগুলোরই চারা জোগাড় করে পুঁতে, যত্ন করে বড় করুন। নিজের এলাকায় সব চেয়ে ভাল বাড়বে গাছ। একটা গাছই পুঁতুন বা ১০০টা, সকলের যথাযথ যত্ন করাটা খুব জরুরি।”

পমপায়ার কাজের প্রশংসা ছড়াতে শুরু করেছে নানা জায়গায়। সকলেই বলছেন, তিন বছরে একার চেষ্টায় আস্ত এক অরণ্য– এ যেন অসাধ্য সাধন করা! ৫০ বছরের পমপায়া অবশ্য বলছেন, “এ সব কিছুই নয়। ওটা প্রকৃতিরই জমি ছিল, মানুষ নষ্ট করছিল। আমি প্রকৃতিকে ফিরিয়ে দিলাম কেবল।এমনটাই হওয়ার কথা।”

আরও পড়ুন…

বন্ধ্যা বলে একঘরে করেছিল সমাজ! আট হাজার সন্তানের মা হয়ে পদ্মশ্রী পেলেন সেই থিম্মাক্কা

Shares

Comments are closed.